৮ম বর্ষ ৩৫তম সংখ্যা ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এই সংখ্যার লেখকসূচি : সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য, রত্নদীপা ঘোষ, তৈমুর খান, বৈশাখী চক্রবর্তী, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, অনুপম দাশশর্মা, শাশ্বতী সরকার (টালিগঞ্জ), সতীশ বিশ্বাস, তপন মন্ডল, আসমা চৌধুরী, নাসির ওয়াদেন, জারা সোমা, কৌশিক চক্রবর্তী, গৌতমকুমার গুপ্ত, সুনীতি দেবনাথ, পার্থ রায়, প্রীতি মিত্র, সুপর্ণা বোস, সুমিতা মুখোপাধ্যায়, মারুফ আহমেদ, আহমেদ কায়েস ও আহমেদ ছহুল ।

                সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য

বিংশ শতাব্দী থেকে বলছি

ঠিক আগের শতাব্দীর শেষ রাতটা পার হতেই
সৌরমন্ডল নড়ে চড়ে বসলো
নিরাপদ নিরাভরণ উজ্জ্বল চাঁদে কেন বারবার হানা দেয় ওই মনুর সন্তান
প্রশ্নটা পাক খেতে খেতে পেন্ডুলামের মত তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আর একটু তীব্র ও নিষ্ঠুর রাগে ফুঁসে উঠল সভাসদ সহ দ্য প্রিন্স অব দ্য সোলার এক্লিপ্স্।
সেই নীল আমস্ট্রং থেকে শুরু 
তারপর থেকে ফুঁসতে ফুঁসতে 
তামিলনাড়ুকে শুখা বানাবার জন্য একটু একটু করে তৈরি হয়েছে সে
এইমাত্র বাহুবলীর কাঁধে চড়ে উড়ে গেলো চন্দ্রযান।
আকাশের পেট ফুঁড়ে ঢুকে গেল পৃথিবীর কক্ষপথে। লতা মঙ্গেশকার থেকে বচ্চন স্যার,শাহরুখ থেকে বিরাট
সবার মুখে চওড়া হাসি! 
তেরেসকোভাও ব্যালের তালে তালে এগিয়ে আসছেন সম্বর্ধনা দিতে 
ছাপ্পান্ন ইঞ্চি বাহবা দিয়েছেন ভারতীয়  বিজ্ঞানীদের।
বিংশ শতাব্দীর শেষরাগটুকু ততক্ষণে ঢেলে দিয়ে তামিলনাড়ুকে শুখা করেছেন 
আকাশের একচ্ছত্র জ্বলন্ত সম্রাট
উৎক্ষেপণ স্থল থেকে মাত্র ১০০ কিমি 
সোয়া দুঘন্টার দূরত্বে অধিবাসীদের হাহাকার গড়াগড়ি খাচ্ছে 
সংবিধানের মৌলিক অধিকারের আবর্তে। 
পরের শতাব্দীতে ঘটমান পাপের ভবিষ্যৎ বাণী
শুনিয়েছিল সোভিয়েত
শুনিয়েছিল তাবড় ইওরোপ,এশিয়া 
অবশ্যই ভারতবর্ষ।
সাইবেরিয়া বা তাসখন্দ থেকে তাসার শব্দে ভেসে আসত ভারতের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়
বুলগেরিয়া,চেক,পোলান্ড ও রোমানিয়াও পিছিয়ে ছিল না 
একমাত্র প্রতিরক্ষা ও অর্থ,যোগাযোগএবং বৈদেশিক নীতি ব্যতিরেকে 
ভূস্বর্গে স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া আর কারুরই জমি কেনার অধিকার ছিল না। 
স্থায়ী বাসিন্দা কে আর কে নয় সেটাও ঠিক করার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের।
নেহেরুজী আর ৩৭০ ধারার মধ্যে রহিত ৩৫এ আজ বাতিল করলো গডসেকে যারা দেশপ্রেমিক তকমা পরিয়েছে সেই দলটি
আবার ডিলিমিটেশন জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখে।
সৌরমন্ডল জুড়ে অসম্ভব ছটফটানি
গরবাচেভ,ইয়েলেৎসিন,শেখ আবদুল্লা, ইন্দিরা ও ব্রেঝনেভ নেহেরুর সঙ্গে একসঙ্গে আলোচনা করছেন বাহুবলীর উৎক্ষেপণ আর শুখা তামিলনাড়ুর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

তিনশো সত্তর গড়াগড়ি খাচ্ছে।
সময় স্মৃতি হচ্ছে ক্রমশ।



রত্নদীপা দে ঘোষ

স্বামীকে বশে রাখবেন কী কোরে

আপনি রম্ভা নন, উর্বশীও নন। হোমের কস্তূরী আর যজ্ঞের শিখা। আগুন আপনার করতলে আঁকা, সমিধের ধূপ। আপনার বাণভাসিকে নিছক জলাশয় ভাবলে কিন্তু ভুল হবে।

সমুদ্রকে বইতে দিন আপনবনে। কতদূরই বা যেতে পারে সে। বড়জোর জিপসি নদীর ধেউ, অথবা রঙবাহারি হরতনের ঝোপ। খুব বেশি হলে পৌরাণিক কোনো গদ্যযন্ত্র। যেতে দিন। বুলবুলির হাসিস ফুরিয়ে গেলে, জানবেন ফিরে সে আসবেই নিজস্ব বাগাডুলিতে।

মাঝদরিয়ার গড়ন অনেকটা পানপাতার মতন। তাকে দেদার বিলিয়ে দেবেন না। জানবেন, অবসরপ্রাপ্ত চিঠিদের ঠিকানায় কোন পোষ্টমাষ্টার থাকে না।

আপনি বরং বৃষ্টিভিজে প্রখর ভ্রু-পল্লব, মেঘের উলগোলাটি ঝরিয়ে দিন।
পর্যাপ্ত খুশবুদার রাখুন আকাশ এবং বাতাসের মধ্যবর্তী বাগানটিকে।

কোজাগরীর জাফরিতে জ্বেলে রাখুন কদমের আলেখ্য। গানে মিশিয়ে দিন গান। চোখে মিশিয়ে রাখুন চোখ। মনে রাখবেন, চখাচখির পূর্ণস্থানে যেটুকু আশার আখরোট, সেইটি রূপালী কাজুবাদামের রোদ।

সাংসারিক ধুনুরিতে তাকে হারিয়ে ফেলবেন না যেন।

মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে, তার পাখিগুলিকে শুনবেন।উড়তেও শেখাবেন। সাদা পালকের রুমাল, সাবেক কালের প্রজাপতি। বের করে আনবেন একে একে
সব্বাইকে, সময়-সিন্দুকের জাল কেটে। আহ্লাদের আগুনে যে প্রবল জলোচ্ছ্বাস তারই ডুবসাঁতারে, মেতে উঠবেন হঠাৎ এস্রাজ, মাঝরাতে।

মনে রাখবেন, প্রতিটি পালতোলা নৌকোডুবির পরেই জ্বলে ওঠে এক একটি
শ্যামলী ছুমন্তর, আভা ...

সে হয়তো বলবে, এইসব অকাল অমলতাসের বনস্পতি।
আপনি জানবেন, এই মুহূর্তটি আসলে তমালতরুর সর্বনাশ।

তৈমুর খান

আহত সৈনিক 

এত আলোর গান কারা গায়  ? 
তাঁবুর ভেতর অন্ধকার 
অন্ধকারে যুদ্ধ আমাদের 

কার সঙ্গে যুদ্ধ ? প্রতিপক্ষ কারা ? 
নিজের সম্মুখে নিজে জেগে আছি 
নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করা  ! 

নিজেকেই চেনা যায় না 
আদিম রক্তের ধারায় ভেসে যায় আলো 
ক্ষতগুলি বেঁধে রাখি বারবার 

সংযম কোথাও নেই 
আত্মবিষণ্ণ মাঠ জুড়ে 
মর্মের স্বপ্নিল পাখিগুলি উড়ে যায় 

অথর্ব পরাজিত বসে থাকি 
আহত সৈনিক এক 
চারিপাশে বিদ্রুপের ঘোর বজ্রধ্বনি 


বৈশাখী চক্রবর্তী

ক্ষত

জলে ভেসে যায় সবুজের তালসারি
ঝিমধরা কোনো নিমজ্যোৎস্না হাসে
নিভৃত আলোয় বৃষ্টির লয়কারি
বহুদূর থেকে তোমার গন্ধ আসে।

দারুচিনিচোখ বিরলতম আতর
বিভাজিকাহীন বিদর্ভ ধূসরতা
বেলাশেষগান অচেনাসন্ধ‍্যা কাতর
বিবেচনাহীন প্রাসঙ্গিক বিষন্নতা।

থমকে গিয়েছে তাম্রলিপ্ত শহর
ছলকে আসা মরচেরঙা গানে
ভেজে করতল ভেজে আরশিপ্রহর
জড়িয়ে নেওয়া বিশেষ সর্বনামে।

তরজা মুখর দরজারা সব জানে
দেহপটসনে অপরিনামের মানে।


বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

ছোট হয়ে আসছে বারান্দা

পা থেকে কেউ খুলে নিয়ে যাচ্ছে সময়
বারান্দায়  বসে  দূরের দিকে খেয়া বাইছে চোখ

কেউ অনবরত কাঁপিয়ে যাচ্ছে শব্দের  পাঁজর
ঝাঁঝরা  হয়ে যাচ্ছে  পা রাখার বসতি
কোনপথই আমাদের ব্যক্তিগত  নয়

হাহাকার  তুলে কোথায় গচ্ছা দেবে তুমি ?

একটি বারান্দা  নির্জনতা  বুনে চলেছে  ফুসফুসে

এই বাতাস অম্লজান  নয়।
ছায়ার দিকে তাকিয়ে দেখো

 পা থেকে কেউ খুবলে নিচ্ছে সুখী চলাচল।

অনুপম দাশশর্মা

একার এক্কাদোক্কা

একক তুমি, স্বাধীন বলাকাও
নিভৃতে রচনা করো কাব্যফসল
আমি বিকেলের রোদ
তবু তোমার উত্তরণে চাই
হোক শোরগোল।

প্রথমা তুমি, যে-নাকি ডেকেছ আমায়
তোমার কাঁচা দাগে প্রলেপ দিতে
ব্যাকরণ নয় নিজের সৃষ্টি থেকে
ভরিয়েছি ফাঁক।

তুমি প্রগলভ তবুও-
দ্রোনাচার্যের মত এঁকেছ আমায়
কেঁপে উঠি অজান্তে ভরা পূর্ণিমায়
মরা কোটালে লেগে যায়
ফাগের লালিমা।

একক তুমি, একক আমিও
শরীরে পেতেছি শেষ শ্রাবণের বাদল
একাকী থাকুক অসম বয়সের দে-দোল।

শাশ্বতী সরকার (টালিগঞ্জ)

তবে বাজার-ই ঘুরে আসি

সেদিন থেকে আর যাইনি ওদেশে
যেখানে আমার জন্য কোন প্রেম জমা নেই

মৃত ঘাসে ছেয়ে গেছে আমার ভূমি

দূর্বাদলশ্যাম কবিতার খই ফুটিয়েছিল
ফোটাতে পারত আরও কথা ও কাহিনী

এদেশের কথা ও কাহিনীরা জড়েই বদ্ধ থাকে
কঠিন ধাতু অথবা মৃত্তিকার প্রলেপে ফেলে
অং বং চং দিয়ে গড়ে তোলে প্রগাঢ় পাঁচিল

দূর্বারা হাঁফ ধরে মরে যায় নিত্য অপমানে

তবে কী দিয়ে সাজাই বল কবিতা আমার?

মিথ্যের পসরা নিয়ে যারা বসে আছে
যাও, তাদের কাছে যাও

ভিক্ষান্নেই যার রুচি
রাজ-অন্নের কদর সে আর কী জানে!

যাই, আমিও তবে যাই,
একটু বাজার ঘুরে আসি।

সতীশ বিশ্বাস

ধন্দ

খানিকটা অন্ধকারকে কি ভালবাসা যায়?
সূর্যকরোজ্জ্বলও কি ভালবাসার যোগ্য?
চন্দ্রালোক-উদ্ভাসিত হলেই কি ভালবাসার আদর্শ দাবীদার ?
মাটির প্রদীপকে প্রণয় জানাতে গিয়ে দেখেছি-সলতে পুড়ে যায়
নিয়নের আলোকে ভালোবাসতে গিয়ে হারিয়েছি স্বাধীনতার অকৃত্রিম স্বাদ
নিখাদ আদরে শিখাকে হাতে তুলে নিতে গিয়ে দেখেছি-মোম গলে যায়—
তাই, আলো না অন্ধকার-অন্ধকার না আলো-এই ধন্দে পড়ে,
আমার আর উর্দ্ধে ওঠা হল না।
  


তপন মণ্ডল অলফণি

ঝিনুক

আশেপাশে প্রিয়জন বলে কিছু নেই
আমি একা
আর একটা বিষন্ন বিকেল

ঐ যে বৃষ্টির বার্তা বাহক মেঘ

ঐ যে পর্ণমোচী গাছ

কত শত বিশ্বাস হারিয়ে যায়
তবু আমি আহাম্মকের মতো
ফাগুন ডাকি
পলাশ খুঁজি

জানি এইসব নিছক ঝিনুকে
শিল্পকলা হয় না