বর্ষ ৭, সংখ্যা ১৭ - ভাষাদিবস বিশেষ সংখ্যা

এই সংখ্যার লেখকসূচিঃ প্রবন্ধ – শ্রীশুভ্র, রম্য গদ্য – তুষ্টি ভট্টাচার্য, দময়ন্তী দাশগুপ্ত ও শ্যামলী  -বন্দ্যোপাধ্যায়, গল্প – ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, কবিতা - রত্নদীপা দে ঘোষ, তৈমুর খান, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, বিজয় ঘোষ, মৃন্ময় চক্রবর্তী, শর্মিষ্ঠা ঘোষ, তপন মন্ডল, শৌনক দত্ত, দিশারী মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর দেবনাথ, নন্দিনী সেনগুপ্ত, চয়ন ভৌমিক, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, প্রীতি মিত্র, কাজরী তিথি জামান, অনুপম দাশশর্মা, মৃত্তিকা মুখার্জী চট্টোপাধ্যায়, অসিতবরণ চট্টোপাধ্যায়, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, সুবীর সরকার, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনাকী দত্তগুপ্ত, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, বর্ণালী বিশী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রূপক সান্যাল, মৌ দাশগুপ্ত। মিলি মুখার্জী, প্রশান্ত ভট্টাচার্য, সুচরিতা মুখোপাধ্যায়, পারমিতা চক্রবর্তী, সুনীতি দেবনাথ, আলি রেজা, চিত্তরঞ্জন সাহা, আফরোজা অদিতি, ওয়াহিদ জালাল, ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত, উত্তম বিশ্বাস ও মলয় সরকার ।

   সব লেখা পড়ুন - সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করে

সম্পাদকীয়


একুশের শিক্ষা

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’ । ‘একুশে’ - তিন অক্ষরের এই শব্দটা বাঙালির হৃদয়ে আবেগের দোলা দেয়, সামনে নিয়ে আসে মাতৃভাষার  মর্যাদা রক্ষায় বাহান্নর ভাষা আন্দোলন ও  মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদদের । স্বাধীন ভারতেও বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবীতে এগারো শহীদের আত্মদানের ইতিহাসও সমান শ্রদ্ধায় আমরা স্মরণ করি ।

কবিতা, গান ও নানান সৃজনশীলতার মধ্যদিয়ে আমরা একুশে পালন ও ভাষা-শহীদদের শ্রদ্ধাস্মরণ করবো এটা আমাদের দায় । সেই সঙ্গে একুশের শিক্ষাকে আত্মস্থ করাও আমাদের দায় । সংশয় হয় একুশের মূল শিক্ষাকে কি আমাদের জীবনে সত্য হয়ে উঠছে ?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আরো বেশি মাতৃভাষার ব্যহার, মাতৃভাষায় কথাবলার গর্ব-গৌরব আমার সন্তানদের কাছে হস্তান্তর করা এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে আরো বেশি মাতৃভাষার ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং নবীন প্রজন্মের মাতৃভাষায় কথা বলা গর্ব বোধ করা – এগুলিই একুশের শিক্ষা । একুশের সেই শিক্ষা আমাদের জীবনে সত্য করে তোলার মধ্য দিয়েই আমাদের একুশে পালন সার্থক হতে পারে ।

যাদের লেখায় অন্যনিষাদ ভাষা-প্রণাম সংখ্যা সমৃদ্ধ হয়েছে তাদের , অন্যনিষাদের পাঠকমন্ডলী ও সমস্ত শুভানুধ্যায়ীকে আমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন । একুশের শিক্ষা সত্য হোক আমাদের জীবনে ।


রত্নদীপা দে ঘোষ

যে ধ্রুবভাষাটি মিশে গ্যাছে শুকতারার কাব্যগ্রন্থে

যে ভাষায় বুক। দুধের পলিমাটি। মিষ্টান্নের সৌরসুধা

যে ভাষার অবয়ব ভোরের বুদ্ধ।তথাগত সন্ধেবেলা।
যে ভাষা দারুচিনি। নবীনা বনলতা।
যে ভাষার গহনায় নববধূর জ্যোতি আভা
যে ভাষার তালে তালে নাচ ধানস্বর মিঠেবোল

যে ভাষার কৈশোরকুঁড়িটি ব্যক্তিগত খুব ললিতরাগে যে ভাষার দরজাদুটি
জানালার অপেক্ষায়। কাশফুল ছুটি যে ভাষার রূপটান দিগন্ত
চিরতরুণী হিমালয় যে ভাষার পেন্সিল
বিহানের রোদ ছায়ার পাঠশালা

কাতর শঙ্খদুয়ারটি যে ভাষার প্রতি ছত্র মৃৎপত্রে আঁকা

যে ভাষায় মা মানে কাঁখে কলস লালপাড় একজন প্রান্তর
যে ভাষায় হাসির রঙ শালিখ কান্নার ওজন ক্রমশ ছলছলো

যে ভাষার বিদ্যুৎ গ্রহ আর বিগ্রহের আকাশ বৃষ্টি
মোহনায় ঘেরা। দেবতাদের গ্রাম।
যে ভাষার বাঁশী সঙ্গীতের অবয়ব।
গানের চন্দ্রমা মূর্ছনার পাখিতে অচেনা ছদ্মনাম

তৈমুর খান

একুশ তারিখ

গাছে গাছে কত ভাষার পাখি
ডেকে উঠছে সবাই আজ
আমরা ভালোবাসায় মাখামাখি
জেগে উঠছি ভাষার সমাজ

কত আলো ছড়িয়ে আছে
কত নামের ডাক
বাংলা জুড়ে সকাল সাঁঝে
তাঁরাই শোভা পাক

একুশ তারিখ ফেব্রুয়ারি
চোখে মুখে বিস্ময়
বিশ্ববাসী ভাসায় তরি
ঘোষণা করে জয়

একটি ভাষাই মাতৃভাষার
দীপ্ত অধিকার
সবাইকেই জানায় তার
কুশল সমাচার








বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

একুশের ঘরবাড়ি

যে ভাষায় মা বলে ডেকেছি প্রথম
সেই ভাষা আমার  ঘরবাড়ি
কান্না পেলে কীভাবে জানাবো বলো ?
বেদনাপর্বের নীচে শুয়ে থাকে অশ্রুর অক্ষর,সঞ্চিত কষ্টের গায়ে অনুতাপ লেখা
 মনখারাপ এবং বিষাদ লিপি হাহাকার যা শুধু আমারই ।

যে ভাষায় বাল্যকাল লিখি
নৌকা ভাসিয়ে দিই নদীজলে যে ভাষায় দুরন্ত আবেগ

ভেসে ভেসে স্মৃতিগুলি চলে যায় কিনারার দিকে
বৃষ্টি জমে আমার আকাশে  জমে ওঠে কত কথামেঘ

প্রেমপত্র লিখে ফেলা আপন শব্দেরা
জানে এই ঘরবাড়ি আমার একুশ
নিজস্ব মুক্তির জন্য আমরা শহীদ হই প্রতিদিন শব্দে শব্দে চিন্তার বিপ্লব ।
নিজস্ব মাটির জন্য নিজস্ব  ভাষার জন্য
গড়ে তুলি বাসগৃহ এবং নতুন কলরব।

শ্রীশুভ্র / গদ্য

শিক্ষার ভাষা ও মাতৃভাষা

কবি বলেছিলেন ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত। আমরাও তেমনই দেখতে পা বাংলাভাষা বাঁচুক না বাঁচুক আজ একুশে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অনেককেই এমন কথাও বলতে শোনা যায়, একুশ মানেই বাংলা ভাষা নয়। একুশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই এই দিনটি সকল ভাষারই। বাংলার একার নয়। অর্থাৎ তাদের মতে একুশে ফেব্রুয়ারীতে বাংলা নিয়ে লাফালাফি করার কোন মানেই নাই। বরং আজকের বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজির মতো আন্তর্জাতিক ভাষাটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন। আমাদের সন্তানসন্ততিদের ভবিষ্যত বাংলা ভাষায় নেই। সেই ভবিষ্যৎ একমাত্র ইংরেজি ভাষায় পঠনপাঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ এমনটাই মনে করে আজকের অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালিই। তা তিনি বাংলার যে প্রান্তেই থাকুন না কেন। যে ঢাকা শহর একুশের জন্মদাতা, সেই শহরেই সবচেয়ে বেশি ইংরেজি মাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয়। যে শহরে আধুনিক বঙ্গসংস্কৃতির প্রথম উন্মেষ, সেই কোলকাতাতেই সর্বত্র কোণঠাসা বাংলা ভাষা। যে বাঙালি ভাষা আন্দোলন করে সারা বিশ্বকে একদিন তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, সেই বাঙালিই আজ বাংলার উপর কোনভাবেই আর নির্ভর করতে রাজি নয়। জীবনের অধিকাংশ বিষয়েই বাঙালির একমাত্র নির্ভরতা ও আশ্রয় তাই আজ ইংরেজিভাষাতেই। আজকের একুশে পালনকে বুঝে নিতে হবে ঠিক এরই প্রেক্ষিতে। নয়তো সত্য থেকে স্বকল্পিত দূরত্বেই অবস্থান করতে হবে আমাদেরকেই।

ফরফর করে ইংরেজি বলতে না পারলে চড়চড় করে উন্নতি হবে না জীবনে। কাঁটাতারের দুই পারেই শিক্ষিত স্বচ্ছল বাঙালি অভিভাবক মাত্রেই এই এক মন্ত্র জপতে জপতে সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। ব্রিটিশদের ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই বিগত সাত দশকে এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আর সেই কারণেই উচ্চশিক্ষার দ্বার পর্য্যন্ত পৌঁছাতে, বিভিন্ন পেশাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার সুযোগ পেতে সন্তানদেরকে প্রাথমিক স্তর থেকেই ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলিতে ভর্ত্তি করানোর প্রবণতা প্রায় ক্যানসারের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সর্বত্র। আর জনসাধারণের এই প্রবণতাকেই মূলধন করে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে অর্থলগ্নী করে অতিরিক্ত মুনাফা করে নেওয়ার সুযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ব্যবসায়িক মহল। ফলে যা হওয়ার ঠিক তাই হয়ে চলেছে কাঁটাতারের উভয় পারেই। পড়াশুনোর থেকেও, শিক্ষিত হয়ে ওঠার থেকেও, স্বাধীন মেধার নিরন্তর বিকাশের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইংরেজি ভাষাটাই। এই ভাষাটায় শক্তিশালী হয়ে ওঠাটাই জীবনের সকল সাফল্যের চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলার সমাজবাস্তবতায়। আর এরই হাত ধরে মধ্যমেধার চর্চা হয়ে চলেছে নিরন্তর। একটি দেশের পক্ষে একটি জাতির পক্ষে এ এক ভয়াবহ অবস্থা। অনেকই বলবেন তা কেন? ইংরাজি এখন গ্লোবাল ভিলেজের ভাষা। আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে গেলে, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে ইংরাজি ছাড়া কোন গতি নাই। হ্যাঁ, ঠিক এই কথাটিই নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্কে আমূল ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সেই দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন অভিভাবক থেকে বুদ্ধিজীবী সবাই। আমাদের বাংলায় এটাই আর এক মস্তবড়ো অভিশাপ। কেউই মূল দিকটার দিকে মনোনিবেশ করছেন না। ইংরাজি শেখা না শেখার উপরেই যদি একটি দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হতো, তবে সারা পৃথিবীতে একটি মাত্র জাতিই উন্নতি করতো। কিন্তু তাতো নয়। ইংরেজীর চর্চা না করেও আবিশ্ব বহু জাতিই উন্নত বিশ্বের দরবারে আত্মমর্য্যাদায় অধিষ্ঠিত।  আসলে, ভাষা নয়, ভাষার থেকেও বড়ো বিষয়, মাতৃভাষা। সেই মাতৃভাষার যথাযত চর্চা ছাড়া কোন জাতিরই উন্নতি সম্ভব নয়। বিদেশী ভাষায় লেখাপড়া করাই যায়। প্রকৃত শিক্ষিত হতে গেলে, নিরন্তর মেধার চর্চা জারি রাখতে গেলে মাতৃভাষার কোন বিকল্প হয় না। এই পরম সত্যটি যে যে জাতি অনুধাবন করতে পেরেছে, আজকের উন্নত বিশ্বের দরবারে তারাই আত্মমর্য্যাদা অধিষ্ঠিত। আমরা বিগত দুই শতাব্দির আধিক সময় ধরে নিরন্তর ইংরেজি ভাষার দাসত্ব করেও উন্নত বিশ্বের ধারে কাছে আজও কেন পৌঁছাতে পারলাম না, এই হলো তার মূল কারণ। আজ সারা বাংলা জুড়ে যত স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষায় পঠন পাঠনের ব্যবস্থা জারি আছে, খোদ ইংল্যাণ্ডেও বোধ করি তত নাই! তাহলে আজও আমরা ইংল্যাণ্ডের থেকে; জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা থেকে, ব্যাবসা বাণিজ্য থেকে, উন্নত জাতি ও সমাজ গঠনের সকল বিষয় ও পরিকাঠামোতে প্রায় এক শতাব্দী পিছিয়ে আছি কেন? আসলে ন্যূনতম আত্মমর্য্যাদা সম্পন্ন জাতি হলেই এই প্রশ্নগুলির সম্মুখীন হতে হতো আমাদেরকে। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড়ো সুবিধা, আমাদের আর যাই কিছু থাক বা না থাক, আমাদের আত্মমর্য্যাদা বোধ শূন্য। আমাদের আত্মমর্য্যাদাবোধ আর্থিক ও বংশগত কৌলীন্যে সীমায় বাঁধা। এর বাইরে স্বজাতি ও স্বদেশের সাথে ব্যক্তিগত আত্মমর্য্যাদার গভীরতম সম্পর্কসূত্রটি বাঙালিমানসে কোনদিন জায়মান ছিল না। আজও নাই। ভবিষ্যতেও যে থাকবে তার কোন ক্ষীণসম্ভাবনাও নাই।

একটি জাতির দুই একজন বা কোন একটি দুটি শ্রেণীর মানুষ বিদেশী ভাষায় পণ্ডিত হলেই জাতির সামগ্রিক উন্নতি সম্ভব হয় না আদৌ। জাতির উন্নতি নির্ভর করে সমগ্র জাতির অধিকাংশ জনসাধারণের জনসম্পদে পরিণত হয়ে ওঠার উপরেই। আর জনসাধারণের জনসম্পদে পরিণত হয়ে ওঠা নির্ভর করে সার্বিক শিক্ষার প্রসার ও বিস্তারের উপরেই। এখন যেকোন দেশের সার্বিক শিক্ষার প্রসার ও বিস্তার, ইতিহাসের কোন কালেই কোন বিদেশী ভাষার দ্বারা সাফল্যের সাথে সম্পন্ন হয় নি। হতে পারে না। কারণ সেটি প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ। মানুষ, যত যাই কিছু করুক, প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে কোন কাজেই সামগ্রিক মঙ্গল সম্ভব নয়। আর সেই কারণেই বিগত দুই শতকের বেশি সময় ধরে এই বাংলায় নিরন্তর ইংরেজি ভাষার চর্চা করেও ফরফর করে ইংরেজি বলে জীবনে চড়চড় করে উন্নতি করেও বাঙালি জাতির সামগ্রিক কোন উন্নতি সম্ভব হয় নি। এটাই বাংলা ও বাঙালির দুর্ভাগ্যের জলন্ত ইতিহাস। আমরা ভুলে যাই, সমাজের বিশেষ কয়েকটি শ্রেণীর উন্নতি মানেই জাতির উন্নতি নয়। আমরা ভুলে যাই কজন বাঙালি ফড়ফড় করে ইংরাজি বলতে পারলো, তাতে করে বাঙালির আত্মমর্য্যাদার বৃদ্ধি হয় না। আমরা ভুলে যাই, জাতির অধিকাংশ জনগণের সার্বিক শিক্ষার হারের গুণগত অবস্থার উপরেই একটি জাতির উন্নতি নির্ভরশীল। কোন একটি বা দুইটি শ্রেণীর শিক্ষাদীক্ষার উপর নয়। অনেকেই এখন বলতে পারেন, বেশ তো। না হয় মেনেই নেওয়া গেল এই যুক্তি। জাতির সার্বিক শিক্ষাদীক্ষার উন্নতিতে তাহলে ইংরাজি ভাষায় পঠন পাঠনে অসুবিধা কি? বরং সমগ্র জাতিই যদি ইংরেজিতে সড়গড় হয়, তাহলেই তো বিশ্বসভায় আমরাই সবচেয়ে উন্নত হয়ে উঠবো। মূল কথা তো শিক্ষার সার্বিক বিকাশ। সেটি ইংরেজির মতো একটি বিদেশী ভাষায় হলে তো সোনায় সোহাগা। আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলা ও বাঙালিরই তাতে সম্মান বৃদ্ধি পাবে। হ্যাঁ, দুর্ভাগ্যের হলেও এটাই সত্যি যে অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালিরই এটাই মনের কথা। আবেগের কথা। অন্ধবিশ্বাসের কথা।

এই যে অন্ধবিশ্বাস, এর উৎপত্তি কিন্তু দুই শতাব্দীর অধিক সময় ব্যাপী ব্রিটিশের অধীনস্ত থাকা। শাদা চামড়ার উপর আমাদের যে অন্ধমোহ, সেই অন্ধমোহেই ব্রিটিশ চলে গেলেও আমরা তাদের ভাষা আদব কায়দার দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারিনি বলেই, আমাদের এই ধরণের মতিগতি। আমরা এই দাসত্বের মধ্যে থাকি বলেই গোড়ার কথাটাই অনুধাবন করতে পারি না কিছুতেই। সেটি হলো, ইতিহাসের পাঠ। মানুষের ইতিহাসে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নতিতে বিদেশী ভাষার দাসত্বের আদৌ কোন ভুমিকা থাকে কিনা, এই সামান্য তথ্যটুকুও খতিয়ে দেখার মতো স্বাধীন মনোবৃত্তিটুকুও তৈরী হয় নি আমাদের। চুষি কাঠি ছেড়ে এ ফর অ্যাপেল বি ফর ব্যাটমুখস্থ করতে করতে সেই শক্তি তৈরী হওয়ারও কথা নয়। হয়েও নি। আর হবেও না। আজকের উন্নত বিশ্বের যে কোন দেশের উন্নতির ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পাবো: না কোন দেশই তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোন বিদেশী ভাষায় পরিচালিত করে নি। কোনদিন। আর ইউরোপের উপনিবেশের দেশগুলিতে যেখানে নিরন্তর বিদেশী ভাষায় স্বদেশী শিক্ষা বিস্তারের পরিকাঠামো চালু আছে, সেই দেশগুলির একটিও উন্নত বিশ্বে আজও স্থান পায় নি। যে কোন জাতির উন্নতির মূলে থাকে শিক্ষার সার্বিক বিকাশ। শিক্ষার সার্বিক বিকাশেই মনুষ্যত্ব গড়ে ওঠে। মেধাসম্পদের স্বাধীন বিকাশের সকল অভিমুখ খুলে যায়। আর তখনই একটি দেশের জনসাধারণ পরিণত হয় জনসম্পদে। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে কোথায় কোন কালে শিক্ষার সার্বিক বিকাশ কোন বিদেশী ভাষার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে?। প্রতিটি উন্নত জাতির সমাজবাস্তবতায় শিক্ষার সার্বিক বিস্তার দাঁড়িয়ে আছে তার মাতৃভাষায় শিক্ষার পরিকাঠামোর ভিতের উপরেই। এই সরল সত্যটুকু শিক্ষিত বাঙালির চেতনায় ধরা পড়ে না। কারণ একটিই, শিক্ষিত বাঙালির শিক্ষার ভিতটাই নড়বড়ে, বিদেশী ভাষার ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটলে স্বাধীন চেতনা গড়ে ওঠে না। তখন সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলে বোঝার শক্তিও তৈরী হয় না। বাজার ও মিডিয়া যা বলায়, এ বি সি ডি মুখস্ত পণ্ডিতও সেটাকে স্বতঃসিদ্ধ মনে করে তাই বলে, পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ উত্তর লেখার মতো করে। একটি বিদেশী ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের ভিত্তিই হলো মুখস্থ করার অভ্যাস। শিক্ষার্থী সেখানে প্রশ্ন করার অবকাশই পায় না। সে জানে সবটাই তাকে মুখস্থ করে নিতে হবে। নয়তো সে পিছিয়ে যাবে বাকিদের থেকে। আর মুখস্থ করার এই ভয়াবহ পরিণতি কারুর মধ্যেই স্বাধীন চিন্তা করার সামর্থ্য তৈরী করে দিতে পারে না। যে কোন দেশের কায়েমী স্বার্থভোগী শাসকগোষ্ঠীর কাছে এর মতো সুন্দর ও নিশ্চিন্ত অবস্থা আর হয় না। তাই ব্রিটেশ চলে গেলেও ব্রিটিশের কাছ থেকে ক্ষমতার মৌতাত ভোগের অধিকার পাওয়া শাসকগোষ্ঠীর মানুষ কখনোই চাইবে না, দেশের সকল মানুষের মধ্যে স্বাধীন চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটুক। এবং ঠিক সেই কারণেই, আজকে সারা বাংলা জুড়েই শিক্ষার পরিকাঠামোকে ইংরেজীর উপর নির্ভরশীল করে রাখার সার্বিক ষড়যন্ত্র কাজ করে চলেছে নিরন্তর। এই ষড়যন্ত্রের একদিকে রয়েছে, ইংরেজী জানা মধ্যমেধার মুখস্তবিদ, যাদের চিন্তাভাবনাকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ও শাসন ও শোষণের কাজে তাদের মস্তিষ্কগুলিকে সুনিপূণ দক্ষতায় কাজে লাগানো যায়। আর এক দিকে রয়েছে ইংরেজি না জানা বৃহত্তর জনসাধারণ। যাদের শ্রমকে অতি শস্তায় নিঙড়িয়ে নিয়ে শোষণ ও বঞ্চনার নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমকে নিশ্চিন্তে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ফলে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে কোন একটি বিদেশী ভাষার উপর নির্ভরশীল করে দিতে পারলেই ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির পক্ষে সোনায় সোহাগা হয়। আমাদের বাংলায় ঠিক এইটাই ঘটে চলেছে।

তাই আমাদের বাংলায়, এই যে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারের কয়েক শতাব্দীব্যাপী ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে; তাতে করে আর যাই হোক উন্নত বিশ্বের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারবো না আমরা কোনদিনই। সেই বাস্তব সত্যটুকু যতদিন না আমরা জাতিগতভাবে স্বীকার করবো ততদিন, আমাদের দেশ উন্নত বিশ্বের ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাবে। আর আমরা কে কত ইংরেজিতে পণ্ডিত সেই হিসাব মিলিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে থাকবো, নিতান্তই অশিক্ষিত মূর্খের মতোই।


বিজয় ঘোষ

বর্ণমালা

                      ১

কালো কলো বর্ণমালারা পিঁপড়ের সারির মতো হাঁটছে
মৃত্যুর দিকে
কোনও একদিন অসংখ্য বর্ণমালায় শিশির ঝরে পড়তো

আকাশের তারায় সাদা অক্ষরেরা বসবাস করে মৃত
ফড়িঙের মতো

                     ২

একটু দাঁড়িয়ে যাও
অক্ষরগুলি তোমাকে ডাকছে

'মা'-কে মা বলে ডাকবে না

                   ৩

অভিধানের বর্ণমালা নৈঃশব্দ্যে ডুবে আছে
ঈশ্বরের শপথ কোনও শব্দ আমার ক্রীতদাস নয়

মৃন্ময় চক্রবর্তী

ভালোবাসার ভাষা

সকালবেলায় ডাক দিল যে 
পরম হাওয়া
পথজোড়া তাই ফুলের গন্ধ
কুড়িয়ে পাওয়া।
হাত বাড়ালো, বলল এসে
ভালোইবাসি
বুকসাগরে টলমলালো
কান্নাহাসি।
সেই হাওয়া ঠিক মেঘ নামালো
বিকেলবেলায়
হাওয়ার দাপট একটিবেলার
পুতুলখেলায়।
ফুরিয়ে গেল বসন্ত ঠিক
আসার আগেই
ঝাপটা এসে ধাক্কা দিল
প্রাণপরাগে।
ভালোবাসার ভাষায় ছিল
খুঁতের ক্ষত
দেখতে ছিল ঠিক যদিও
ফুলের মত।
যত্নে থাকুক শীতজীবনের
হিরণ্যভুল
স্মৃতির ডালে দুলুক দুলুক
অশ্রুশিমূল।


শর্মিষ্ঠা ঘোষ

কথাবিজয়

খুব শীতে কথা ভেঙ্গে যায়
এলোমেলো অক্ষরে ইকেবানা বানাই
আভিধানিক হয় না বাহুল্য বোধে
এমনি এমনি ছুটি সেদিন
বানিয়ে নিই কমজোরি বাহানা
বাহানা জমতে জমতে নীরবতা পেয়ে বসে
বরফ পড়ছে মেরুদেশীয় ভাবনায়
মেরু মানেই সম্মানজনক দূর
এটা কিন্তু অভিধান সম্মত
কেউ কেউ তখন ফাল্গুনী মদে গ্লাস ভরছে
কেউ কেউ তখন কুড়োচ্ছে পলাশ শিমুল
কুড়োনো তো আসলে উড়িয়ে দেবার ছুতো
কথাদের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে
কথারা নাভিদেশে খুঁজে বেড়ায় শেকড়
নাড়িতে জড়ানো আছে "মা " ডাকের আপন
সবাই ঠিক বুঝে যায় সে ডাকের ধ্বনি আর স্বর
জড়িয়ে যায় মায়াবী নরম আদরে
কথা ফোটে বোলে চালে রঙে ছন্দে
আহ্লাদিত কথাবসন্ত আসে মেরুদুর্গ জয় করে
সে আগ্রাসনে গলে যায় অভিযোগ অভিমান
সে দুর্বার জয়পতাকা তলে আমাদের রাস্তা এবং ঘর