গঙ্গাঋদ্ধি

বঙ্গোপসাগরের ঊর্মিরাশি থেকে
এখানে এসেছি আমি
সমুদ্র দেবতা বারুণ
সুন্দরবনের লবণাক্ত জলে
সুন্দরীরা নৃত্য করে ঘুরে ফিরে

গঙ্গাঋদ্ধ নগরকে আমি খুব ভালোবাসি
ভালোবাসি গঙ্গাঋদ্ধির মানুষগুলোকে
আর তাই ভালোবেসে, সযতনে
উঁচু করে বেঁধেছি নগর-প্রাচীর
গঙ্গা-তটে; নাগরিকবৃন্দ রক্ষার্থে

গঙ্গাঋদ্ধকে চিরদিন ভালোবাসি
আজও অটুট সেই ভালোবাসা
এখন আর্যদের বর্শাঘাতে
ভুলুণ্ঠিত, অগ্নিদগ্ধ
গঙ্গাঋদ্ধ নগরি
দিকে দিকে শুধু ধোঁয়ার কুণ্ডলি
জ্বলছে দাউদাউ করে ঘরবাড়ি
লাঞ্ছিত, বিধস্ত হায় গঙ্গাঋদ্ধ নগরি

আর্যবর্তের সেনার্যরা আশ্চর্য কৌশলে
লৌহ-জলযানে, ইন্দ্রের আশীর্বাদে
সশস্ত্র লৌহ-পোশাকে
লুকিয়ে আড়ালে, বিস্তার করে অযুত ফণা
ভিখারির বেশে, কৃতাঞ্জলিপুটে
পৌঁছে যায় গঙ্গাঋদ্ধ নগর অভ্যন্তরে
কে জানত হায়, ভয়ঙ্কর মৃত্যু ছিল অপেক্ষায়

রাজোদ্যান ছিল নয়ন-শোভন
আজ হায়, জনশূন্য পুষ্পহীন মরুভূমি যেন
বীর নিকুঞ্জগুলো বীরত্যক্ত, মন্দির রক্তাপ্লুত
নৃপতি আজ লুটিয়ে পড়ে হায়, মৃত মৃত্তিকায়
পড়ে আছে সেনাদেব মনসা-বেদী-পদমূলে
অগণিত মাণিক্য আর লুণ্ঠিত সম্ভার
গঙ্গাঋদ্ধ থেকে নিয়ে চলে আর্যবর্তে

এখন শুধু পরিতাপ, দারুণ বিধি
আর্যশরে নির্মূল সমূলে
গঙ্গাঋদ্ধের পতন আর আর্যের বিজয়
আমি পরাজিত তবে সকল অর্থে
এখন আমাকে তাই ছেড়ে যেতে হয়
আমারই প্রিয় গঙ্গাঋদ্ধ নগরি
ছেড়ে যেতে হয় এই অনার্য উপসানাবেদী
জনশূন্য জনপদ, শুধু ধ্বংসের সাক্ষাৎ
বারুণ দেবতার উপাসনা আশার অতীত

বন্দিনী নারীবৃন্দের আকুল ক্রন্দনে
প্রতিধ্বনি জেগে ওঠে সাগর-তটে
তারা আজ বিতরণ হয় সেনার্যদের কাছে
ক্রীতদাসীরূপে; হয়নি যারা রয়েছে এখানে তারা
ব্রহ্মাপতিদের জন্য রক্ষিত একান্তে, জলশূন্যগঙ্গা যেন তারা

প্রাচ্যরাজের কন্যা যিনি ছায়া, মেঘযুক্ত কেশ যার মেঘমালা
সেও এখানে বন্দি আর-সব বন্দিনীর সঙ্গে
আর, এই যে, মন্দির-দ্বারে, মাটিতে লুটিয়ে কাঁদে
কী করুণ দৃশ্য, হৃতভাগ্য বিধুমুখী মহারাণী মুরু
নিখিল ধরণীর ব্যথা আজ তারই বক্ষে, চারুনেত্রা দেবী
কে না জানে হায়, ছিল সে বীরপত্নী, বীরপ্রসূনের প্রসূ ভাগ্যবতী
কিন্তু ভেবে দেখ, কোথায় গঙ্গাঋদ্ধি আর কোথায় আর্যবর্ত
রতনলোভে এসেছে আজ এই রজত-প্রাচীর সম শোভিত দেশে
বামন হয়ে ধরতে চায় চাঁদ, এতদিনে বীরশূন্য হল গঙ্গাঋদ্ধি
আর মরু'র কন্যা তরঙ্গিণী, আর্যসেনার বীরগর্ব রণে
বীরমদ-আত্মহারা-লালসায় হয় বলি, রাজপ্রাঙ্গণে

নিষ্ঠুর এই আর্যবাসী, ডমরুধ্বনি যেন কালফণির মুখে
তাদেরই কারণে ভৈরব হুঙ্কারে বীররাজেন্দ্র মুরু'র স্বামী
কনক মুকুট শিরে ঘুমায় আজ শরশয্যোপর
অগ্নিশিখাসম পুত্রবৃন্দ একে একে সব বিদ্যুৎঝলকে হল মৃত
দৈবজ্ঞানী কন্যা তার হৃদয়-বৃন্তের কুসুমরতন
প্রাচ্য সুন্দরী অহল্যা, আলুথালু হায় তার করবীবন্ধন
ইন্দ্র যাকে রেখেছিল নিশার শিশিরপূর্ণ পদ্মের মতন
উৎসর্গিত কুমারী রূপে, দেবেন্দ্র কনক-আসনে
তাকে আজ মৃত্তিকা-বেদীতে, আভরণহীনভাবে
উপভোগ করছে আর্য সেনারা, রতি-মহোৎসবে
ইন্দ্রের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে, বীরকর্মপরাক্রমে

বিদায়, বিদায়, তবে হে প্রিয় গঙ্গাঋদ্ধ নগরি
ছিলে তুমি এক শোভিত কানন, মনোহরি পুরী
আমার প্রিয় চুক্ষু-বিনোদনী নগরি, বিদায় বিদায়
ছিলে তুমি প্রাচ্যের হীরাচূড়াশিরে রঞ্জিত এ জগতে
প্রাচ্য স্থাপত্যে গড়া তুমি ছিলে অতুল এই ভূমণ্ডলে
ছিলে তুমি গৌরবে দীপ্তিমান, বীর চূড়ামণি
আজ তা ভূতলে লুটিয়ে পড়ে আর্যাক্রমণে
কাল-অগ্নি জ্বালিয়েছে আজি

ইন্দ্রদেব রুদ্রেশ্বর আর্যপতি

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About