৮ম বর্ষ ২৬ তম সংখ্যা ৯ মে ২০১৯ ২৫ বৈশাখ ১৪২৬।। 'কবিপ্রণাম'

২টি গদ্য ও ৪২টি কবিতায় কবিপ্রণাম ১৪২৬ । লেখকসূচি : দময়ন্তী দাশগুপ্ত, তৈমুর খান, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, ইন্দিরা দাশ, রত্নদীপা দে ঘোষ, অরুণিমা চৌধুরী, সৌমিত্র চক্রবর্তী, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, সুবীর সরকার, শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়, মানস বিশ্বাস, সোনালি ভট্টাচার্য মুখার্জী, রমা সিমলাই, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, তপন মন্ডল, নন্দিনী সেনগুপ্ত, অনুপম দাশশর্মা, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রলেখা মহান্তী, শ্যামশ্রী রায় কর্মকার, প্রণব বসু রায়, শাশ্বতী সরকার (টালিগঞ্জ), সুমিত্রা পাল, জয়া চৌধুরী, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, শবরী শর্মা রায়, কৌশিক চক্রবর্তী, সেলিনা জাহান, ফিরোজ আখতার, মৃত্তিকা মুখোপাধ্যায়, জয়িতা ভট্টাচার্য, কোয়েলী ঘোষ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, মালবিকা হাজরা, শাশ্বতী ভট্টাচার্য, প্রীতি মিত্র, দেবশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, অদিতি চক্রবর্তী, মৌ দাশগুপ্ত, সুতপা সরকার, চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়, ওয়াহিদ জালাল, পিয়াংকী মুখার্জী ও স্বপ্ননীল রুদ্র ।

           সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লক করে পড়ুন

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

রবিঠাকুরের খোঁজে            

গীতবিতান পড়ে রবিঠাকুরকে প্রথম ভালোবেসে ফেলি। তারপর সেই যে কবিতাটা ভবিষ্যতের এক সপ্তদশীর উদ্দেশে তিনি লিখেছিলেন, সেটা পড়ে সতেরো বছরের আমার মনে হয়েছিল বুঝি বা আমার কথা ভেবেই লেখা। রঞ্জনের থেকে ভালোলেগেছিল বিশু পাগলকে। সেই বিশু পাগলের খোঁজে শান্তিনিকেতন গিয়ে ইট-কাঠের ভিড়ে কোথাও তাকে পেলাম না। ফেরার সময় বৃষ্টিধৌত নীল আকাশের দিকে চেয়ে হঠাৎ মনটা উঠল ভরেমনে হল প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে।
স্বর্ণকুমারী দেবীর বর্ণনায় পড়েছিলাম কালিম্পং-এ মর্গান হাউসে বসে রবির টেনিসন আর ব্রাউনিং পড়ে শোনানোর কথা। কালিম্পং-এ মর্গান হাউস ও গৌরীপুর হাউসে রবি ঠাকুর থেকেছেন পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে। ২০১৭ সালে কালিম্পং-এ গিয়েছিলাম। দেখলাম জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে গৌরীপুর হাউস। ১৩৪৫ সালের ২৫ বৈশাখ কবি এখান থেকে দূরভাষে আকাশবাণীতে 'জন্মদিন' কবিতাটি পাঠ করেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতার জন্ম এই বাড়িতে। চিঠিপত্রও রয়েছে এই ঠিকানায় নামাঙ্কিত। এতসব স্মৃতিবিজড়িত। বাড়িটা সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাইট সিয়িং এর তালিকায় না থাকায় ড্রাইভার গাঁইগুঁই করবেন হয়তো। এটা দূরপিনদাঁড়া ভিউ পয়েন্টের দিকে যেতে ক্রকেটি হাউসের (এখানে একসময় খ্যাতনামা রাশিয়ান শিল্পী নিকোলাস রোয়েরিখের স্ত্রী হেলেনা রোয়েরিখ পুত্র ইউরিকে নিয়ে বসবাস করতেন। লেখিকা হেলেনা এখানেই মারা যান) একেবারে গা ঘেঁষে যে রাস্তাটা নেমে গেছে সেই পথে কয়েক পাক নিচের দিকে নামলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। ওপর থেকেই বাড়িটির জরাজীর্ণ টিনের ছাদ,ফায়ার প্লেসের ধোঁয়ার নল চোখে পড়ে। তবে নিচে নেমে অতি কষ্টে বাড়ির সামনে পৌঁছলে মনখারাপ হয়ে যায়। খোয়ার পাহাড় পেরিয়ে একমাত্র খোলা ফাঁকা ঘরে ঢুকি। পুরোনো দিনের ফায়ারপ্লেসটুকুই যা আছে। এর আগে গিয়েছিলাম মর্গান হাউস। মেনটেনড। এটি সরকারি লজ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ভাড়াও ভয়ানক বেশি। ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে হয় না। বাইরে থেকেই দেখি। অথচ ইচ্ছে ছিল খুব। কোথায় রবিমামা বসে নানাকিছু পড়ে শোনাতেন, লিখেছিলেন সরলাও। সেইসব স্মৃতিবিজড়িত। কিন্তু... দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ফেরার পথে মংপুতে। কেমন আছে আর এক স্মৃতিবিজড়িত? সারানো হচ্ছে। কিন্তু কেন একেবারে আগাপাশতলা সারাচ্ছে তা বুঝলাম না। ২০১৬ সালের ছবি দেখলাম ড্রাইভারের ক্যামেরায়। ভাঙাচোরা কিছু তো চোখে পড়ল না। এখানেও বাগানের গোলাপ আর রবিঠাকুরের মর্মর মূর্তি দেখেই সান্ত্বনা পেলাম। কালিম্পং,মংপুর পর গতবছর শিলং-এ রবিঠাকুরের খোঁজে পরপর দুদিন গিয়ে দেখি মিউজিয়াম বন্ধ। রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে ঢুকে মিউজিয়ামটা। সামনে রবীন্দ্রনাথের একটা বড় মূর্তি।রাস্তার এদিকে ওদিকে ছায়াভরা গাছ। মরসুমে চেরী ফুলও ফুটেছে গোলাপি রঙে গাছ আলো করে।তৃতীয়দিনে দরজা খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে কিছুটা হতাশই হই। একটিমাত্র ঘরে ছাড়া পুরোনো জিনিসপত্র কিছুই নেই।
তবু কিছু যেন রয়ে যায় সব জায়গাতেই। তাকেই কি বলেমায়া,’ নাকি আমারই মনের কল্পনা সে? কে জানে! শেষবিকেলের মায়াভরা রৌদ্রে, ঝরে পড়া চেরীফুলের রঙের আভায় মনে হয়, “সে আমার প্রেম। তারে আমি রাখিয়া এলেম অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে। পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে কালের যাত্রায়।

তৈমুর খান


রবীন্দ্রনাথকে দেখি

আধ্যাত্মিক প্রশ্রয়ের মতো কোনো কোনো রাত আসে
যে রাতে রবীন্দ্রনাথকে দেখি
আলোর বলয় হয়ে চারিপাশ ঘিরে ঘিরে হাসে

ক্ষুৎপিপাসায় ডুবে থাকা এ জীবন ধুলো ও কাদায় মাখামাখি
অশ্রু ও বেদনার কলঙ্কে ভেজা
তবু এক লুকোনো ডানায় উড়তে থাকে অলৌকিক পাখি

এপারে ওপারে সাঁকো , মাঝে কাল প্রবাহের নদী
বয়ে চলে দীর্ঘ পথ
দুইপাশে জীবনের ঢল, নশ্বর মায়ায় খেলে রতি

বোঝালেন রবীন্দ্রনাথ, এখানেই তাঁহার ঘরের চাবি
মগ্নচৈতন্যের আঁধারে ডুবে আছে
অথবা সোনার তরী ভাসে, তরীতে আমাদের পার হওয়ার দাবি.

সীমানা যতই আঁকা , অসীমের হাতছানি বাজে
অমরতার সুতো টেনে টেনে
জীবনকেই মেলে দিচ্ছি রোজ রোজ মানব সমাজে


সপ্তাশ্ব ভৌমিক


২৫শে বৈশাখ

সময় কেড়েছে সব বোধ
ভেতরে বাইরে যত ক্রোধ
স্তব আর স্তুতি হয়ে ঝরে
আলো নেই নিষেধের ঘরে
অবিরাম এই ছেলে-খেলা
কথাতেই ভেসে চলে ভেলা
মুছে যায় অভিমানী দাগ
ভাব নেই নেই অনুরাগ
শুধু কিছু আছে অভিনয়
বিষ মাখা সাবেকী বিনয়
মেপে মেপে দিতে হয় দাম
তবু কত ব্যর্থ প্রণাম।

ইন্দিরা দাশ


যাত্রাপথ - শান্তিনিকেতন

ছুটে ছুটে পেছনে চলে যায়
মাঠ, গাছ, জ্যামিতির ত্রিকোণ, চতুর্কোণ খেত, একলা পুকুর
ট্রেন-ঘরে, কফি-চা, ঝালমুড়ি পেরিয়ে
ধূপকাঠি বুড়ি, নেভি-ব্লু রুমালওলা দরদস্তুর

এ সময়ে গৈরিক মাঠ জুড়ে কোথাও কোথাও জল
থমকে রয়েছে অটল
সেইখানে কাকে দেখি একতারা হাতে
বেরিয়ে বেড়ায়
ছাগলছানা,গোলাঘর, রোদেলা সকাল
সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়
স্নেহময় হাত দিয়ে,
অবাক বিস্ময় নিয়ে
অামি শুনি সেই আজানুলম্বিত-বাহু পুরুষের গান
কেন কেঁপে ওঠে আশেপাশে বিশ্বভরা প্রাণ!
শুনতে শুনতে তাঁকেই উদ্দেশ্য করে
মাঠ শেষে তিনভাই তালগাছ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে
বড়জন গলা ছাড়ে, বেশ সুর ধরে
তাঁরই কথা-সুরে
'আগে তো হারিয়ে যাই,
তবেই তো ফিরে পাবো,
কি বল গোঁসাই'!

আরও কিছুদূর গিয়ে
আমার যাত্রাপথ ধরে
মধ্যদিনের রাখালিয়া সুরে এসরাজ বাজিয়ে
সাথে যেন চলেছেন সাদা-জোব্বা লম্বা শ্মশ্রুধারী
কেন ভেতরের ঘর থেকে উঠে অাসে
আকুল উদ্দেশে তারই
সকল জনম ভরে, কাঁদি কাঁদাও মোরে,
ও মোর দরদীয়া,
গেয়ে চলি ওরে

কি বলে আমার মন?
চেরাইগ্রাম, শিবাইচণ্ডী, ফেলে গুসকারা, বোলপুর
পিতার ভবন?
হ্যাঁ গো, হ্যাঁ,
তোমরা, যারা ধৈর্য্য ধরে পড়ছ এ প্রলাপ, জেনে রাখো
এ পথে যে গিয়েছ বারবার, সাক্ষী থাকো
আমি তারে কই
আজকাল সত্যিই কান পেতে রই
পার্শ্ববর্তিনীর ধীরজ-নেটওয়র্ক হোয়াটস-আপে ব্যর্থতার বিরক্তি পেরিয়ে
পৌঁছতে চাই
মনের কোণের বাইরে
আর নাইরে সময় নাইরে
সত্যিই তাই
এ বেলা ডাক পড়েছে ফাগুনের ক্লান্ত ক্ষণে,
শেষ গানে
চিরসখা হে, সেই ভালো,
আপন হতে বাহির হয়ে নাহয়
বাইরে দাঁড়াতে দাও
ওগো আলো
যে কথা শুনিনি এখনও, ভালো করে বলে যাও
যাত্রা শেষ হয়ে এলো,
নেমে গেলো
বাদামের টিন, ঝোলাব্যাগ, লোকজন বাকি চেনামুখ
পাশাপাশি বসে আছে দুঃখ ও সুখ
হাত রাখো বন্ধু হাতে তাও
যে জাগিছ অন্তরে অন্তরযামী
এইবার তোমার সে নিজস্ব রঙে
আমাকে রাঙিয়ে দিয়ে যাও।

রত্নদীপা দে ঘোষ


লিভ-ইন


আপনাকে এড়িয়ে যাবো এমন শিলাইদহ আমার নেই, রবিবাবু।
যেদিকে আপনার ঘ্রাণ সেদিকপানেই আমার গরাস।
কী করি, বলুন তো ...
এমন অমিত শুনশান, পাহাড়িয়ায় হেলান 
সেই লাবণ্যের নাম, আপনি কী দেবেন...
এই ভেবেই ঘুমনেই সারারাত, বুকে কালনেমির অসুখ
ওষুধে আর কাজ হয় না
আপনার স্বর্গীয় সরাইখানা, পান করতে চাই এখন
বজরার চূড়ায় আলোর ফলার, আহার করতে চাই
খুব খিদে সারারাত! সর্বনাশের আভাষ।
আপনি কি আজ উপবাস, রবিবাবু?


ইচ্ছে করে আপনার বুকে ঝাঁপ দিই। তারপর যা থাকে কপালে! 
ভুলগুলি লেখা থাক ভুলের মাশুলে।
ভরাডুবির নৌকায় দিকভ্রষ্ট আপনি। নষ্ট আমি রাঙাকুঠির বাণে। 
শ্যাম কূল রাই। একে একে সবই খোয়াই, দু'জনে।
কয়েকদিন লেখালেখি না হয় বন্ধই রইল, রবিবাবু 
না হয়, আমরা পালিয়েই গেলুম রানুগ্রন্থের দ্বীপে
না হয়, খুব বৌঠান আমাদের মৌতাপ
না হয় একবার শিকারে মত্ত চিতাবাঘের মেঝে
আমরা দুই ডরপোক শিলঙ, অরণ্যের ভেতর
চুরচুর করি উচ্ছন্নের দেওাল, ছাল-বাকল-ঘাস
না হয় উথলেই উঠলো বাঘ-বিহারের ঊরু
না হয় একবার সমিধপ্রাপ্তিই হল আমাদের
তাতে  কার কী ক্ষতি ... রবিবাবু ...


অরুণিমা চৌধুরী


ঈশ্বর আমার


হাত পুড়ে গেছে  চাল নেই চুলোতেও নিজেকেই গুঁজে প্রবৃত্তির দোষে 
শাপশাপান্ত করি
জড়িবুটি সার ফিরে তাকায়না কেউ

অভাজন আমি
মালা গাঁথি মূর্তি গড়ি
পোড়া চোখ পোড়া  দেহ  শুদ্ধ হয় সুরে

ছায়ায় মায়ায় পরম কল্যানীয় বেশে
দৃশ্যের অতীতে তুমি  দাঁড়িয়ে থাকো  

"
প্রভু আমার প্রিয় আমার পরম ধন হে"
  
 


সৌমিত্র চক্রবর্তী


রবিঠাকুর হে 

কে যেন বলেছিল রবিঠাকুর আমাকে টানেনা
কারা যেন বলেছিল রবিঠাকুর আমাদের টানেনি কখনো,
কোনো এক বাড়িতে ছোট্ট মেয়েটা রবিগান শুনলেই
চিৎকার করে কেঁদে উঠতো, হিস্টিরিয়া তার মাথার চুল
ধরে ঝাঁকাতো সেই গান বন্ধ করার জন্যে,
এক ধারে মেয়েটার মা আর তার তাৎক্ষণিক বাবা
হেসে গড়াগড়ি খেত, বন্ধুদের কাছে মুখের ওপরে গোলাপী
আভা এনে সগর্বে বলতো, মেয়ে আমার ওয়েস্টার্ন -
মেয়ে আমার ওয়ান ডাইমেনশনাল, মেয়ে আমার টিন ফিট।
দূরের গ্যালাক্সির ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতো
লম্বা মুড়ো ঝাঁটার আকারের বিরল ধূমকেতু, তার শরীর থেকে ল্যাজ
পরিপূর্ণ গ্রহের গ্রহণকালের বিষাদস্মৃতিতে ভরপুর
খোলস ছাড়া অনাদি অতীতের স্যুভেনিয়র অসংযমী টুকরোর ঝুন্ড,
কয়েক লক্ষ কোটি আলোকবছরের দুরূহ রাস্তা অতিক্রম করে
সবুজ গ্রহের বুকে টুপ করে ঝরে পড়ত একফোঁটা চোখের জল।
কারা যেন উন্মত্ত থাকতো ড্রাগের সর্বব্যাপ্ত আগ্রাসনে;
রবিঠাকুরের রেখে যাওয়া অক্ষর ঠিক তখনই উত্তর মেরুতে
নীল সবুজ কমলার মায়াবী আলোয় তৈরি করতো অরোরা বেরিয়ালিস। 



সমরেন্দ্র বিশ্বাস


পঁচিশে বৈশাখের কবিতা


গুরুদেব, আজ আপনাকে নিয়ে একটা কবিতাও লিখতে পারলাম না –
ভোরের হেলানো রোদ এখন খাড়া, সকাল থেকে বসে আছি,
আপনাকে নিয়ে সুন্দর একটা কবিতা লিখতে চাইছি
কিন্তু পারলাম কই?
প্রত্যেকটি অক্ষরের শেষে কারা যেন সার বেঁধে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে,
এক একটা লাইন শেষ করার আগেই কারা যেন দড়িতে বেঁধে রেখেছে কলমের ডগা
বাইরে মানুষের উৎপাত, ঝড়ের দাপটে বিধ্বস্ত হচ্ছে আমার মনের স্থিরতা।

আজ সকালে একটা মৌন মিছিল এগিয়ে গেল,
ওদের সামনে আপনার একটা ফটো থাকা উচিত ছিল।
মিছিলের আগে আপনার শশ্রুমন্ডিত কোনো ফটো নেই
একটা নিহত মানুষকে বয়ে নিয়ে চলেছে শকটে
মিছিলের সরীসৃপ বোধের আলোয় ঝলসাতে চাইছে- কিন্তু পারছে কই?

গুরুদেব, আপনি ছিলেন বিশ্বশান্তির সপক্ষে, অথচ
কাগজে হেডলাইন জুড়ে হেডলাইটের মতো জ্বলজ্বল করছে
আর্জেন্টিনার কোল ঘেঁষা ছোট্ট এক দ্বীপ
কে কার জাহাজ ডুবিয়েছে, কে কাকে অস্ত্র দিয়ে সশস্ত্র করে তুলেছে।

গুরুদেব, আপনার লেখায় আলোর দীপাবলী ছিল
উজ্জ্বলতা ছিল, বিবেকের অঙ্গীকার ছিল
কিন্তু কোথায় বিবেক, কোথায় সেই আলো?
বেলুচিতে হরিজন মরে, দিকে দিকে দাঙ্গা বাধে
রিলিফের গাড়ি মাঝপথে ফিরে যায়,
বন্যার লোনাজলে বাসন্তীর ঘরদোর ডুবেডুবে জল শোষে!

মানুষ কি মানুষ নেই?
হয়তো মানুষ মানুষই আছে-
নইলে বাউল আজো পীরিতের গান গায়-
নইলে পরাণমাঝি আজো দুপয়সায় খেয়া পারাপার করে?
মানুষ তো মানুষই-
মানুষ মানুষেরই সুখে হাসে, মানুষেরই দুঃখে কাঁদে
মানুষেরই অত্যাচারে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
কবিগুরু, আপনি অনেক মানুষের কথা ভাবতেন,
অনেক জল ঝরেছে আপনার চোখে
আপনি জালিয়ানওয়ালার হত্যা দেখেছেন, প্রতিবাদে দীপ্ত হয়েছেন,
আপনি বিলেত ঘুরেছেন,
জমিদারি করতে করতে নৌকার গলুইতে বসে কত কবিতা লিখেছেন!

গুরুদেব, আপনি আর কতটা করবেন-
আসলে মানুষ কিছু বোঝে না, মানুষ ভালো কথা কিছু শোনে না।
হারাণ শেখের ছেলে তিন বছর বয়সেই ক্ষেতে খাটা ধরেছে,
হারান শেখ আপনাকে চেনে না, তবে নিশ্চয়ই নাম শুনেছে,
হারান শেখেরা নিরবিচ্ছিন্ন প্রজন্ম, হারান শেখ কবিতা পড়ে না
শুধু ক্ষিধে বোঝে।

আমি হারান শেখ নই,
আমি কবিতা পড়ি, মাঝে মাঝে লিখিও।
অথচ গুরুদেব, আজ আপনাকে নিয়ে একটা কবিতাও লিখতে পারলাম না।
মনে হচ্ছে সময়ের অস্থিরতা মানুষকে করে তুলেছে অস্থির-
আজন্মের প্রতিবাদ শ্বাপদের মতো গোপনে এগিয়ে যাচ্ছে,
মূল্যহীন মানুষগুলো কবিতার বদলে
ফুটপাথের ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে আনছে এঁটোকাঁটা,
ফুরানো পাউডারের কৌটো আর ব্যবহৃত বেলুন।

কবিগুরু, আপনি এবার বলে দিন
এখন কি করবো-
অজস্র কবিতায় এই পৃথিবীকে ভরে তুলব,
নাকি কবিতা লেখার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে
আজন্মের মতো লেগে যাবো কাজে
যাতে করে বই-এর অজস্র কবিতার বদলে
সুন্দর পৃথিবী আপন নিজস্বতায় নিজেই হয়ে ওঠে একটা কবিতা।

তখন পৃথিবী একটা কবিতা
ধানের দোলার পৃথিবী
কচি কাচাদের হেসে বেড়ানোর খেলে বেড়ানোর পৃথিবী
হারাণ শেখের পিদিমজ্বলা দাওয়ায় দাওয়ায় উজ্জ্বল পৃথিবী
মানুষের প্রাজ্ঞ দৃষ্টির পৃথিবী।

আমায় ক্ষমা করুন, গুরুদেব,
আপনাকে নিয়ে একটা কবিতাও লিখতে পারলাম না।
গুরুদেব,
এখন কি অজস্র কবিতার ফেস্টুন
না কি একটা পৃথিবী, একসঙ্গে অসংখ্য মানুষ
আর তাই নিয়ে এক এবং একমাত্র বেঁচে থাকার কবিতা।





সুবীর সরকার


রবীন্দ্রনাথ সমীপেষু

শমী যেদিন চলে গেল সেরাতে কি চমৎকার                                                                            জ্যোৎস্না 
কুষ্টিয়া থেকে শিলাইদহ  যাচ্ছেন
আর আড়াল থেকে হেসে উঠছে 
                            আমাদের আব্দুল মাঝি 
আপনার ছিন্নপত্রে উবু হয়ে বসে পড়ে 
                      জ্যোতি দাদার লাল পিয়ানো 
রবীন্দ্রনাথ, সাজাদপুরে যে দোয়েল শিষ দেয় 
আপনি তা অনুবাদ করেন 
আর হাসন রাজার দেশে খুব 
                                   রবীন্দ্রগান বাজে