শিশু-সাহিত্যের পিতৃপুরুষ যোগীন্দ্রনাথ সরকারের জন্ম সার্ধ-শতবর্ষে ‘অন্যনিষাদ’এর বিনম্র প্রণাম । আজ তাঁর ১৫১তম জন্মদিন ।

আধুনিক কবিকুলের অনেকেই ‘ছড়া’ চর্চার কথা শুনলেই নাসিকা কুঞ্চন করেন । সাহিত্যে ছড়াকে স্থান দিতে তাদের প্রবল অনীহা । বড়জোর তারা বলেন 'ছড়া শিশুদের খেলামেলার কাব্য' এর বেশি মর্যাদা তারা ‘ছড়া’কে দিতে চান না । অথচ তারা কেউই বুক ঠুকে বলতে পারবেন না যে তারা কবিতা লেখার হাত মকশো করেননি ছড়া কিংবা ছন্দবদ্ধ পদ্য চর্চার মধ্য দিয়েই । ছড়া সাহিত্যের মূল ধারারই এক শক্তিশালী শাখা । ছড়ার রয়েছে দেড়হাজার বছরের ইতিহাস । সাহিত্যের প্রথম শাখা বা সৃষ্টিই ছড়া । ছড়া প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সুদূর কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই কাব্য (ছড়া) যারা আউড়িয়েছে এবং যারা শুনেছে তারা অর্থেও অতীত রস পেয়েছে। ছন্দতে ছবিতে মিলে একটা মোহ এনেছে  তাদের মধ্যর । সেই জন্য অনেক নামজাদা কবিতার চেয়ে এর আয়ু বেড়ে চলেছে’ ।

হলই বা ছড়া শিশু-সাহিত্যের বিশিষ্ট উপাদান । কিন্তু যুগ যুগ ধরে অজস্র লৌকিক ছড়া, যেগুলির রচনাকারের নাম জানা য্য না, সেইসব লোকায়ত সৃষ্টিগুলি যে আমাদের সাহিত্যভাবনার বীজ তা অস্বীকার করবে কে ? এমন কে আছেন, যিনি তার নিতান্ত শৈশবে মাতৃক্রোড়ে ছড়া, গান শনতে শউনতে ঘুমননি ! এমন কি কেউ আছেন যিনি আস্ফুট বোলে যোগীন্দ্রনাথের ‘অএ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাবো পেড়ে’ পড়ে বাংলা অক্ষর পরিচয় করেননি কিংবা প্রবাদ হয়ে যাওয়া ‘হারাধনের দশটি ছেলে’ ছড়াটি আপন শৈশবে পড়েননি ! এইসব ছড়া তবুও ছাপাখানা আসার পরের সৃষ্টি, যে সৃষ্টির ভুবনকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছেন যোগীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অন্নদাশঙ্কর রায় থেকে একালের ভবাণী প্রসাদ মজুমদারের মত কত কবি, ছড়াকার ।

বাংলা সাহিত্যেরই তখন নির্মাণের কাল । মার্চ ১৮৬৫তে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হয়েছিল । রবীন্দ্রনাথ তখন চারবছরের বালক, উপেন্দ্রকিশোর ১৫মাসের শিশু আর যোগীন্দ্রনাথ জন্মাবেন আরো আঠেরো মাস পরে । যোগীন্দ্রনাথ সরকার ও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাতেই বাংলা শিশু-সাহিত্যের একটা স্পষ্ট অবয়ব তৈরি হয়েছিল । আর ক’বছর পরে এলেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার । ছড়ার যোগীন্দ্রনা্থ, গল্পের উপেন্দ্রকিশোর  আর রূপকথা গল্পের দক্ষিণারঞ্জন আর উদ্ভট কল্পলোকের ছড়া ও গল্পের সুকুমার রায় । শিশুসাহিত্য বলতে আজও বাঙালি এঁদের কাছেই ফিরে যান ।

অগ্রজ নীলরতন সরকার সেকালের প্রখ্যাত চিকিৎসক । কিন্তু যোগীন্দ্রনাথ প্রথাগত শিক্ষায় বেশিদূর না গিয়ে শিশুসাহিত্য রচনা ও প্রচারকেই জীবনের ব্রত মনে করেছিলেন । শুধু নিজে লেখা নয়, শিশুসাহিত্যের প্রচারের উদ্দেশ্যে ১৮৯৬তে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সিটি বুক সোসাইটি’ । তাঁর প্রকাশনা সংস্থা থেকেই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রথম গ্রন্থ ‘ছেলেদের রামায়ণ’ প্রকাশিত হয় । তাঁর এক অনন্য কীর্তি বাংলার লোককথা ও মৌখিক সাহিত্যে ছড়িয়ে থাকা ছড়া-ভান্ডারের উজ্বল উদ্ধার । বাংলার লৌকিক ছড়া সংগ্রহ করে ১৮৯৯ সালে প্রকাশ করেন ‘খুকুমণির ছড়া’, যার ভূমিকা লিখেছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদি । যোগীন্দ্রনাথের ছড়ার মধ্যে আছে সহজিয়া ভাব, নেই তত্ব বা উপদেশ । তিনি বিশ্বাস করতেন, ছড়ার ধর্ম হল শিশুর অস্ফুট ভাষ্য, বিজ্ঞের ভাষ্য নয় । শব্দই ছড়ার প্রাণ , অর্থ বা তত্ব সেখানে গৌণ ।

যোগীন্দ্রনাথ আজ হয়তো এক ভুলেযাওয়া নাম । কিন্তু সংশয় নেই ‘টিয়াপাখির ঠোঁটটি লাল ঠাকুরদাদার শুকনো গাল’- এমন অপরূপ ছন্দ তালে শিশুকে অক্ষর পরিচয় শেখানো একশো কুড়ি বছর আগে প্রকাশিত ‘হাসি-খুশি’ চিরদিন উজ্বল হয়ে থাকবে, চিরদিন তারা তাদের মনের মত খেলনার সঙ্গে আমরা ‘হাসিখুশি’ও তাদের হাতে । বাংলায় সার্থক কল্প-বিজ্ঞান লেখক, ঘণাদার স্রষ্টা প্রেমেন্দ্র মিত্র যোগীন্দ্রনাথকে নিবেদিত একটি ছড়ায় লিখেছেন যে চাবিতে এই দুনিয়ার সকল মহল খোলে /  তোমার কাছেই তা পেয়েছি বসে মায়ের কোলে। এই দুটো পংক্তিই বোধ করি যোগীন্দ্রনাথের প্রকৃত মূল্যায়ন ।

অর্ধশতাধিক ছড়া, একটি প্রবন্ধ দিয়ে সাজিয়েছি এই সুবৃহৎ সংকলন । পাঠকের ভালোলাগাই এই প্রয়াসকে অর্থবহ করবে । সকলকে আসন্ন শারদীয়া উৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানাই । পরের সংখ্যা প্রকাশিত হবে ৬ই অক্টোবর । সেটিই ৫ম বর্ষের শেষ সংখ্যা । তারপর এক সপ্তাহ অন্যনিষাদের শারদ-অবকাশ । ৬ষ্ঠ বর্ষের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হবে ২০শে অক্টোবর ।




5 মন্তব্য(গুলি):

PALASH KUMAR Pal বলেছেন...

ছড়া লেখা খুব সোজা নয়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য। তাই বলি শিশু সাহিত্যিক হল সাহিত্যের বড় প্রতিভা। শ্রদ্ধেয় যোগীন্দ্রনাথ সরকারকে বিনম্র প্রণাম জানাই।

PALASH KUMAR Pal বলেছেন...

শিশুদের সঙ্গে যুক্তথাকার সুবাদে ওনার ছড়া প্রত্যহ পড়াতে হয়। সেরকম ওনার লেখা একটি ছড়া খুব মন টানছে আজ, যে ছড়া প্রাথমিক পাঠ সহজে শিখিয়ে দেয়-

"কাক ডাকে কা-কা
আগে অ পরে আ
খোকা হাসে হি হি
(হ্রস্ব)ই (দীর্ঘ)ঈ
ঘুঘু করে ঘু-ঘু
(হ্রস্ব)উ (দীর্ঘ)ঊ
রুই কাতলা জোড়া কই
ঋ ঌ এ ঐ
ভুলো ডাকে ভৌ ভৌ
বাকি শুধু ও ঔ"

Soumitra Chakraborty বলেছেন...

অপরূপ সংকলন।

রুখসানা কাজল বলেছেন...

ছড়া লেখা অনেক অনেক কঠিন। আমার বিশ্বাস খুব পবিত্র মন না থাকলে ছড়া লেখা যায় না।

Damayanti Dasgupta বলেছেন...

খুব ভালো সংকলন আর মনভরানো সম্পাদকীয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About