প্রয়াত কবি অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি 'অন্যনিষাদে'র শ্রদ্ধার্ঘ্য ও অন্যান্য লেখা


অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় - জন্ম ১৯৩০ পিতা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের নামকরা সরকারী চিকিৎসক । শৈশবে পিতার কর্মসূত্রে মানভুম জেলায় ছিলেন অনেকদিন। তারপর নিজের কর্মসূত্রে এই অঞ্চলে স্থায়ী বসবাস । কর্মজীবন শুরু করেন দক্ষিণ-পূর্ব রেলের সদর দপ্তর গার্ডেন রিচে । পরে চিত্তরঞ্জন এ । কলকাতার চাকুরী জীবনে , রেললর্মী আন্দোলনে অংশ নিয়ে জেলবন্দিও হয়েছিলেন ১৯৪৯এ
কর্মসূত্রে মানভুম অঞ্চলে থাকার থাকার সুবাদে অরুণ কুমার লোকজীবন দেখেছেন ঘণিষ্ঠ সান্নিধ্যে – ওপর অপর দেখার সৌখিন মজদুরী নয় দেখেছেন আপনজনের মত , অন্তরঙ্গ অনুভবে মানভুমের মানুষজনদের একজন হয়ে । তাদের ভাষা , লোকাচার ও জীবন যাত্রার একজন শরিক হতে পেরেছিলেন অরুণ কুমার । কবিতায় সেই অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষজনের কথা বলেছেন তাদেরই ভাষায় , নানান চরিত্রের মুখে । প্রান্তীয় বাংলা-বিহারের কয়লাখণি-কারখানা আর শাল মহুয়ার আরন্যক বিস্তারের মানুষের হৃদয়ের যে উদ্ভাস তারও এক নাম ‘কবিতা’ যে কবিতা অরুণ কুমারের লেখনিতে প্রাণবন্ত । বস্তুত প্রান্তীয় বাংলার মানভুম-সাঁওতাল পরগনার বাংলা উপভাষার একজন প্রধান কবি ছিলেন প্রয়াত অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় । 

তিনি দেখেছেন প্রান্তীয় বাংলার এই মানুষগুলোর শোষন পীড়ন জীবন-যন্ত্রণা এবং সেইসঙ্গে গ্রামজীবনের বিবিধ বিশ্বাস ও অন্তগূঢ় সারল্য যা অসামান্য বাণীমুখ লাভ করেছে তাঁর কবিতায় । তিনি একাত্ম হয়ে যেতে পেরেছিলেন ওই অঞ্চলের চরিত্রগুলোর সঙ্গে । তাঁর কবিতার পাঠকদের ভ্রম হতে পারে কবিতায় বর্ণনাকারী যেন কবি নন, ঐ অঞ্চলের একজন সাধারণ মানুষ । প্রান্তীয় বাংলার মানভূম অঞ্চলের জনজীবনের সঙ্গে তাঁর একাত্মতাই অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাগুলিকে এমন আন্তরিক ও হার্দ্য স্পন্দনশীল আও জীবন্ত করে তুলেছে । কোন কবি শুধুমাত্র প্রান্তীয় বাংলার আঞ্চলিক ভাষাকে আশ্রয় করে , ভুমিপুত্র না হয়েও তাদেরই একজন হয়ে নিজের তাবৎ কাব্যজীবন সমৃদ্ধ করেছেন – প্রয়াত কবি অরুণ কুমার ভিন্ন আর কারো নাম আমার জানা নেই । 

অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের স্রেষ্ঠ কাব্য সঙ্কলন নিঃসন্দেহে ‘সাঁঝ বিহান’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬র কলকাতা বইমেলায় । বলা দরকার, ‘সাঁঝ বিহান’ কাব্য সংকলনেই প্রথম বাংলা-বিহার সীমান্তবর্তী মানভুম-সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলের প্রচলিত উপভাষাকে বাংলা সাহিত্যের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস হয়েছিল এবং তা কবিতার মাধ্যমে । আঞ্চলিক মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা তাদের ভাষার গন্ডী পেরিয়ে বৃহত্তর বাঙালি পাঠকের দরবারে হাজির করেছিলেন প্রয়াত অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় । বহু আবৃত্তিকার তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেছেন ও করছেন, আঞ্চলিক ভাষার কবিতার সন্ধান করতে তারা ‘সাঁঝ বিহান’এর কবিতা চয়ন করেন , অজিত পান্ডে সহ অনেক শিল্পী , গ্রাম্য শিল্পীও তার কবিতা থেকে গান গেয়েছেন ।ভালো ছবি আঁকতেন । তাঁর সম্পাদিত ‘বোধ’ পত্রিকা এবং নিজের কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ তাঁরই আঁকা।চিত্তরঞ্জন-আসানসোল- বর্ধমানের অনেক ছোট পত্রিকায় তাঁর অনেক কবিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । সেগুলি প্রয়াত কবি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন কিনা জানা নেই, জানা নেই তাঁর স্মৃতি চিহ্নিত উপন্যাস ‘দীর্ঘপথে অশ্বারোহী একা” প্রকাশিত হয়েছিল কিনা । এইটুকু মাত্র জানি উপন্যাসটি আসানসোল থেকে প্রকাশিত ‘আজকের যোধন’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছিল ।

প্রয়াত অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের প্রকাশিত কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ  :

সোনালী ডানার চিল
সমুদ্রের দিকে
এইসব হার্দ্য প্রেম রক্ত ধূলিকণা
মাঠ পাথারের গান
আলোকিত ইচ্ছার তরীগুলি (তিনজন কবির সঙ্গে)
অলিন্দে সূর্যের হাওয়া (তিনজন কবির সঙ্গে)
সুখ-দুঃখের কবিতা
সাঁঝ বিহান
(তালিকা অসম্পূর্ণ)

কবি অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় - আবহমানের এক কবি

সুবীর সরকার

গত ২৯ এপ্রিল ২০১২, প্রয়াত হয়েছেন কবি অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়।বয়স ৮২ পেরিয়েছিলেন তিনি তবুও যে কোন মৃত্যুই বেদনাদায়ক।  অরুণকুমার ছিলেন প্রান্তিক মানুষের কবি তার দুটি কবিতার বই --- 'সাঁঝ বিহান' ও 'আলোকিত ইচ্ছার তরীগুলি' আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে । তাঁর সাথে একবার দূর্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে আমার দেখা ও কাছে আসার সুযোগ হয়েছিল সেখানে, ছিলেন মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায় ও মঞ্জুভাষ মিত্রও সে এক বিরল অভিজ্ঞতা

অরুণকুমার ছিলেন অকপট, সহজ সরল ও মিশুকে মানুষ , খুব সরাসরি কথা বলতেন

সারাজীবন শালমহুয়া,আদিবাসী সমাজ ও প্রান্তীয় বাংলার আবহমানতায় কবি বিলিন হয়ে গিয়েছিলেন কখনো প্রচার,খ্যতি,যশাখাঙ্খা তাকে নড়াতে পারেনি নিজস্ব সততা ও বিশ্বাসের জায়গা থেকে। সেই অর্থে তিনি ছিলেন কিছুটা উদাসীনও বটে কেবল অন্তহীন মানুষই তার উপজীব্য ছিল তার লেখার

কিছুদিন সম্পাদনা করেছেন বোধ-পত্রিকাও।কয়লাখনি,শাল-মহুয়াময় অন্ত্যজ জনমানুষের লড়াইসংগ্রাম ও যাপন কে কবিতা ও গানে গানে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন

কবি ও মানুষ হিষেবে অরুণকুমার ছিলেন প্রকৃতই অতি বিরল প্রজাতির এক প্রকৃত মানুষ ও কবি, সাঁঝ বিহানের পরতে পরতে যিনি ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন অন্তহীন এক জীবনেরই গান, অদ্ভূত হেঁসেলের ভিতর  
প্রয়াত কবিকে শ্রদ্ধা ও প্রণাম


কাঁড়াতে বোল উইঠেছে

রাধিকা হে তুমার প্রাণে আংরা জ্বালা
ওই বাঁশি বাঁজাই আসছে কালা
তুমার আগুনে জল ঢালতে...

ইধার উধার ভাইলছ কেনে
সরম নাইহে তুমার মনে -
কালাচাঁদ লয় আপন মরদ
উয়ার বাঁশি শনতে তুমার দরদ –
ই খবর রসের নাগর জাইনে গেল সব্বজন
কাঁড়াতে বোল উইঠেছে উথাল পাথাল বিন্দাবন ।

বসুন্ধরার বিত্তান্ত

ধনধান্য আর ফুলে ভরা ই বসুন্ধরার বিত্তান্ত
বাবুদের বেটাবেটি গুলান বড় জোর গান কইরলেন .....।
উনার অঙ্গ ভইরে নদী
ঠিকেই আইজ্ঞা মা বসুন্ধরাতো অমনিই বটেন ......
উনার অঙ্গ ভইরে নদী জঙ্গল ডাঙ্গাল পাহাড় জোড় খেত খামার
ই সকলই উনার বাহার ......
তা বাদে খরায় পুড়া বাণে দুবা মা জননী
 শুখা সানপকী চাইতছে ...... আমার ভিখমাঙ্গা মা ,
তা আইজ্ঞা, উ ধনধান্যভরা মায়ের দেখা মিলবেক নাই ......
আমাদিগের বেটা বিটি গা্ন কইরবেক নাই ...
হে হে হেই ঘিজিং ঘিনা
ই মাটি আমারি মা
মায়ের অমগ সোনা পারা
আমার রুয়া ধানে ভরা
ঘামে মিশাল রক্ত পানি
লাঙ্গলের ঠেট জবানী ......
ই গান কইরতে লাইরবেক আইজ্।
আমাদের বেটা বিটি ......

লোকগীতি

অরে চাউল নাই চুলা নাই
নাই কলিজায় খুন
অরে চুরি কইরা খাইল কেডায়
পান্তা ভাতের নূন ।
অরে মুন্ডবিহীন ধড়কে সাজায়
জরির ছেড়া কানি
মেঘনা গঙ্গার দুকুল ভাসায়
চোখের নোনা পানি ।
অরে পান খিতে চূণ জোটেনা
কাজিয়া খেলার ঝোঁক
অরে দেহের রক্ত চুইষা নিল
যতেক ছিনেল জোঁক
এহন ঘর কই পান্তা কই
দেখাইয়া দেও
নাইলে ঠাইকরেণের মুখে নুড়া
কুলার বাতাস খাও ।
ঘামে মিশাল রক্ত পানি
লাঙ্গলের ঠেট জবানী ......
ই গান কইরতে লাইরবেক আইজ্।
আমাদের বেটা বিটি ......

নতুন রূপকথা

দেশ হইয়াছে ভাগ রে মণি,
পরাণ পুইড়া খাক,
আর দেশের মানষে বলি দিয়া
নেপোয় মারে ভাগ - রে মণি
দেশ হইয়াছে ভাগ ।
সুখ-কন্যা ঘুমায় যাদু
তেপান্তরের পার
আর সোনার কাঠি চুরি কইরা
দানোয় পগার পার – রে যাদু
কন্যা তেপান্তরের পার ।
আইস আমার যাদুমণি
কও নূতন রূপকথা
আর তলোয়ারে ঝিলিক হাইনা
কাইটো দানোর মাথা – রে মণি
কও নূতন রূপকথা ।
নাইলে ঠাইকরেণের মুখে নুড়া
কুলার বাতাস খাও ।

কে লিবেক হে

ই জমি আমার
উ জমি তুমার
ই গাঁ আমার
ত উ শহর তুমার ...
ফেরে ই দিন ই রাত
ই মেঘ ই বাতাস
কে লিবেক হে ......
হোই বইলে যাও ... কে লিবেক ......

পনেরোই আগষ্টের গল্প

হঁ আইজ্ঞা আমাকে চিনতে লাইরছেন ?
সাপডিহা গাঁয়ের ভুজুং মাঝি বাবু –
শুনেন নাই সেই –
টাঁরে টাঁরে লাল পাগড়ি
গাঁ ঘিরে লিল
ঘর লুটল জান লুটল
বিটির ধম্ম লুটে লিল
পৌষের পঞ্চ দিনে –

ইটো রাবন মাহাতোর গান বটে বাবু
ত আমরা বুইঝলেন আইজ্ঞা শেষ তক্ক ছাড়ি নাই
শন শনাই কাঁড় চইলল লাঠি আর টাঙ্গি
উয়াদের বন্দুক বারুদ – সি সব ছিরছাতুর বিত্তান্ত
কিতাব কাগজে লিখাপড়ি কইরেছেন তো বাবুরা
ত আমার নামতা লিখেন নাই আইজ্ঞা
ভুজুং মাঝির কাড়ার পারা তাগদ গুলিতে এখন ফুটা
ভুজুং মাঝি ইখানে ঠিকাদারের বেগার কুলি খাইটছে
সিপিশাল টিরেনে ঝকঝকাঁই পৌঁছাই দেন কেনে
দিল্লী শহটোতে ! সোনার মেডেল লিতে লয় বাবু
একটি কথা বইলতে – আমিতো লড়াই কইরেছি লাল মুড়াদের সঙ্গে
শেষ তক্কো পারিনাই ইটো তো মাইনবেন না কি /

সোনার মিডেল আপনারাই লেন বাউ
বড় খাতাটোয় নাম লিখান আপনারাই
আমার নামটা থাক কেনে বেগার কুলির পাতে
লিয্যাস কথাটো বইলতে দিবেন বাবু
পাপ লিবেন নাই মনে
আমার ঘর আমার খামার
আমার টুকচেক জমি সোনার বন্ন ধান
ফিরাইঁ দেন কেনে বাবু
আমার টুসু আমার পরব
হারাইঁ গেইছে যে অঘাণ
ফিরাইঁ দেন কেনে বাবু ...
হঁ আইজ্ঞা শুইনছেন
আমার সোনার বন্ন ধান...
শুইনছেন আইজ্ঞা সোনার বন্ন ধান ...

[আঞ্চলিক শব্দগুলির শিষ্ট প্রতি শব্দ – ডাং = লাঠি , সিঝা = সিদ্ধ , কিরা = দিব্যি , বিহান = সকাল
কাঁড়া = ঢাক , তাথেই = সেইজন্য , পারা = মত, ভাইলছ = দেখছো ]

এখনি

বয়স বাড়ছে নাকি হে !
আধো আধো উচ্চারণ আর কেন ?
স্পষ্ট করে বোঝঃ
ব্লাড ব্যাঙ্কে আর রক্ত নেই
অথচ দুনিয়ায় নূনের পরেই খুন কত সস্তা !
সেফ ডিপোসিটে নিজের মাথা জমা রেখে
অন্যেরটা নিয়ে দুষ্ট বানিজ্য এবার ছাড়ো তো !
মা-য়ের বুকে মুখ লুকিয়ে
কখন আর চোখের জল ফেলবে হে ?
মানুষের কাছে নতজানু হয়ে
কবে আর ক্ষমা চাইবে ?


অন্য কিছু নিয়মিত লেখা

কাব্য গ্রন্থ আলোচনা

শর্মিষ্ঠা ঘোষের কাব্য সঙ্কলন : ‘অলীক অলীক ভালোবাসা

উন পঞ্চাশটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে শর্মিষ্ঠা ঘোষের প্রথম কবিতা সঙ্কলন ‘অলীক অলীক ভালোবাসা’ ২০১২’র কলকাতা বইমেলায় । প্রকাশক পরশ পাথর প্রকাশনা । কলকাতার নগর জীবনের জটিলতা থেকে মুক্ত শর্মিষ্ঠার জন্ম, শিক্ষা ও বেড়ে ওঠা উত্তর বঙ্গের রায়গঞ্জ শহরে , কর্মস্থলও সেখানেই ।সঙ্কলিত কবিতাগুলির রচনাকাল বোঝার উপায় নেই যা থেকে তাঁর কবি মনের বা রচনা শৈলীর কোন পূর্বাপর বোঝা যায়। তবে গ্রন্থিত কবিতাগুলি পাঠ করে আমার বিশ্বাস কবিতাগুলির বেশির ভাগই রচিত হয়েছে মধ্য নব্বই থেকে দুহাজারের প্রথম দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়কালে ।

নব্বই দশকের সময়কালটা আমাদের সমাজ জীবনের এক অদ্ভুত নিস্তরঙ্গ সময় – কোন প্রশ্ন নেই জিজ্ঞাসা নেই আছে আদর্শবাদের সঙ্গে অ-প্রাথিত অনাত্মীয়তা । আবার এভাবেও বলা যায় যে আদর্শহীন এই নিস্তরঙ্গ সময়কালই নাকি মানব মনের গভীরতর অনুসন্ধানের কাল , হয়তোবা সৃষ্টিশীল মানুষজনের আত্ম-অন্বেষণ বা নিজেকে বুঝে নেবার কাল । শর্মিষ্ঠা যেমন নিজেই পড়ে নিতে চেয়েছেন “নিজের ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান” জেনে নিতে চেয়রছেন “কোন কার্তুজে কোন বন্দুক ঠিক ঠাক চলে”(দায় নেই) ।

সঙ্কলিত কবিতাগুলিতে শর্মিষ্ঠা ভালোবাসার যে নানান চিত্রাভাস নির্মাণ করেছেন সেগুলিকে অর্থহীন বা অলীক মনে করেছেন এবং নতুন কোন বিশ্বাসের অন্বেষণ করেছেন । দ্বিতীয় কবিতা ‘খোঁজ’ এ কবির বিশ্বাস “জীবন যখন অন্তরঙ্গ, জীবন তখন মৃত্যুঞ্জয় সুখ/জীবন জানে তুমুল বেঁচে ওঠা /তোর ঠোটেতে নামিয়ে আনলে মুখ” । তাই ঘরের দুঃখকে “কুলুঙ্গীতে তুলে রেখে” (‘দূর’) ওই অধরের অমৃতরস নিয়ে জীবনপাত্র পূর্ণ করি রোজ”এর জন্যই কবির “আজন্মকাল খোজ”

কবির অন্বেষণ ভালোবাসার । - মানব-মানবীর ভালোবাসা, নৈর্ব্যক্তিক বা বিমূর্ত ভালোবাসা নয় । কবি বলেই দিয়েছেন “ বনলতা সেন আশ্রয় দিক, নীরা শান্তির নীড় /এই কাব্যেতে স্থান নেই কোন, বাড়াবে অযথা ভীড় (অন্যগল্প) , চেয়েছেন “শরীরি গল্প রাত্রি জাগুক, আর সব কিছু পাক লয়”। কয়েকটি কবিতায় ভালোবাসার শারীরি রূপের চিত্রাভাস পাই । কয়েকটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে । “তরুণ যুবা কাম পাইথন জাপটে ধরে,আবেশ নামে নাভির নীচে / অস্থি-মজ্জা শিউরে ওঠে গা ছমছম ভালো লাগায়.../...... তরুণ যুবা যাসনা আমার সজ্জা ছেড়ে, রাত্রি শীত্‌ প্রবল ক্ষুধা /এই শরীরের ফায়ারপ্লেসে/ দিস, রাতভর অঙ্গ জ্বেলে জীবন সুধা “(‘অঙ্গ জ্বেলে দিস’)‘ড্রাগ’ কবিতায় বলেছেন ইঞ্চি মাপা জীবন যাপন অনেক সয়েছি, উড়িয়ে আজ নতুন যৌবন,/তোর দু বাহুর অয়ানাকোন্ডার মরণ পাকের মত / শিকার করুক জড়িয়ে ধরুক আধমরা এই মনআবার আর একটি কবিতাইয় ভালোবাসার যে গল্প শুনিয়েছেন তা নাকি “নিষিদ্ধ আপেল এক কামড়”এর পরিণতি । কবিতার নামটিও তাই ‘নিষিদ্ধ’ ।

“তুই নামিয়ে আনিস ঠোঁট
আমার চোখের ভেতর ছবি
তুই না, তোর বাবার ।
ক্ষমা করিস আমায়
নিষিদ্ধ এক আপেল ক্মড়ে খেয়েছি
এখন তোকে দেখলে
ভাইটি মনে হয়” ।
আমার কাছে অতয়েব এই ইঙ্গিত স্পষ্ট হয় যে বোধ করি ভালোবাসার এই ছবিগুলিই কবির কাছে অলীক অলীক মনে হয়েছে ।

গ্রন্থিত কবিতাগুলিকে বোঝার জন্যই আমি সেই সময়-কালটাকে বুঝতে চেয়েছি, যে সময়-কালে দাঁড়িয়ে কবি ‘অলীক অলীক ভালোবাসা’র নানান চিত্রাভাস নির্মাণ করেছেন । শুরুতেই আলোচনা করেছি নব্বই পরবর্তী একটা দশক তরঙ্গহীন এবং নিজেকে খোজার সময় । আবার এই সময়কালেই ‘বিশ্বগ্রাম’ ধারণাটির জাকিয়ে বসা, পুরাতন মূল্যবোধগুলির দৃশ্যমান ক্ষয়,তরুণ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীর নানান বিভ্রান্তির মাঝেও নতুন নতুন বিশ্বাসের খোঁজ ও সেই আয়নায় নিজেকে দেখা । কেউ বলবেন সে ছিল এক ‘ট্রানজিশনে’র  সময় , কেউ বলবেন ‘ট্রানসফিউশন’ – নতুন রক্তের সঞ্চালন । সম্প্রতি প্রয়াত এক প্রবীণ কবি ১৯৯১তে রচিত কয়েকটি পংক্তিতে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ছবিতা ছিল এই রকম –
“একই ছাদের নিচে তাদের বাস
একই সঙ্গে ওঠা-বসা,শোক-ভালোবাসা
তবু সেই চেনা শরীর মনে হয়
হঠাতই অচেনা... বাইরের
দরজা খুলে যায় ...অজানা বাতাস
আনে বীপরীত রক্তের খবর”

আলোচিত গ্রন্থের কবিতাগুলিতে সেই ‘বিপরীত রক্তের খবর’ । এবং সেই খবর বা ভালোবাসার নতুনতর বিশ্বাসের ছবি এঁকেছেন বেশ দক্ষতার সঙ্গে । কবিতাগুলির ভাষা বেশ সহজ – কথ্য আদান-প্রদানে যে ভাষা বলি সেইভাষায়, এমনকি অনেক ‘ক্যাজুয়াল’ শব্দ ‘বিন্দাস’, ‘ছাতার মাথা’, ‘ঢপ’, ‘আতলামো’, ‘ছাতার মাথা’ ইত্যাদি কাব্যরসের হানি না ঘটিয়ে ।
          
কবিতার শব্দময় উঠান নিকিয়ে বসে থাকুন কবি, ভালোবাসার নব নব বিশ্বাসের অন্বেষণ - তাঁর কবিতার উঠানে শব্দের মিছিল হয়ে এসে মিলবে – শর্মিষ্ঠার প্রথম কাব্য সঙ্কলন নিশ্চিত ভাবেই সেই প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিয়েছে ।

এক গুচ্ছ কবিতা -

মাকে লেখা চিঠি
মৌ মধুবন্তী
মা, শেষ চিঠিতে তুমি লিখেছিলে
ভাইটামিন না পাঠাতে, তোমার
সংসারে আরো অনেক কাজ
বাকী পড়ে আছে, পথ্যের চেয়ে 
ঔষধ তোমার খুব বেশী দরকার-
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
তুমি বরাবর ঔষধ ভালবাসতে
এমন কি আমার চেয়েও বেশী-- 
নানা রকম ঔষধ ভালোবাসতে 
মনে আছে মা? জিয়া চাচা
তোমাকে ডাকতো দাতব্য চিকিৎসালয় বলে।
তুমি রেগে গিয়েও ঔষধ খেতে।

তোমার নিজের কথা বাদ দিলেও

আমার কিংবা আশেপাশে আর কারো
মাথা ব্যথা ,পেট ব্যথা বলার জো ছিল না
সাথে সাথে তুমি মৌখিক একটা
প্রেস্ক্রিপশান দিয়ে দিতে; মুখে তুলে
সেই ঔষধ খাইয়ে দিয়ে তবেই স্বস্তি পেতে।

মা, আজ সকাল থেকে পেট ব্যথায় অনেক কাতর
কেউ আসেনি এক গ্লাস পানি কিংবা একটু ঔষধ নিয়ে
তোমাকে এতো করে ডেকেছি, তুমিও এলে না। 

মাদার্স ডে তে তোমাকে মনে মনে অনেক আদর দিয়েছি
তুমি বোঝনি? সেদিন যদি ভাইটামিন গুলোই পাঠাতাম ; সংসারে আজো তুমি জীবনান্দ হয়ে বেচে থাকতে মা। আমাদের জীবনান্দ নিয়ে তুমি চলে গেলে কোন সেই মহাবিশ্বে যেখানে কোন ফেসবুক নেই, টেলিফোনের কানেকশান নেই, এমন কি উড়ো চিঠিও যায় না। ডাকপিয়ন, ঠিকানা, পোস্ট অফিস কিছুই কি নেই মা? একটা চিঠি লিখ তোমার বিশ্ব হতে
এপারের ঠিকানায়। 
আমার ঠিকানা? 
টু 
মেয়ে, 
বাসার নং ১, 
শহর তোমার ভালোবাসা। 
দেশ পৃথিবী
ফ্রম
মা
মহা বিশ্বের ওপার হতে

একতা চিঠি লিখ। খামের কোন দরকার নেই। উলটো পিঠেই লিখ। এই নাও আমার ভালবাসা ।
ইতি 
তোমারই মেয়ে
চন্ডালিকা
ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়

লহারিতে ঢোকার মুখে 
আদিবাসি গ্রাম
ছোট ছোট সারি বাঁধা ঘর
গরু,ছাগল, মুরগীও আছে
বুড়ীরাও দু-হাতে ভর দিয়ে উবু হয়ে বসে

বহু দূরে চোখে পড়ে বাঁধানো পাতকুয়ো 
জল তোলে যুবতী মেয়েরা
চন্ডালিকার মতো

শুধু, আনন্দ আসে না কখনও
সে কুয়ার পাড়ে
বলে না হৃদয় নিংড়ানো স্বরে
জল দাও

লহারির চন্ডালিকা তাই 
দেখে না নিজেকে মায়া দর্পনে
লহারির চন্ডালিকা তাই চেনে না আপন হৃদয়

বিষণ্ণ সোনালী সন্ধ্যা নামে বটের ঝুরিতে
চন্ডালিকা বসে থাকে মিথ্যে আশায়
যদি বা এখনও আসে,
যদি বা আনন্দ এসে দু-হাত বাড়ায় !

পাহাড় তবু পাহাড়ে
কচি রেজা

অনেক দেরি হয়ে যে যায় অনেক
দাঁড়িয়েছিল যাবার বেলা ক্ষনেক
অভিমানের ছায়ায় ঘেরে,আহারে
পাহাড় তবু দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়ে

যাবার কথা ছিল কি তার  ? না নেই
শৈশবে যার দিন কেটেছে গানেই
পাখির গানে যে মেয়েটি হাসতো
আকেয়ামত তাকেই ভালোবাসতো

সোনার মতো মুখটি তাহার আহা রে
হারিয়ে গেল পাহাড় তবু পাহাড়ে

বন্ধু

তশলীমা খানম

যখন বন্ধু বলে ডাকি
তখন তোমায় মনে পড়ে
তোমার মুখের কথায় 
আমি ঝ’রে পড়া ডালে 
ফুটিয়েছি ফুল সযতনে

যখন বন্ধু বলে ডাকি
বন্ধু তুমি আমার
ব্যাথিত মনে দেখলে 
এতো উতালা কেন হতে ?
তোমার ছবির সাথে কথা বলি 
আকুল হয়ে ;
আমার আকুল করা প্রান 
ব্যাকুল হয়ে তোমায় খোঁজে

যখন বন্ধু বলে ডাকি 
দুপুরের তপ্ত রোদে 
ছাদে গিয়ে বসি , যদি দেখা পাই
নাম খুজি মুঠো ফোনের লিস্টে 
নিজেকে সুধাই, তোমার ঐ ছাদে 
তুমি আসবে কি একবার !!

এর চেয়ে বেশি দূরে যেতে 
আমার সাধ্য নাই।
রাস্তার কোলাহল মাড়িয়ে
যান্ত্রিক জীবনের মাঝে 
বড় ভয় করে
আবার যদি অমন ঘটে ।

মা
অভিষেক মজুমদার

একটা মা শপিং মলে
একটা মা রেস্তরাঁতে,
একটা মা ঘুপচি ঘরে
একটা মা কাঁদে যন্ত্রণাতে।

একটা মা বৃদ্ধাশ্রমে
পুরনো স্মৃতি জাবর কাটে,
একটা মা শরীর বেঁচে
রোজ ঘুমোয় অন্য খাটে।

একটা মা স্কুলের বাইরে
একটা মা ঠাকুর ঘরে,
একটা মা শুধায় বকে
একটা মা আদর করে।
একটা মা আধপেটা খেয়ে
সন্তান দের পেট ভরায়,
একটা মা সব কাজ ফেলে
বিকেল হলেই পড়তে বসায়।

একটা মা ফুটপাথেতে
একটা মা ভোটে দাঁড়ায়,
একটা মা ভিক্ষা করে
একটা মা, মায়ের অভাব মেটায়।

মা আমার সারা জীবনের
আমার মা আমারই থাক,
মা দিবসের ন্যাকামি তাই
দুনিয়া থেকে নিপাত যাক।

অন্ধকারে ইথারে
জাহাঙ্গীর খান

একদিন চলে যাব
হয়ত ছিলাম না কোনকালে
যা দেখলাম আর ধারণ করলাম সৃতিতে
 
হয়ত মুছে যাবে
কবরের  হিউমাস
বা শশানের উড়ে যাওয়া ছাইয়ে !!!

তার পর ... অনন্ত , অসীম কিংবা স্থীর সময়ে
শুধুই কি শূন্যতায় শূন্য হয়ে ভেসে বেড়ানো অস্তিত্বহীন হয়ে ?

জানব কি সেদিন কখনো ...
একদা পৃথিবী নামক গ্রহ ছিল
ধুসর বালুকায় ছেয়েছিল সবুজ সবুজ ঘাসে
মাথাতুলেছিল গুল্ম ঔষধী আর মহীরুহ বৃক্ষ |

আর গুহাবাসী প্রপিতামহগণ তাড়া  কর
ফিরত শ্বাপদ সরীসৃপ, বন্য জানোয়ারদের
কালক্রমে গুহা ছেড়ে অভিবাসিত হয়েছিল নদীবিধৌত উর্বর অরণ্যে |
পাজরের  হারে  লিখেছি
 
নিজের করে আরণ্যক এ  পৃথিবী |
ক্রন্দনরত সমস্ত জীবকুল বোধগম্যহীন ভাষায় চিত্কার করতে করতে বিতারিত হয়েছিল
সভ্য মানুষের দানবীয় আগ্রাসনে |

মনে  কি রবে কোনদিন ...
আমাদের অধিকারের মিছিলে
নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সাদা ফসফরাস বোমা
তৃতীয় বিশ্বের বিলুপ্ত জনপদের হার-গোর যখন কাড়াকাড়ি করেছিল 
আর্কটিক হতে উড়ে আসা অভুক্ত শুকুন,
ঠিক তখন ঠিক তখন পৃথিবীর অপর প্রান্তের
ল্যাবরেটরিতে চলেছিল তত্ব উপাত্তের নীগুঢ়বিশ্লেষণ
ঠিক কি পরিমান দুর্বিক্ষ হলে বা কি পরিমান তেজস্ক্রিতায় 
ঢেকে দিলে হয় মানব বিপর্যয় . ...
হয়তবা কিছুই রবে না মনে  !

শুধুই অন্ধকারে ইথারে ইথারে
মিশে থাকা অসীম সময় গর্ভে !


নীলাম্বরী আকাশ
সেলিম রেজা

গাছের পাতা যেন হলুদ আঁচল ঘাসের ভেতর

টেনে নেয় মায়াবী পরশে অনন্তের দিকে

শিরশিরে বাতাসে নিবিড় আবেগ তাড়া করে ফেরে-

ক্লান্তিময় দেহ হিরণ্ময় রাত্রিতে পরশ বুলায় সপ্রতিভ হাত;

ঘুম চোখে দাঁড়িয়ে থাকে শূন্য আঁধার

নদীর জলে ভাসে রাজহাঁস

মানুষের সাথে থেকে জেনেছি অনেক কিছু-

আমার ভেতর আমি নই তো !

সময়ের জালে পড়েছি আটকা- অকূল মরুভূমি

বুনি স্বপ্নিল বীজ অনাবাদী মৃত্তিকায়

আশার আলোয় অনুশীলন ফলায় ফসল

মিল- অমিলের রহস্যসুতোয় পড়ে টান

বাড়ে কোলাহল, ওড়াউড়ি দিগ্বিদিক

শুকনো পাতায় ফিরে প্রাণ

শঙখচিল ডানা মেলে উড়ে
প্রেমপ্রতিভায় নীলাকাশের কাছাকাছি ।

ইদানীং যে আকাশে আমার বসবাস





২টি মন্তব্য: