পাঠ প্রতিক্রিয়া

অবচেতন’- পিনাকী দত্তগুপ্ত

আলোচক - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

পিনাকী দত্তগুপ্তর প্রথম কাব্য সংকলন অবচেতনপড়লাম । কেন তাঁর কবিতার কাছে আসা কিংবা কবিতার তার কাছে আসা, সংকলনে এক নাতিদীর্ঘ ভূমিকায় কবি সেকথা বিবৃত করেছেন । বলেছেন অবচেতনের ভিড়ে একা খুঁজে চলো বিশল্যকরণী আর মৃত সঞ্জিবনী। অতয়েব পাঠক পেয়ে যান তাঁর কবিতার মূল সূত্রটি । সংকলিত ৪৯টি কবিতাকে ৪টি পর্যায়ে ভাগ করেছেন কবি ।
নীলকন্ঠ পর্যায়ের ১২টি কবিতায় দেখি আমাদের চারপাশের ক্লেশ, গ্লানি, বিষন্নতা কবির মনোজতে ছায়াপাত ঘটিয়েছে । কবি লেখেন জীবনের পাপ-পূণ্য, পার্বন ঘিরে ধরে জতুগৃহ অন্ধকার ঘর”, তথাপি কবি বিশ্বাস রাখেন

এবার কোলের শিশুচাঁদ আলোছায়া মেঘ খুঁজে
হামাগুড়ি দিয়ে এক নাগরিক পিচ জমা রাস্তায় পৌছবে বলে,
অবচেতনের ঘোরে, হাতে তুলে নেবে এক
বৃষ্টিভেজা পাখির পালক

নীলকন্ঠপর্যায়ের কবিতাগুলিতে একটা বিষন্নতার সুর পাঠককে স্পর্শ করে । নাগরিক জীবনের সমস্ত বিষাদময়তা, বিসঙ্গতি, অবসাদের ক্লেদ যেন নিজ কন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হতে চেয়েছেন কবি । এই পর্যায়ের কবিতাগুলিতে কবির একাকীত্বের যন্ত্রণা স্পষ্ট, কিন্তু তার মধ্যেও জীবনের আশ্চর্য বোধ তাঁর কবিতাগুলিকে শুধুই বিষন্নতার কবিতা হতে দেয়নি । কবির অনুভুতি বেঁচে থাকা যায় যদি থাকে এক বিস্তীর্ণ আকাশ” (‘প্রতিক্ষার শেষ নেই’) । নিশ্চিতভাবেই পাঠক একাত্মবোধ করবেন এই অনুভুতির সঙ্গে ।
অচেনা অন্ধকারপর্যায়ের ১২ট কবিতায় পাই দৈনন্দিন যাপনের অবসাদে ক্লান্ত কবি বিপন্ন নাগরিকতার দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে অন্ধকারের আশ্রয়ে সমর্পন করেন নিজেকে । অথচ কবির উচ্চারণ চারিদিকে এত আলো অচেনা রদ্দুর, এত বৈভব। এত ক্ষণজন্মা সুর, এত তীব্র বাতাসের শব্দ-সমাচার। তবু কেন কবি নাগরিক জীবনের বৈভব, বাতাসের শব্দ-সমাচার থেকে নিজেকে বিযুক্ত করে অন্ধকারেই আশ্রয় খোঁজেন ? আসলে এই বিপন্ন সময়ে মানুষ বড় একা আর সেই একাকীত্বই পীড়া দেয় কবিকে, কবি দেখেন

“... দুচোখ বেয়ে নীল নদী ...
স্রোতে ভেসে যায় যত অনাবিল স্থির বিশ্বাস’” (‘নিশিথিনী’)

কিন্তু অন্ধকারে সমর্পন স্থায়ী হতে পারে না । কবি তা বিশ্বাসও করেন । তাই অচেনা অন্ধকারএর শেষ কবিতায় লিখে রাখেন

সূর্য জানালা খুজে, বিছানায় হেসে লুটোপুটি,
সম্পর্ক ধুয়ে গেলে বেঁচে থাকে কিছু ঊষ্ণতা।
বাতাসে ছড়িয়ে দিলাম মুঠি মুঠি” ( ‘বিশ্বাস করি’)

এই পর্যায়ের কবিতাগুলি কবিতার অক্ষরে কবির আত্মদহনের বিবৃতি । আমি এভাবেই বুঝতে চেয়েছি ।
নগরে নির্জনের কবিতাগুলির মধ্যে আছে মৃত্যুচেতনা, আছে জীবনের রূপ-রস-গন্ধও । কবি দেখেন

মুহুর্তে যত আছে পরাজিত সৈনিক,
একে একে ভিড় করে ঘিরে ধরে । জেনে নেয়, ধাম,
জেনে নেয় পরিচয় । দেখে নেয় দেহে আছে কত ক্ষত ?
আমাকে ওদের দলে টেনে নেয়,
পুড়ে যাওয়া ইন্দ্রিয়ে রেখে যায় মোমের প্রলেপ ।
আমি ছায়া হয়ে যাই মৃতের মিছিলে। (দহন) 

কবি জানেন মৃত্যুই শেষ কথা নয়, জীবন মৃত্যুর চেয়েও বড় । কবিরও উপলব্ধি তাই মৃত্যুর পরও বুঝি থেকে যায় বোঝাপড়া,কুন্ঠা ও দায়” (‘দহন’)। এই পর্বের শেষ কবিতায় তাই যেন জীবনে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত-
প্রস্তুত হও যুদ্ধে যেতে হবে । পৃথিবীর অন্তিম ধর্মযুদ্ধে আমি মহাভারতের অভিমন্যু” (‘প্রত্যাবর্তন অভিমন্যু’) ।

শেষ পর্যায়ে মেঘ পাহাড়ের রহস্যনামটিতেই স্পষ্ট হয় কবির অভিপ্রায় । কবি যেন আশ্রয় খুঁজেছেন অরণ্যের নির্জনতায়, প্রকৃতির রহস্য আর গোপনীয়তা গায়ে মেখে ।

অনুভুতির সহজ প্রকাশের জন্য পিনাকীর কবিতাগুলি ভালো লাগে এবং আমি বিশ্বাস করি অনুভুতির সহজ প্রকাশই কবিতার সঙ্গে পাঠককে জুড়ে দেয় । আশা করবো জীবন থেকে সরে গিয়ে শুধু একাকীত্ব ও অন্ধকারে আশ্রয়ের কথা নয়, আলোর কথাও বিবৃত হবে তাঁর কবিতায় পরবর্তীতে ।
দেবত্তম মল্লিক কৃত প্রচ্ছদে অবচেতনঅসময় প্রকাশনীর বেশ পরিপাটি প্রকাশনা । ৬৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির মূল্য ১০০টাকা । আশাকরি, ‘অবচেতনপাঠক সমাদর পাবে ।

1 মন্তব্য(গুলি):

Pinaki Datta Gupta বলেছেন...

আপনার পাঠপ্রতিক্রিয়া আমার সাহিত্যজীবনের অন্যতম সম্পদ। আপনাকে প্রণাম জানাই। আশা রাখি আপনার স্নেহধন্য হয়ে থাকতে পারব আজীবন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About