৭ম বর্ষ ১৪শ সংখ্যা ৩১ জানুয়ারি ২০১৮

এই সংখ্যার লেখকসূচি - রত্নদীপা দে ঘোষ, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, রাজর্ষি ঘোষ, জয়াশিস ঘোষ, ভগীরথ মাইতি, হরপ্রসাদ রায়, জয়দীপ চক্রবর্তী, বিবেকানন্দ দাস, দিশারী মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর দেবনাথ, রূপক সান্যাল, বচন নকরেক, সুজনা চক্রবর্তী, জ্যোতির্ময় মুখার্জী, লক্ষীকান্ত মন্ডল, অরূপ পাল, শুভশ্রী সাহা, সুকল্যাণ তপস্বী, নমিতা দাশ, দেবাশীষ সরকার ও গৌতম কুমার গুপ্ত ।

রত্নদীপা দে ঘোষ

চক-খড়ি হাতে

নিজের ছায়ায়। ফেরাতে চাইছি চোখ।
বারবার পিছলে যাচ্ছে আইবলের পালক। ওহে
ভদ্রাসন ...হামাগুড়ির জিরেত... জমিন ... আজ
কেনো এমন শোকদিন। শোকবেলা। কীসের জোয়ার ...
কুয়াশা না কৃষ্ণচূড়ার?
সম্ভবত এক অনন্ত থেকে অন্য গ্রহান্ত। দুপুর দুটো
কুড়ি গতে। টানাগদ্যে যাত্রা অন্ত।
অপারছুটি। টগরগ্রামের প্রাইমারি-ইস্কুলটি। দেওয়ালে
আঁকা। রূপকথার মণিমালা।
ঢেউ তুলছে মরমিয়া। স্লেটআলোর ফুটবলশিখায়।
ফিরতে চাইছে পা।
পারছে না।

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

এবার বাজাও ডুগডুগি

খেলা জমে উঠছে বেশ
ধারে কাছে সম্মোহন  পার হয়ে
তুমিও তো ধান্ধা নিয়ে ডুগডুগি বাজাও

নিষিদ্ধ আলোর বৃত্তে একদিন ঢুকে পড়ে তোমার ব্যক্তিগত সর্বনাম।

নিজস্ব মন্ত্রের কাছে আবিল কুয়াশামাখা দ্বিখন্ডিত কেউ

আমি তাকে না চিনেও পাশ ফিরে শুই
আত্মীয়তা জড়ানো ওম
মুছে ফেলি অনায়াসে তাচ্ছিল্যের ধারালো অহং

আমাদের পাখিগান
আমাদের শস্যের শ্রাবণ
ভাঙা বুকে পঙ্গু রোদ  পিপাসার স্তর

কেবল ভ্রান্তির পথে সতর্কতা লিখে রাখা হাত
এইবার ডুগডুগি বাজাও আবেশে।

রাজর্ষি ঘোষ

প্রতিবাদ

মেগাস্থিনিসের শেষ ঘোড়াটি নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল ময়দানের এক কোণে
কি হল হঠাৎ - আজ হেমন্তের বিষণ্ণ সকালে প্রতিবাদ করে উঠল উচ্চ হ্রেষা স্বরে

প্রতিবাদ করে উঠল
প্রথম পশলা রোদে হারিয়ে যাওয়া শিশিরের সে দল
বিদায়ী সম্বর্ধনায় যারা ডেকেছিলঘোড়াটিকে
মেগাস্থিনিস, সেও বুঝিক্রমে তার নিভৃত স্মৃতিচারণ কিংবা প্রলাপ বক্তৃতায়
পিছোতে পিছোতে...
কখন কেনভিক্টোরিয়ার পরী ক্রমশ লজ্জায় নতচোখ
একান্তে বারোটি কাক ইডেন গার্ডেনসের রাস্তায় বসেছে স্বভাবসুলভ ধর্ণায়
যদিও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাতে কিচ্ছু এসে যায় না

তাও প্রতিবাদ করেছে মেগাস্থিনিসের ঘোড়া
হয়ত তাতে কিছুটা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ছিল, কিছুটা নষ্টামি ছিল
সুড়সুড়ি ছিল কিছুটা
যদিও ঘোড়াদের যৌনতা এখন এই নগরের বিবেচ্য নয়
ধর্ষণ খুন ইত্যাদি জাগতিক অন্যায়ের বাঁধনে সে বাঁধাও পড়বে না সহজে
কোর্ট কেস হবে না
        সুতরাং নাগরিক সমাজ বিব্রত চোখে ঠিক যতটুকু দৃষ্টি দেওয়ার
ততটুকুই দিল
মোমবাতি জ্বলল ঠিক পাঁচটি

তারপর দিন গড়িয়েছে, সন্ধ্যা নেমেছে
ঘোড়াটিকে সামান্য চিনি এগিয়ে দিয়েছে কেউ
সামান্য গুড়, সামান্য ছোলা

একরাশ পায়রাওনেমেছে ময়দানের সবুজ ঘাসে



জয়াশিস ঘোষ

পাকদন্ডী

এই ঘুম। মেঘেদের ফিরে যাওয়া
চড়ুইভাতি সেরে। তাদের ঘর থেকে
ফিরে গেছে পোস্টম্যান
মেয়েটিকে ঘিরে ধরেছে কুয়াশা
আরো ঘুম, আরো ঘুম চোখে এলে

ফায়ার প্লেসে ঢেলে দেবে ভালোবাসা...

পাকদন্ডী পথ। কোথায় হারিয়ে গেছে
দেখা যায় না কিছুটা হাঁটার পর
তারপর
তাকে তুমি সন্ধ্যা বলে ডাকো
মনে হয় আলোগুলো জমে গেছে স্থির
দূর থেকে দেখা যায় না


কতটা ধরেছে তার চির!

ভগীরথ মাইতি

শীষভাঙা ধান

চাও বা না চাও- ফিরতে হবেই-
একবার কোথাও দাঁড়ালে- সেইখানে ৷
তোমার অজান্তেই কাঁটাগাছে আটকে যাবে
তোমারই ছায়া থেকে কিছু প্রিয় ছায়া-
যতোই গুছোতে যাও খুঁটে খুঁটে-
কিছু তো থেকেই যাবে
শীষভাঙা ধানের মতো অঘ্রাণের মাঠে ৷
সবটুকু কোনদিনই সঙ্গে ফেরে না !
পোঁটলা গুছোতে গেলে একদিন ঠিকই চোখে পড়ে
এটা নেই- সেটা নেই-
আর তখনই মনে পড়ে যাবে
রাবিশের নীচে চাপা পড়ে যাওয়া
কাঁটাগাছ- ছিঁড়ে গিয়ে থেকে যাওয়া ছায়া ৷
 কাঁটাও কি ডাকে না ভাবো ? ডাকে ৷
কতোটুকু জানি আর ! এতোটা গুছোই তবু
অসাবধানে কোথায় কতোটা পড়ে থাকে !

হরপ্রসাদ রায়

একটি অকবিতা
(প্রেক্ষিতঃ কলকাতা ১২ জানুয়ারি)

লুকোচুরি তোরা খেলবিনা সেটা জানি,
সেটা হতে গেলে মনে শিশু হতে হয়;
নেশার ঘোরে করছিস টানাটানি,
নেশা কাটলে বুঝবি তা নিশ্চয় ।

যাঁদেরকে নিয়ে টানাটানি করছিস,
তাঁরা তোদেরকে বর্জন করেছিল ;
তোরা মানুষকে দাবার গুটি ভাবিস,
তাঁরা মানুষকে ভগবান বলেছিল ।

তোরা অন্ধ ক্ষমতা, ধর্ম-নেশায়,
এসব কথা মিথ্যে তোদের জন্যে
তোরা ব্যস্ত ভান-ভড়ঙের পেশায়
আখের গোছাতে উদয়-অস্ত হন্যে।

জয়দীপ চক্রবর্তী

চুপলিপি

রক্তমাংস হয়ে উঠে মদ,
প্রতিশ্রুতি জমে জমে শর্তের রুটি!

হেমন্তর ছায়াতলে ফুলেরা ঝরে যায় অভিমানে

দৃশ্যতা যেন আদর পেয়ে মাথায় উঠা বাঁদর
এরকম আবহে আমার খিদে পেতে শুরু করে!

গোটা শীত জুড়ে খিদে পায়।
মৃত্যুমুখি চোরা স্রোত ফড়িংয়ের মতো ছুঁয়ে যায়

 রক্তমাংস হয়ে উঠে মদ,
প্রতিশ্রুতি জমে জমে শর্তের রুটি... 

বিবেকানন্দ দাস

অনুসরণ

অনবসিত সন্ধ্যায় আজকাল 
একটি দীর্ঘ ঋজু রহস্যময় ছায়া
 
সড়কের আলোকসিক্ত মায়াময়তাকে মাড়িয়ে
 
আমাকে ছুঁয়ে হেঁটে চলে যায়
 
নৈঋতের নিস্তব্ধতার দিকে !

গতানুগতিক প্রাপ্তির কোলাহলকে এড়িয়ে 
আমার ইচ্ছে করে তার গন্তব্যাভিমুখী হতে -
 
তাকে স্পর্শ করে হাঁটতে !

এ রহস্যময়তার প্রতিচ্ছায়া আমি যেনো কবে 
কতবার দেখেছি - ঋতুবদলের গভীর রাতে
 
নক্ষত্রের বিচিত্র আন্দোলনে,
 
এক দীর্ঘ ঋজু ছায়া, আজকাল, হেঁটে চলে
 
অনন্ত পথে সম্মুখে আমার !

কাকে যে অনুসরণ করতে করতে 
আমাদের জীবনের দীর্ঘ সময় যায় কেটে,
 
এ জীবন তবু আজো কার অভিমুখী
 
ম্রিয়মাণ প্রৌঢ় গলিপথ, যৌবনদীপ্ত ফসলের মাঠ
 
অব্রুবাণ নদীতীর, কোন কৈশোরের বেলাভূমি,
 
কোন এক নিভৃত অতীশ
 
আমার সম্মুখে হেঁটে যায়
 
এইসব স্থাপত্যকে এড়িয়ে,
  
তাকে স্পর্শ করে হাঁটতে ইচ্ছে করে,
 
জীবন যে কি ভীষণ স্পর্শানুলোভী !

কার অনুষঙ্গে এতদিন চলে গেলো 
কার স্পর্শে উতলা হই আজো একান্ত সংলাপে,
 
ঝরা ফাল্গুনের দিনে
 
মানুষেরা কেন যে আবার
 
বালক হতে চায়,
 
আজকাল সন্ধ্যায় আমি কার যে অনুসারী
 
নিঃশব্দে হেঁটে যাই -
 
আত্মানুসন্ধানী নীরবতার দিকে !



দিশারী মুখোপাধ্যায়

শব 

আমাকে অপারেশন টেবিলে একটি রঙ 
প্রথমে মাথার চুলে বিনয় বিহীন প্রবাহ 
পড়ে সে কানে তালা কণ্ঠে অবাঙ হরমোন 
বোতাম চেন হুক যেখানে যা ছিল খুলেছে 
হাতে নিয়ে ছুরি ফর্সেপ 

' দশকের জীবনে আমি রঙটিকে
কয়েক হাজারবার দাঁতে কেটেছি চিবিয়েছি 
কুরথি কলাই 
ঢোঁক গিলেছি বারবার স্বাদ রস ফেনা সহ 
তবু রঙটি অক্ষত চিউয়িংগাম 

আজ সেই রঙটি আমাকে নিয়ে 
একটি নতুন অ্যাপ্সে 
আমি তার জানুর উপর 
বিক্ষত হিরণ্যকশিপু 


শংকর দেবনাথ

অণুকবিতা

অনুভবগাঁথা


তোমার শরীর থেকে টুপটাপ ঘাম ঝরে পড়ে--
ভালবাসা বীজধান ভিজে ভিজে অঙ্কুরিত হয়...


চলে যেতে যেতে আরো একবার ফিরে তাকানোর মতো-
বুকের গভীরে  রেখো কিছু ভুল - এঁকো কিছু নীল ক্ষত।


পাখিটির বুকে আছে যতটুকু নীড়,
তারও চেয়ে বেশী নাচে পরিযায়ী ভীড়


নদী ছোটে 'যদি' সুখে ফেলে রেখে চর,
ঘর থাকে একা ঘরে - মন যাযাবর।


পাখি জানে- বাসা করে কতটুকু আশা,
এবার একটু উড়ি, এসো ভালোবাসা।


নদীরও তো বুকে থাকে নূনের পিপাসা,
নিষিদ্ধ পথে হাঁটি- এসো না বিপাশা!


ঝরে পড়া ঘামে থাকে যতখানি ঘ্রাণ,
প্রেমের শরীর জুড়ে ততখানি প্রাণ।


তোমার শিরায় হাঁটে নিকোটিন ধারা,
কোথায় ঘুমোবো আমি? বিছানা সাহারা।


পথ আর ঘরে থাকে  সাঁকো যতটুক-
তার চেয়ে বেশি ডাকে নীলাভ চুমুক।

১০

কুয়াসার মতো কু-আশারা যত চারদিক ঘিরে থাকে-
তারই মাঝে তোরই তরীখানা খুঁজি ধোঁয়াশার বাঁকে বাঁকে।

১১

চারদিকে লোনাজল - মাঝখানে ভূমি
শ্বাসমূলে-ঠেসমূলে আমি আর তুমি---

১২

পাবক দ্রাবক হলে জীবন দ্রবণ
আমার অন্ধতাটুকু গন্ধপ্রবণ

১৩.
প্রেমের ভেতরে কিছু সেঁকোবিষ থাকে
রাত্রি ঘুমিয়ে গেলে চুপিচুপি ডাকে---

১৪

গৃহস্থ নিরুদ্দেশ- গৃহিণীর জ্বর
চৌকাঠে সারারাত বসে থাকে ঘর

 ১৫.
ঘরের মধ্যে ঘর - বুকের মধ্যে বুক জড়াজড়ি করে থাকে 
ছন্দভূক চোর তবু ঘরের মধ্যে ঢোকে ---

সম্পর্করা ক্ষয়কাশে ধোকে

১৬

মা তোমার সাদা থানে এত নীল খিলখিল করে 
আর তুমি মুরগীর খুপির মধ্যে তা দিচ্ছো ডিমে-

আমি পড়ে যাচ্ছি হিমে---


রূপক সান্যাল

ঢেউ

এক একটি বর্ণময় সকাল
কেমন নষ্ট হচ্ছে দেখ,
খুব জোর হাঁটছি, তবু
দাঁড়িয়ে আছি -- এ কেমন চলা ?
নৌকাটার না আছে দাঁড়, না আছে পাল
মাঝির আসনে বসে আছে
কয়েকটি পিঁপড়ে, অথবা আড়শোলা
  ... দাঁড় কাক
আমাদের একজন চালক চাই --
চালক ,
আর বড়সর একটা ঢেউ।


বচন নকরেক

বেভুল মনটা

টেনশন বেশি হ'লে রক্তচাপ
বাড়ে

আদা-কচুর আবাদ ক'রি
শব্দের বাগান আছে দু'একটা
কোথায় যে পড়ে থাকে বেভুল মনটা

চাষাবাদে অনভিজ্ঞ আমি।
তবুও চালাই জমিনে লাঙ্গল
খোঁড়াখুঁড়ি


সুজনা চক্রবর্তী

সনাতনী

অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় সে যখন --------
দাবানল বিভীষিকা অট্টহাস্যে উন্মাদপ্রায়,
গ্রাস করে বিরাটকে নিমেষে ,
চরাচরে হাহাকার ,
মৃত্যুর চরম দৃশ্যপট, হাপিত্যেশ ঝঞ্ঝাট,
তীব্র অনুপ্রবেশ ধ্বংসের জিঘাংসা , নষ্টের তমিস্রা ।
মেপে চলো, মেপে চলো পথ চাওয়াতে যাত্রী ,
মেপে চলো শৃঙ্খলিত জীবন পরিক্রমণ নির্দেশিকা ,
অমান্যের স্ফুরণ যে নিঃশেষ করে দিতে মূহুর্তে !
উষ্ণতা জীবনের প্রাণস্বরূপ -
পাগলপারা আবির্ভাবে মৃত্যু প্রহেলিকা সেওযে !
সুষম ছন্দে, তালে, লয়ে সঙ্গীত শ্রুতিমধুর -
বিঘ্নের সামান্যই বিনষ্টের বৈশাখী !
সব শেষ অকাতরে প্রচণ্ড শৈত্য সংবাদে !
অলিখিত চুক্তি স্বাক্ষর করে আমরাই ।
মুক্ত এই প্রকৃতিও নিয়মিত নিয়ম মেনে-
মিহি সুতো শৃঙ্খলে,
ছাড়পত্রের নূন্যতম চরম বিভ্রাটের বার্তাবহ !
সম্পর্ক সমীকরণও অলিখিত প্রতিশ্রুতি বন্ধন ,
অনিয়মিতে সংঘাত, সংঘর্ষ, সংকট !
মরে যায় চেনা সুর অচেনার সাপে নকুলে
ধ্বসে পড়ে বিশ্বাস নির্দ্বিধায় অকুলে ।
চিহ্নিত মাত্রাযোগে গল্পগুলো সুসংবদ্ধ
অন্যথায় ? হায়! সংহতি বিনষ্টে !
মেপে চলো, মেপে চলো পথ চাওয়া পথে, বাঁকে,
মেপে চলো ছন্দে, তালে, লয়ে, নির্দিষ্ট নিয়ম পাকে,
মেপে চলো পরিমিত বলয়ে নির্ধারিত চুক্তিতে,
অঙ্কের সামান্য ভুলের মাশুল --------- !
জীবন চক্রের নিয়মকানুন সাংঘাতিক !
লক্ষ্মণ রেখা অতিক্রমে হুমকিরা কট্টর ভীষণভাবে,
মেপে মেপেই চলছে জগৎ গণিতে, আনমনে ।।