নির্বাক একুশ

একুশ শুধুই একটি সংখ্যাবাচক শব্দ নয়। একুশ এক ইতিহাস। একুশ একটি অর্জন। একুশ আমাদের উত্তরাধিকার। একুশ বাংলার অহংকার। আবিশ্ব মানবগোষ্ঠীকে একুশ বাঙালির উপহার। তাই আজ সারাবিশ্ব জুড়ে একুশ পালিত হচ্ছে মাতৃভাষা দিবস রূপে। সেই একুশে এসেই বাৎসরিক স্মরণ সভার মতো আমাদের ভাষা উদযাপনের অনুষ্ঠান কাঁটাতারের দুই পারে। কোথায় বেশি কোথাও কম। কোথায় জাতীয় উৎসব কোথাও সাংস্কৃতিক কলরব। কোথাও স্রোতস্বিনী আবেগের উন্মুক্ত উৎসরণ। কোথাও একাডেমিক সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার এক উপলক্ষ্য। কোথাও উৎসব কোথাও আনুষ্ঠানিকতা।

কিন্তু যে ভাষার স্বাধিকারের দাবিতে একুশের জন্ম, কেমন আছে সেই ভাষা। ভাষা কি শুধুই ব্যকরণ? ভাষা কি শুধুই যোগাযোগের আটপৌরে মাধ্যম? না কি ভাষা একটি জাতিগত প্রত্যয়? না কি ভাষা মানবিক চেতনার সুস্থ সুন্দর সবল বহিঃপ্রকাশ? একুশ শতকের এই পর্বে দাঁড়িয়ে স্বভাবতঃই এই প্রশ্নগুলি আমাদের চেতনায় উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে। ভাষা তো কয়েকটি ণত্ব ষত্ব ক্রিয়া বিশেষণ নয়। গভীর সত্য উপলব্ধিজাত মূল্যবোধের ভিতও ভাষা। সেই ভিত মজবুত আছে তো? কেননা সেই ভিতেই যদি ঘূণপোকা বাসাবাঁধে তবে, ভাষার ক্ষতি যতটা নয়, জাতির ক্ষতি অনেক অনেক বেশি।

কাঁটাতারের উভয় পারেই বাংলাভাষার সামনে আজ অনেকগুলি প্রশ্ন দেওয়াল তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেই প্রশ্নগুলিকে সাধারণ ভাবেই আমরা এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করি। করি কারণ আমাদের হাতে বিকল্প অনেকগুলি উপায় রয়ে গিয়েছে। এবং সেই উপায়গুলির কার্যকরি জৌলুসও চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কিন্তু চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্যে যতই কার্যকরি হোক না কেন, একটি জাতির জন্যে সে বড়োই বিপদজনক এক প্রবণতা। যে কোন জাতির সমৃদ্ধির বিষয়টি প্রধান যে বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে তার একেবারে প্রাথমিক বিষয়টিই হলো শিক্ষা। একথা জানি আমরা সকলেই। অনেকেই প্রায়, সার্বিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও তার বিস্তারের গুরুত্বের বিষয়ে আলোচনা করে থাকি। কিন্তু আমরা প্রায় সকলেই যে গুরুত্বপূর্ণ দিকটিতে নজর দিতে ভুলে যাই, সে হলো শিক্ষার মাধ্যম! আর এইখানে এসেই আপামর শিক্ষিত বাঙালিকেই আত্মমর্য্যাদাহীন নিদারুণ এক হীনমন্যতায় ভুগতে দেখা যায়। এবং আমাদের বাঙালির এই এক জাতীয় রোগ। প্রায় কেউই আমরা মুক্ত নই আত্মমর্য্যাদাহীন এই হীনমন্যতা থেকে। তাই সকলেই আমরা শিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্ব স্বীকার করতে দ্বিধ্বাহীন চিত্তে অস্বীকৃত! যার নীট ফল, কাঁটাতারের উভয় পারেই ইংরাজী মাধ্যমের স্কুল ব্যবসার বাঁধনহীন রমরমা। আমরা বাঙালিরা সন্তানদেরকে শৈশবেই ইংরাজী মাধ্যমের স্কুলে ভর্ত্তি করানোর জন্যে আদাজল খেয়ে লেগে পড়ি। যে স্কুলে যত বেশি খরচ, সেই স্কুলেই গার্জেনদের লাইন তত বেশি দীর্ঘ!। একটি জাতির কি অদ্ভুত পরিণতি? যে জাতির আবার নাকি একুশের ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত!

একটু ভেবে দেখলেই দেখা যায় আমাদের চেতনা আজকে কতটা দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। একদিন যে ভাষার স্বাধিকারের দাবিতে অমর একুশের জন্ম, আজ সেই ভাষার ধারক বাহক হয়েও আপন সন্তানের গর্ভস্থ অবস্থাতেই আমরা মনে মনে ঠিক করে ফেলি কোন কোন ইংরাজী মাধ্যমের স্কুলে সন্তানের ভর্ত্তির জন্যে দৌড়াবো। এই মানসিকতা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটি জাতির সমগ্র শিক্ষিত জনমানসেই এই মনোবৃত্তি হিমালয়ের মতো দৃঢ় হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে অটল হয়ে। কাঁটাতারের এপারে স্বাধীনতা বয়স পেড়িয়ে গিয়েছে সাতদশক। অপর পারে অতিক্রান্ত সাড়ে চার দশক। কিন্তু শিক্ষার জড়তা কাটেনি কোথাও। তাই আজ সুশিক্ষিত মানেই ইংরাজি ভাষায় সড়গড়! তাই আজ উচ্চশিক্ষার সকল বিষয় কেবলই ইংরাজী মাধ্যমেই সুসম্পন্ন হয়। কিন্তু বিশ্বে এমন কোন জাতি আছে কি, যারা নিজের মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে কোন একটি নির্দিষ্ট বিদেশী ভাষার কাছে দাসখৎ লিখে দিয়ে হামলে পড়ে শিক্ষার্জনের জন্যে? বিশ্বের আর কোন উন্নত জাতি মনে করে মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা সম্ভব নয়? অনেককে দেখা যায় গলা ফাটাতে, ইংরাজী এখন আন্তর্জাতিক ভাষা। ইংরাজী এখন ইনটারনেটের ভাষা। বিশ্বায়নের হাতিয়ার। ইংরাজী এখন যোগাযোগের একমাত্র ভাষা বলে। বেশ তো তাহলে তো ফরাসী জার্মান রাশিয়ান স্প্যানীশ ইটালিয়ান জাপানী সবাই এই একই কথাই বলতো! কিন্তু বলছে কি কেউ? এইসব দেশের নাগরিকরা? এই দেশগুলিতেও শিশুদেরকে মাতৃভাষার বদলে ইংরাজীতেই পড়ানোর জন্যে বাবা মায়েদের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকতো। কিন্তু হচ্ছে কি তাই? একটু ভালো করে খবর নিলে দেখা যাবে। না তারা স্বাধীন জাতির নাগরিক। তারা শিক্ষার মূল্য বোঝেন। তারা জাতি গঠনের মূল্য বোঝেন। তারা জানেন একটি দেশের পক্ষে তার জনসম্পদ কতখানি মূল্যবান। আর সেই জনসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষার গুরুত্ব কতখানি। আর শিক্ষার বিস্তার ও সমৃদ্ধিতে মাতৃভাষা কতটা প্রয়োজনীয়। কতটা অপরিহার্য্য। এগুলি জানেন সেই সব উন্নত দেশের নাগরিকবৃন্দ। শিক্ষিত অশিক্ষিত উভয়ই!

তাই উন্নত বিশ্বের কোন দেশেই শিক্ষার ভিতটি বিদেশী কোন ভাষার মাধ্যমে গড়ে তোলার আত্মঘাতী প্রয়াস চোখে পড়ে না আজও। না আবিশ্ব ইংরাজী ভাষার এই বিপুল ঢক্কানিনাদের আমলেও। কিন্তু আমাদের এই কাঁটাতারে বিভক্ত ক্ষতবিক্ষত বাংলার দুই পারে আমরা কি পরম আনন্দে শিক্ষার ভিত থেকেই সরিয়ে দিয়েছি আ মারি মাতৃভাষা বাংলাকে। এবং কি নিপুণ দক্ষতায়!  ভাবলে নিজেদের আত্মঘাতী দক্ষতার শক্তি দেখলে অবাক হয়ে হতবাক হতে হয়। এবং শুধু ইংরাজীতেই কিন্তু থেমে থাকি নি আমরা। কাঁটাতারের এপারে আমরা যারা ভারতপন্থী, নিজেদেরকে হিন্দুস্থানের নাগরিক বলে শ্লাঘা বোধ করি। সকল হিন্দিভাষী হিন্দুস্থানীদের নিজেদরই স্বগোত্র বলে অনুভব করি। সারা রাজ্যব্যাপি হিন্দীস্কুলের ব্যাপক বাড়বড়ন্তেও নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাই। তারা কিন্তু আজকে কল্পনাও করতে পারি না, এর পরিণতি কিরকম ব্যাপক ভাবে এই রাজ্যে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকেই একদিন কোনঠাসা করে ফেলবে। এমনিতেই বর্তমানে রাজ্যবাসীর এক তৃতীয়াংশই প্রায় অবাঙালি। তাদের সংখ্যা কিন্তু ক্রমবর্ধমান। যারা বাংলার সংস্কৃতির সাথে কোনদিনই নিজেদেরকে একাত্ম করবে না। করে না। কারণ তাদের আপন মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সম্বন্ধে রয়েছে আজন্ম ভালোবাসা, ও প্রত্যয়! সেটাই স্বাভাবিক যে কোন জাতির পক্ষে। একমাত্র ব্যাতিক্রম বাঙালি। অপর দিকে উচ্চশিক্ষিত বাঙালির অধিকাংশই পাড়ি দিচ্ছে বহির্ভারত সহ দেশ বিদেশে। ফলত এপার বাংলার মেধার ক্ষেত্রে দিনে দিনে সৃষ্টি হচ্ছে অপূরনীয় এক শুন্যতা। যে শুন্যতায় জায়গা দখল করে নেবে অবাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি। সেদিন আর বেশি দুরে নেই। হয়তো আগামী শতকেই দেখা যাবে এপার বাঙলায় বাঙালিই সংখ্যলঘু। রাজ্যের অবাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছে তাল মিলিয়ে চলতে। নিরন্তর চেষ্টা করছে হিন্দুস্থানী হয়ে ওঠার। নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছে হিন্দীর চেনা ছকেই বন্দী করে ফেলতে নিজের আটপৌর পরিসরকে।

একটু সঠিক পরিসংখ্যান নিলেই দেখা যেত, এই সম্ভাবনা আদৌ অমূলক নয়। সারা রাজ্যের বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলি থেকে যত পড়ুয়া বেড়োচ্ছে তাদের কত শতাংশ উচ্চশিক্ষায় সুযোগ পাচ্ছে, আর ইংরাজী মাধ্যমের পড়ুয়াদের কত শতাংশ সেই সুযোগ দখল করছে। আবার সরকারী অফিস আদলতে হিন্দী মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েরা কত শতাংশ সুযোগ পাচ্ছে, আর বাংলা মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েরা কত শতাংশ সেই সুযোগ জোগাড় করতে পারছে। এইভাবে যে শিক্ষিত শ্রেণীর সৃষ্টি হয়ে চলেছে সমাজে যারা নেতৃত্ব দেবে সমাজকে, তাদের মধ্যে বাংলাভাষা ও বঙ্গসংস্কৃতির যোগসূত্র কতটুকু? এবং কি তার পরিণাম?  এই তুলনামূলক পরিসংখ্যানের গুরুত্ব উপলব্ধি করার ক্ষমতা আজ আর  কোন বাঙালিরই নাই। সেটা দূর্ভাগ্যের। কিন্তু তাই বলে গুরুত্বহীন নয়। একমাত্র মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে একটি উন্নত সমাজব্যবস্থা একটি জাতিগত প্রত্যয়ের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারে। এটাই মানব সভ্যতার ইতিহাস। কোন জাতি যদি সেই ইতিহাসকেই অস্বীকার করে, তবে তার অধঃপতন ঠেকানো অসম্ভব।

আর এইখানেই অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন কাঁটাতারের অপর পারের কথা ভেবে। অমর একুশের গর্বে আত্মশ্লাঘাও বোধ করেন ওপারের অধিকাংশ বাঙালিই। একুশ নিয়ে সেখানের আবেগ উৎসাহ অহংকার উৎসবের জোয়ারে অনেকেই বিশ্বাস করতে ভালোবাসেন, বাংলাভাষা ও তার সংস্কৃতি সুরক্ষিত থাকবে মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারীদের হাতেই। কিন্তু সত্যই প্রকৃত অবস্থা কি এমন নিশ্চিন্তে থাকার মতোই? একুশের শহীদবেদীতে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অপর্ণ করা দিনে দিনে যতটা অনুষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে, ততটাই তলায় তলায় শিক্ষার ভিতে গেড়ে বসেছে সেই একই ঘূণপোকা। সারাদেশেই উন্নতমানের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্জনের থেকে ইংরাজী মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে রয়েছে কয়েক কদম। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের সন্তানদের বেশিরভাগই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিসরের বাইরেই বড়ো হয়ে উঠছে দিনে দিনে। এবং এই সংখ্যাটিও ক্রমবর্ধমান। এর সাথেই যুক্ত হচ্ছে মেধানিষ্ক্রমণ। সৃষ্টি হচ্ছে বিরাট এক শূন্যতার। আর নিম্নবিত্তদের একটি বড়ো অংশই বাংলার দিক থকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ হচ্ছে আরবী ভাষা ও সংস্কৃতির শিক্ষায় মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমের পরিসরে। ফলে কাঁটাতারের অপর পারেও বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির সামনে ইংরাজী ভাষা ও আরবী ভাষা ও সংস্কৃতি আজ দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে উত্তর না মেলা প্রশ্নের দূর্ভেদ্য দেওয়াল। যে দেওয়ালটির আপাতত নিরব অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন নন ওপারের অধিকাংশ মানুষই। এদিকে সাম্প্রদায়িক জীবনশৈলী ও ধর্মীয় মৌলবাদের প্রবল চাপে জমি হারাতে শুরু করেছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষের সম্ভাবনাটুকুই। যে সম্ভাবনাটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন। ঠিক যে অর্জনে ওপারে পাকিস্থানপন্থী বাঙালিদের স্বদেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন উঠতো এতকাল। আর যে অর্জনের অভাবেই এপারে ভারতপন্থী বাঙালিদের দেশপ্রেম নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠে না আজও। প্রায় নিধিরাম সর্দারের মতোই বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকে এইভাবেই কাঁটাতারের উভয় পারেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইংরাজী হিন্দী ও আরবী ভাষা ও সংস্কৃতির দূর্ভেদ্য দেওয়ালের সামনাসামনি।

ভাষা তো কেবলমাত্র শব্দের কঙ্কাল নয়! ভাষা মেধা ও মননের ধারক ও বাহক। ভাষা চিন্তা ও চেতনার সমৃদ্ধির ভিত। ভাষা সুস্পষ্ট জীবনবোধের প্রকাশ মাধ্যম। সেই জীবনবোধের প্রকাশকেই বলে মুক্তচিন্তার পরিসর। একটি জাতি ঠিক ততটাই উন্নত, যতটা উন্নত তার মুক্তচিন্তার পরিসর। একুশের চেতনায় আজ যদি সেই সত্যই ধামাচাপা পড়ে গিয়ে থাকে, তবে বাংলাদেশের আজ সত্যই বড়ো দুর্দিন! যে দুর্দিনের সূত্রপাত তসলিমা নাসরিনকে দেশছাড়া করার মধ্যে দিয়ে। বস্তুত তারপর থেকেই ওপার বাংলায় মুক্তচিন্তার পরিসর ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসতে থাকে। বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী হুমায়ুণ আজাদের উপর বর্বর আক্রমণের পথ ধরে আজ বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার পরিসরটিই পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। পরপর ব্লগার হত্যা, লেখক বুদ্ধিজীবিদের উপর প্রাণনাশের হুমকি ও হত্যালীলায় আজকের বাংলাদেশে কেউই আর স্বাধীন লেখক বুদ্ধিজীবি হিসাবে থাকতে পারছেন না। হয় তাদের দেশ ছাড়তে হচ্ছে তসলিমার মতো, নয়তো তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গুটিয়ে নিচ্ছেন নিজেদেরকে। আর বুদ্ধিমানেরা সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে পাল্টে ফেলছেন নিজেদের গায়েরই রং। একটি দেশের পক্ষে এ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। একটি জাতির জীবনে এ এক অন্ধকার যুগ। যে অমর একুশ নিয়ে বাংলাদেশের গর্ব করার কথা, সেই অমর একুশের ঐতিহ্যবাহী একুশের বইমেলাতেই একের পর এক ঘটে গিয়েছে মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে চাপাতির আস্ফালন। গড়িয়ে পড়েছে বাংলার মনীষার তাজা তরুণ রক্ত। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে বিবেকী কণ্ঠের প্রত্যয়ী উচ্চারণগুলি। যেগুলি সমাজ ও জাতিকে পথ দেখাতে জরুরী ছিল সবচেয়ে বেশি। একদিকে মেধানিস্ক্রমণ, একদিকে স্বাধীন মেধাগুলিকে চিহ্নিত করে একে একে হত্যা করা, একদিকে মুক্তচিন্তার সমস্ত পরিসরগুলিকে হুমকি দিয়ে ভয় দেখিয়ে অবরুদ্ধ করে দেওয়া এই সবের মধ্যে দিয়ে আর যাই হোক না কেন, কোন জাতির মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটে না। জাতির ভাষা ও সংস্কৃতি মুখ থুবড়ে পড়ার দিকে এগিয়ে চলে দ্রুতগতিতে। আবার সেই সাথে শুরু হয়েছে বাংলাভাষার ধর্মীয়করণের এক ষড়যন্ত্র। স্কুলপাঠ্য সিলেবাসে হাত পড়েছে সবার আগে। সেখান থেকেই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার অভিশপ্ত বীজ বপনের চেষ্টা চলছে পুরোদমে। যাতে করে একটি পঙ্গু ও খর্ব প্রজন্ম তৈরী করে তোলা যায়। যাদেরকে ধর্মীয় আবেগে সহজে বশ করে ব্যবহার করা যাবে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে। বলি হবে জাতির বিবেক। অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে জনসত্ত্বার স্বাভাবিক বিকাশ।  বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ছাড়া বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি কখনোই উন্নত বিশ্বের অন্যান্য ভাষা ও সংস্কৃতির সমপর্যায়ে উন্নত হয়ে উঠতে পারবে না। কাঁটাতারের উভয় পারেই সেই সম্ভাবনার লেশমাত্র দেখা যাচ্ছে না।

আজ যারা মনে করছেন, না অতটা হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয় নি এখনো। এখনো অনেক ভালো ভালো কাজ হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। বিশেষত নেট বিপ্লবের হাত ধরে অন্তর্জাল দুনিয়ায় বাংলা সাহিত্যচর্চার দিগন্ত যে ভাবে বিস্তৃত হয়ে উঠেছে তাতে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির সুদিন এসে গিয়েছে। এমনটা ভাবা বেশ আরামপ্রদ সন্দেহ নাই, সত্যই তো সারাদিন যত কবিতা আছড়ে পড়ছে ফেসবুক সহ নানান সোশ্যাল সাইটের চৌহদ্দীতে, তাতে বাংলা নিয়ে শ্লাঘা বোধ করা যায় বইকি। কিন্তু একটু ইতিহাসের দিকে পিছন ফিরে তাকালেই অনুধাবন করতে পারতাম, কেবল মাত্র গান গেয়ে, কবিতা লিখে, নিজের কষ্টার্জিত অর্থব্যায়ে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে সেল্ফী তুললেই কোন ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটে না। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নয়ন ঘটে দেশের মানব সম্পদের উন্নয়নে। উন্নত মানবসম্পদের দেশ ও জাতিসমূহের দিকে চোখ ফেরালেই এই সত্য সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়। আর মানব সম্পদের প্রকৃত উন্নতি ঘটে তখনই যখন একটি জাতি তার মাতৃভাষাতেই স্বশিক্ষিত হয়ে উঠে মুক্তচিন্তার সকল পরিসরগুলিকে উন্মুক্ত করে দিতে পারে। কেননা তখন জীবনজীবিকার ক্ষেত্রগুলিতে মাতৃভাষা অবহেলিত অপাংতেয় হয়ে অকার্যকর রূপে পড়ে থাকে না। বরং একটি জাতির জীবনের সকল পরিসরেই মাতৃভাষা ও সেই ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি জাতিকে পুষ্ট করতে থাকে নিরন্তর। সেই নিরন্তর পুষ্টির মধ্যে দিয়েই সেই দেশের মানবসম্পদ নতুন পথ দেখাতে থাকে সারাবিশ্বকেই। এটাই মানুষের ইতিহাস।

আর তাই যে জাতির জীবনে, তার জীবন জীবিকা থেকে শুরু করে জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধনায়, প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবনে, শিল্পবাণিজ্যে, আইন আদালতে, সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর প্রতিটি স্তরে, শিক্ষাব্যবস্থায় ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিকাঠামোয়ে;- সমস্ত উদ্যোগ ও উদ্যোম সমস্ত পরিকল্পনা ও কার্যসম্পাদন সেই জাতির মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে; একমাত্র সেই জাতিই আপন জাতিগত বৈশিষ্ট সহ নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে পারে সদৃঢ় শক্তিতে। তখনই সেই জাতি বিশ্বসভায় সম্মানিত হয় আপন গৌরবে। নয়তো কেবলই বৈদেশিক ঋণভারে রুগ্ন হতে হতে কেবলই জাতিকে বৈদেশিক লগ্নীর জন্যে হাত বাড়িয়ে রাখতে হয়, দেশের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। তাতে সমাজের ধনিক শ্রেণীর জীবনযাপনের মানের উন্নতি ঘটলেও সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি সম্ভব নয় আদৌ। গড়ে ওঠে না প্রকৃত মানবসম্পদের শক্তিশালী পুঁজি। যে কোন জাতির জীবনে এর থেকে বড় দূর্বলতা ও রোগ আর হয় না। অমর একুশের সমস্ত আবেগ ও আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে কাঁটাতারের দুই পারেই জাতি হিসাবে দূর্বল বাঙালির এই অসুখ দিনে দিনে গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠে ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র জাতিসত্ত্বায়। সেই কারণেই কেউই আজ আর খোলা চোখে প্রকৃত অবস্থা অনুধাবনে সক্ষম নয়। এটাই এক ভয়াবহ দুঃসময় যে কোন জাতির জীবনেই।

তাই তো আজ অমর একুশ বাঙালির জীবনে বার্ষিক স্মরণসভা হয়েই ফুলের মালায় ঢাকা পড়ে রয়েছে নির্বাক নিস্পন্দ হয়ে। গোটা জাতি এক দিশাহীন নিরুদ্দেশে ছুঠছে দিশাহারা প্রলাপের রোজকার সংলাপে। এই দুঃসময়ে বিলাপ করার মতো সচেতন মননেরও বড়োই অভাব। চারিদিকে ভোগবাদের বিপুল সমারোহে মানুষের অবলুপ্ত চেতনায় আজ আর জাতির কোন সমগ্র রূপ ফুটে ওঠে না কাঁটাতারের কোন পারেই। নির্বাক একুশ বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতায় ঘেরাটোপে ব্যার্থ হতে থাকে বছর ভর। বছর থেকে বছরে।


0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About