এই সংখ্যায় ২৯টি কবিতা । লিখেছেন - সৌমিত্র চক্রবর্তী, প্রদীপ গুপ্ত, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, অরুণিমা চৌধুরী, কাজরী বসু, পিনাকীপ্রসাদ চক্রবর্তী, প্রণব বসু রায়, সুবর্ণ রায়, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, পিনাকী দত্তগুপ্ত, শাশ্বতী ভট্টাচার্য, হরপ্রসাদ রায়, জারা সোমা, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, নুপুর রায়, বিবেকানন্দ দাস, শ্রীলেখা মুখার্জী, মনোজ ভৌমিক, পিয়াল রায়, বর্ণালী সেন ভট্টাচার্য, স্বপ্ননীল রুদ্র, সুনীতি দেবনাথ, বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য, সিয়ামুল হায়াৎ সৈকত, নীহার চক্রবর্তী, সাজ্জাদ হোসেন, নিবেদিতা পুণ্যি ও সনৎ কুমার ব্যানার্জী ।
বাণভাসি

বাড়ীর পাশে নদী, নদীর পাশে বাড়ী
একতলাতে জল, ঢেউ হয়েছে শাড়ি।

চালের পিঠে ডাল, ডালের পিঠে চাল
আজকে নিরম্বু, স্বপ্ন ছিল কাল।

বাঁধের গায়ে সাপ, সাপের গায়ে বাঁধ
ঘূর্ণিজলে লাশ, উধাও বেবাক কাঁধ।

রাত্রি জড়ায় বৃষ্টি, বৃষ্টি জড়ায় রাত
কাঁটাতারের বর্ডার, হাত জুড়েছে হাত।

দায় এড়ানো রাজা, রাজা এড়ানো দায়

উলুখাগড়ার প্রাণ, ভাঙা কুলোর ছাই।

এসো কবিতা

সোনালি ধানেরা বুকভরা কাচা দুধ নিয়ে
এলিয়ে দিয়েছে শরীর।
পাতা উনুনের পেটে আগুনের চিহ্ন নেই কোন
নদী এসে বিছিয়ে দিয়েছে শয্যা,
এ অশুচি সময়ে তুমি ত্রাণ হয়ে এসো কবিতা
তোমার কলমে ভরা থাক ট্যালটেলে খিচুড়ির
দুপাটি দাঁতের উষ্ণতা।
পেটের ছেলেটা যদি এসেও ফিরে যায় ফের
না খাওয়ার যন্ত্রণায় নীল হয়ে, অভিমানে
সে যে কি ভীষণ লজ্জা!
প্রতিরোধ

এবার
বাজাও জবর ঢাক
সবাই
শুনতে এখন পাক
মনের
দুঃখ দূরে যাক

যখন
বিছন বোনার দিন
তখন
পাইনি কোনো ঋণ
আসুন
মুখোশ চিনে নিন

সাধের
অবশ বিবশ মন
পাবেই
দুঃখ আমরণ
শুধুই
চলবে সখের রণ

এখন
তারের ভেতর রোধ
তড়িৎ
পেলেই প্রতিরোধ
তাপেই
জানাও মনের ক্রোধ

আবার
বাজাও জবর ঢাক
সবাই
শুনতে এখন পাক
মনের
দুঃখ দূরে যাক

অসুখের রাফখাতা

অসুখ ডানা মেলছে জানলায়
তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে  সায়াহ্নিক ঘাম
দৃশ্যক্লান্ত ।
ঘুমের বাগানে  ঠোঁটের শূন্যতা কেউ মেলে দিয়েছে
গোপন জ্বরে ।

 দুরন্ত ভাবনায়
এগিয়ে  আসছে রোদ প্রহর
উন্মুখ চৌকাঠে স্বনির্ভর পায়ের আকুতি  ।
ফাঁকা আলপথ  ধরে তুমি কি এসেছ,   নিরাময় ?

বোবা ফেরিওয়ালা
শুভেচ্ছা আঙুলে  মায়া বিপনী

দরজা  খোলার শব্দে নির্জন বেজে উঠল দূরে ।  

  
যুদ্ধ

ট্রেন চলে গেলে আমি তার উড়ে যাওয়া শালপাতা আরও কতো খুঁটিনাটি দেখি.. 

সমস্ত ঘন রাত
ঠান্ডা চাদরে  অসময়ে শীত ভর করে
আরেকটু গভীর  হয় কুয়াশায় ঘিরে থাকা মুখ 

 গলা বেয়ে উঠে আসে ক্রোধ 

মনে পড়ে ঘণ্টা বাজলে ফের যুদ্ধ  শুরু হবে 

আমরা কি সত্যিই পাশাপাশি থাকি!  


ভ্রম

ঝড় ওঠেনি,বুক জুড়ে চিনচিন
মেঘ ভাবে তার কি নাম ছিল জন্ম নেবার দিন!
মনের ভিতর একটানা কুলকুল
ভুলেই গেছে,ফুটিয়েছিল বেল নাকি জুঁইফুল!

সেদিন ছিল বৈশাখী ঝড় কণ্ঠে প্রবল হ্রেষা,
লাগছে তুমুল নেশা
কখন যেন টগবগিয়ে অশ্বঝড়ের খুর,
রাত ভেঙে চুরচুর...

বুক করে টনটন
উত্তাপও গনগন
জল টলোমল গর্ভে যখন, আকাশ দিল ফাঁকি
জানবে কখন কেমন করে, প্রসব যন্ত্রণা কি!

জানল, কখন গড়তে গিয়ে স্তব্ধতা খানখান
জানল, কখন নিভতে গিয়ে আগুন অনির্বাণ।
জানল,কেন কোন নিষেকে অজান্তে হয় ভুল,
ভুলতে বসে, ফুটিয়েছিল  বেল নাকি জুঁইফুল!






কথাগুলো যেভাবে যেমন--

আমাদের কথাগুলো এ ভাবেই লিখে যাব
এযাবৎকাল যে ভাবে লিখে গেছি যেমত--

এক একটা খুন পেরিয়ে,বৃষ্টি আসে
বৃষ্টি আসবে,আমাদের হৃতসর্বস্ব

এ ভাবেই লিখে যাব,কুচকাওয়াজ
দূরাগত,বাতাসে সোঁদাগন্ধ মতো
আমাদের কথাগুলো যেভাবে যেমন --


খিল

শব্দ ছিটকে যাচ্ছে সমতল থেকে মালভূমির দিকে
আমরা, কার্যত বন্দীশিবিরে দিন কাটাই
আমাদের বন্দুক কার্তুজ নেই, আছে চাঁদমারি
ক্রল করা আছে, আছে পোকাভরা ট্রেঞ্চ
যোগ ছিঁড়েছে রুটিন ধ্বসে-- খাদ্য ও বস্ত্রসম্ভার
কবে যে আসবে...

এভাবে থাকতে থাকতে আমরাও একদিন
জলপাই গাছে হয়ে যাব
বাড়ি ফিরে গেলে প্রতিবেশীও ভয়ে ভয়ে
নিজেদের দরজায় খিল দিয়ে দেবে
হাপিত্যেশঃ অবয়ব বিষয়ক

বহুদিন নিজের অবয়ব দেখিনি!

আর্শিতে জলের জমা দাগ
ছোপ ছোপ ধুলো , মাকড়শার জাল
চোখ মেলে চায়ও নি
যে চোখের মণিতে নিজেকে  পাওয়া যায়
বহুদিন অবয়ব দেখিনি নিজের
তবু টের পাই
বলিরেখা গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ
ক্রমশই , যেমন দিগন্তে নামে গোধূলি


চন্দ্রগ্রহণ

মস্ত বড়
 চাঁদের ছবিখানায় পোকা লেগেছে
ভালো করে ঝেড়ে-মুছে

তাকে ঘরে তুলে আনি
 
তাই দেখে কে যেন বললে হেসে ---
 
গ্রহণের আগে তুলসীপাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়,
 
কখনও শোন নি?’

তারপর থেকে গ্রহণের আগে তুলসীপাতা দিয়ে ঢেকে রাখি
তবু চাঁদে পোকা লাগে
অন্য গ্রহের পোকারা এসে তাকে খুবলে খুবলে খায়

দিন যায়, মাস যায়...
এতদিনে বুঝি আমার চাঁদেও গ্রহণ লাগে

তেমন করে বুঝিনি আগে
পোকা না চাঁদ, কে কখন দংশেছে কাকে

তুলসীপাতা দিয়ে কত আর ঢাকব তাকে...!
 
হেমন্ত কিংবা হেমলক

সার্কাস শেষ। এবার তুমিও যেতে পারো।
এখনি অন্ধকার হবে। পরিধেয় বদলাবে জোকার, ষোড়শী 
আর ঝুলন্ত ট্রাপিজের দল।
অন্ধকারে মিশে যাবে নরক, নারী নীরা। নিশ্চিন্তে মুছে
নেবে অসমর্থিত যত রঙ...
তারপর নিষিদ্ধ যন্ত্রণা নেবে একা একা,
কিংবা এক পেয়ালা হেমলক।

শোনো, তোমার বহিরাঙ্গে ঘুন ধরে গেছে।
অন্তরাঙ্গে লেগে আছে শতাব্দীর বুনিয়াদি উঁই। গোপন অঙ্গ
গুলি ঢেকে রাখে শিউলি জুঁই।
তোমার কন্ঠ থেকে রে পড়ে বিষময় শ্বাস। ভোরের কাকলি
 দিয়ে ঘিরে রাখো গোপন আকাশ।
তারপর দিন শেষ হলে, শুরু হয় নৃশংস ভোজ।
রাতের অন্ধকারে রোজ।

দেখো,
হেমন্ত এসে গেছে, গাছে গাছে ফুটে আছে ফুল।
অপেরা উঠেছে সেজে, সার্কাসে নবীন বুলবুল...
চুল বাঁধে, রঙ মাখে, যৌবন উথলিয়ে ওঠে
কেউ ঢোকে মৃত্যুকূপে, বিষাদের হাসি লেগে ঠোঁটে!
আগুন বলয়ে কেউ ছুড়ে দেয় সাধের শরীর,
কপালে আপেল রেখে কেউ চোখ বুজে ছোড়ে তীর।
ট্র্যাপিজেরা দোল খায়, মৃত্যুও রোমসর্ষক...
ওদের চোখেতে লেগেহেমন্ত, কিংবা হেমলক
তোমারও মৃত্যু লিখে যাবে একবিংশ শতক,
আপাতত বেছে নাওহেমন্ত কিংবা হেমলক”!
বৈপরীত্য

এককালে আমাদের নিজেদের হিমালয় ছিল,
শুভ্রতায় মহিমায় শিক্ষা, জ্ঞানে  শির চূড়ামণি,
মানচিত্রে বুক জুড়ে আমাদের প্রেইরি  অঞ্চলে,
হলুদ চাঁদের আলো খুঁজে পেতো সভ্যতার ধ্বনি |
এককালে আমাদের নীলাকাশে খসে যেত তারা,
ভেসে যেত ধমনীর ভাগীরথী অববাহিকায়,
আমাদের অলিন্দের উপসাগরীয় কূল জুড়ে
হিরণ্যস্রোতের তাল নেচে যেতো সুন্দরীর পায় |

এখন ধ্বসের দিন, রক্তনদী জমে থাকে লাশে,
অযান্ত্রিক চাহিদায় যান্ত্রিক শাসনের হাওয়া...
গরানের পাতা বেয়ে বাঘেরা হারিয়ে যায় স্রোতে,
নিবিড় অরণ্য মন মাতলার বুকে ভেসে যাওয়া |
ধানক্ষেতে জেগে থাকে আমাদের আলোর কফিন ,
খিদে পেলে মাটি খায়, ভুলে যায় নবান্নের দিন |

About