তাতাই এর রবীন্দ্রনাথ

এইরকম... এই এপ্রিল মাসেই তো ! সেই বছর, সিদ্ধার্থর মনে পড়ে গেলো,মালা পড়াতে পড়াতে...   ওরা  পুরী গিয়েছিলো বেড়াতে , কিন্তু তাড়াহুড়ো তে বেশি দিন থাকতে পারেনি, যদিও পুরী তে আর মানুষ কদিন ই বা থাকে এটা যাদের মনে হয় তাঁদের কথা হচ্ছে না এখানে , এখানে পূরবী ব্যানার্জির কথা হচ্ছে, বিনোদিনী গার্লস হাই স্কুলের গানের দিদিমনি, আর এটা তাতাই এর ও গল্প বটে ! তাতাই ? তাতাই আমাদের সিদ্ধার্থ ! যে এখন স্যুটেড-বুটেড মালটি ন্যাশানাল কোম্পানীর সি.এম.ডি ।
তাতাই... তাতাইইইই... তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে নাও!!!
না মা আর একদিন থাকি!! প্লিজ মাম্মাম!!! আজ সকালে আমার বানানো বাড়িটা ভেঙে দিয়েছে পচা সমুদ্র!! কাল আবার বানাতে হবে মাম্মাম আজ থেকে যাই!
এ কি কথা তাতাই আজ না গেলে হয়! এ কি তুমি মামারবাড়ি এসেছো নাকি! বলতে গিয়ে গলায় কি একটা আটকে এলো পূরবী তো জানে মামাবাড়ি বলতে আসলে একটা পোড়োবাড়ি, যার চারদিক টা পূরবীর সিঁথির মতন, সাদাসিধে ।
আস্তে আস্তে ব্যাগে পুরে নেয় কুড়িয়ে আনা ঝিনুক, টুথব্রাশ, জামা প্যান্ট, যেই জামা টা পরে হাওয়া হাওয়া ছবি তুলেছিলো সেটা ভালো করে ভাজ না করেই রেখে দিচ্ছিলো তাতাই, হঠাৎ পূরবীর চোখে পরে গেলো! ঐ! ও কি হচ্ছে!! ওটা যদি খারাপ করে দাও, ফাংশনের আগে কিন্তু নিজে কেচে আয়রন করে পড়তে হবে বলে দিলাম ! সেদিন কেমন ছ্যাকা খেয়েছিলি গরম আয়রনে, ভুলিস নি নিশ্চয়ই?
তাতাই নিজেই নিজের কাজ করে, পূরবী ছেলে তৈরি করেছে বটে! একবার দেখিয়ে দিলেই সব কাজ সুন্দর করে করতে পারে... সব্বাই বলে! যেমন মা তেমনি ছেলে!
এই ছেলে! মনখারাপ করে না বাবুই জানিস তো ফাংশন টা না থাকলে থেকেই যেতাম! হতো ক্যান্সেল টিকিট! তোর মা কি টিকিটের পরোয়া করে! পূরবীর কথা শুনে ততক্ষণে তাতাই এর মন ভালো হয়ে গেছে , ঝটপট বলল না না মাম্মাম কোনই দরকার নেই আমার ও অনেক কাজ আছে আমার মনে পরে গেলো চলো চলো বাড়ি যাই
ছেলের কথা শুনে মুচকি হাসল , পূরবী ছেলের গাল টিপে বললো পাকা বুড়ো !
চল! খেয়ে আসি ।
তারপর সন্ধ্যে ছটায় হোটেল লক্ষ্মীজ্যোতির ম্যানেজারের ঘরের পাঁচটা লোকের অবাক দৃষ্টি ভেদ করে মা ছেলে অটোতে উঠে বসতেই মহাদেব ছুটে এলো দিদিভাই টাটা টাটাপূরবী হেসে বলল খুব বুলি ফুটেছে ব্যাটা হ্যাঁ আগের বার যখন এসেছিলাম লজ্জায় তো মনোজের পিছনে গিয়ে লুকিয়েছিলি! এই নে এটা ধর, আবার আসবো কবে... কে জানে
মহাদেব কে বলেছিলো পূরবী চাকরি পেলে মিষ্টি  খাওয়াবে !

এসো হে বৈশাখ এসো এসোস্কুলে প্র্যাকটিস করাতে করাতে নিজের গলা টাই নষ্ট হয়ে যাবে দেখো মিনতি দি! স্টাফরুমে এসে ধপ করে বসে পড়লো পূরবী!
ধুস আমি যাই কিছু কিনে আনি যা গরম!!! ওরেবাবারে!
আর শোনো ছবি টা এসেছে তো? আর দিন বেশি বাকি নেই কিন্তু!
হ্যাঁ রে যা যা তোর যেন সব চিন্তা! সব এসেছে! যা তো! মিনতি মজুমদার পূরবীর মায়ের বয়সী, কিন্তু তবুও প্রথম দিন ঢুকে যখন দিদি বলে ডেকেছিলো তিনি কিঞ্চিৎ অবাক ই হয়েছিলেন!

আস্তে আস্তে দিন এগিয়ে এলো! তাতাই কিছুই করতে পারবে না... থাক... বাচ্চা তো! পঁচিশে বৈশাখের সকালে আর মনখারাপ করে কাজ নেই পূরবী কে বলল মিনতি দি , চল আমরা গুছিয়ে ফেলি সব! তাতাই কে কোথায় বসিয়ে রেখে এলি?
ঐ তো সুধীর কাকুর কাছে, দিব্যি খেলছে!বলতেই মিনতি বলে উঠলেন ওমা খেলবে না এই স্কুলে ওর মায়ের, দিদিয়ার গায়ের গন্ধ লেগে আছে যে
বাদ দাও না মিনতি দি, বলেই ছুটে বেড়িয়ে গেলো পূরবী আর পিছন থেকে মিনতি শুনতে পেলো পূরবীর হাতের চুড়ির রিনঝিন শব্দ... আবার কাঁদালাম ! ভাবতে ভাবতে মিনতি মজুমদার তাতাই কে দেখতে গেলেন, ‘অনেকক্ষণ দেখিনি যাই কি করছে দেখে আসি
আর পূরবী ছুটতে ছুটতে হল-ঘরে ঢুকতেই জোর হোঁচট খেলো! দেখলো যে ছবি আনার কথা ছিলো সেটা তো নেই! তাতাই... ৬ বছরের বাচ্চা... ওর আঁকা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাস এইটের মেয়ে গুলো বলছে ম্যাডামের ছেলের হাতের কাজ দ্যাখ! বালি দিয়ে কি সুন্দর কবিগুরু কে বানিয়েছে!! বাবারে!! আমরা তো আঁকতেও পারবো না!

নাহ... পূরবী আর কাদছিলো না, আর কেন কাঁদবে! ও বরাবর চেয়েছিল তাতাই সন্দীপনের মতন হোক, পূরবীর মা ও সেটাই চাইতেন তাই তো পূরবীর বিয়ের প্রথম অ্যানিভারসারি তে একা একাই গাড়ি চালিয়ে চলে এসছিলেন মেয়ে-জামাই কে উইশ করবেন বলে, ওরা তিন জনে হারে রেরে রেরে আমায় রাখবে ধরে কেরেগাইতে গাইতে হাইওয়ে দিয়ে আসছিলো আর তখন ই মায়ের হাত পিছলে যায়, আর অ্যাক্সিডেন্ট! কিভাবে যেন পূরবী বেঁচে যায় সন্দীপন আর মায়ের মৃতদেহ মর্গে পাঠায় কিভাবে যেন তাতাই কেও পৃথিবী তে আনে...

পূরবী কিচ্ছু জানে না!
আমি জানি, এই ঘর থেকে বরাবর ওর মাথায় ছাতা ধরে ওর আঁচল বাঁচিয়ে, ওকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তো এখন আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য!
আহ! না মা আপনার নাতি মোটেই আমার মতন হয়নি আমি কিন্তু গুরুজনদের সামনে সিগারেট খেতাম না আপনি জানেন!
-    আহ সন্দীপন! আমরা কি আর ততটা সামনে আছি! আমরা ছবি হয়ে গেছি ভুলে যাও কেন তুমি! তুমিও দেখছি দিন দিন কচি হয়ে যাচ্ছ!
বলে গুনগুনিয়ে উঠলেন পূরবীর মা হে ক্ষণিকের অতিথি

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About