৮ম বর্ষ ৩৩তম সংখ্যা ।। ২২ অগস্ট ২০১৯

এই সংখ্যার লেখকসূচি : প্রণব বসু রায়, নাসির ওয়াদেন, হরপ্রসাদ রায়, কাকলি দাশ ব্যানার্জী, জপমালা ঘোষ রায়, মন্দিরা ঘোষ, শাশ্বতী ভট্টাচার্য, শীলা বিশ্বাস, মৃত্তিকা মুখোপাধ্যায়, সুনীতি দেবনাথ, আদিল পারভেজ, চৈতালী রায়, গৌতমকুমার গুপ্ত, খাতুনে জান্নাত, বিনতা রায়চৌধুরী, হাসানাৎ আসিফ কুশল, জারিফ এ আলম, সুতনু হালদার, জহির খান, সুপ্রীতি বর্মন, দেবলীনা দে ।

প্রণব বসু রায়

যে লেখা কবিতা নয়

উজ্জ্বল উপস্থিতির দরকার নেই
হঠাৎ কখনো মনে পড়ে সমুদ্র- ঝড়ের কথা
সেই ভয় কুন্ডলী পাকায়
ছোবল মারে হাঁটুর নীচে, পথ আটকায়
কবিতা- কার্ণিভ্যালের। ওটা যে অনাবশ্যক পাড়া
ঝড় সে কথা কবেই জেনেছিলো!
ওইস্থানে যে ভাষায় কথা হয়
আমাদের বুনিয়াদি বিদ্যালয় সে পাঠ দ্যায়নি কখনও।
ওখানে সবাই সুসজ্জিত অথচ উলঙ্গ বলে যৌনকেশ দৃশ্যমান
রজঃস্বলারা হুইস্পারের মডেল আর পুরুষরা কন্ডোমের বর্মধারী
তাই অবাধ মেলামেশা, গট-আপ পুরস্কার, ঝলমলে অভিজ্ঞান-পত্র
পত্রিকায় কার ছবি, ওপার থেকে কে আসবে---সবেরই নিয়ম আছে
আছে হাসি মুখে তীক্ষ্ণ প্রতিযোগিতার, নিয়ম করে বাতির মিছিল।
এইসব গমন ও ভ্রমণ শেষে অনেকেরই গনোরিয়া হয়
তখন বিদেশি ব্যান্ডেজ কেনার অর্থ পরিষদ জোগায়...

তোমার জানার জন্যে বলি আমি ওপাড়ায় যাইনি কখনও
----- সে যোগ্যতাও নেই, আমাকে বড়জোর একটা শালখুঁটি ভাবতে পারো
যাকে ঘিরে টিনের একটা ঘর ছিলো, মাটির বারান্দা ছিলো
#
তুমি এলে আমি ফের সব সাজিয়ে দিতে পারি

নাসির ওয়াদেন

মৃত্যুর আগের মুহূর্তের কথাবলী 

মরে যায় মানুষ, মনুষ্যত্ব মরেছে বহুকাল 
ঝর্নার মতো ধারাপাত থেমে গেছে পথে 

মাতৃস্নেহে লালিত সূর্য্যের আলোরেখা মেখে 
সেই চোখ দেখে কালো অন্ধকার , খুনসুটি 

কে কখন কোথা যায়, কেউ কি জানে 
নিস্তরঙ্গ স্রোতে মাছেদের হাঁটাহাঁটি ?

ছোট মাছ তবু সেও ঘোরে নিরাপদ মনে 
তীব্রগতি দৃঢ় আশা বুকে  সহচরী সাথে 

কী রকম ভাবে জেগে ওঠে ধুলো সংসার 
দ্বেষ-বিদ্বেষ ভরা শূন্য জীবন, শূন্য বিরাম 

সহস্র বন্ধনে বাঁধা মনগুলো বৃন্তচ্যুত ফুলে 
ঝরে যায়,সৌরভ জৌলুস ছড়ানো ঢ়ের বাকি 

মৃত্যুর ক্ষণস্থায়ী জীবনের পূর্ব শর্তাবলী, ঠিক 
রাঙা হরিণের চঞ্চল পদে বেঁচে থাকা তৃণলতা 

আবেগ আছে তাই ভালবাসা নিয়েই বাঁচি 
মৃত্যুর আগের মুহূর্তগুলি রঙিন কথায় আঁকি 
                        

কাকলি দাশ ব্যানার্জী

একটা স্বাধীনতা চাই

৭৩ বছর আগে সম্মোহিত হয়েছিল ভোলানাথ টিকাদার ,
শঙ্কর আইয়ার,আদিল মিঞা,করুণা সুব্রামনিয়াম,বিষ্টু চক্কত্তির মত মানুষেরা 
"স্বাধীনতা" উচ্চারণকে বুকে জড়িয়ে ।

ভোলানাথ টিকাদার টিটাগড় জুটমিলের শ্রমিক,
আপোষ শেখেনি -
মালিকের শেখানো বুলির জাবর কাটেনি বলেই 
উল্কাপাত হয়েছে ওর সংসারে । 
তড়িজুত করে ব্যভিচারী মিথ্যের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে দিয়ে ওকে আস্তাকুঁড়ে ফেলা হয়েছে ।

স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে 
শঙ্কর আইয়ার - দলের বিরুদ্ধে গলা তুলেছিল বলেই ,
গলে গিয়েছে ভরসা
দেশভক্তির স্ফটিকাকার স্বপ্নদেখা দুটো চোখে এখন অমাবস্যার অন্ধকার ..
আঁধারে দেখতে পায়নি কারা অ্যাসিডধর্মী ছিল !

করুণা সুব্রামনিয়াম  চিত্রনাট্যে লিখেছিল- 
কারা অগ্নিভ নেতার ঝলমলে রোদকে গুমঘরে পাঠাতে চেয়েছিল ,তাই কাকপক্ষীকেও অজ্ঞাত রেখে  তার বলিষ্ঠ হাত থেকে উদ্ভুত তপোবনে রাতারাতি দেওয়া হয়েছিল আগুন,আর হাত দুটো এখন মুড়ে যাওয়া লাঠি -- আত্মরক্ষার উল্লাসটুকুও নেই ।

বিষ্টু চক্কত্তি  মা মরা মেয়ে মেহেরুন্নেসার মাথায় চাঁদোয়া খাটাতে চেয়েছিল বলেই আজও সে কলঙ্কিত নায়ক ।
শুধু চাওয়ার জন্য যদি এমন হাঁড়িকাঠ হয় তবে করার জন্য 
কতটা হ্যাঁচকা টানের তান আছে তার হিসাব কে দেবে ?

আমরা কি এমন রোদ চেয়েছিলাম ?
চাই নি -

তাই আজকের অ্যাজেন্ডা -
আমরা এই ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষ 
একটা দূষণ মুক্ত স্বাধীনতা চাই ....

দেবে গো ?




জপমালা ঘোষ রায়

তৃষ্ণার ক্যালরি বিতৃষ্ণার টক্সিনস

         ১

আষাঢ়ের তৃষ্ণায়

সদর্থক কবিরাই লিখতে পারেন ঝোল ভাতের গন্ধ, উদরের ওঁ আর হৃদয়ের
হৃং নিবেদিত মন্ড মন্ড প্রসাদ খাওয়ার কথা, অনুপুঙ্খ জীবনসমেত প্রকান্ড পরম্পরা।
সভ্যতার অ্যালয়েড পর্বে  তোমার সঙ্গে আমার আর কোনো ঝগড়া থাকবে না।
আমরা এখনো যে জনপদে আছি সেখানে খনি নিঃসৃত আকরিক।
তাই যেটুকু ঝগড়াঝাঁটি এখনো লেগে আছে তাকে সহজেই
খুনসুটি বলে চালানো যায়, কোনো খুনখারাপি নেই। 

সহজপাঠের যে তিনটে শালিখ রান্নাঘরের চালে ঝগড়া করতো, 
রবিঠাকুর তাদের লিঙ্গ নির্ধারণ করে যাননি। ধরা যাক একজন তৃতীয় বা ট্রান্স,
তবে কেউই এখন আর ঝগড়া করে না, ভীষণ  আপোষে থাকে, বরাদ্দ আয়ুষ্কাল,
লালে লালায় লালনে তারা খুব একটা লালায়িতও নয়। শুধু ঘন মেঘ '' বললে
তারা তিনজনেই থমথমে বিশ্রী আপোষের ভিতর থেকে হৃদয় মন্দ্রিল গান গায়,
যাবতীয় ঘনীভবনের পাখনামায় বর্ষা ঋতুর পদ্য লেখে, এভাবেই কখন
শালিখবিশেষ থেকে পাখিয়ালি স্বভাবে.... আষাঢ়ের তৃষ্ণায় তাদের দাবিদাওয়ায় 
লিঙ্গাত্মক তারতম্য তেমন থাকে না।

  ২ 

শ্রাবণের ক্যালরিতে

মনে করুন কবিতাটা ধারাবাহিক। এমন হয় না, তবু যদি হয়!
আজ সকালের সিরিয়ালে দেখলাম শ্রাবণ ভিজে ফুলে ঢোল।
আমাকে জাগানোর কোনো মানুষ নেই আর, আমাকে ঘুম পাড়ানোর
কোনো মানুষ নেই আর।  কখনো এমন রোদ্দুর দরকার হয় শ্রাবণকে
তোষক নিঙড়ানো করে নিঙড়ে রোদে দিতে হয়। ছোট্ট মেয়ে এভাবেই কি
বেগনে রঙের শাড়ি রোদ্দুরে দিয়ে তেপান্তরে চলে গেছিলো? 
আমার জানা নেই, কোনো হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ...

এই যে আষাঢ় শ্রাবণকে নিয়ে যাবতীয় রবিঠাকুরীয় ভাবাবেগ,
এসব অক্ষরই মাত্রায় রেখেছি। তবুও দেখলাম প্রচন্ড নেশাগ্রস্ত কেউ একজন,
সাড়ে তিনহাত ব্যবধানে দূটো স্লিপার রেখে মাঝখানে শুয়ে পড়লো....
ভূমি ফেটে গিয়ে লাভায় তলিয়ে যেতে থাকলো.... এটাকে আপনি
শ্রাবণের ক্যালরি ভাবতে পারেন  অথবা বিতৃষ্ণার টক্সিনস....


মন্দিরা ঘোষ

আবহমান

সব সুর  নিয়ে গেছো ভরে
উঠোনের গান
নদীর  ছলাৎছল
শান্ত চেয়ে থাকা
কুয়াশার আদিগন্ত বান

ছড়ানো  ধুলোর অবাধ

ভাঙা ডানার গায়ে
দিব্য আলোর রঙ
অলংকারের মত

ধারণে মাথুরকথা

অনিবার্য  এই সব জানি
জেগে থাকা রাত্রির কাছে
আবহমান

হরপ্রসাদ রায়

আমার স্বাধীনতা

তোমরা যখন তেরঙ্গাতে উড়াচ্ছ জোর স্বাধীনতার কথা,
আমি তখন সীমান্ততে দিচ্ছি টহল, খুঁজছি স্বাধীনতা।
তোমরা যখন রঙিন ফিতেয় সেলোফেনে মোড়াচ্ছ স্বচ্ছতা,
আমি তখন গলির মোড়ে, কোমর জলে খুঁজছি স্বাধীনতা।
তোমরা যখন শক্ত মুঠোয় আঁকছ শ্লোগান বন্দেভারতমাতা
আমি তখন ব্যর্থলাঙল মুঠোয় ধরে খুঁজছি স্বাধীনতা।
তোমরা যখন স্বপ্ন দিয়ে ঢাকছো বসে কঠোর বাস্তবতা
আমি তখন বদ্ধঘরের ঘুলঘুলিতে খুঁজছি স্বাধীনতা।
তোমরা যখন মিষ্টিমুখে রূপোরতবক মোড়াও উচ্ছ্বলতা 
আমি তখন নির্জাতিত, লুকোচ্ছি মুখ, খুঁজছি স্বাধীনতা।
©হরপ্রসাদ রায়


শাশ্বতী ভট্টাচার্য / দুটি কবিতা

নিষেধ - যাপন

রোদের মতো অনেকটা বিনয়
মেঘের মতো একটা চক্রান্ত
রামধনুর মতো রঙচঙে প্রগতি
বৃষ্টির মতো একটা প্রবল ভাষণ
বিদ্যুতের মতো কিছু প্রতিশ্রুতি
আর রাত্রিকালীন কয়েকটা চিহ্ন ...

আসলে আকাশ একটা রাষ্ট্রনীতির নাম ।

চলেছি অসম্ভবে

এইযে আমরা হারিয়ে ফেলেছি স্বপ্ন,
এইযে আমরা ভুলে গেছি মেঠো শৈশব
এইযে আমরা আকাশ নামিয়ে আনছি,
রোজ কবিতার উৎসব।

এখন কেবল চাঁদের পাহাড়ে উঠছি
এখন সকালে রোদ মাখছি না গায়
এখন সবাই শাসন করছি রাষ্ট্র
ঈশ্বরও নিরুপায় ।

এরপর শুধু বাকি থেকে যায় গল্প
এরপর শুধু ভয় আর সংশয়ে
মরে বেঁচে আছে কঙ্কালসার লজ্জা
ঘৃনা আর অবক্ষয়।

চোখ খুলছি না , স্বপ্নরা ভয় পাবে
আমরা এখন চলেছি অসম্ভবে।


শীলা বিশ্বাস

গাছ ভাষা

এখানে একদিন জলপাই রঙের গ্রাম ছিল 
তখনও মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের সবুজ খসে পড়েনি 

এখন যুদ্ধের রক্তচিহ্ন নিয়ে হাওয়া উড়ে বেড়ায় অন্ধগলিতে
গুপ্তহত্যার ইতিহাস লেখা গাছের পাতারা কুঁকড়ে আছে
অশ্মখুরে ভস্ম ওড়ে; ধীবরের জালে উঠে আসে মানুষের অস্থি 
বিজ্ঞাপনের ফ্লেক্স টাঙানো অন্ধদের রাস্তায় 
জিভকাটাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া মাইক্রোফোন
সবুজের হাহাকার পৃথিবী জুড়ে
সৈন্যদের ব্যুহ ভেদ করে চলে যাচ্ছে শ্যেল

আবার সবুজ ফিরিয়ে আনতে 
গ্রাম ছাড়িয়ে দেশ কালের সীমানা ছাড়িয়ে
গাছেরা  ঝরে পড়তে চায় সভ্যতার বুকে 

 চলো আমরা গাছ ভাষা শিক্ষা করি
 সে ভাষা পড়তে শিখুক আমাদের সন্ততি ।   



মৃত্তিকা মুখোপাধ্যায়

আশ্বিনের প্রেম

রোদে ভীষণ মায়া,মনকেমন ঘিরে ধরে ক্রমে
কাশের বেদনা ছিল,ভুলে গেছে স্মৃতিবিভ্রমে।

মন তো নদীই এক,খুঁড়ে খুঁড়ে স্মৃতিজল তুলি
আশ্বিন এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত বেদনাগুলি।।

যদি বলি আলো দিয়ে বিষণ্ণতা ঢাকি!
তুমি তো আমায় চেনো,আড়ম্বর ভীষণ পোশাকী।।

খড়,মাটি,ধুনো,ঢাক এসব বাহুল্য শুধু,
হৃদয়ে উৎসব নেই,ফাঁকা মাঠ,ধূ ধূ।।

 তোমার বুকের বাঁদিকে মন্ডপ,দেবী তার নিভৃতচারিণী,
আরতির পরেও সে স্বপ্নসঞ্চারিণী।।