আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিবস । প্রতি বছর এই দিনে অন্যনিষাদ প্রকাশ করে বিশেষ সংখ্যা । সেই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হল বিশেষ সংখ্যা ‘অন্যনিষাদ ভাষাপ্রণাম ২০১৭’ । একটি শ্রুতি নাট্য, দুটি মননশীল গদ্য এবং একগুচ্ছ কবিতায় সাজিয়েছি এই বিশেষ সংখ্যা পাঠকের সমাদর পাবে এই প্রত্যাশায় ।

বিষয় যখন মাতৃভাষা, তখন ভাষা নিয়ে দুটো একটা কথা বলে নেওয়া যেতে পারে । ১৯৯৯এর ১৭ই নভেম্বর বিশ্ব সংগঠন ইউনেসকো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’ পালনের আহ্বান জানানোর পর বিশ্বের নানা প্রান্তের সঙ্গে এ বাংলাতেও ‘ভাষাদিবস’ পালনের রেওয়াজ শুরু হয় । ওপার বাংলাতো বটেই এ বাংলাতেও দু একটি ভাষা সংগঠন আরো আগে থেকেই ‘ভাষা শহিদ দিবস’ পালন করে আসছে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি নিহত দিনটিতে । এপারের বরাক উপত্যকার বাংলাভাষীরা বিনম্র শ্রদ্ধায় একষট্টির ভাষা আন্দোলনে হত এগারো শহিদের স্মৃতিতর্পন করেন প্রতি বছর ১৯শে মে । এটা ভাষাদিবস পালনের একটি দিক ।

অন্যদিকে আমাদের অবধারিত জিজ্ঞাসা, কেমন আছে আমাদের মাতৃভাষাটা ? আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে ‘বিশ্বায়ন’ নামক পাঁচ অক্ষরের এক দানবীয় বন্দোবস্ত তার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের কৌশল হিসাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভাষাগত বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । সেই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ হিসাবে আমরা টেলিভিশন, সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন, মোবাইল ফোনের এসএমএস ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এক বিকৃত ভাষা রপ্ত করে নিচ্ছে নবীন প্রজন্মের শিশুরা, গড়ে তুলছে নিজ মাতৃভাষার সঙ্গে অনাত্মীয়তা ।

 গত শতকের নব্বইএর দশকের শুরু থেকেই উন্নত বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞানীরা লাগাতার গবেষণা শুরু করেছিলেন বিশ্বায়ন বা পন্যায়ন কিভাবে অনুন্নত জনগোষ্ঠীগুলির ভাষাগত ভারসাম্য এলোমেলো করে দিতে পারে, কিভাবে ভাষাগত বহুত্ববাদকে ধ্বংশ করতে চাইছে সে বিষয়ে । সেইসব গবেষণায় এক ভয়াবহ ছবি উঠে এসেছিল যে এই শতাব্দীর মধ্যে এখন বিশ্বে প্রচলিত সাতহাজার মাতৃভাষার মধ্যে ছয় হাজার ভাষাই লুপ্ত হয়ে যাবে যদি না ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতাকে ঠেকানো যায় । বস্তুত, এই উদ্বেগ থেকেই মাতৃভাষাদিবস পালনের আহ্বান ।

চারবছর আগে ২০১৩তে  ইউনেসকো একটি উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছিল যে বিশ্বে এখন কথা বলা অর্থাৎ চলতি ভাষাগুলির মধ্যে ২৫০০ ভাষাই বিপন্ন ভাষা এবং গত তিন প্রজন্মে দু’শটি ভাষার বিলুপ্তি ঘটে গেছে । ভাষাবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করেছেন যে যখন তরুণ প্রজন্মের মানুষ তার ভাষায় কথা বলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যেমন বাড়িতে – সে ভাষা বিপন্ন ভাষা । শিশুরা যখন তার মাতৃভাষায় কথা বলে না তখন সে ভাষা নিশ্চিত ভাবেই বিপন্ন । আবার যে ভাষায় বৃদ্ধ বা প্রবীণ অর্থাৎ দাদু-দিদিমারা কথা বলেন, পরের প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুটির পিতা-মাতা সে ভাষা বুঝতে পারেন কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের সন্তানদের সঙ্গে সেই ভাষায় আদান-প্রদান করেন না, সেই ভাষা ভাষা বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে মারাত্মক ভাবে বিপন্ন ।

বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসে কেমন আছে আমার মাতৃভাষাটা । সে ভালো আছে কি না সেই সত্যটাকে খুঁজতে  হবে ভাষাবিজ্ঞানীদের এই বিশ্লেষিত সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ।
এপারে, আমার মাতৃভাষাটা যে ভালো নেই, সে যে ক্রমবিপন্নতার দিকে এগিয়ে চলেছে আমাদের ব্যবহারিক জীবনের সেই সত্যকে বোধয় আর বাংলা ভাষার উন্নত শিল্প-সাহিত্যের অহংকারের আবেগ দিয়ে লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না । অতয়েব একুশের একটা শপথ উচ্চারিত হোক যে আমরা আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে আরো বেশি মাতৃভাষার প্রয়োগ করি এবং নবীন প্রজন্ম ও শিশুদের নিজমাতৃভাষার সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তোলার প্রয়াসী হই । 




3 মন্তব্য(গুলি):

PALASH KUMAR Pal বলেছেন...

ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রণাম জানাই।

এই বিশেষ সংখ্যার অপেক্ষায় ছিলাম। বাংলা ভাষার লেখনীর আন্দোলন সমাজের কালিকে মুছিয়ে দিক, আজ এই আশাই রাখি প্রতি বাংলাভাষীর কাছে।

K M Rabbani বলেছেন...

খুব সুন্দর লিখেছেন। ধন্যবাদ।

UTTAM BISWAS বলেছেন...

ami valo aac! tui ki kor6'-----------এই গোত্রের কিছু উন্নত ভাষা প্রযুক্তি জন্ম নিয়েছে আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে। আপনার সম্পাদকীয় কলমটা যদি তাদেরকে একটু পড়াতে পারতাম; মনে শান্তি পেতাম!

আমার শ্রদ্ধা, আজ ভাষা-বেদীতলে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About