এই সংখ্যায় ২৫ কবির সাতাশটি কবিতা । লেখকসূচি - ইন্দিরা দাস, সৌমিত্র চক্রবর্তী, সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য, বিদিশা সরকার, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, মৈনাক সেনগুপ্ত, কৌশিক চক্রবর্তী, রেজওয়ান তানিম, ঋকপর্ণা ভট্টাচার্য, রিয়া চক্রবর্তী, মিলি মুখার্জী, অনুপম দাশশর্মা, জয়া চৌধুরী, ব্রতীন বসু, মৃন্ময় চক্রবর্তী, অদিতি চক্রবর্তী, রূপক সান্যাল, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, অসিতবরন চট্টোপাধ্যায়, দর্শনা বোস, মতিন বৈরাগী, ব্রততী সান্যাল, বিনতা রায়চৌধুরী, পার্থ রায় ও সর্বাণী রিঙ্কু গোস্বামী ।

             সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

সদ্য প্রয়াত লোকসঙ্গীত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে দিল্লি প্রবাসী কবি ইন্দিরা দাস লিখেছেন কবিতাটি । দিল্লির বাঙালি সমিতি কৃত কবিতাটির সঙ্গীতায়ন সম্প্রতি দিল্লি বইমেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত ও সমাদৃত হয়েছে । ইন্দিরার কবিতাটির মধ্য দিয়ে অন্যনিষাদপ্রয়াত শিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে ।





বন্ধু চললে কতদূর

সহজিয়া পথটা ধরে চললে কতদূর
দোতারা রয়েছে পড়ে, ভুলে গেছ  যন্ত্র তোমার
তবু বুঝি ভরে দেবে অজানা সে আরশিনগর
এবার তোমার সুর
বন্ধু চললে কতদূর

পীর-ফকিরের ভাষা, রশিউদ্দিন
হাসনরাজা, রাধারমণ গাইতে চিরদিন
মাঝিগান, কীর্তনেতে, বিহু, শালবনে
ছন্দ তোমার রইল মনে, ভাষায় সুমধুর
সহজিয়া পথটি ধরে, বন্ধু চললে কতদূর

এমন কথা ছিল না তো, গান ছিল বাকি
কাছাড়ের সোনার মানুষজীবন দিল ফাঁকি
তবু জেনো 'দোহার' তোমার, খনি' শ্রমিকগান
অবিনাশী রইবে হেথায় ভরাবে যে প্রাণ
তোমার কথা 'ভুবনমাঝি' কইবে চিরদিন
তোমার স্মৃতি প্রাণের মাঝে রইবে যে ভরপুর

বন্ধু যতই বা যাও দূর



সিরিজ কবিতা

সুচেতনা তোমাকে -

হেমন্ত আঁতুড় শেষে ঘরে ফিরে গেছে
সদ্যোজাত মেয়ে ধান - ছেলে ধান
মাঠ কাঞ্ছিতে পড়ে থাকা অবোধ মৃত সন্তান
আর কিছু বেবশ ভুলে ফেলে যাওয়া
কচি কচি হাতে খুঁটে তুলে নেয় আঁচলের
ক্ষুদ্র সঞ্চয়ী আমানত,
তিন তালাকের অবশ্যম্ভাবী ছেনাল রোদ্দুরে
পুড়ে যাওয়া সিক্ত যৌবন মাঠকোঠার গোপণ
কুলুঙ্গিতে রেখে ব্যস্ত কাঠের উনুন
আগামীর মুখে কুমারী ভাতের যোগানে।
অসুস্থ বিকার ছাপ পিঠের খোলা আকাশে
লটকে চলে গেছিল যে পেয়াদার দল
তারা আজ খোদ অ্যাসাইলামে গরাদ ঝাঁকায়,
কচি কচি অনাথ ধানের শিশুমুন্ড নিবিড় হাসিতে
শুধু তোমার আঁচলপ্রান্তে অচানক সূর্য হয়ে যায়।
আমি চিত্রাংগদা,রাজেন্দ্রনন্দিনী

যা কিছু আটপোউরে
সব তুমি অনন্য করেছ
পিতা।
আমার সব অসোউন্দর্য
ভালোবাসা,
ভ্রম
তুমি অসংগত
প্রমাণ
করেছ অবলীলায়।
বুঝিয়েছ সমবেদনা নয়
সংগও নয়
মাথার ওপরে তুলতে হবে
মুষ্টিবদ্ধ হাত।
জগত স্বতন্ত্র
মন সম্পূর্ণ
ভিক্ষার অঞ্জলি
তোমার জন্য নয়।
পিতা,
আমি জানি
জগতের অর্থ-ভিক্ষামুষ্টি
একটি প্রার্থনা
একটা রোদন
আর গোটাকতক ক্ষুধার
অসম্পূর্ন বিবরণ
আসলে সূর্যরশ্মি পান করার
অনন্ত পিপাসা
আমার মধ্যে
সেই কবেই তো আমাদের
দুই ভাইবোনের হাতে
তুমি ধরিয়েছ লাল পতাকা
স্কন্ধে রং তুলির বোঝা
করেছ
দেওয়াল লেখার
সংগী
দুনিয়ার মজদুর এক হও।
পাভেল বলেছিল,
শোন,
"
আমি তো কোনদিন ভুলি নি তোমায়
চিত্রাংগদা বললেই মনে পড়েছে
তোমার মুখ
তোমার নাচ
তবুও
নাচঘর থেকে অনেক দূরে
রেখেছি চেয়ার
পিতঃ
দুরুদুরু বক্ষ আমার
তুমি বলিবে
ধিক ধিক
বলিবে তর্পণে কালিমা নীল
ইন কিলাব জিন্দাবাদ
পিতা,
আমি যে ক্রিষ্ণবর্ণা
আমি ভিখারিনী


চিত্রাংগদা প্রিয় বান্ধবী

অনন্ত আকাশে মেঘ
তুমি ওড়ালে
অঞ্চলে কাব্যি গাথা
তোমার মানবীর
প্রেম
শুধু
বায়বীয়
বাকিটা মানবিক
ধান ক্ষেত জুড়ে
কুয়াশা ছড়ায়
টুংটাং শব্দ ফোটে
গাং নদীটির
বুলন্দ দরোয়াজার
পাখোয়াজ
সুর
তোমার কিংখাবে
চিত্রাংগদা
তুমি ই অঙ্গার
তুমি ই সমুদ্দুর
নতমুখ

তোমার
কেমন চাওয়া
ত্রিতীয় পান্ডবে
মুক্তি
প্রেম
বন্ধন
সাতপাক
পরজন্মে দেখার
এ জন্মে প্রস্তুতি
তুমি বড্ড
অস্থির

চিত্রাংগদা প্রিয় বান্ধবী


খাদ্য সম্মেলন

আসন্ন মন্বন্তরের জন্য সঞ্চয়ের মজুত আংশিক তোমার জন্যেও
অন্নপূর্ণা আজ মড়কের কথা বলবে না
 নগরপালের না-মঞ্জুর,
পেল্লাই দরজার অনুশাসন অথবা
 মুখোমুখি দরজা জানলা সম্পর্কিত সচেতনতা আপনাদের জন্যেও ঢালাও সুব্যবস্থা
 খাদ্য সম্মেলনের অন্তর্দেশীয় ডাকপত্রে
 আপনাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে --

পূজায় ধুপ ধুনো আবশ্যিক নয়
 দেদার আনন্দের শেষে পড়ে থাকা টিস্যু পেপারে
 মধ্য বয়স্কার মুছে যাওয়া রঙ
 মালাইকারির গন্ধ দিয়ে ভাত মেখে তুলে দেবে
 অন্ধকারের আত্মকথা ---


পিতৃহীন এই সমাজ ব্যবস্থায় মাতৃত্ব অভুক্তই থাক
সামান্য এগিয়ে এসো

উষ্ণতা থেঁতলে যাচ্ছে কেউ তার পায়ে নীল চাপ চাপ

অসম্পাদিত ভুল রাস্তা । হাতে অলৌকিক শব্দের দস্তানা ।

প্রতিধ্বনি বলতে গিয়ে কেউ যেন মুখ ভেংচে আমাকেই ডেকে উঠল ।

হাওয়া যতখানি আপন হতে পারে ততটাই আগুন বিমুখ। বিপন্ন

অহংকার থেকে সামাজিক গন্ধের নির্বাসন আমাকে দিও না । বরং

ধ্বনির আঁধার ডিঙিয়ে সামান্য এগিয়ে এসো
দাড়িয়ে আছে আমার কৈ‌শোর

অস্তরা‌গে ভিজ‌বি মু‌ন্নি‌পি‌সি ? উদ‌য়ের প‌থে যাতায়াত অ‌নেক তো হল !
আন‌কোরা রাত ছুঁ‌য়ে দে‌খিস ভালবাসাচাঁদ রোজ ডু‌বে যায়
মেঘলানদী‌তে । সমর্প‌ণে ভে‌ঙে যায় দীর্ঘ উপোস - এসব পুরাণগাথা আজ ।
মন‌কেম‌নের দুপু‌রে নির্জন অলিগলি ঘু‌রিস কখনও ,
ঘুঘুর ডাক আর ক্লান্ত শা‌লিক ছাড়া কেউ থা‌কে না কোত্থাও ।
‌বি‌কে‌লে পা দি‌লে য‌দি  ভুল ভে‌ঙে যায়  দে‌খিস 
তোর উপ‌ছে পড়া দী‌ঘিতে আকন্ঠ দাঁ‌ড়ি‌য়ে আছে আমার কৈ‌শোর ।

কুয়াশার আদর মাখ‌তে মাখ‌তে

কুয়াশার আদর মাখ‌তে মাখ‌তে কো‌নো‌দিন ঘু‌মি‌য়ে দে‌খিস , তোর
আর রা‌তের মা‌ঝে যেন কো‌নো স্বপ্নের চাঁদোয়া - দোল খায়
নিজস্ব বাতা‌সে । যার হাত ধরার কেউ নেই , তারও তো আদর ছুঁ‌তে ভাল লা‌গে ।
মজা নদীর একলা মা‌ঝি‌কে দে‌খিস , যে পথ পে‌রো‌নো যায় পা‌য়ে পা‌য়ে
প্রাণপ‌ণে দাঁড় টা‌নে তবু । ভো‌রের আজা‌নের কা‌ছে ফি‌রে যে‌তে চায় ,
ফি‌রে যে‌তে চায় ঘুমন্ত সন্তা‌নের কাছে ;
তার কো‌নো গ্রাম নেই,শুধু স্মৃ‌তি আছে ।
তুইও কি গ্রহান্ত‌রের স্মৃ‌তির শরী‌রে বাসা বাঁধ‌লি মু‌ন্নি‌পি‌সি ?
মৃ‌তের নগ‌রে ?
ঋতুবর্ণ

প্রেম আবর্তে সার্থক ক্ষত দিয়ে
সবার মতোই করেছো অস্বীকার,
স্বপ্নেরা একা নীল আশকারা বয়ে
বশ্যতা খোঁজে আমার রাতভাঙার!

শহর আজ-ও আড়াল করেই দেখে
শ্রাবণ নাহয় ভেজায় ঘরের আলো,
কত উস্কানি তোমার দুহাত বয়ে
মান করেছিল, জানবে গ্রীষ্মকালও!

আমি তো চাইনা বৃষ্টির পর্দায়
সব ধুয়ে যাক, দৃষ্টি কিংবা শোকে,
প্রেমের জন্য আর যেকদিন জাগি
সত্ত্বা হারাক নির্বিষ শর্তকে!

পাখির সঙ্গে মিথ্যে সাহস নিয়ে
চলার মন্ত্রে নতুন নতুন সাজো,
বুকের ত্রাণেই সময় স্মরণ নিলে
এ কোন স্পর্শে ঘুম ভেঙে যায় আজও?

বিচার আসে না, ফেরে শুধু বন্ধকী -
শরতের দান ফেরে বসন্ত এলে,
নিয়মের কাছে বাঁচতে শিখেও যেমন
মুক্তোর প্রাণ ঝিনুকের আবডালে!

পণবন্ধু

জীবন বলে যারে ডাকিস, সে তোর ডাক শোনে বিশ্বাসে?
জন্ম বলে যারে প্রকাশ করিস নিষ্ঠুর গতিমালার রূপে
সেও কি তার সাহস রাঙায় খোলা মাঠে, বিধির বারোমাস্যায়?
কে আসলে স্থায়ী? একা শুধু ভঙ্গুর নয়-
সমস্ত জীবন জুড়ে যার সাথে কথা বলতে চেয়ে পৃথিবীর সম্মতি চেনা
মিশে গিয়ে বিনাশের আশ্বাসে, সেও আজ আড়াল খোঁজে-
আমি তাও কথা বলতে চাই, চাই তার পণবন্ধু সেজে!

তবে কি মিথ্যে সব প্রসঙ্গ, আভরণ, মৃত্যুর ভয়?
যার শরীরে লেগে থাকে ধ্বংসের ক্ষয়, লোককথার আগুন
সে করেনি কখনো ভগ্ন ছায়ামালার দিকে একরাশ গন্ধর্ব নির্মাণ!
এখনো প্রশ্ন জাগে, কে তার তীর্থের কাছে
রয়েছিল ত্রিসন্ধ্যা, বিবর্ণ সভ্যতা সেজে...
আমি শুধু ডেকে গেছি সকাল, সন্ধ্যে, দুপুর গড়িয়ে রাত-
তবু কোন বিত্তের আড়াল থেকে জন্ম নেয়নি গর্ভজাত শোধ, ভীষণ সহজে-
আমি তাও কথা বলতে চাই, চাই তার পণবন্ধু সেজে!

যেটুকু নিহিত ছিল জীবনযাপন হয়ে দৈন্যতার ভারে,
সেই শুধু অমরত্বের দায় নিয়ে সদর্পে তৃপ্ত একা!
আমি কার কাছে শোনাতে চাই বিহিতের শব্দ?
কার ছন্দে ভোলাতে চাই বধ্য হওয়া সম্বন্ধগুলো?
মিথ্যে সব, মিথ্যে যত গ্রহণীয় উপকরণসময়
জ্বলন্ত বশ্যতার জন্য আজও কেউ জন্মায়, বর্ণিত অন্ধকারের লাজে-
আমি তাও কথা বলতে চাই, চাই তার পণবন্ধু সেজে!

ভালোবাসা বয়ে যায় আপন খেয়াল হলে,
যেদিকে তাকাই, শুধু স্পর্ধিত, অস্থির কিছু গম্ভীর মান্যতার ভিড়ে
মিশে যায় যত অনিষ্ঠের দাসত্ববোধ!
যে আজ একাই ঢেকে গেছে কিছু নির্বাক অরণ্যের মাঝে-
আমি তাও কথা বলতে চাই, চাই তার পণবন্ধু সেজে!
আমি একা কথা বলতে চাই, চাই এই নগ্ন সমাজে!
 হেমলক

শঙ্কাহীন অন্ধকার 
আমাকে গ্রাস করবার আগে
আমি চুমুক দিয়ে পান করি, নির্ভাবনার বীজমন্ত্র!

হে বিষাদ! 
করুণ সৌম্য বিষাদ-
মেঘের কপালে আদরের তিলক আঁকার আগে
আমাকে দিয়ে যেও যথেষ্ট হেমলক।


ত্রিশঙ্কু   

এতো কথা বলে যেতে কবিতার আড়ালে আড়ালে
তোমাকেই খোঁজাখুঁজি,অনিবার চলে।
তারা কেউ কবিতা হয়না,কোনওদিন।
আড়াল টানতে গেলে--অঞ্জলি মেশে জলে।
অথচ,তুমিও,পাওনা তাদের --
সেইসব ঠিকানাহীন চিঠি---
কবিতা হতে পারে,ভেবে,যারা,
রাজপথে পিকেটিং সেরে,
অনায়াসে কাদামেখে মেখে...
সাঁতরেছে অন্ধকার গলি!
তারা কেউ কবিতা হয়নি।
তারা কেউ চিঠিও হয়নি,কোনওদিন।
অথচ প্রেরক কিম্বা প্রাপক
উভয়েই আজ ও,দেখো,ঠিকানাবিহীন। 



About