দীর্ঘ কবিতা

অমোঘ সংলাপ

পার্টি অফিসের বাইরে লাল কাপড় ঢাকা
শুয়ে আছেন যে আটানব্বই বর্ষীয় চিরতরুণ
তাঁর নাম কমরেড মায়াণ্ডি ভারতী।

তখন বত্রিশ সন
কতই বা বয়েস ছেলেটার - বড় জোর পনের
দেশজুড়ে 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের ঝড়
কেন জানি না, তার বুকে দামামা বাজে
অথচ একুশজনের অভাবের সংসারে
ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোয় না
দুই বউ আর আঠেরটি সন্তান নিয়ে
বাবার নাজেহাল অবস্থা তার নিত্য সাথী
তবু দামামা বাজে
তবু যেন সে কিসের ডাক শুনতে পায় অনুক্ষণ।

মাদুরাইয়ের এখন যেখানে রাজাজী হাসপাতাল
তখন ঐ জায়গাটা এমন ছিল না।
ঝোপ-জঙ্গলে ঢাকা ছিল একেবারে
কাঠবিড়ালী খেলা করত
কতরকম পাখিরা করত মাতামাতি
আলপনা আঁকত প্রজাপতির দল
সে কি অবর্ণনীয় রঙের বাহার তাদের।
শিক্ষকের কথায় মন বসত না ছেলেটার
একেবারে পেছনে বসে জানালার বাইরে
তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত ঋতুরঙ্গের খেলা।
আর দেখত ঐ ইংরেজদের দোকানটাকে
ওরা মদ বিক্রি করত। বিদেশি মদ।
আরো টুকিটাকি নানান জিনিষ।
সারাক্ষণই সেখানে সাদা চামড়ার আনাগোনা।

এমনই একদিন হঠাৎ সেখানে খন্ডযুদ্ধ
লাঠি হাতে গোরা পুলিস, আর
খালি হাতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অসম লড়াই
কি যে হোলো ছেলেটার
মাথাটা কেমন গন্ডগোল হয়ে গেল
শিক্ষকের দৃষ্টি এড়িয়ে, জানালা টপকে
একাবারে রাস্তায়
বইখাতা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রেখে
ব্যাগ ভর্তি করে নিল ইট-পাটকেলে
তারপর দে ছুট
সংগ্রামী ভাইদের হাতে তুলে দিল সেই অস্ত্র
নিজেও ছুঁড়তে থাকল
অব্যর্থ নিশানায় ঢিল ছুঁড়ে আম পাড়ে সে
ধরে নেওয়া যাক এক একটা সাদা মুখ
এক একটা পাকা আম।

চাবুক পড়ছে - সপাং
অন্য একজন চুলের মুঠি ধরে বলছে -
'সে, লং লিভ দা কুইন'
ছেলেটি চিৎকার করে বলছে -
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
আবার চাবুক - সপাং...সপাং...সপাং
একসময় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লে
ইংরেজ পুলিস তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যায়।
জ্ঞান ফিরে এলে কোনোক্রমে সেই ঝোপ থেকে
বইখাতা নিয়ে গুটিগুটি পায়ে বাড়ি ফেরে সে।

তারপর থেকে ঐ ইট-পাটকেলই তার অস্ত্র
ইংরেজ দিশাহারা
কখন কোন দিক দিয়ে যে তা ধেয়ে আসবে
কেউ বলতে পারে না।
নাম দিল - 'দা স্টোন বয়'

বড় হচ্ছে সেই পাথুরে ছেলেটা
যত না শরীরে, তার অনেক বেশী মননে।
মহাত্মা যখন মাদুরাই এলেন,
সে তখন আবাহনী দলে। সুযোগ পেয়ে
প্রণাম করে প্রশ্ন করল -
'বাপুজী, আমরা ঠিক পথে যাচ্ছি তো?'
বৃদ্ধ মানুষটি কেমন থতমত
এক নির্দিষ্ট অভীষ্ট লক্ষ করে এগিয়ে চলেছেন
পরিনতির আগে কি দিশা সম্পর্কে
নিঃসন্দেহ হওয়া যায় কখনও!
তবু তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন
চোখ বন্ধ করে কি যেন বললেন
আসলে তিনি জানেন -
এদেরই রক্তের বিনিময়ে আসবে স্বাধীনতা।

না, কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না মন
আরও একটু বড় হয়েছে সে
আরও বেশী শানিত বোধ
আরও ক্ষুরধার বুদ্ধি
আর তাতেই যত গোলমাল
বাপুজী'কে করা প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও
আর তার পরই একদিন ঘটে গেল ঘটনাটা
এলেন সুভাষ চন্দ্র বোস
একই প্রশ্ন করল ছেলেটা
মৃদু হেসে, তার হাত নিজের প্রশস্ত হাতে নিয়ে
নেতাজী বললেন -
'যদি মানুষ হও, তাহলে বোধ যে দিশা দেখাবে
সেটাই তোমার সঠিক পথ
আমি তোমার বোধের ঘরে আলো জ্বালতে পারি
পথ বেছে নিতে হবে তোমাকেই,
আমার সাথে বল - ইনকিলাব জিন্দাবাদ।'
যেন কোনো জাদুকর সম্মোহিত করল তাকে
পথ বেছে নিতে আর ভুল হয়নি কখনও।

হাসপাতালে শিশুশ্রমিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে
যে কিশোর রুগীদের বর্জ পরিস্কার করত
সেদিন সকাল থেকেই সে লক্ষ্য করেছিল
বৃদ্ধ মানুষটা বিড়বিড় করে কি যেন বলে চলেছেন
ভাল করে শোনার জন্যে
মুখের কাছে কান নিয়ে যেতেই
পাণ্ডুর রোগক্লিষ্ট মুখ মুহুর্তে ঝিলমিলে তারা।
হাতে একগোছা তাজা লাল গোলাপ নিয়ে
সে প্রণাম জানাতে এসেছে।
আলতো করে বুকের উপর রাখল সেটা
তারপর টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে
ডান হাতের শক্ত মুঠোটা আকাশের দিকে তুলে
চিৎকার করে বলে উঠল -
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

ভারতীদের মৃত্যু হয় না
শুধু জীবনের ডিঙা বেয়ে পাড়ি দেন
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে,
বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়।

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About