৯ম বর্ষ ৮ম সংখ্যা ২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

এই সংখ্যায় ২৪টি কবিতা । লেখকসূচি : সুবীর সরকার, এলিজা খাতুন, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, উমা মাহাতো, সুমিত্রা পাল, ওয়াহিদা খন্দকার, জ্যোৎস্না রহমান, জয়িতা ভট্টাচার্য, কামরুন নাহার কুহেলি, পারমিতা চক্রবর্তী, মৃত্তিকা মুখোপাধ্যায়, চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম কুমার গুপ্ত, মৌ মধুবন্তী, পার্থ রায়, স্বপ্ননীল রুদ্র, নীলাদ্রি ভট্টাচার্য,রুমা সরকার বসু, মলয় সরকার ও দেবলীনা দে ।

ঘোষণা

জানিয়ে রাখি, প্রতি বছরের মত এবারও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মরণে ‘অন্যনিষাদ ভাষাপ্রণাম’ সংখ্যা প্রকাশিত হবে ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ । এই সংখ্যায় প্রকাশের জন্য কবিতা আহ্বান করছি । লেখা ১৮ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাঠাতে হবে । অভ্র কি বোর্ডে টাইপ করে anyonishadgalpo@gmail.com এই মেইল আই ডিতে পাঠাতে অনুরোধ করি ।

সুবীর সরকার

দেশ

হাতির শুঁড়ের মত আমাদের জড়িয়ে ধরেছে
                                          আমার দেশ
চারদিকে কালো পাখি।সাদা ডানায় মিশে থাকা
                                                  রক্ত।
ভয় তাড়া করে।
আর্তনাদ অনুবাদ করতে বসি 
                                     ভরসন্ধেবেলায়
দেশ মানে কি তবে হিমঘর!
সাজঘরে ঢুকে পড়ে ক্ষিপ্র
                                    কুঠার


এলিজা খাতুন / দুটি কবিতা

অধিকার আর দাবি এক নয়
   
নাগরিক হাঙ্গামার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
মঞ্চ থেকে শোনা যায়-
চৌকস  ভরা খুলিগুলোর চমৎকার  চিৎকার
নেতা তোমাদের বাড়ি বাড়ি যাবে
নিশ্চিত যাপনের কত্তকিছু দেবে
চাল ডাল কম্বলে ভাগ্য খুলে যাবে...

দেবার কথা শুনলে দাবির কথা উঠে আসে
আকাল, বিরোধ, ভাঙনের অতীত গন্ধ পাওয়া যায়
সমবেত উৎসব থেকে

গন্ধ পেলে ঘ্রাণের কথা মনে পড়ে
আমি তখন বুঁদ হই অরুণবাড়ির ভোরে
কানা তোলা টিনের থালায়
সজনে ফুলের সালুন মাখা বাসি ভাতের ঘ্রাণে
কাঁথায় ফোঁড় তুলতে তুলতে মা তাকিয়ে দ্যাখে
থাবা থাবা ভাত তুলে খেতে শিখেছে তার কোলের গ্যাঁদা
মা হেসে বলে, ‘আমার আর কিছু লাগবে না !’
 দুধের সর সরানোর মতো
গালের খসখসে চামড়া প্রসারিত করে
টানটান শুকনো হাসিতে যার ঠোঁট চিরে রক্ত উঁকি দেয়
তাকে কি চেঁচিয়ে কোন দাবি দাওয়ার কথা তুলতে হয় !
সেই অনুচ্চারিত ঠোঁটে কি তার অধিকারের কথা লেখা নেই !

কুশারের ভূঁইয়ে কামলা খাটা গাঁয়ের ছেলে
কুশার পিড়ায়, চিপড়ে চিপড়ে রস বের করে
মিঠা রস ফুটায় টগবগিয়ে
দানা দানা লাল গুড়ের ঝোল তোলে
চেখে দ্যাখে, চাখতে দেয়, কথাতেও তার মিঠা চুয়ায়

শহুরে শব্দ, মাইক্রোফোন আর সাউন্ডবক্সে ব্যাঘ্র কণ্ঠে
নরম স্বরে, দাবি পূরনের মিষ্টি কথা  কাদের জন্য !
কী এমন হয় তাতে !
নির্ভার ঘুম নিশ্চিত মেলে যে বিচুলি পাতানো গরম বিছানে
কম্বল পাওয়ার লিস্টিখানা তুচ্ছ নয় কি তাতে !

বাঁচা’ শব্দটি খুব সরল, হাতে নাতে প্রমাণ পাওয়া
চাষা বাপ’টা যখন উদোম গতরে বেগুনের  ভুঁই থেকে বেরোয়
সারা বুকে পিঠে তার কাঁটার আঁচড় থাকে সোজা সাপটা
কাস্তের আগায় পিঠ চুলকাতে চুলকাতে মা’কে বলে
‘ভাতের চুলাতে বাগুন পুড়াও,আর চুকার খাটা রান্ধো’



শিল্পীকে পুরস্কৃত করার ঘোষণায় রাজ্য তোলপাড় হয়
শিল্পীর কাছেই পৌঁছায় না সে খবর !
যার কড়কড়ে তালুর আদরে তৃষ্ণার্ত হয় মাটির বুক
ঝুরঝুরে  মেটো শরীরে কী শৈল্পিক তার সারি সারি বীজ বোনা!
যার নীরব ভাষায় মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে তুমুল সবুজ কথারা
তার থেকে বড় শিল্পী আর কে আছে ? 

বড়দের কোন দাবিদাওয়া থাকে না !
বড়রা দাবিদাওয়া পুরণ করে

ভালোবাসার নামে জড়াতে চেয়েছো তো !
অনেক আগেই জড়িয়ে গেছি তার সাথে
মহানন্দায় সাঁতার দাবড়ে ঐ যে যুবক হাবুডুবু খাওয়া
মস্ত গাভীকে বাঁচিয়ে তোলে মৃত্যুর মুখ থেকে
নিড়ানি দিয়ে যে  জমাট মাটি উসকায়, আগাছা তোলে
জল ঢালে শস্যের বিস্তারে

ভালোবাসার দাবি ছিলো না তার
ভালোবাসা অধিকারের অধিপতি সে

 ব্যবধান

শ্রাবণের জানালায় হাত বাড়াও তোমরা  
বৃষ্টি ছোঁও, আকাশ দ্যাখো
 
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গুরুপাকের ঘ্রাণ আর
 
সঙ্গীতে ভেসে যায় তোমাদের শৈল্পিক হৃদয়
আমার শুধু হৃদয় ভাসে না ; ভেসে যায় সবটুকু  
চোখ ভেসে যায়, বুক ভেসে যায়
 
টাটি-বেড়ার ঘর-দুয়ার ভাসে
 
ক্ষুধা ভাসে জলে হাবুডুবু উনুনে
 
উপেক্ষা ভাসতে থাকে চলমান স্রোতে
আকাশের হাতে কী এমন নীল ? আমি  দেখেছি
প্রহারে প্রহারে বিক্ষত কালশীরে নীল !
অভূতপূর্ব প্রাসাদের গল্প শুনি তোমাদের মুখে  
সেসবের দেয়ালে বিচিত্র কারুকাজ
 
আমি দেখি মজুরের পিঠে বিন্দু বিন্দু ঘামের নকশা
আফসোস করেছো,  ভুলক্রমে আমাকে সভায় আমন্ত্রণ
করেছে বলে ; সেই সুবাদেই চোখে পড়েছিল  
মাথার উপরে ঝাড়বাতির ঝলকানি !
  কয়েকবার
উপরমুখো তাকাতেই উপচে পড়ছিলো তোমাদের দম্ভ
আমার তো বহুযুগের দেখা,  ন্যায্য পাওনা থেকে
বঞ্চিত কৃষকের ক্রোধ জমে জমে তার চোখের চাহনিতে
কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জ্বলে উঠতে পারে !

তার দৃষ্টি-তীব্রতায় ফসলের গায়ে কেমন আগুন লাগে !  
এর কাছে তোমাদের ঝাড়বাতি বড় ক্ষীণ !
লাল-রক্ত-চক্ষু শাসনে প্রতারণার দাপাদাপি ছাড়া 
কী এমন করেছো তোমরা !
আমার আছে-  খেটে খাওয়ার, বাঁচতে চাওয়ার 
আশা বাঁধার অগাধ অনবকাশ
কান্নার নয়, স্থবিরতার নয় ...  
অপ্রাপ্তি আর বিদ্রোহের যতক্ষণ না পুনর্মিলন ঘটবে
 
আত্মশক্তির দেয়ালে যতক্ষণ না হতাশার রং ছিটে পড়বে
আমার গন্তব্য  থাকবে সন্মুখেই





সমরেন্দ্র বিশ্বাস

একটা লাইন লেখার জন্যে

একটা কল্পমেঘ লেখার আগে
কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী অপেক্ষা করে
আঠাশটা বিষন্ন দিনের,
একটা অচেনা স্পর্শ বুঝে নেয়ার জন্যে
ঝড় ওঠে, বজ্রপাত, বৃষ্টিসাঁজ, প্রেম নামে
একটা নতুন চোখ লিখে নেয়ার আগে
চন্দনের দৃষ্টি মেখে উড়ে আসে দূরগামী হাওয়া, ভ্রান্ত ফুল
একটা নতুন গন্ধ খুঁজে নেয়ার জন্যে
মুক্তিসংকেত, যুদ্ধক্ষেত্র, রক্তপাত, বিশ্রামের তাঁবু,
অপেক্ষার কতই না প্রহরযাপন !
একটা নতুন শব্দ লেখার আগে
সহবাস, ক্ষেতখামার, চিমনীর ধোঁয়া, সন্তানের ক্লান্ত মুখ।
অথচ প্রত্যেকদিনই এখন
বিনা অপেক্ষাতে, বিনা বজ্রপাতে, বিনা দিনযাপনে
লেখা হচ্ছে কবিতা – মাইলের পর মাইল!

উমা মাহাতো

মেহেরগড়

মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে উঠে আসছে ঘরবাড়ি, পথঘাট,
মাটির পাত্র--সাধারণ ও রঙীন,নকশাকাটা।
হাতে নিয়ে শঙ্খমালা,পাথরের কর্ণকুন্তল -
বালুচ কিশোরী আনমনা
এক্কা -দোক্কা খেলার ফাঁকে, বসে আছে নিরুত্তাপ।
কুড়িয়ে পাওয়া যখের ধন

নয়,পাঁচ,চার,তিন...হাজার বছরের পূর্বদেশ
লক্ষ কোটি যুগের উত্তরাধিকার --
প্রথম শস্যচেনা মেয়েটিও সেদিন বক্ষনত এক হারে
অভিমানী সূর্যাস্ত সেজেছিল অনায়াস
তার পশুশিকারি পুরুষের বুকে সুগন্ধী জঙ্গল,
মোহ-মোক্ষ সারাদিন।
অস্ত্র ও অলংকার,মানুষের যৌথতার অহংকার!
সেই রাত্রিরেই উজ্জাপন প্রথম প্রণয়ের গর্বভার

চরৈবেতি..
বালোচ মেয়েটি একাকী একটিই পৃথিবী এখন
একহাতে মরুধূসর,সৃষ্টির প্রথম প্রস্তর
পারাবার-পারাপার শঙ্খনিনাদ,অন্যহাতে জীবন।





সুমিত্রা পাল

ফেরা

বৃষ্টিমাখা কোমলগান্ধার অন্ধকার
অপসৃত করে যায় নাছোড়বান্দা মনোবিকার
শান্ত, সমাহিত শব্দে এখন ঢেউ এর পরে ঢেউ
দুলে ওঠে সারা সংসার;

মহাপরিনির্বাণ থেকে উঠে এসেছেন তিনি
সময়কে দিয়ে চলেছেন শান্তি আর সংহতির উপচার
শতধায় বিভক্ত জীবনে আবার
আদি ও অকৃত্রিম সভ্যতার সার।
       

ওয়াহিদা খন্দকার

জাস্টিস ফর প্রমিলা

মা একটু শেখাবেন প্লিজ
মাংসল স্বাদের বাইরেও শরীরের অনেক ব্যবহার আছে..!
মেয়ের রক্ত যে বার বার শুকিয়ে যাচ্ছে
নাকি রক্তশূন্য হয়েই মাটি উর্বর হবে বার বার ?
যাতে ফলতে পারে অনেক প্রমিলা-শরীর,
নিষিদ্ধ পুরুষের শরীর!

মা শুনতে পান সেই প্রাচীন এক ঘেয়ে গোঙানি ?
দেয়াল তো চৌচির, তবু কানে ওঠে না কেন আর্তনাদ
আসলে পুরুষ তো বড়ই প্রাতিষ্ঠানিক, বৈষয়িক
সমাজ স্কুল রয়ে গেছে মেয়েটির জন্য!
তবু দেখুন আয়েশা, দেবস্মিতা, ঐশীরা কী প্রবল, প্রখর...

মা ওকে একটু মানুষ হতে শেখাবেন,
ওকে একবার মা ডাকটা শেখাবেন
মা জাতটা শেখাবেন!

জ্যোৎস্না রহমান

আগরবাতি
   

একটি মৃত্যুর পর আঁতুড়ঘরে কাঁদতে থাকে নতুন জন্ম;
আমি তখন ধাইমা, আমি তখন শুশ্রূষা।

জন্মের পর
কবরের মাটি দিয়ে মোছার চেষ্টা করি ভাগ্য-লিখন,
ঈশ্বর তখন মুচকি হেসে বলেন,
" কালি বিহীন কলমে লেখা হয় জীবন
আর  পদচিহ্ন আঁকে   ভাগ্য।"

অসংখ্য মৃত্যুর যোগফলের সাথে
প্রতিটি  জন্ম বিয়োগ করলে
 যে  জীবনের সন্ধান পাই
সে প্রতিদিন আপোষের খাতায় নতুন নতুন   অঙ্ক শেখে
তারপর শূন্য দিয়ে  গুন চিহ্নের পাশে
নির্মাণ করে  কবরস্থান;
তখন আমি জানাজা, তখন আমি আগরবাতি।




জয়িতা ভট্টাচার্য

রাশিচক্র

কাষ্ঠখণ্ডের ওপর শুয়ে আছে নারী
নিটোল নিথর শীতল শিশির যেন
সব কিছু ঠিকঠাক করে ছিলো কাজ
সঠিক  বউ,মা,ব্রত পার্বণ, 
উঠোন ঝাঁট দিয়ে বাসন......
বছরে বছরে রূপশালী
 ধান প্রজনন,

তারপর একদিন রক্ত নিভে আসে
ম্লান আকাশ তাকিয়ে দেখে 
শালিখেরা দল বেঁধে আসে
জীর্ণ সেই নারী শীর্ণ বিভাবরী 
আলো কমে আসে
শিশুকন্যা দুধ নিয়ে আসে
শুশ্রূষা কিঞ্চিত প্রাপ্তির ঝুলিতে
কথা শেষ হয় দিন শেষে

পেঁচার ,বাদুরের ডানায় সন্ধ্যা হয়
নিষ্কৃতি পায় নারীটি অবশেষে
শেষবার ঘন শ্বাস বুক ছিঁড়ে 
যেন ঝরে পড়ে রাত ফুল
শত আকুতির মতো
সাদা তুষারের মতো
তারা ঢেকে রাখে নারীর শরীর
প্রতিবার কথা শেষ হলে।।