৮ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা ১৬ নভেম্বর ২০১৮ ২৯ কার্তিক ১৪২৫


এই সংখ্যার লেখকসূচি : রণদেব দাশগুপ্ত, বিজয় ঘোষ, জয়ব্রত বিশ্বাস, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, সৌমিত্র চক্রবর্তী, সোনালী বেগম, সমীরণ চক্রবর্তী ফারহানা খানম, সুবীর সরকার, জ্যোতির্ময় মুখার্জি, সুবীর ঘোষ, শাশ্বতী সরকার (টালিগঞ্জ),দিশারী মুখোপাধ্যায়, সৌমেন গুহ রায়, নাসির ওয়াদেন, জারিফ এ আলম, ওয়াহিদ জালাল, স্বপ্ননীল রুদ্র, গীতশ্রী চক্রবর্তী মল্লিক, দেবাশিস কোনার, উষা মিশ্র, ইন্দ্রাণী সরকার, সুপর্ণা                                      বোস ও মলয় সরকার ।

            সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন

রণদেব দাশগুপ্ত

সমাবেশকথা

এখানে অনেক মানুষ |
দু'পাশে সরে যাওয়া ভিড়ের মত স্বপ্নরা
এখানে পিছনে সরে যায় তোমার |
এখানে কেউ এসে হাত ধরে না |
কেউ সাজিয়ে রাখে না শ্বেতচন্দন ,অপরাজিতা আর ঝুমকোলতার তন্দ্রা |
এখানে তোমার কি কাজ ?

তাকিয়ে দ্যাখো , তোমার একচিলতে অযত্নের বাগানে সাদা রঙ্গন কতদিন ধরে ডাকছে |
মনখারাপের গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেখানেও পৌঁছনো যায় |
অথবা , ঐ যে কিশোরীর বিনুনি থেকে উড়ে গেল অজানা বাতাসের ছোঁয়া _
তার সাথে কথা বলা যেত একবার |

তবু এমনভাবে তুমি তাকাও যে সব দৃশ্য ভেঙে যায় |
চোখ তুলে দেখি _ আমার চারপাশে সেই ধোঁয়া আর ধুলোর পুরোনো গল্পগুলো ,
আমার হাতের মুঠোয় সেই মরা প্রজাপতির ডানা আর সকালের সূর্যের ফসিল |
তখনি বুঝি , আরো অনেক দূরে সেই ভালোবাসার ডিঙিনৌকা |

ভিড়ের সাথে গলা মেলাতে মেলাতে , ব্যস্ততার সাথে পা মেলাতে মেলাতে আমি খুঁজতে থাকি
সূর্যডোবা ঠোঁটের বিষাদচুমু , হিরেকুচির মতো ফোঁটা ফোঁটা চোখ
আর পাহাড়ি উপত্যকার রহস্যময় ঘুম |
আমি পেরোতে থাকি সাঁকো ও সড়ক , গিরিখাত ও গর্বিত চূড়া , প্রান্তর ও নিশ্চুপ গ্রামসমূহ |
নগরীর মধ্যযামে পায়ের শব্দ শুনে জেগে ওঠে ঘুমন্ত শবেরা |
অরণ্যের ভাষা থেকে ঝরে পড়ে দু-একটি সঙ্গমের ছবি এখানেও...


বিজয় ঘোষ

অপেক্ষারা অস্পষ্ট হতে হতে

আমি স্পষ্ট অপেক্ষায় আছি।
আসলে অপেক্ষাগুলিই দাঁড়িয়ে আছে দূর দূর বারান্দায়।
তারপর বিড়াল আসে।থাবা চাটে।
তখনও বারান্দার দড়িতে সার সার টানানো সায়া-ব্লাউজ- ব্রা।

অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সন্ধ্যা হয়।
সায়া-ব্লাউজ -ব্রা ঘরে যায়।
বিড়াল ছাদের কোণে।
এখন আর ঘরে ঘরে হ্যারিকেন জ্বলে না।
আমি এখনও  স্পষ্ট অপেক্ষায় আছি।

বছর বিয়োনি বউটি জাবর কাটে। একা একাই।
যারা একদিন উল্টোরথ পড়তো তারা এখন ফেসবুকে বন্ধু পাতায়।
লাস্যময়ী হয়ে ডিপি দেয়।
দূর থেকে দেখা যায়-----  নদীর জলে ভাসে
 কালো কালো নৌকা আর...

সেই সব অপেক্ষা।যারা স্বপ্ন স্বপ্ন সকাল বেলা আঁকতো।
সাঁঝবেলায় ঘন্টা বাজে।
অপেক্ষারা অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে যায় ...


জয়ব্রত বিশ্বাস

অনুরাগ

ফিরে ফিরে আসে নৌকাবিলাস বেলাভূমিতে
সামনে চলে আসে অন্তর্বাসহীন যমুনা
দাঁড়ে 'সে রসিকতা করে প্রাজ্ঞ কাকাতুয়া:
কী আছে আর এই তো লুকোচুরি খেলা

দু'দণ্ড স্থির তাকিয়ে জোর ছুট লাগায় হরিণী
মাথার মধ্যে জেগে ওঠে শিংওয়ালা হরিণ
              দক্ষ চোখে দেখে পারিপার্শ্বিক
              ছুট লাগায় ঘাসজমি মাড়িয়ে

পরিক্রমার মাঝে সূর্য দাঁড়িয়ে যায়
নিরালায় 'সে এখন দেখে যাবে অভিসার
ঠিকরে থাকে চোখ জঙ্গম হরিণের শরীরে
এই তো এখনই মিটে যাবে সব চাওয়া

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

স্পার্টাকাসের মাথা

পথের উপর পড়ে আছে স্পার্টাকাসের মাথা।
তার দুচোখের গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসছে লাভাময় আগ্নেয় হিংসা!
কাটা মাথার উত্তপ্ত আঁচ পেরোতেই পৌঁছে গেলাম এরিণায়!
পরিত্যক্ত রোমান সাম্রাজ্য, যুদ্ধক্ষেত্র,এরিণার বিরাট ময়দান।
স্টেডিয়ামের সুসজ্জিত গ্যালারি জনহীন,সেখানে দর্শকদের আসনে
নির্দিষ্ট কয়েকটা মাত্র লোক,আচ্ছাদনের নিচে কয়েকটা সিংহাসন।
মৃত্যুর খেলা দেখছে।আসল জনগনেরা মাঠে।এরিণায় হাজার হাজার লোক,
তারাই খেলোয়াড় - একে অন্যের বিরুদ্ধে খেলছে। দর্শকাসনে উপবিষ্ট
কয়েকজন মাননীয়,হাতে তাদের বৈদিক-গ্রাম নির্মিত সুরা ]
সুসজ্জিত মনোহারী পাত্র ।পেছনের বিরাট ক্যানভাসে আঁকা
রাজপরিবারের চলমান পটচিত্র। রাজ্যের যাবতীয় সুকীর্তির গুনগাথাময় বিজ্ঞাপন।
মাননীয় উপবিষ্টদের চোখে অধিক সুরা জনিত ঘুমের আবেশ,
থেকে থেকে দুচোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে হিলহিলে সাপের ফনা!
ময়দানের বাদামী ঘাসে রুক্ষতা,হাজার হাজার দর্শক,প্রতিদ্বন্দ্বিতা,
সবাই খেলা দেখাতে চায়, চিৎকার - সবাই জিততে চায়।
একজন তার হাত খুলে নিয়ে ব্যাট বানায়,আরেকজন তার মুন্ডুটাকে
ভাড়া দেয় বল হিসেবে! মুন্ডু হয়ে যায় বল,ধাক্কা মারে ময়দানে
দাঁড় করিয়ে রাখা উইকেটের মতো তিনটে মৃত মানুষকে!
বলের ধাক্কায় একজন উইকেট-মানুষ ছিটকে পড়লে আরো কিছু মানুষ
ছুটে আসে; তারা হিংস্র এক প্রতিযোগিতায় চোখয়ালা ডিউজ-বল ভেবে
পতিতের মুন্ডুটা খুলে নেয়!ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত।
আয়ুধহীন প্ররোচনাহীন অনেক শান্তিপ্রিয় মানুষই স্টেডিয়ামের মাঠে স্ট্যাম্পেড !
আরেকটা মুন্ডু প্রচন্ড গতিতে গ্যালারীর আসন ছাড়িয়ে সজোরে উড়ে গিয়ে
পড়ে ব্যস্ত রাজপথে –ওভার বাউন্ডারি! দারুণ শট ! দর্শকাসনের মহামান্য
কতিপয়, সভাসদ, ডিরেক্টর, মন্ত্রী আর সেক্রেটারি – তুমুল আনন্দে
হাততালি দিতে থাকলে এরিণায় হাজার হাজার মানুষ মেতে ওঠে
মৃত্যু মৃত্যু খেলায়! এক জন অন্য জনের উপর ব্যাট চালাতে গিয়ে
মুন্ডুগুলো উড়িয়ে দেয় বাউন্ডারি সীমানার বাইরে।মাঠ জুড়ে থাক্ থাক্ রক্ত।
মাঠের বাইরে হলুদ, সবুজ, নীলফুলের গাছগুলো- কেউ হিন্দু,
কেউ মুসলমান, কেউ শিখ – পদদলনে পিষ্ট হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে।
ময়দানের কোলাহল আর হাঙ্গামা বাড়তে থাকলে মহামান্য সাতজন দর্শকের হাতে
উঠে আসে বিয়ারের ক্যান । মৃত কিংবা আহত মানুষগুলোর চীৎকার
অসহ্য হয়ে উঠলে দর্শকাসনের মহামান্য সভাসদেরা সুসজ্জিত শকটে
সুরক্ষিত প্রস্থান করে।ময়দানের মানুষগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে
তখনো তলোয়ার চালিয়ে যাচ্ছে। নিচে বয়ে যাচ্ছে রক্ত গঙ্গা ।
মাথার উপর বিবর্ণ আকাশ আর ভাসমান মেঘের গায়ে আঁকা থাকে
দেশের মানচিত্র!শান্তি মিছিলের প্রস্তাব সন্ত্রস্ত কবুতরের ডানায়
উড়াল দেয় পুব থেকে পশ্চিমে । কোলাহল, আর্তনাদ, আতঙ্ক, উল্লাস !
রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকে অসংখ্য শরীর,স্পার্টাকাসের মাথা!

সৌমিত্র চক্রবর্তী

একনায়কের ঝুন্ড

জেগে থাকা আর ঘুমোনোর গল্প শুনলেই
আমার হিটলারের সূক্ষ্ম বুদ্ধির কথা মনে পড়ে যায়,
কি অনায়াসেই না কমেডিয়ান মার্কা ভদ্রলোক
কয়েকটা দেশের সব জেগে থাকা মানুষদের
ঝেড়ে পুছে সাফ করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন!

অবশ্য হিটলার এটা শিখেছিলেন
মহামহোপাধ্যায় বীর নেপোলিয়নের কাছে,
নেপোলিয়ন আবার ক্রেয়নের কাছে
আর এভাবেই দেশ কালের কাঁটাতার আর
নোম্যানসল্যান্ডের উঁচানো
তরোয়াল কিম্বা কালাসনিকভের ভয়াল
সবুজ চোখ টপকে 
চলতি সব পার্লামেন্টেরিয়ান
আইন কে কাচকলা দেখিয়ে উত্তরাধিকার
সূত্রে ঢুকে পড়ে রাজকীয় আগুনখেকো দর্শন।

মাঝেমধ্যে দু একটা পাগল বিড়বিড় করে
কথকিঞ্চিৎ বিড়ম্বনায়
সুইমিংপুলের মউ মউ মৌতাতে
মজে থাকা জল ঘুলিয়ে ফেললে
নিরো জেগে ওঠে ঝুরঝুরে পুরনো কবরের
তলা থেকে হাতের গুপ্তি থুক্কু বীণা নিয়ে
হতভাগা পাগলগুলোর আইডেন্টিফিকেশন প্যারেড হয় -
নাম্বার ওয়ান, ব্রুনো, 
টু লোরকা, 
থ্রি মোলায়েজ 
ডট ডট ডট...

একচোখোমি মাতাল হয়ে গেলে
বড্ড অসহ্য লাগে, আরেবাবা
শুধু অ্যানিমিয়া কেসের মত রক্তকণা কাউন্ট
করে গেলি! এমন ঝক্কাস ক্ল্যাসিক দর্শনের 
কদর করতেই শিখলি না!

শঙ্খ শ্রীজাতের বাপের ভাগ্য এখনো
সকাল হলেই চা, খবরের কাগজ
আর ধারালো পেন পেয়ে যাচ্ছেন;
ঘুম পাড়ানোর লিস্ট কখন যে জেগে ওঠে,
কে জানে!