৭ম বর্ষ ২২তম সংখ্যা ৩১মার্চ ২০১৮

এই সংখ্যায় ২৮টি কবিতার লেখকসূচি - জয়ব্রত বিশ্বাস, রেজা রহমান, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, বর্ণশ্রী বক্সী, অনুপম দাশশর্মা, জ্যোৎস্না রহমান, জয়া কুন্ডু, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শঙ্কর দেবনাথ, শাশ্বতী ভট্টাচার্য, সুতপা সরকার, কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী, অরুণ সেনগুপ্ত, আকাশ সৎপতি, কাজরী তিথি জামান, সুতনু হালদার, তুলসীদাস ভট্টাচার্য, পদ্মাবতী রায় ছৌধুরী, জয়া ঘটক, যাজ্ঞসেনী গুপ্ত, জয়তী দাস, বচন নকরেক, মনোজিৎকুমার দাস, উত্তম বিশ্বাস, শুক্লা মালাকার, মহম্মদ জসীম ও মনোজ ভৌমিক ।
               সব কবিতা পড়তে সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

জয়ব্রত বিশ্বাস

কাকাচার

গুছিয়ে উঠতে পারে না অনেকেই ইহকাল

হাতে কোনো শিল্প নেই
ভাবনায় গড়ে ওঠে না মাধুরী
নিতান্ত গরজে স্থূল খড়কুটো কুড়িয়ে  
বাসা বানাতে চায় এক কাক

কিছুতেই গুছিয়ে উঠতে পারে না ইহকাল   
ভিজে যায় বর্ষাদুপুর
সন্তানেরা কখনো বেড়ে ওঠে পরের জিম্মায়   
মৃতজীবিতায় শুদ্ধ মাটি ও বাতাস

সৌখিন বিলাস ফেলে এসে
উঞ্ছবৃত্তির তালিকায় নথিভুক্ত হ'য়ে 
               আজও থেকে যায় সমাজবন্ধু ।

রেজা রহমান

অভ্যুদয়

অনিদ্র পলাশ পোড়া চোখ দুটো চোখের কোটরে
কেবলই ঝিমোয় বসে রাটি যে করে না সাত চড়ে।
হাজার একটা প্রশ্ন একটা জবাব যদি পাই
সমস্ত অঞ্জলি মা গো তোমার পায়েই রেখে যাই।
অত্যাচার নির্যাতন গুমখুন অপমৃত্যুশোক
ঘরে ঘরে পুনর্বার উথ্বানের উৎসশক্তি হোক।

জিজ্ঞাসা জবাব দুইই হোক সৃষ্টিশীল ও মৌলিক
অভয় সে মুক্তিমন্ত্র উচ্চারিত হোক চতুর্দিক।
উপদ্রুত বিহঙ্গম তোমার আমার কন্ঠস্বরে
অমৃত তৃষ্ণার গান গীত হোক প্রতি ঘরে ঘরে।
নষ্ট হৃতসর্বস্বতা অবশিষ্ট অস্তিত্বের দেনা
তোমাকে ফিরিয়ে দিতে চাই মা গো তুমি কি নেবে না?
মুক্তিপতাকাবাহী মানুষের হোক অভ্যুদয়
জয় হোক মানুষের স্বাধীনতা সমতার জয়।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

অমলিন সকালেরকথা


রাস্তা বসে আছে পাশে কণ্ঠস্বরের
জলের কাছাকাছি নয়ন
শব্দের অস্পষ্ট ভঙ্গিমা আলো ডাকছে

সমুদ্র নিয়ে শুয়ে আছি রাতভোর


 নীরবতার ভিতর জমে উঠেছে কুয়াশার দুধ
 কে কাটবে কে কাটবে ভেবে পাখিডানা কেটে জল পড়ে
 রাধাপিসীদের বাড়ি সাদা রঙ
 কারা ডালিম ছুঁড়ে যায়
 মৃদু সরোদ বেজে ওঠে

পোড়া দুধের গন্ধে নড়ে ওঠে পাড়া

বর্ণশ্রী বক্সী

ভোরের স্বপ্ন
  
জীর্ণ পাতার গায়ে লেখা আছে
যে দিন চলে গেছে তার ইতিহাস 
সূর্য উদয় আর অস্ত্র কড়া প্রহরায় 
পাতা ওল্টানো সাদা কাগজের,
চলে যেতে যেতেও যে নদীটি 
গুণ গুণ গান গেয়ে গেছে
ম্লান হয়ে আসা চাঁদের আলোয় 
লেখা থাকে পূর্ণ জ্যোৎস্নামাখা 
অপরূপ সৌন্দর্য আর মায়াবী রঙ!
যে দিন  অতিক্রান্তির রেখায়
তার কাছে নতজানু হই
ভোরের স্বপ্ন আঁকি দু'নয়নে ।


অনুপম দাশশর্মা

অপরূপ যাতনায়

দুটি সচেতন মন এক হয়না কখনও
যদিওবা ঝড়জল বয়ে যায়
প্রতিটি মাথায় মাথায়

একান্তে বিনিময় হয়না নিজস্ব দিনান্ত
সন্ধে হলেই ঘিরে ধরে
গোটা পৃথিবীর দুঃখের কবিতা
ভেসে যায় শুদ্ধ-ইচ্ছেগুলি দুরূহ সম্পর্কের
জলোচ্ছ্বাসে

তবু নির্মোহ হোক জীবন।
ঢেউ ও বালি সরিয়ে এগোক অক্ষর-বেদ
কিছু চিহ্ন স্থায়ী হোক বিধুরবেলায়
অপরূপ যাতনায়।

জ্যোৎস্না রহমান

অন্ধকারে আলোর খোঁজ

পতিতালয়ে মেয়েটির দেহের ভাঁজে জ্বালানো আগুনে পলাশ পুড়ে ছাই
ঠিক যেমন শহুরে আলোর পায়ের নীচে
পিষে মরা জ্যোৎস্না।

রোদের শামিয়ানায় লোডশেডিং রঙের সুতোয় বোনা
 সুক্ষ্ম রিফুর মত মেয়েটির মন;
আঙুলের স্পর্শে খুলে গেলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।
ভিজিয়ে দেওয়ার আহ্বান
জানলায় দোল খাওয়া জলের ফোঁটার মত পবিত্র।

 চাঁদের কলঙ্কে তর্জনী রেখে
পূর্ণিমার মাদকতায় ডুবে যাওয়াই ধর্ম।

অমাবস্যার গাঢ় আঁধার
প্রেমময় চোখে কাজল টেনে দিলে
দৃষ্টির টলটলে দীঘিতে প্রতিফলিত হয়
আলোকচ্ছটা
যাকে ছোঁয়ার জন্য
একটি লোডশেডিং মুহূর্ত চাই।

জয়া চৌধুরী

ডিপ্রেশন

ডিপ্রেশন তোমাদের হয় শুনি কবি
সে পরম অবসাদের রিডে পা ফেলতে ফেলতে
গমগমিয়ে গেয়ে উঠে ঠাটবাট
ডিপ্রেশন জুড়ে অমোঘ ফাঁকা ঘর গুহা জানলাহীন
কেউ বা কুড়িয়ে নেয় কালোজিরে কাঁচালঙ্কা কাজলির
ঝোল
লেখকের নির্জনতার আশীর্বাদে উড়িয়ে পুড়িয়ে দেয়
নোনতা হাওয়া
জলে মুখ ভিজে যায়। জিভে স্বাদ নেই তবু করোটির
জিভে ডিপ্রেশনের বড়ি বাহিরে আনে  সৃষ্টি কারোও বা
কবিতা
নির্মাণের নেশা যার নেই
ডিপ্রেশন থোড়াই তার সাঞ্চো পাঞ্জা
এবং লিকলিকে বুড়ো রোসিনান্তে
ডিপ্রেশন আসলেই স্বাদু সাধু
রাম ও পেঁয়াজির ককটেলখানা


জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

শুদ্ধিকরণ

চৈত্রের বিষণ্ণ সকালে একটি বৃষ্টিদিন ফুটলে
বুঝি,দরজায় মরুভূমি উঁকি দেয়.....

অনেক কষ্টের ফসল তোলা ঘরে
তুমি তো দিব্য ঝুলিয়েছো অপ্রবেশ্যলিপি।
অভিমান আগুনে পোড়া মাটিও জানে
খলতার কড়াইয়ে ভাজা এক আস্ত মাছ
এখন ধর্ষকের দলে।
মুখ ফেরানো মায়ের শ্বাসে যদি আসে চৈত্রঝড়
নাঠিকানার দেশে পাঠায় যত আবর্জনা......



তবে আমি সেই নির্মল মাটিতে বুনে দেবো
সততার অজস্র শস্য
মায়ের শুকনো মুখে ঝরনাজল এনে দেবে
স্বস্তির আশ্বাস।
আবার জীবনসংকেতে অজস্রক্লোরোপ্লাস্ট
নাচবে ভরতনাট্যম।


শংকর দেবনাথ / দুটি কবিতা

চতুর্দশপদী

ইশারা

তোমার ইশারা নামে মহাশুন্য থেকে
যেখানে প্রত্যহ চলে নদী নদী খেলা
গর্ভ থেকে ফুল ফুটে মৃত্যঘ্রাণ মেখে
ভালবাসা হয়ে জ্বলে আকাশবেলায়
সেখানে আমাকে তুমি ইঙ্গিতে দেখাও
সমুদ্রশরীর ভাসে নদী বুকে ধরে
পথের গোপনচিত্র আমাকে শেখাও
শক্তির নিত্যতা এঁকে অনিত্য আঁচড়ে
তোমার চোখের মধ্যে সসীমে অসীম
নীড় বেঁধে অহরহ ওম্ দেয় ডিমে
আর আমি পুড়ে পুড়ে জ্বলে উঠি হিমে
তুমি হাসো কক্ষকেন্দ্রে- আমি তারা খসি
জ্যামিতি বুঝিনি বলে আমি বারবার
ভুল করে ফেলি পথ - ঠিকানা তোমার

ঘরে ফেরার মন্ত্র

যতখানি পথ ভেঙে এসেছি তোমার কাছে আমি-
তারও চেয়ে বেশি জ্বর ইছামতী নদীর শরীরে
রাত ক্রমে রজঃস্বলা হয়ে এলে হিমে হিমে ঘামি
নক্ষত্রকন্যার চোখ নেমে আসে ঘরে ধীরে-ধীরে-
কেমনে তোমার শাড়ি পাল হয়ে রূপসায় ভাসে-
বুঝে উঠবার আগে কৈলাসের শিব পার্বতীকে
দক্ষযজ্ঞে হঠাৎ হারায় আর পৌরাণিক গাছে
কামসূত্র লিখে প্রেম হেঁটে যায় শ্মশানের দিকে-
আমাদের এইসব চেনা চিত্রকল্প ঘিরে ঘিরে
বিজারন সুখ খেলে - তাবৎ শুন্যতা চিরে চিরে
পর্বতের ঘরে তুমি জন্মান্তর প্রেম লিখে লিখে
শুয়ে থাকো দূরে কোনো প্রেইরী কী সাভানার ঘাসে
এরপরও পার্বতীর লাশ কাঁধে উন্মাদ কবিকে
ঘরে ফিরবার মন্ত্র কে শেখাবে এই মলমাসে-


শাশ্বতী ভট্টাচার্য

শিকার

সভ্যতার মানচিত্রে বাঘ ঢুকে গেলে
আমরা সবাই কেনেস্তারা পেটাই,
বল্লম, বর্শা, বন্দুক নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে
আমাদের সহজাত হিংস্র শ্বাপদ আর
অন্তর্জাত দাম্ভিক শিকারীরা...
তারপর একসাথে আদিম অনাবৃত উল্লাসে
তার ছাল ছাড়িয়ে সিংহাসনে পেতে
বলিষ্ঠ হতে থাকে
রাজসুয়ো গণতন্ত্রের শেকড়...

সময়ের শিরা বেয়ে রাত নেমে এলে
আমাদের নরম হাত লোমশ হতে থাকে,
পাঞ্জা শক্ত হয়, নোখ ধারালো হয়,
লকলকে জিভ বের করে আমরা
মানচিত্রে ঢুকে পড়ি ।
বল্লম, বর্শা, বন্দুকের শিরদাড়া
নটেগাছের মত মুড়িয়ে আমরা গল্প শেষ করি ।
তখন কেউ কেনেস্তারা পেটায় না...

শুধু এমন দিনে বাতিওয়ালার বাজারে রমরমা ।
মোমবাতি চড়া দামে বিক্রী হয়
সর্পিল দেওয়াল মোড়া ঘরে,
রঙিন বোতলে ভরা ক্ষুধাতুর রাতে...

জানলায় ঝুলে থাকা পূর্ণিমার চাঁদটির সাথে ।।

সুতপা সরকার

চৈতালী

চৈত্র সূর্য্য এবার পৃথিবীর করতলে
খুলে যাক আমার বুকের কবাট
পুড়ে ছাই হয়ে সে অনলে
সন্ন্যাসী  আমিকে মুক্তিদিই নিপাট---

যত বক্ষোজ  মোহ
দগ্ধ তাপে ঐচ্ছিক  সমর্পিত
মাটি মালসার অনুগ্রহে
কাঁটার পদচারনে আগামী দীক্ষিত--

আমি আর কারো নই অধীন
ত্র‍্যহস্পর্শী পিরামিডে আত্মদান
আগামী সংক্রান্তির  গাজনে
আমার চৌচির বুক সন্ন্যাসে উত্থান--

গভীরতম সংসার সন্তরণে
ফলাফলে   ক্লিশপ্রতিদিন,
অসার যাপনের তিমির সমর্পণে
সন্ন্যাসী বল্কলে উত্তরণ--

আমি আর আমি নই,কাদামাটিতাল
গেরুয়া আমার উত্তরীয়
স্বচ্ছ সলিল নির্মল
বিভাজিত স্বত্তায়,নির্ভীক অদ্বিতীয় ----


কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী

এটুকুই চাওয়া

মরতে চাই না আমি অপঘাতে,
       কিম্বা কোনো জটিল অসুখে!
এটুকু আমার চাওয়া,তাই আজ,
       এখানেই তুলে রাখি টুকে
আমার নয় শুধু, তোমার
       সবার মনের বাসনা,
পাখি তো উড়েই যাবে,নির্বিঘ্নে
      যাক,এই হোক উপাসনা!
এভাবেই একদিন, পাখি উড়ে,
       যাবে অনির্দেশ্য ঠিকানায়...
ঝরুক শান্তিবারি সেই পথে,
         কেউ যেন আঘাত না পায়!

অরুণ সেনগুপ্ত

শিকার 

শিকার হয়ে গেলে
শিকারি উৎসবে মাতে 
কয়জনা জুটিয়ে সাঙ্গাত
আগুন জ্বালিয়ে রাত্রি নেভায় 
সকালে ছাই 
রক্ত আর্তনাদ ধোঁয়া কুয়াশা মাখামাখি 
ছাপার অক্ষরে লেখা বর্ণমালা 
চোখের সামনে দুলে ওঠে আততায়ীর শব 
শব্দ ব্যবছেদ 


শিকার যেমনই হোক , রক্তপাত বিনা 
লুকিয়ে গোপন অপমান অথবা ঘৃণা । 


আকাশ সৎপতি

মিলনের দিনে 

আজ মিলনের দিন 
দূর্বা-আতপে ভরে গেছে উঠোন 
ছিটকে বেরোচ্ছে ভালোবাসার ওম ....., প্রশান্তি 
মেঝেতে লক্ষ্মীর ছাপ ;
জ্বলছে সম্পর্কের আদিম হ্যারিকেন 
হৃদয়ে শুধুই রুবিক্সের আনাগোনা ,
পিরামিডের আকৃতি বদল 
একটু পরই হঠাৎ বিস্কুট মাখা সব রোদ নিভে গেল .......
এরপরই এই স্থানে উড়ে বেড়াবে 
সম্পর্কের পুরাতন ছাই-এরা !



কাজরী তিথি জামান

আজ নয়

বলে দেবো একদিন প্রেম কী,
কখন হয় ,হবে বা কবে
তবে, আজ নয়।

আজ কথা হোক
যেমনটি হচ্ছে।আজ এই সময়,
কী দরকার প্রেম কী জানবার!

বলে দেবো একদিন, বর্ষাহীন
সরল বৈশাখে বৃষ্টির আশায়
চাতক চোখে কে বলেছিল,"বড্ড গরম , পু'ড়ে যাচ্ছে চারদিক"

পু'ড়তে পু'ড়তে ঝড় উঠেছিল ,
ঝড়ের সাথে ঝড় মিশে বৃষ্টি নেমেছিল ঘরে,শহরে,
কার্ণিশে, ধমণী-শিরায়

আবার কোনদিন পু'ড়তে চাইলে,
বৃষ্টি ভিজে লিখে দেবো 'বদনাম'
কখন হয় , হবে বা কবে....

তবে আজ নয়; আজ এই সময়
কী  দরকার  প্রেম কী জানবার!