৮ম বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ ।। ৪ঠা মাঘ ১৪২৫

এই সংখ্যায় যাদের কবিতা : রত্নদীপা দে ঘোষ, তৈমুর খান, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, অনুপম দাশশর্মা, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, জ্যোতির্ময় মুখার্জি, অমিতাভ দাস, শাশ্বতী সরকার (টালিগঞ্জ), ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, বচন নকরেক, অরুণ সেনগুপ্ত, স্বরূপ মুখার্জী, মৃত্তিকা মুখার্জী চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা বসু, শঙ্কর ঘোষ, পারমিতা কর বিশ্বাস, তাপস দাস, মতিউল ইসলাম, গৌতমকুমার গুপ্ত, চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুক্লা মালাকার ।

রত্নদীপা দে ঘোষ

যে ভাষা একজন আলোক-বালিকা

যে ভাষায় পান্থ-বিলাবলে ঝিকমিক করে সূর্যজ্যোৎস্না
যে ভাষায় ধানপথ বসে থাকে চাঁদের আরামে, কেদারায়
যে ভাষায় পাখিদল মেতে ওঠে পদ্মগন্ধের শিরায় উপশিরায়
যে ভাষায় প্রতিটি প্রার্থনাই উপাসনার মক্কা

যে ভাষায় ব্রজবুলির বাঁশীতে বেজে উঠছে বসন্তের অমেয়ধূলা
যে ভাষায় কথাকলি নেচে উঠছে গানশতাব্দীর শিখরচূড়ায়
যে ভাষায় মনোরম চুম্বনে সেজে উঠছে আকাশের ঠোঁট
যে ভাষায় সমুদ্রের ডানায় পেখম মেলছে স্নানময়ূরের রোদ

যে ভাষায় ঘর থেকে বেড়িয়ে বাড়ি
বাড়ি থেকে বেরিয়ে টকটকে দেশ
দেশ থেকে বেরিয়ে অবাক পৃথিবী
নিপুণ আবাসন সাজানো নবগ্রহ নদী

যে ভাষায় ভাসতে ভাসতে বারবার ফিরে আসি মা-গর্ভে
গাছের ধ্বনিতে ধমনীপ্রাপ্ত হই যে ভাষায় কান্নাপ্রথম
ডুবসাঁতারের তুলসীমঞ্চে লিখে রাখি তারই বৃদ্ধপ্রদীপ,
লিখে রাখি করুণাময় মাতৃক্রোড়,আনন্দিত অন্তঃপুর

তৈমুর খান / দুটি কবিতা

জলগান 

কৌতুক জলের কাছে বিজ্ঞাপিত হই
বিম্বিত ছায়ার হাসি মিশে যায় জলে
জলও হাসে, জলের ঔরসে
আত্মজনেষু মায়া জন্মায় অন্তরালে

জীবন সত্যের কাছে অন্ধ বাউল
দ্যাখে শুধু জলোচ্ছ্বাস, নত অন্ধকার
চারপাশে ভিক্ষার দেওয়াল দেওয়া ঘর
ঘরে ঘরে মুণ্ডুহীন ধড়, নিঃস্ব করতল

হাততালি তোলে ঢেউ, ভেজা অভিমান
দুপুরও ভেঙে যায়, নৌকায় প্রজ্ঞা পার হয়
কতদূর এসে তারপর জেগে ওঠে মূর্খ হৃদয়
বাঁশ বাঁশির কাছে তবু জল ভেজা জলগান  
         

সংশয়ের সিলেবাস

নিজেকে গড়ানোর প্রক্রিয়া কী
সমাজের কীভাবে উন্নতি হবে
কল্যাণ কল্যাণ বলে যাকে ডাকি
সে কি প্রকৃত কল্যাণ  ?
এসবই সংশয়ের সিলেবাস
রোজ সূচিপত্র দেখে দেখে
ধ্বংসাবশেষ হাতড়াই
সময়ের মরালাশ বজ্রের আলোয় চকচকে
বিভূতি উড়িয়ে দেখি শুধু হাড়
বেঁচে থাকা যদি নদীর মতো হয়
বিশ্বাস যদি পাহাড়ের মতো
তাহলে ধ্বংসাবশেষই সংশয়
আলো জ্বেলে কিছুই দেখা যায় না
অথচ অন্ধকারে স্পষ্ট হয় কল্যাণের মুখ






বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

আগন্তুক

কেউ আসে মাঝে মাঝে
গল্পস্বল্প করে তারপর উঠে যায়
শুধু ফেলে যাওয়া স্তব্ধ চায়ের কাপে
ধোঁয়াটে আকাশ লেগে থাকে

এসব দেখতে দেখতে সময়ের জটিল সুড়ঙ্গ
কখন যে ডুবে যায় ভাবি

একান্ত স্মৃতির নীচে
কেউ এসেছিল
তার ছায়া নিভিয়ে দিয়েছে
মৃদু আলো

অনুপম দাশশর্মা

নির্ভার অক্ষর আমার

যা কিছু লিখি তৃপ্তির চৌকাঠ পেরোতে না পেরোতে
হুড়মুড় করে এসে পড়ে বেগুনি রোদ,
সহসা খাতা জুড়ে বয়ে চলে রংহীন অক্ষরস্রোত
শূন্যতার গ্রাসে ভেসে যায় মানুষের অটল বিশ্বাস
যেন সামনে আসে মায়াচ্ছন্ন ভুবনডাঙা
সাদা হয়ে যাওয়া খাতার বুকে পঙক্তিগুলোর হাহাকার
রোজই ভাবি ছেড়ে দেব কলমের আঙুল
বিশ্রামে পাঠাব পক্ষপাতহীন অনুভবকে
দিনের দৌড় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলে নেমে আসি
রাত্রির অম্লান দরবারে,
নক্ষত্র ফুটতে থাকে আকাশের বুক চিরে
চরাচর আরো নিঝুম হয়ে এলে লেখার তাগিদে
ভীড় করে মমতাময় শব্দের প্রণয়
না-লিখে কে কবে উঠতে পেরেছে অর্জুনের রথে?
গভীর রাতে মগজে বসে উৎসাহের মজলিশ
একটি গোপন শুধু আড়মোড়া ভাঙে নিঃশব্দে
আঁধারের মায়া আজও বোঝেনা ভোরের উজ্জ্বল বলয়

ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

সীমানা

তোমার আমার মরু ব্যারিকেড
পেরিয়ে যাচ্ছে হাওয়া;                                            
জল ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পাওয়া।
                                                                              
বৃত্ত ভেঙে বিশ্বাস ভেঙে 
বাতাস পোড়ায় অলৌকিক দ্যুতি;
দ্বিধার তর্জনী সরিয়ে যাই কার কাছে, ভাবি!
কোথাও যাবার নিসর্গ পাই না আর!

অভ্যর্থনাহীন সেবিকাসমূহ দরোজা পশ্চাতে
বসে আছে! স্নিগ্ধ গ্রাম হলুদ শস্যাবলী নিয়ে
জেগে আছে। অথচ আমি আগ্রহ দেখি না কোন।
ডাকছে না কেউ, বলছে না এসো।

কোন গাণিতিক সূত্র ?
জানি না গবেষণা কেউ   করছে কিনা,
জন্মান্তরেও কি সরবে না সীমানা?


দীর্ঘ স্বপ্নের মতো  ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত

দীর্ঘ স্বপ্নের মতো জেগে আছ কে?
সন্তর্পণে চলে গেছে শীত,
সম্পূর্ণ খসেনি পাতাগুলো;
অন্ধকারে আধো আলোয় বৃক্ষের পাশে
দাঁড়িয়ে আছ কে?

ঘুমন্ত গোধূলি পায়ে মাড়িয়ে এসেছ কে,
বৃক্ষের নিচে?
যা কিছু উপমাময় তাকেই নিহিত করেছ
গভীরে, অনুপম ঐশ্বর্য তবু জেগে আছে
পৃথিবীর অন্ধকারে।

চোখ মেল আঁধারের রানী;
এতটা এসেছ তুমি বক্রোক্তি আর
ক্ষুদ্র লোভের বাগান পেরিয়ে
মৃদু মৃত্যুর হাতছানি পেরিয়ে  
এসেছ রানী।

প্রতিটি আলিঙ্গনই যদি ভালোবাসা হবে,
মুঠোয় নিশ্চিত পেয়ে পেশী শক্ত করে দেখেছি
কখন সরে গেছ তুমি; উত্তর গোলার্ধ সাইবেরিয়া
থেকে আসা পাখির মতো তুমিও শুনেছি ফিরেছ ঋতুশেষে।
সত্যি এসেছিলে তো? কাকে দেখলাম তবে?
দীর্ঘ স্বপ্নের মতো কে রয়েছ বৃক্ষের অন্তরালে?