দীর্ঘ কবিতা

উত্তরাধিকার


আমার হাতের মুঠোয় এখন শুধুই আকাশ আকাশের শূন্যতা
আলোকবর্ষ দূরের তারারা দলবেঁধে সব নাইতে নেমেছে এ আমারই চোখে
সমুদ্রটির এপারে ওপারে শোণিত-শাসনে সন্ন্যাস পথিকতা
যমুনার তীরে নেমেছে সন্ধ্যা কুঞ্জবনে
আমি তো যাবই রিক্তশস্য শেষ সন্ধ্যা-রাত্রির এই সন্ধিক্ষণে
প্রাকৃতপুরুষ
প্রাগিতিহাসের ঋষিরা জানেন এই পৃথিবীর একলা দুজন আমাদের কথা ।
আমি তো যাবই পরিত্রাণহীন যা বলে বলুক লোকে চারদিকে
কে আছ দাঁড়িয়ে আলো হাতে শাদা সুজাতা-পায়েস
তোমার পায়েই রেখে যাই তবে পথের পুরাণ জন্মান্তর
জল-পাথরের যুদ্ধের শেষ ইতিহাস লিখে
বুকের ভেতরে যত মেঘ ছিল যত ছায়াপথ যত ছিল ভুল বিষয়বাসনা গহনদহন
তোমার পায়েই আজ রেখে যাই 
ভুল মানুষের কাটাছেঁড়া দেশ পুড়ে যাওয়া লাল পতাকার ছাই
ফিরে যেতে যেতে পেছনে তাকাই তোমারই তো দিকে ।
যতদূর যাই
তোমাকেই পাই বৃক্ষছায়ায় তোমাকে হারাই কাঠফাটা রোদে
তোমাকেই শুনি চৌরাশিয়ার বুকভাঙা বাঁশি আমজাদ আলি খানের সরোদে ।
তোমাকে দিলাম দিঘাপতিয়ার পাতাঝরা ঝাউগাছের যুগলসারি
মাঠের ওপারে দুঃখের পাঠ ফসলের ক্ষেত কৃষকের ঘরবাড়ি
আড়ানি ইস্টিশানটা পেরিয়ে নদীর ওপারে রেললাইনের বাঁকে
প্রত্ন টেলিগ্রাফের তারে লেজঝোলা ফিঙে এখনো কি বসে থাকে?
বুকের ভেতরে গহনদহন ভাঙনের উদ্ধৃতি
তোমাকে দিলাম পান্থপাখির নষ্টনীড়ের স্মৃতি
তোমাকে দিলাম অদৃষ্টদ্রোহী চাঁদ বণিকের পালা
অনাদি এক যাদববাবুর সেই কবেকার বিবিধ প্রশ্নমালা ।
তোমাকে দিলাম তরণীবাবুর ফেলে রেখে যাওয়া অবিনাশ দীঘি
তেপান্তরের তীর্থংকর 
হারা বনপাড়া দয়ারামপুর গোপালপুরের ভুল বাল্মীকি
তোমাকে দিলাম শেফালির হাসি শাপলার ফুটে থাকা 
নিজ হাতে খুলে জলে ফেলে দেয়া নিজেরই হাতের শাঁখা ।
তোমাকে দিলাম সকল বিফল বিষয়বাসনা
ধুলোমাটিকাদা সেঁচে ছেনে তোলা শেষ নিয়ারির একরতি সোনা
ভোরের আযান সূর্যগ্রহণ
নিশুতি রাতের বেপথু পাখির বুকভাঙা ডাকাডাকি
সহস্রকের সব ভুল সাড়া আকাশে বাতাসে যত গান শোনা বাকি ।
তোমাকে দিলাম অন্তবিহীন ফেরা
একটি সন্ধ্যাগৃহ থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে
আকাশে আকাশে তারাদের দেশে বেড়াক না স্বপ্নেরা !
আসুক না তারা যতদূর পারে যতদিনে পারে ব্রম্মাণ্ডটি ঘুরে ।
বেলা পড়ে আসে ধীরে বহে করতোয়া
পুণ্ড্রনগর পাহাড়পুরের দেশে
ভুলের পতাকা উড়ছে আকাশছোঁয়া
আমি ফিরে যাই জলের কিনার ঘেঁষে ।
তোমাকে দিলাম সমস্ত দিন
অনেক রাত্রি মধ্যরাত্রি বহুমাত্রিক
দমকা হাওয়ায় নিভে যাওয়া দীপ একটিমাত্র মোমের আলো
মহাজাগতিক ।
একান্ত এক ব্যক্তিগত মহাকাব্যের নষ্ট খসড়া শূন্যপুরাণ 
তোমাকে দিলাম গহিন গাঙের গহন ভাঙন কিংবদন্তি চাতক পাখির তৃষ্ণার গান ।
তোমাকে দিলাম ফিরিয়ে তোমারই একটি না-রাখা কথা
সারা জীবনের সব ভুলভাঙা শেষ প্রশ্নের উত্তর নীরবতা
পূর্বদিনের প্রিয় জনপদ নদী প্রান্তর পাঁজরে বনস্থলি
অনেক পুরোনো একটি কলম পত্রলেখা প্রত্নগৃহ বিস্মৃত পদাবলি
মানুষের দিকে মানুষেরই মাঝপথে থেমে যাওয়া অমীমাংসিত যতি
অতিউপদ্রুত এই সমতটে সমতাদর্শবিরোধী অগ্রগতি ।
তোমাকে দিলাম ইতিহাসে অভিবাসী বড়ালের অনিদ্র ক্ষীণকায়া
নদীর দুতীরে রিক্তশস্য বিনষ্ট গ্রাম অপসৃয়মান হিজলতমাল ছায়া
পাখি হয়ে যাওয়া একটি প্রাণের ক্লান্ত ডানায় মরুমেঘলোক পাড়ি
অন্তর্গত আরেক পৃথিবী আরেক গ্রহের আরশিনগর আরেক বসতবাড়ি ।


0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About