‘অন্য নিষাদ’ বিশেষ সংখ্যা ‘স্বাধীনতা তুমি’

লেখক সূচী : কবিতা - নন্দিতা ভট্টাচার্য , শৌভিক দা’ , আহমেদ মুনীর, চৈতালি গোস্বামী, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, দীপিকা রায়, এবিএম সোহেল রসিদ, মৌ মধুবন্তী ও সুনন্দ দত্ত
প্রবন্ধ – শ্রী শুভ্র , শৌনক দত্ত তনু ও রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

সম্পাদকীয়

 '' স্বাধীনতা তুমি পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন
স্বাধীনতা তুমি উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন
স্বাধীনতা তুমি বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ
স্বাধীনতা তুমি বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার
স্বাধীনতা তুমি গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম ।
স্বাধীনতা তুমি খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা
খুকুর অমন তুলতুলে গালে রৌদ্রের খেলা
স্বাধীনতা তুমি বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা
স্বাধীনতা তুমি যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা ''

প্রথাগত সম্পাদকীয় লেখার বদলে প্রয়াত কবি শামসুর রহমানের সেই বিখ্যাত কবিতা থেকেই উদ্ধৃতি দিলাম । এর বেশি আর কিই বা বলার আছে- এই সংখ্যার শিরোনামইতো ‘স্বাধীনতা তুমি’

         সংখ্যাটি প্রকাশ করতে পেরে ‘অন্য নিষাদ’ গর্বিত বোধ করছে । একাত্তরের বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা শুধুমাত্র একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের গঠন ও তাড় ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয় – বিশ্বের ছাব্বিশ কোটি মানুষের ভাষারও স্বাধীনতা, আর তা নিয়েই এপার-ওপার এক হয়ে যাওয়া ।
প্রকাশিত তিনটি নিবন্ধে একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাসকে ফিরে দেখার পাশাপাশি স্বাধীনতা পরবর্তী ভাঙ্গা-গড়া ও আজকের প্রজন্মের ভাবনাকেও ছুঁয়ে গেছি । ‘অন্য নিষাদ’এর শুভানুধ্যায়ী পাঠক মন্ডলীর পাঠ-প্রতিক্রিয়া আশা করছি । 


রাষ্ট্র ঘুমিও না , জাগো

রাষ্ট্র ঘুমিও না , জাগো
অনেক দিন ডেকেছ নাক , কুম্ভকর্ণ
মানুষ দিয়েছে সময়
আর নয় আর নয় ,

মুষ্টিবদ্ধ শাহবাগ
ঝরনা হয়েছে আজ
বেড়ি নেই পায়ে তার
সেজেছে আগুন সাজ ,

ভাষা মেখেছে বাংলা
স্বাধীনতা সাজ বাংলা
পথ দেখিয়েছে বাংলা
পথ দেখাবেই বাংলা ,

মাতৃভাষায় এনেছে জোয়ার
অন্ধ ধর্মে পেরেক হাজার .........

মশাল জ্বালাবে দুনিয়ার চোখে
দুর্নিবার দুর্নিবার ..................

এ বসন্ত

এ বসন্তে শিমুল পলাশ
রক্তচন্দন তিলক
এ বসন্তে দখিনা বাতাস
রক্তের পিচকারি
এ বার বসন্ত উৎসব
গলায় মুণ্ডমালা
এ বার বসন্ত উদাসীন
খরা দহন জ্বালা
এ বার বসন্ত পুর্নিমায়
কলঙ্ক মালা গাঁথা ...। 




 শোয়াইব ও মেহ্‌জাবীনকে –

অবাক লাগে...
এই ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইলের দেশে
এই অসভ্য বর্বর নোংরা স্বদেশে
এই মৃত্যুপুরীতে, সাম্প্রদায়িক পরিবেশে- 
তোরা ভালই আছিস !!!

তোরা ভাল আছিস -- যাবতীয় হত্যা-মৃত্যু-গুম অস্বীকার করে -
যেভাবে কিছু ফুল তবুও ফোটে, পাখিরা ওড়াওড়ি করে,
কিছু মানুষ বেঁচে থাকে স্বচ্ছল আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে -
এইভাবে ভাল থাকুক সমস্ত প্রাণ ও প্রাণের উপকরণ।
ভাল থাকুক এই দেশ ও মাটি, পাহাড় ও বনবাসী, বিরাগী বাউল।

তোরা ভাল থাক্‌ যেভাবে ভাল থাকে শব্দহীন রাত, তারার উপমা।
এইসব শত্রু-শত্রু খেলা, রাজনীতি, মুদ্রাস্ফীতি, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে
দূরে থেকে সহস্র মাইল, তারার কুটিরে, স্বমহিম আপন সংসারে।
টোনাটুনি হয়ে বেঁচে থাক্‌ নিজেদের মত করে -

তোদের নিশ্ছিদ্র সুখ পাহারা দেবে কিছু সশস্ত্র তরুণ,
সামরিক সাজোয়া যান টহল দেবে রাতভর, উত্তাল শ্লোগান,
মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত রাজপথ পাহারা দেবে তোদের ও তোদের আগামী প্রজন্মের।

নির্ভাবনায় বেঁচে থাক্‌ প্রজাপতি ও গোলাপ। তোদের সুনীল সৌন্দর্য নিয়ে।
তোদের কোল আলো করে আসুক আগামী বাংলাদেশ !!



‘মুক্তিসেনার স্বাধীনতা তুমি অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে চোখের ঝিলিক’!


      শামসুর রাহমানের এই কালজয়ী বাণী সত্য করে অর্জিত স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর অতিক্রান্ত! অনেক ভাঙ্গাগড়া উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের বাংলাদেশ! কবি জীবিত থাকলে আজকেও কি বলতেন "উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ"?   

তিরিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আজ তো অনেক পরিণত! বিশেষ করে দীর্ঘ দুইদশকের সামরিক শাসনের অবসানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র আজ অনেকটাই সুপ্রতিষ্ঠিত! এই বিয়াল্লিশ বছরে, যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক ভাবে আজ অনেকটাই সুগঠিত! বাঙালির জীবন যাপনের মানও অনেক উন্নত হয়ে উঠেছে আগের থেকে!

বিগত বিয়াল্লিশ বছরে বাংলাদেশে যতটা অর্থনৈতিক উন্নতি ঘঠেছে তার সিংহ ভাগের দখল নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের অধিকারে রাখতেই বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলির মধ্যে নিরন্তর রাজনৈতিক লড়াই চলেছে! আর সাধারণ জনসাধারণের মধ্যে সুযোগ সন্ধানী সুবিধাবাদী শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে নানান ভাবে সংযুক্ত থেকে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে সদা ব্যস্ত! মাঝখান থেকে কপাল পুড়ছে বাকিদের, যারাই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ! মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম মূল্যবান, ঘোষিত একটি লক্ষ্য ছিল; সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা! অর্থাৎ দেশে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিকাঠামো থাকবে যেখানে ধনবন্টনের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য থাকবে সমাজের সকল শ্রেণীর মধ্যে!
             
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আরও একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ছিল! সেটা হল রাষ্ট্র পরিচালনায় সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার শপথ! দুঃখের বিষয় এইদুইটি প্রতিশ্রুতিই বঙ্গবন্ধুর হত্যার ষড়যন্ত্রের সাফল্যের সাথে সাথেই নির্বাপিত করা হয়! ফলে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় বিয়াল্লিশ বছরে রাষ্ট্রীয় পোষকতায় মুক্তিযুদ্ধের এইদুইটি মূল বিষয়কে অপ্রাসঙ্গিক করা হয়েছে! যার প্রভাব দেশের প্রতিটি ছোট বড়ো বিষয়ের উপর পড়েছে নানা ভাবে! স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছরে কিভাবে এই প্রভাবগুলি আজকের বাংলাদেশকে রূপ দিয়েছে সেইটি বুঝতে গেলে একটু ফিরে তাকাতে হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে, যে ইতিহাসের সলতে পাকানো শুরু হয় বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকারে!

বাহান্নর ভাষা আন্দোলন জাতির মধ্যে যে সর্বাত্মক উন্মাদনার সৃষ্টি করে তার পিছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ ছিল পাক প্রশাসনের বলপূর্বক উর্দু চাপিয়ে দেওয়া, যার ফলশ্রুতি সরাসরি জীবন জীবিকার উপর এসে পড়েছিল! ফলত মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার থেকেও বড়ো হয়ে উঠেছিল জীবিকার প্রশ্ন! রাতারাতি উর্দু না শিখলে উপার্জন বন্ধ! সেখান থেকেই গড়ে ওঠে মাতৃভাষার অধিকারের দাবি! ঠিক তেমনই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাক সামরিক বাহিনীর অত্যাচার থেকে বাঁচার সংগ্রাম! অত্যাচার ঐ পর্যায় না গেলে জাতি স্বাধীনতার জন্য কতটা প্রস্তুত ছিল সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর মধ্যেও কিছু দ্বিধা ছিল! যে কারণে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি!

এইরকম পরিস্থিতিতেই বাহান্ন থেকে একাত্তর অব্দি সময়সীমায় জাতির একটি বড়ো অংশের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও স্বাধীন বাঙালি জাতীয়তার উন্মেষ গড়ে উঠল গভীর ভাবে! উল্টোদিকে উর্দু আরবী জানা পাকপন্থী বাঙালিরা ইসলামের দোহাই দিয়ে জাতির অন্য অংশকে কেবলমাত্র মুসলিম পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট থাকল ভীষণ ভাবে! মুক্তিযুদ্ধ শুধু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধেই ছিল না! ছিল এই পাকপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও! এই মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির চেতনায় বাংলাদেশের জাতীয়তা বাঙালি হলে তা অনেকটাই ভারতেরও অংশ হয়ে যায়! তাই এই জাতীয়তাকে ইসলামিক রূপ দিতে পারলেই পাকিস্তানী বশংবদ হয় থাকা যায় ভেবে এরা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী!

ঠিক এইপরিস্থিতিতে নয়মাসের মুক্তিযুদ্ধও একরৈখিক ছিল না! একদিকে মার্কিণ মদতপুষ্ট পাক সামরিকবাহিনী ও তার রাজাকার আলবদর আলশামস প্রভৃতি সহোযোগী দেশীয় দালালগোষ্ঠী! আর অন্যদিকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ভরপুর আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক মুক্তিবাহিনী! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে তীব্র দলাদলি মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ঠেলে দেওয়ায় সচেষ্ট ছিল! কারণ দেশ মুক্ত হলে ক্ষমতার অধিকার কার ভাগে কতটা থাকবে তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল! বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে কারান্তরালে! এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের সুদক্ষ প্রশাসনিক দৃঢ়তাই মুক্তিযুদ্ধকে লক্ষ্য চ্যুত করেনি! ফলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ ছিল না! ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির রেষারেষি, আওয়ামী লিগের অভ্যন্তরে অন্তর্দ্বন্দ্ব, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতালোভী সেনা নায়কদের উচ্চাকাঙ্খা এবং পাকপন্থী মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মৌলবাদী শক্তির নিরন্তর ষড়যন্ত্র! এরই মধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জনমোহিনী নেতৃত্ব যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে দাঁড় করানোর শপথ নিল! পাকিস্তান ৪৭ এর পর গোটা বাংলাদেশকে প্রায় ছিবড়ে করেই রেখেছিল! তারপর ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা! মানুষ তবু ভেবেছিল এবার সুদিন আসবে! কিন্তু খুন হওয়া দেশীয় অর্থনীতিকে রাতারাতি চাঙ্গা করা কোনো ম্যাজিকেও সম্ভব ছিল না! দেশের এই টালমাটাল অবস্থার সুযোগেই সুযোগসন্ধানী বিভিন্ন পক্ষ সময়ে শান দিতে থাকে! বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্বার্থে সর্বাত্মক মদতদাতা ছিল মার্কিণ সাম্রাজ্যবাদ তার সেই সময়ের সহযোগী শক্তি গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে সাথে নিয়ে! কিউবার মিসাইল ক্রাইসিসের সদ্য পরবর্তী সেই সময়ের দুই বিশ্বশক্তির ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ময়দানেও রাষ্ট্রপুঞ্জে প্রভাব খাটিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বানচালের সবরকম প্রয়াস করে মার্কীণ শক্তি! যুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহন আটকাতে ২৭শে নভেম্বর বঙ্গোপসাগরকে মার্কীণ ৭ম নৌবহরের এক্তিয়ারভুক্ত করে প্রেসিডেন্ট নিক্সন এক নির্দেশ জারি করেন! তবুও সোভিয়েত সাবমেরিন বহরের উপস্থিতিতে সেই নির্দেশ কাজে লাগেনি!

এত প্রচেষ্টার পরেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা রুখতে না পেরে মার্কীণ শক্তি যে বাঁকা পথ ধরে কুটনৈতিক কৌশলে বাংলাদেশকে নিজের পকেটে রাখতে চাইবে সে কথা বলাই বাহুল্য! আর এই ব্যাপারে তাদের স্বার্থের সহযোগী হয় উঠতে মরিয়া সামরিক বাহিনীর ক্ষমতালোভী উচ্চাকাঙ্খী সেনানায়করা থেকে শুরু করে দেশের আভ্যন্তরীণ বুর্জোয়া শক্তি এবং ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী সহ রাজাকার বাহিনী! এমনকি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই প্রবাসী সরকারের আওয়ামী লীগের কিছু নেতা মার্কীণদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন! ফলে স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু ও তার বিশ্বস্ত সহোযোদ্ধাদের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরানোর চক্রান্তে বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থ এক হয় যায় স্বাধীন বাংলায়! স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই তাই বিভিন্ন পক্ষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেদের অধিকারে নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় সচেষ্ট হতে থাকে! সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতি থেকে দেশের মানুষকে জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়াই যখন সবচেয়ে বড়ো লক্ষ্য তখন দেশের অভ্যন্তরে তলায় তলায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অধিগ্রহনের হিসেব নিকেশ শুরু হতে থাকে! মার্কীণ শক্তি এই সুযোগটাকেই সুকৌশলে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়! মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবিদের নিধন করে বাংলাদেশকে মেধা শুন্য করে দেওয়াটাও এক সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার প্রথম ধাপ ছিল!
স্বাধীন দেশ যাতে কোনোদিনও আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে!

এই পরিকল্পনারই দ্বিতীয় পর্যায়ে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন করার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহযোগী নেতৃবৃন্দ এবং দেশের বিশ্বস্ত প্রথম সারির   সেনা অফিসার মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়কদের বিশিষ্ট কজনকে হত্যা করে বাংলাদেশকে অভিভাবকহীন করে দেওয়া হয়! শোনা যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বিরুদ্ধে এই রকম চক্রান্তের আভাস দিয়ে সাবধান করে দিতে, বঙ্গবন্ধু একে আজগুবি কল্পনা বলে হেসে উড়িয়ে দিয়ে নাকি বলেছিলেন তাঁর স্বদেশবাসী এইরকম কাণ্ড ঘটাতেই পারে না! দেশের মানুষের প্রতি দেশপ্রাণ মানুষটির এতটাই বিশ্বাস ছিল! শুধু ছিল না ক্ষমতালোভী কুচক্রীদের সম্বন্ধে সঠিক অভিজ্ঞতা!

স্বদেশবাসী সম্বন্ধে তাঁর ভুল ধারণার মাশুল দিয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫! ফলে মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনায় স্বাধীন দেশকে গড়ে তোলার কথা ছিল সেই চেতনাকে পরিচালিত করার মানুষগুলিকে একে একে সরিয়ে দেওয়া হল রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে! অদৃশ্য শক্তির সুতোয় বাঁধা পড়ে গেল বাংলাদেশ! একদিকে মেধা শুন্য সমাজ এবার নেতা শুন্য দেশে পরিণত হল! ডালিম সহ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা প্রচুর উপঢৌকন সহ দেশবিদেশেরাজার হালে সমাদর সহ গুছিয়ে বসলেন! যুদ্ধবিদ্ধস্দারিদ্র পীড়িত হতভম্ভ দেশবাসিকে দ্রুত মূক ও বধির করে দেশের কাণ্ডারী হয়ে মসনদে এসে বসলেন মহামান্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়া! শুরু হল সামরিক শাসনের অন্ধকার যুগ!

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ২৬শে মার্চ১৯৭১ চট্টগ্রাম থেকে জেনারেল জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন! ফলে এই স্বাধীনতার উপর তার মতো ক্ষমতালোভী উচ্চাকাঙ্খী সেনানায়কের একটা ব্যক্তিগত অধিকার তো থাকবেই! সেই অধিকারেই সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে সামরিক শাসনের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেল্লেন মহামান্য জিয়া! শুরু হল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন যুগের! দেশ নয় দেশবাসী বুঝতে শিখল আপনি বাঁচলে দেশের নাম! শুরু হল আখের গোছানোর দীক্ষা! সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নয় ধনতন্ত্রের গোলামীই বেঁচে থাকার প্রধানতম শর্ত হয়ে দাঁড়ালো! এবং আর বাঙালি নয়! বাংলাদেশের জনগণ এখন থেকে বাংলাদেশী!

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয়দিবসের পর গর্তে ঢুকে যাওয়া রাজাকার আলবদর আলশামস বাহিনীর কেষ্টবিষ্টুরা ধীরে ধীরে সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় গর্ত থেকে বেড়িয়ে এসে ইসলামের পোশাক পড়ে নিয়ে ধর্মকে হাতিয়ার করে সমাজদেহে নিজেদের জাল বিস্তার করতে লাগলেন! শুরু হল দেশের সর্ব বিষয়ের ইসলামীকরণ! মহামান্য জিয়া শক্ত হাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বাংলাদেশকে বের করে নিয়ে আসলেন! হাসি ফুটল মার্কীণ সাম্রাজ্যবাদের মুখে! বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা দূর হল! শুরু হল পেট্রো ডলারের আগমন! রাজাকার বাহিনী আরও সংঘবদ্ধ হয়ে উঠল জামাতের নামে! প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে তারা প্রবেশ করতে থাকল সামরিক শাসনের অধীনে!

ফলে সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায় দুটি জিনিস ঘটতে থাকল এক সাথে! একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্রমাগত দূরবর্তীকরণ! স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাসের ক্রমান্বয়ে বিকৃতিকরণ! মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধার তকমা পেতেও থাকল! আর অন্যদিকে বাংলাদেশক ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার সূত্রে মৌলবাদী শক্তির সমাজদেহে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার! এবং এরই সাথে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির জাঁতাকলে ধনবন্টনের বৈষম্য সুদৃঢ় ভাবে অর্থনৈতিক শ্রেণী বিভাজন প্রকট করতে থাকল! ফলে জনসাধারণের মধ্যে আখের গোছানোর মানসিকতাই মুখ্য হয়ে উঠল দেশ গঠনের চাইতে! এবং ধর্মীয় মৌলবাদে অভাবী যুবশক্তিকে তিলেতিলে গ্রাস করার চেষ্টা হতে থাকল!

জিয়ার সামরিক শাসনকালেই বাংলাদেশে ইসলামিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব! জিয়াকে সরিয়ে এরশাদ এসেই দেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে এই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করেন! পূর্বতন রাজাকার গোষ্ঠী সহ পাকপন্থী মৌলবাদী সংগঠনগুলি এরপরই ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে! জামাতের মতো সংগঠনগুলি তাদের কর্মীদের সামরিক বাহিনী সহ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সক্ষম হয়! একই সাথে সমাজের দারিদ্র্যক্লিষ্ট অংশের যুবশক্তিকে মৌলবাদের প্রতি আকৃষ্ট করতে তারা নানান রকম সাহায্য প্রদান করতে থাকে! ফলে সমাজের একটা অংশের মধ্যে জামাতপন্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে! ধর্মীয় আবেগকে হাতিয়ার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিহত করার এই প্রয়াস! যদিও বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক দলগুলি বরাবরই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত তবুও দেশে সীমাবদ্ধ শিক্ষার প্রসার এবং দরিদ্র জনসাধারণের ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রাবল্যের কারণে সমাজদেহে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হওয়ার মতো উপযুক্ত পরিস্থিতি কোনোদিনই তৈরী হয়ে ওঠেনি! ফলে সমাজিক বিন্যাসে ধনতান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্যে বুর্জোয়া শ্রেণীও ঐ ধর্মীয় ভাবাবেগকেই হাতিয়ার করে রাজনীতি করতে থাকে!

এই রকম পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের শুভবোধ সম্পন্ন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বাঁচিয়ে নিয়ে চলতে থাকেন! যার প্রথম স্ফুরণ হয় ছাত্র আন্দোলনে এরশাদের পতনে সামরিক শাসনের অবসানে! ছাত্র আন্দোলনের সাফল্যে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসানে গনতন্ত্র ফিরে এলেও নানান প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্র পরীক্ষিত হচ্ছে বাংলাদেশে! সবচেয়ে বড়ো প্রতিকূলতা রাজনৈতিক দলগুলির ব্যাপক দূর্নীতি আর ধর্মীয় দলগুলির রাজনৈতিক ক্ষমতালিপ্সা! এই দুইটি প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বোধ সম্পন্ন মানুষ! প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশাসনে থাকলেও তাদের নেতা কর্মী মন্ত্রী আমলাদের লাগামছাড়া দূর্নীতিতে বাংলাদেশের সমাজ জীবনে লুম্পেনাইজেশান একটা বড়ো বাস্তব! তবুও তারই মধ্যে দেশপ্রেমী মানুষের স্বপ্নে সুস্থ সবল বাংলাদেশের আকাঙ্খা কতটা তীব্র তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটল শাহবাগ আন্দোলনের সূত্রে!

নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে শাহবাগ আন্দোলনের সূত্রে বাংলাদেশের মানুষ রাজাকারদের মৃত্যদণ্ডের দাবি উপলক্ষে মূলত মুক্তিযুদ্ধের হারিয়ে ফেলা চেতনাকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছেন! এইখানেই বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে পাকপন্থী রাজাকার মুক্ত দেশের! মৌলবাদের বিষবৃক্ষ উপড়িয়ে ফেলার! বাঙালি জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণের! ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থার! যে কারণে দাবি উঠেছে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার! দাবি উঠেছে রাজনীতিতে ধর্মীয় দলগুলির প্রবেশ নিষিদ্ধ করার! বিগত ৪২ বছরের বন্ধ্যা দশার মধ্যেও বাংলাদেশের অন্তরাত্মা তার দিশা হারায়নি! নতুন প্রজন্মের প্রত্যয়ে বাংলাদেশ আবার স্বপ্ন দেখছে দ্বিতীয় এক মুক্তি যুদ্ধের!

বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখেছিল  শত্রুমুক্ত স্বাধীন দেশের! ১৯৭১ সেই স্বপ্ন পুরণের মাইলস্টোন! দেশ স্বাধীন করা হয়ত তুলনা মূলক ভাবে সহজ! কিন্তু বহিঃশত্রুদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার থেকেও অনেক বড়ো কঠিন কাজ স্বদেশী শত্রুদের সমাজদেহ থেকে উপড়িয়ে ফেলা! বিগত ৪২ বছর বাংলাদেশ দেখেছে সেই শত্রুদের বাড়বড়ন্ত! আজকে তারা অনেক বেশি সংগঠিত! কিন্তু তাদের বিরুদ্ধেই আজ আবার নতুন মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন দেখছে নতুন প্রজন্ম! স্বপ্ন দেখছে নবজাগরণের!

বাঙালি যে আজও স্বপ্ন দেখার শক্তি হারায়নি তার প্রমাণ স্বাধীনতার ৪২ বছরের ভাঙ্গাগড়ার এই ইতিহাসের মধ্যে দিয়েও শাহবাগে আবার গর্জে উঠেছে বাংলার অন্তরাত্মা! এবার স্বপ্ন পুরণের পালা!

আমাদের স্বাধিকার স্বাধীনতা

মা জননীর ওষ্ঠাধারে
প্রিয়তম শব্দ প্রিয়তা স্বাধীনতা
অস্থিমজ্জায় রক্তরেণুতে পূর্ণেন্দু স্বরাজ
বিস্তৃত অন্তরীক্ষে সহস্র শহীদ মিনার
স্বাদেশিকতা সকাশ স্বর্ণস্তম্ভ
কণ্ঠনালী উচ্চকিত হয়
রণিত রণতরঙ্গে
                                                   চির জাগরুক আমাদের
                                                   নাগরঙ্গা গঙ্গা মেঘনা যমুনা ।।
 নক্ষত্র আলোয় উদ্ভাসিত আজ 
আমার অতি প্রীণন বঙ্গজ মৃত্তিকা
বিস্ময়ে বৈভবে মেতেছে মানুষ
সন্ধিক্ষণে সময়ে লহরী দোলে
জেগেছে চির সবুজ তারুণ্য যুবক
প্রলম্বিত আলোকে বেড়ে ওঠে জর্জির
তৃণ গুল্মলতা বৃক্ষ
ভালোবাসার স্রোতস্বতী নির্ঝর নদী
বহে চলে কালে মহাকালে নিরবধি
জ্যোৎস্নালোকের পত্র পল্লবে
শাখা প্রশাখায়
দুর্মদ ফাল্গুনী ভাষা
অতলান্ত অন্ধকার আর প্রত্নস্তূপে
বর্ণমালার আলোকচ্ছটা
পাখীর ঠোঁটে হেমাঙ্গী
সঙ্গীত আধান খড়কুটো
সভ্যতার আরাধ্য ভুবন ।।

বিপুল ধ্বংসস্তূপে অধর্ম অসত্য সন্ত্রাস
পশুত্ব শৃগাল
দুর্যোগ দুর্নীতির বিধ্বংসিত বিনাশ
ক্ষয়ে অবক্ষয়ে
ধর্ম-ব্যবসায়ীদের নিঃশেষিত অবসান
অবশেষে হবে শেষ-
এটাই হউক আমাদের স্বাধিকার
স্বাধীনতা বারোমাস ।।




তরুণ তোমাকে
সময় বিশ্বাস ভেঙ্গে দিলে
বৃত্তের ভিতর মহাবৃত্ত তৈরী হয়
সময় উপেক্ষা এনে দিলে
শীর্ণ হাত শহীদবেদীতে ফুল রাখে।
বিশ্বাস অবিশ্বাসে বিভ্রান্ত হলে মন,
অগ্নিশিখা জ্বলে রাজপথে
বসন্তেও দগ্ধ হয় প্রাণ...

এরা কেউ মুক্তিযুদ্ধে যায় নি
এরা কেউ ভাত রাধেঁনি সৈনিকের
নদীর বুকে একলা ডিঙা বায় নি সেই রাতে...
এরা জন্মেছে, তখন স্বাধীন বাংলাদেশ।

তবু সময় অবিশ্বাসী হলে
এরা সদর্পে ভেঙে দেয়
বলয়ের রং।
সময় উপেক্ষা এনে দিলে,
হাওয়া উল্টো স্রোতে বয়
অমেরুদন্ডী নয়
মেরুদন্ডহীন হলে, জাতিকে ঘুম থেকে তোলে।

আজ পাশ ফিরে শুয়ে নেই ওরা কেউ।
প্রতি চোখ জেগে থাক ততদিন,
যতদিন আকাশটা সাদা নয়
প্রতি পথ শেষহীন ততদিন
যতদিন আরো পথ পার হতে হয়...


ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়
স্বাধীন বাংলা

স্বপ্নটা শুধু আমিনার নয়

নয় সেটা শুধু কাদেরের
স্বপ্নটা ছিল বাংলাদেশের
যত ভাই, যত বহিনের।

লড়েছে তারা একসাথে সব
মরেছেও একসাথে
পতাকা ওড়াবে এই ছিল মনে
স্বাধীন বাংলাদেশে।

সবুজ নিশানে রক্ত গোলক
বাংলার মাঠঘাটে
ঝরেছে যত রক্ত তাদের
জমাট বেঁধেছে তাতে।

যেখানে যে আছো, যত ভাইবোন
বাংলামায়ের কোলে
স্বাধীনতা দেখো এনেছি সকলে
বসেছি পতাকা তলে।

দেশ থেকে দেশে বিশ্বনিখিলে
ছড়াক এই স্বাধীনতা
বাংলাদেশ মাগো, ওড়াও নিশান
কেটে যাক সব বাধা।





মৌ মধুবন্তী
ধর্ম নয় স্বাধীনতা দিয়েছে ডাক



নাস্তিক বেগবান, ইস্কুল খুলেছে জামাতে ইসলাম
ইংরেজি, আরবি , হিন্দু সবই এখন জামাতিদের নাম!

তারা নাস্তিক বলে যাদের তারা সেই ইস্কুলের ছাত্র
তারা মগজে আজগুবি, ভাবনায় খুনি, সংখ্যায় গুটিকয় মাত্র!!



বাকি যারা আছে স্বাধীনতার পক্ষে সবাই আমরা মানুষ
মানুষের জন্য আমরা মানুষ হয়ে ভাবি, উড়াইনা ধর্মের ফানুস

আমরা লুটিনা পরের ধন, মান সম্ভ্রম, আমরা করিনা মানুষ জবাই
স্বাধীনতাকামী আমাদের একটাই লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই

যারা মানুষ তারা ধর্মের পেয়াদা নয় তারা করেনা নারী ধর্ষণ
যারা লিপ্ত আছে এই সব অকাজে আমরা চাই তাদের নিষিদ্ধকরণ

টাকার চালে ঢাকার ভাত পচে আজ হয়েছে গাজন নষ্ট
স্বাধীনতা তাই আর্ত চিৎকারে ডাকছে মানুষকে সুস্পষ্ট

এখানে মানুষ বাস করে ধর্ম একা কোন শাসন পদ্ধতি নয়
এই বাংলায় যেন মানুষের জন্য নিরাপদ বাস যোগ্য হয়
এই আমাদের স্বাধীনতা সচেতন মানুষের অঙ্গিকার
বাংলার বুকে জামাত-শিবিরের নেই কোন অধিকার
খালি হাত মুঠিবদ্ধ সংকল্প নিয়ে এগিয়ে আসো প্রজন্ম
এই দেশ মুক্ত করো জামাতের হাত থেকে পরো বুকে স্বাধীনতার বর্ম
এসেছে দুয়ারে নড়া কেড়ে কেড়ে বিয়াল্লিশ বছরের স্বাধীনতা
এখানে ঠাই পাবে না রাজাকার , জামাত-শিবির কোন ধর্ম নেতা।

স্বাধীনতা, স্বাধীনতা, আমাদের ২৬ শে মার্চ প্রলয় মাতন স্বাধীনতা
এই দেশে রবে না অত্যাচার, খুন, কোন নারী আর হবে না ধর্ষিতা।
শাহবাগ এবং বাংলার সচেতন প্রজন্মের মুঠিবদ্ধ প্রতিজ্ঞা
রক্ত দিয়ে নয়, মানবিকতা দিয়ে দেশকে করবে রক্ষা


দীপিকা রায়
জন্মভুমি

যেখানে দেখবে তুমি
ভাষার জন্য রক্তে রাঙানো রাজপথ
লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা
আজও অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়
দেশের জন্য মানুষ
সেটাই আমার জন্মভুমি।



যেখানে দেখবে তুমি
চারিদিকে অপরূপ সবুজ খোলা প্রান্তর
সুজলা সুফলা ধানের ক্ষেত
কৃষকের মুখে নির্মল হাসি
সেটাই আমার জন্মভুমি।



যেখানে দেখবে তুমি
নদীতে পাল তোলা নৌকা
কলসি কাখে গ্রাম্য বধূঁ
গ্রাম্য কিশোর-কিশোরীর ছুটাছুটি
মায়ের কোলে ছোট শিশুর হাসি
সেটাই আমার জন্মভুমি।

যেখানে দেখবে তুমি
পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসে ঝর্ণা
নদীর কূল কূল ধ্বনি
চাদেঁর সিগ্ধ আলো
দিনের আকাশে মেঘের লুকোচুরি
সেটাই আমার জন্মভুমি।

যেখানে দেখবে তুমি
রাখাল বাজায় বাশিঁ
পাখির মধুর সুর
মানুষ মানুষে অপূর্ব সম্প্রীতি
আমার মায়ের মুখের হাসি
সেটাই আমার জন্মভুমি।

 বি এম সো হে    শি 

রক্ত ঋণ পরিশোধে উদগ্রীব মিছিল

স্বেচ্ছাতন্ত্রে অবগুণ্ঠিত ছিল যত ঘৃণিত কুট-কুশীলব
তারুণ্যর হেঁচকা টানে নগ্ন এখন তাদের স্বরূপ
দ্রোহের একেকটি মুষ্টিবদ্ধ হাত লক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র সমান!


ঐক্যবদ্ধ জনতার রণ দামামায় প্রকম্পিত জমিন
স্বাধীনতার প্রশ্নে রক্তের ভিতর প্রতিশোধের উল্লাস
মুহূর্তেই বিধ্বস্ত সগোত্রীয় বিশ্বাসঘাতকের মিথ্যে প্রাচীর
অগ্রসরমান তারুণ্য! অপ্রতিরোধ্য ভাঙ্গনের স্লোগান
রক্ত ঋণপরিশোধে উদগ্রীব মিছিল! বিস্ময়ে তাকিয়ে স্বদেশ!


মায়ের আঁচলে সাজাতে ফুল, এখনও একুশের রাত নিদ্রাহীন
দুহাত ভরা পুষ্পাঞ্জলিতে রঙ্গিন স্মৃতিসৌধের উঠোন।
প্রকৃতির অঞ্জলি! পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ায় রক্ত আগুন
এ ভাষার রক্ত! স্বাধীনতার রক্ত! শহীদের রক্ত!


ত্রিশ লক্ষ প্রাণ আর তিন লক্ষ মা-বোনের ক্ষোভর দহন
বুকে এখনও নিক্বণের মত বাজে শহিদের আত্মার পদধ্বনি
চাই বিশ্বাসের সাথে ঘাতকের সংঘাত!চাই চেতনার পরিস্ফুটন!

বিচলিত হইও না পথ যাত্রী! ওরা জেনে গেছে
সময় এখন যৌবনের!পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া ছড়িয়ে দেয়ার
সময় এখন দ্রোহের!বিশ্বাসঘাতকদের ক্রোধে পুড়িয়ে মারার
সময় এখন প্রতিশোধের! মা-বোনের ধর্ষকদের ঝুলিয়ে দেয়ার
সময় এখন স্লোগানের! মিছিলের সুনামিতে জঞ্জাল ভাসিয়ে দেয়ার।

আঁতাতে নয়! আশ্বাসে নয়! ক্ষমতার ইঁদুর দৌড়ে নয়!
দেখা হবে মুক্ত বর্ণমালার স্বদেশে! দেখা হবে বিজয়ে আবার!


শৌনক দত্ত তনু
দায়মুক্তি ও স্বাধীনতা পরবর্তী তরুণ...


         তুন বছরের শুরুতেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা তার চেতনা নিয়ে তরু্ণ প্রজন্মের ভেতর কোন দায় আছে আমি ভাবতাম না। ভাবতাম না ভারতের তরুণরাও বিপ্লবী মানসিকতা বহন করে।মনে করতাম তারা কেউ কেউ দলীয় বুলি আওয়ানো পোষা পাখি। রাজনীতিয় নামে চেতনাহীন বিবেকহারা। আর বাকিরা রাজনীতির নামে রুমাল চেপে কেরিয়ার তৈরীতে মগ্ন।দিল্লী ও শাহবাগের পর আমার ধারনা পাল্টেছে।মনে বিশ্বাস জন্মেছে মানুষ ও মনুষ্যত্বের বিকাশের একটি সাধারন নিয়ম আছে।প্রতিটি মানুষই এই নিয়মের অধীন।সেই অর্থে সকল মানুষই এক ও অভিন্ন।স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ধারন বহনে প্রত্যেক মানুষে অবস্থান তার ব্যক্তিত্ব।মনে পড়ে যায় পঞ্চম শতকে গ্রীস দেশীয় চিকিত্‍সক ও আধুনিক চিকিত্‍সার বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিসের কথা যিনি মানানা ধরনের চারটি মেজাজ মর্জির বিশ্লেষন করে সকল মানুষকে চারটি টাইপ বা চারটি ধরনে বিভক্ত করেছিলেন সে বিষয়ে আরেকদিন আলোচনা করবো।প্রসঙ্গে ফিরে আসি।বাংলাদেশের তরুন সমাজের স্বাধীনতার চেতনা কিংবা দেশপ্রেমের কথায়।

        

৫ই ফেব্রুয়ারী শাহবাগ চত্বর কিংবা গনজাগর মঞ্চের আগের তরুনরা কি সত্যিই দেশ প্রেমে বিগলিত ছিলো ? যদি থেকে থাকেন তবে তা তুষের আগুন  একাত্তর কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচার আন্দোলনের পর গত তেইশ বছর সেই প্রেম কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন তারা?আমার এই ভাবনার পক্ষে বিপক্ষে অনেক প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু একাত্তর কিংবা নব্বইয়ের জলন্ত তরুনরা হারিয়ে গেছেন কোন না কোন রাজনৈতিক ছায়ায় কিংবা ঝামেলাহীন নিস্কন্টক পেশায় কিন্তু কেন?বাঁচার তাগিদে নাকি? মানুষের ভেতরে আছে দুটি সহজাত প্রবৃত্তি।একটি আত্মরক্ষণ প্রবৃত্তি ও অন্যটি প্রজাতি বাঁচিয়ে রাখা।প্রজাতি রক্ষণ প্রবৃত্তি মানে বংশানুক্রমে মানব প্রজাতি রক্ষণ প্রবৃত্তি। এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজন হলে নিজের জীবনকেও বিসর্জন দিতে পিছু না হটা।তবে মুশকিল হলো যে, শ্রেণীবিমক্তি সমাজের মানুষকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেই সর্বক্ষণ এমন ব্যস্ত থাকতে হয় যে, প্রজাতি রক্ষণের ভাবনাটি অনেকে নিচে পড়ে যায়।চাচা আপনা জান বাঁচা এটিই শ্রেণী সমাজের মূল নীতি। তাছাড়া নেত্রীত্বের অভাব,ভুল ইতিহাস,পাঠ্যক্রমের ত্রিমুখী ব্যবস্থা,আধুনিক জীবনযাত্রা,অভিভাবকের সময় সল্পতা এমন আরো সব অনুষঙ্গ তরুনকে করছে আত্মকেন্দ্রিক। অনেক তরুণ স্বাধীনতা দিবস বলতে পারেননা। এমন কি অনেক শিক্ষক ও বীরশ্রেষ্ঠের নাম বলতে গিয়ে হোঁচট খান। স্বাধীনতা লালন করে এমন প্রজন্ম বড্ড কম এর কারণ কি? শ্রেণীবিহীন সমাজ গঠন? হয়ত, হয়ত না তবে একটা কথা কথা তো ঠিক সেদিন মানুষ তার প্রয়োজন মোতাবেক খাদ্য বস্ত্র শিক্ষা চিকিত্‍সা বাসস্থানসহ সবকিছুই পাবে আর তার নিজের নিরাপত্তার জন্য তাকে সর্বক্ষণ ব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না।তখন প্রজাতি ও দেশ রক্ষণ প্রবৃত্তি চরিতার্থের দিকেই মানুষের এবং তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ থাকবে। সে সময়কার মানুষ জীবনের প্রথম থেকেই এমন শিক্ষা লাভ করবে যে, শিক্ষার মধ্য দিয়ে তার ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠবে গতিশীল ও পরিমার্জিত ও পরিশীলিত।সমাজে সে সময় সবল,গতিশীল ভারসাম্যপূর্ণ স্নানুতন্ত্র সম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠবে। তবে কি বাংলাদেশী তরুন সে শিক্ষা পায়নি?শাহবাগের জনঢেউ কি তবে গুটিকতক সবল গতিশীল মানুষ হয়ে ওঠা মানুষের চেতনা ? হাজার প্রশ্নের ভিড়ে কোথায় যেন ডেকে যায় চেতনা। সময় নিরন্তর হাঁটে তার পায়ে ধুলো উড়ে না।
        
রাজীনীতির পাশায় যারা দান দিচ্ছে তারা মানুষ নয় তারা মসনদী তবে যে তরুণ সমাজ একাত্তর কে একটি যুদ্ধ ভেবে চলছিলো আজ তারা জেগেছে চেতনায় কিন্তু তারা সুক্ষতায় যে কাজটি করছে তা কি চোখে পড়ছে? সমাজে(তাদের) মানুষের ক্ষমতা ও প্রতিভার সার্বিক বিকাশ ঘটবে এবং এই থেকেই বিভিন্ন মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত পার্থক্য বাড়িয়ে ধর্ম বেড়ে যাবে।আর বাহাত্তরের সংবিধান ও একটি দলের নিষিদ্ধ দাবী দৃষ্টি মেলে দেবে সমাজের ভোট অগ্রগতির সাধনের দিকে।প্রশ্ন উঠবে তবে কি শাহবাগ আর তরুণ প্রজন্ম প্রতিষ্ঠিত হবে শ্রেণীহীন সমাজেই?


রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

একাত্তর শাহবাগের বাংলাদেশ



শুরুর শুরুটা ছিল অন্যরকম ভারতে ব্রিটিশরাজের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার ঘোড়া দাপিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে টগবগ করে আসমুদ্র হিমাচলে একটা আপাত স্বস্তি কায়েম ভাবছে, একটা শৃঙ্খলার শাসন কায়েম হয়েছে দেশে
কিছু  মানুষ তখন আলাদা রকম ভাবছেন জাতীয় চেতনার উন্মেষ তখনও ঠিক ভাবে হয় নি সিপাহী বিদ্রোহ বিফলে গিয়েছে, মূলত সেই কারণে বিদ্রোহটা কুলাক বা বৃহৎ চাষীদের নেতৃত্বে হলেও, সেটা নিশ্চয়ই প্রথম একটা বড়সড় প্রতিবাদ ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে এরও আগে হয়েছিল প্রতিবাদ তবে, সেটা নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ির জন্য সেই মত দানা বাঁধে নি          প্রথমে অকথ্য অত্যাচার নামিয়ে আনল তদানীন্তন বৃটিশ প্রভুরা সমর্থন ছিল কিছু ভারতীয় বেনিয়াদের চলছিল দিন এই ভাবেই ধর্মের ব্যাপারটা ততদিনে বুঝে গিয়েছে বৃটিশরা ডিউক অফ সলসবেরী প্রথম স্লোগান তোলেনডিভাইড আণ্ড রুল দেম ব্যাপারটা কাজেও দেয় বড় রকম হইচই ফেলেন, সুভাষ-গাঁধী- নেহেরু- জিন্না এবং আরও অনেকে এইসব ইতিহাস বহুপঠিত তাই আর নতুন করে কিছু বলার নেই
ডিভাইড আণ্ড রুল দেম’ – এই স্লোগান, দ্বিজাতি তত্ব এবং বেনিয়াদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই ভাগ হল ভারত ১৯৪৭ য়ের আগে যারা ভারতে ছিলেন, তারা ৪৭ সালেই এলেন আবার ভারতবর্ষে সম্পূর্ণ এক নতুন প্রহসনের জন্ম হল ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে, শেয়ালদা ষ্টেশনে পড়ে একদা জমিদার গিন্নি বা কর্তা ভিক্ষে করছেন দুমুঠো খাবারের জন্য, এটাই তখন বাস্তব সত্য সাধারণ লোকেদের কথা বাদই দিলাম তারা তোজনগণ এই জনগণের হিতার্থেই তো দেশভাগ ! পরিহাস আর কাকে বলে ! এদিকে দুইপারে চলছে অবাধ হত্যালীলা শাসক শ্রেণী ক্ষমতার নেশায় মশগুল প্রতিটা মানুষের পরিবার আছে, সকলেই খেয়ে পরে বাঁচতে চায়। খেয়ে পরে বাঁচাটাই যখন সবচেয়ে বড় সমস্যা তখন কেন মানুষ সব ছেড়ে দিয়ে ধর্ম এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ভাবতে যাবে ? এটা কেউ বুঝল না !
নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান দুই হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুটি প্রদেশের সমন্বয়ে গঠিত হল - পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) পশ্চিম পাকিস্তান ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে অবস্থিত দুটি অংশের মধ্যে মিল ছিল কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মে। সৃষ্টি হল এমন এক রাষ্ট্রের যার সঙ্গে তুলনা করা চলে এক অবয়ব হীন পাখীর যার শুধু ডানা দুটো আছে সে ডানা দুটোরও আবার চরিত্রগত মিল নেই ভাষা, সংস্কার, আচার আচরণ সব ভিন্ন শুধু ধর্ম এক
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এর পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতেই থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস।প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় যখন পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা করলেন- "উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা" ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর . জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দূকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করেন সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা এই ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
         এর প্রতিবাদে প্রথম লেখনি ধারণ করে ভাষাচার্য ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যাপ্রবন্ধে বলেন,
পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বিভিন্ন, যেমন পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবী, সিন্ধী এবং বাংলা; কিন্তু উর্দূ পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই মাতৃভাষা রূপে চালু নয়। যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়,তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোন দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দূ ভাষার দাবী বিবেচনা করা কর্তব্য। বাংলাদেশের কোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দূ বা হিন্দী ভাষা গ্রহণ করা হইলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। . জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দূ ভাষার স্বপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি।
১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেছিলেন :- আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়; এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ রেখে দিয়েছেন যে মালল-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি দাড়িতে ঢাকবার কোন জো-টি নেই ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা দিবসে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের ছাত্রদের আহ্বানে তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এসে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এই প্রতিবাদ অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে, জন্ম দিয়েছিল রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের। ১৯৫২র ২১ শে ফেব্রুয়ারী তে শহীদ হলেন বরকত সহ আরও অনেকে
পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চূড়ান্ত নাটকীয়তার মুখোমুখি হয় যখন ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দলটি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে  ১৬৭ টি আসনে জয়লাভ করে এবং ৩১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, যা আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার প্রদান করে কিন্তু নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধিতা করেন তিনি প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের দুই প্রদেশের জন্যে থাকবে দু'জন প্রধানমন্ত্রী। "এক ইউনিট কাঠামো" নিয়ে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে এরকম অভিনব প্রস্তাব নতুন করে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ভুট্টো এমনকি মুজিবের -দফা দাবি মেনে নিতেও অস্বীকার  করেন। মার্চের তারিখ পূর্ব পশ্চিম অংশের এই দুই নেতা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে সঙ্গে নিয়ে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে ঢাকায় বৈঠকে মিলিত হন। তবে বৈঠক ফলপ্রসূ হয় না। মুজিব সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণে ভাষণে তিনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগেই বাস্তবায়নের জন্য চার দফা দাবি পেশ করেন   -()অবিলম্বে মার্শাল' প্রত্যাহার করতে হবে। () সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে, () নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে, এবং () ২৫শে মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" তাঁর এই ভাষণ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্খায় উত্তাল করে তোলে।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন  ‘আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের অধিকার অর্জন করে, কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার ক্ষমতা কোন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। যদিও মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের তারিখ নির্ধারিত হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং সামরিক বাহিনীর অফিসারদের নিয়ে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা বোনা শুরু করে। ১৯৭১ সালের মার্চ কোন কারণ ছাড়াই তারিখের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল করা হয়। ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ধৈর্যের শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেল এই সিদ্ধান্ত। সারা দেশে বিক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়। ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। বঙ্গবন্ধু সারা দেশে দিনের হরতাল এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তার আহবানে সারা পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অচল হয়ে যায়। সামরিক সরকার কারফিউ জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে কিন্তু বুলেটের ভয় দেখিয়ে বাঙ্গালিদের রাজপথ থেকে সরানো যায় না। দিন হরতাল শেষে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন অনেক ক্ষোভ এবং বঞ্চনার ইতিহাস বলার পর তিনি বললেন :-
এরপরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের উপর হত্যা করা হয়- তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু-আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই , তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবেনা। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবাইয়া রাখতে পারবানা। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের ডুবাতে পারবে না।..............................মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” “জয় বাংলা।
২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে , জনযুদ্ধের আদলে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে।পঁচিশে মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানী সামরিক জুন্টা  ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ হত্যা করে নির্বিচারে। যে ধর্মের নামে একটা দেশ তৈরি হয়েছিল, সেই ধর্মের লোকেদেরকাফেরবলে নির্মম এবং পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করে  বাঙালিদের গ্রেফতার করা হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙ্গালীর  প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের ঠিক আগেই ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে সারা বাংলাদেশে  শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ
এদের সাহায্য করে, জামাআত জামাআত ইসলামী একটি আন্তর্জাতিক গোঁড়াপন্থি সুন্নি মুসলিম ধর্মীয় সংগঠন  যার জন্ম ১৯৪১ সালে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আগে লাহোরে (বর্তমানে পাকিস্তানে) এবং জন্মদাতা সৈয়দ আবুল আলা মউদুদী এই সংগঠনটির সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের ভূমিকা শূন্য, কিন্তু ভারত ভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টিতে এদের বিশাল ভূমিকা। এই সংগঠনটি তৈরি করা হয় রাজনৈতিক ইসলামের প্রচার করতে। রাজনৈতিক ইসলামের উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের ইসলামী-করণ। অর্থাৎ এরা যে রাষ্ট্রেই থাকুক না কেন এদের উদ্দেশ্য একটাই -রাষ্ট্রটিকে মধ্যযুগীয় আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করা ইসলামের সমালোচনা এরা সহ্য করে না, কেউ ইসলামের বিরোধিতা করলে কিম্বা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও ইসলামী জীবনযাপন না করলে এরা তাদের শত্রু গণ্য করে। এরা ধর্মের নামেরাজাকারহয়ে সাহায্য করতে শুরু করে মিলিটারি জুন্টাকে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এই নৃশংস রাজাকারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় গোটা বাংলাদেশ
বাংলাদেশে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা। সে নির্বাচনে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বিজয়ী হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগের একজন সাংসদ ২০০৯ সালের ২৯শে জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব পেশ করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অবশেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৩৯ বছর পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫শে মার্চ ট্রাইবুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়।
৩০ লক্ষ ম&