৭ম বর্ষ ২৬তম সংখ্যা ৩০ এপ্রিল ২০১৮

এই সংখ্যায় ২৪টি কবিতার লেখকসূচি - দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, অলক বিশ্বাস, ইন্দিরা দাস, বিদিশা সরকার, রাজর্ষি ঘোষ, জয়া চৌধুরী, অদিতি শিমুল, সুতপা সরকার, চিরশ্রী দেবনাথ, সুবীর ঘোষ, জ্যোতির্ময় মুখার্জি, বচন নকরেক, সকাল রায়, অভিষেক ঘোষ, দেবাশিস কোনার, সুতনু হালদার, গৌতমকুমার গুপ্ত, স্বরূপ মুখার্জী, অপর্ণা বসু, শ্রী সেনগুপ্ত, শুক্লা মালাকার, বনশ্রী মিত্র, সুদীপ ঘোষাল, শুভাশিস দাস ।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

মে 'দিবস

ভাঙাচোরা বাড়ি আর ছেঁড়া কাঁথা খাট
পেয়ালায় গরম চা
মাঝে মাঝে অশ্লীল চাঁদ ঢুকে পড়ে
ছাদহীন গ্রীষ্মের চানঘরে
ধরা জলে সে কী তুমুল
শান্তি নামে গা র পথে পথে
বাবুজী ধীরে চলনা
গমণের পথে কেউ রেডিও চালায়
তেরঙ্গা নামে জানালা বেয়ে
যে রাস্তায় শ্রেণীসংগ্রাম


অলক বিশ্বাস

বৈশাখ,শব্দহীন হাহাকার

তোমাকে ছুঁতে চেয়ে উজান সমুদ্রে উত্তাল
ক্লান্ত জলরাশি কতবার ডেকে ডেকে ফিরে যাচ্ছে ঢেউ
দুহাতে ধরেছি আকাশ
দুচোখে সূর্য লাল।

আরও একটি বছর বয়সে বেড়েছি
তুমিও আগের মত সমানই থেকে গেলে
আরও একশ বছর এইভাবে যোগ করে হে প্রেম,
বেঁচে গেলে ভাল হয় মাটির কাছাকছি।

বৈশাখী বেলাজুড়ে বিন্যস্ত দুপুর পোড়ে, আমিও রাখাল
মাটি আগুন হলে গাছের ছায়ায় বেজে ওঠে বাঁশি
যে নদী শুকিয়ে গেছে সেখানেই স্নান আমাদের
শব্দহীন যত হাহাকার, চোখে চোখে ভাষা হোক এবং সকাল।

ইন্দিরা দাশ

মেঘ কি শুধুই হয় বালিকা

মেঘ কি শুধুই হয় বালিকা?
কেমন যেন আমি দেখি
বরাবর এক শ্যামলা মতন , দীঘল চোখের সে মেঘপুরুষ।  
আপনারা সব শুনলে পরে, ঠিক বলবেন একি, একি
অকাব্যিক এ কথা এমন
শুনতে হবে? ব্যাপারটা কি!

এই বোশেখে জ্বালা পোড়া
আকাশ কোণে আপনমনে, কি সব খোঁজে গেরুয়া বাউল
রুখাশুখা জট পড়া চুল
এই দেখা...আর এই অদেখা
যেমন বেভুল, তেমনি আকুল।

আর আষাঢ়ে কথাটি নেই
কালোকোলো চওড়া বুকের
পেশীতে ঢেউ তিরতিরানি
ধামসা বাজায় যে হাতখানি
অরণ্যময় গন্ধ গায়ের, চোখের ঘন চাউনিতে তার
ঘর ভুলিয়ে রাধেবানায়
চেষ্টা কেবল মন মজাবার।
সব মেয়েরাই প্রিয়তমা... সব বুকেতেই বিরহভার।



তারপর ঠিক পুজোর আগে
বয়েস কমে পনেরো-ষোল
শাসন ফেলে এক ফতুয়ায়...সারা আকাশ ঘুরে এলো
হঠাৎ করেই ছুটোছুটি
ছিপছিপে সেই ছেলের সাথে
নষ্টামি দেখ্‌ খিল্‌খিল্‌খিল্‌
কাশমেয়েদের লুটোপুটি।

ইদানীং সে পঞ্চদশী 
চাঁদনী নিয়ে আদিখ্যেতা-
বলেই চলে সুরঞ্জনা,
ঐখানেতে আর যেওনাবেকার কথা, বুঝবে কে তা।
হিংসুটে সে, এখন তিরিশ
রাত্রিজাগা পাতলা চাদর... আষ্টেপৃষ্ঠে চাঁদকে কেবল, জড়িয়ে রাখে, জড়িয়ে রাখে
তারারা তাই দূরেই থাকে।

মেঘ কি শুধুই হয় বালিকা?
তবে যে ঐ বৃষ্টিরা সব
লুকিয়ে থাকে
মেঘপুরুষের বুকের ফাঁকে!

এসব পড়েও জানি তাও
আপনারা ঠিক অবাক হয়ে
দেবেন বলে অদ্ভুত যে!
হয় নাকি হে এমনটাও!

বিদিশা সরকার

চালান

খোপ থেকে খোপের ভিতরে চালান হচ্ছে সমস্ত আংঠা,
সুদে আসলে উশুল করে নিয়ে ফিরে গেছে থিয়েটার কোম্পানি --
পায়রার ডানার আওয়াজ,না হাততালি হরবোলার পাল্লায় বাটখারা নেই
নেই কোনও দোকানদারি বা ঝুঠো গয়নার বিষয়ে আগমার্কা ছাপ


ক্রমশ কুকড়ে যেতে যেতে অপারেশন থিয়েটারে সংজ্ঞা লোপ, যোনি ফুঁড়ে দৈব ওষুধ,
নিরাময় সম্পর্কে বাকি কথা স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে
পারিবারিক রিক্রিয়েশন

সারিবাদি সালসা সম্পর্কে চীন থেকে বিশেষজ্ঞ সমিচীন
টাট্টুঘোড়ার লপক ঝপক খামচে ধরছে অন্তরার মুখরা
সম থেকে সমে ফিরে আসার সময়টুকুই যথেষ্ঠ
" লাগা চুনরি মে দাগ "--

রাজর্ষি ঘোষ

হুতোম

এইখানে
এই ছায়াভরা গাছের কোটরে একটি হুতোম আশ্রয় কিনেছে
আমার উপর তার ভারী আক্রোশ
হঠাৎ আক্রমণে
ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে কবিতার খাতা
বালিশের ওয়্যার

নোটবইয়ের নোনা ওঠা ঘরে
    মুখ গুঁজে র‍্যাকে আমি বিশ্রাম বেঁধেছি
    একটু একটু চুন খসে পড়ছে
পলেস্তারা থেকে


এখন মাঝরাত
প্রেতময় ঘড়িদের উপদ্রব
স্রোতে ভেসে ভেসে যাচ্ছে নীলাভ কাগজ
ছিলা টানে অপেক্ষায় আছি
    মুঠোভরে বৈশাখী প্রথম সপ্তাহ
হুঁশিয়ার

কখন কি সামনে এসে পড়ে


কলমের ক্রোধে ঘেঁষা নিয়মিত ইঁদুর
এখনও খুঁটে চলেছে অপ্রকাশিত অষ্টাদশী দেহ
আহা কাঁঠাল কোমল

আহা কাঁঠাল কোমল



জয়া চৌধুরী

চেনা বিহান চেনা শাম

এখনও দ্বন্দ্বে ভোগো তুমি! 
সব্জী মজানোর আগে না পরে লবণ দেবে কি না 
সেসব ভেবে বিনিদ্র থাকো বিহান অবধি! 
কতবার তো জেনেছি শ্বাস যৌথ তালে পড়তে থাকলে
গহনে প্রেম ঝংকার দেয় যার আওয়াজ বাজতে থাকে 
ভেতরবাড়ি আমাদের ভেতরে কমন কি নেই সেসব 
জানলেই কত সুখ মিলবে?  বরং তফাৎগুলো জড়িয়ে ধোরো বুকে
বড় তৃষিত এই জমি যার নাবালত্ব দেখে নি কালপুরুষ 
বরং ইগনোর করো ভুলগুলো সত্যিই মনে করো এগুলোর নাম ব্যবধান? 
হাত বিস্তৃত কাঁধ থেকে পা উরুৎ আদি 
সেসবে মিল পাও বুঝি?  সেগুলি নিজের নয়?  
কী পর কার পর কেমন সে পর... 
আছি তো তোমার সুঘ্রাণ মেখে , বিনত আপন
তোমার চিনেও না চেনা লাগে কেন? 


অদিতি শিমুল

শিরোনামহীন

একদিন-
কঙ্কালভর্তি পানা-পুকুরটির পাশ পেরুতেই বাতাস কেটে যাওয়ার মতো শব্দে কেউ যেন আমায় বলছে- শুনতে পাচ্ছো? দমকা বাতাসে শরীরশূন্য অশব্দের দূর'ছায়া। কী হুলুস্থুল একটি পরিত্যক্ত ঘুড়ি উড়ছে আপনমনে আকাশের ফ্যাকাসে আলোর কাগজে! আর তার অনেক নিচে বিনুনির মতো লম্বা ট্রেন চলে যাচ্ছে ঝিকঝিক শব্দ তুলে। তখন আমার মাথার ভেতরে ভেসে উঠছে একটি অদেখা মৃত্যুর রাজ্য আর সাদা চর। চমক ভাঙলো বসন্তবৌরির ডাকে! উৎস প্রপাতের অচেনা আলোয় মরা-রোদেরা অলস বসেছিল -যেন দুই হাঁটুর ভাঁজে মাথা গুঁজে রাখা অচল বৃদ্ধা; যার লিচুফল দুই চোখ আর শুকনো হরতুকির মতো শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট। টের পেলাম আমি এখন "নিরন্তর" নামক এক জলহীন সরোবরে দাঁড়িয়ে আছি; যেখানে- অনুতাপের গ্রহান্তরিত বীজেরা এখনও জলের অস্তিত্ব খোঁজে। প্রগাঢ়তা প্রমাণ করতে তুমিও শেষ অবধি একখণ্ড "অন্ধকার" তুলে ছুঁড়ে মারলে আমার জন্মান্তর লক্ষ্য করে। কালো-বেড়ালের সবুজাভ চোখের মতো চূর্ণ-চূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে মৌসুমি-বনের ভিতর... ভেবে দেখো অতনু- হাসিমুখে আনন্দ-যাতনার ফুলগুলো দ্বিগুণ রাঙিয়ে-মাতিয়ে দেবার কথা ছিল আমাদের চোখ-কান বুঁজে! আমরা এখনও নাবালের দেশে সিঁদুরে-বটফলে কোঁচড় ভরে তুলি আগুনের রঙে। মহাজন্ম আর কবর ঘুরে-ঘুরে কুড়োচ্ছি মড়ার মাথার খুলি, হস্তরেখা -ভবিতব্য! অতনু- যে'বার তুমি আমায় আস্ত একটা সমুদ্র এনে দেবে বললে, সেবার থেকেই আমার মাথায় অপচ্ছায়া। আরেক কৃষ্ণপক্ষে তুমি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে দৌড়ুলে আর উৎসুক এক অস্থিরতায় তোমার দৃঢ়" সে টান ক্রমাগত বাড়ছে -আমিও প্রাণপণ দৌড়ুচ্ছি- দৌড়ুচ্ছি লুপ্ত এক নগরীর দিকে, তুমি তোমার টান আরও দ্বিগুণ- চতুর্গুণ- লক্ষ'গুণ বাড়িয়ে জানতে চাইলে- অদিতি, শুনতে পাচ্ছিস সমুদ্র? আমি বিহ্বল তাকালাম তোমার চোখের শূন্যে। আরেক-দিন-- তোমার মনে আছে অতনু? "আমাদের বাড়ির দক্ষিণের গোয়ালঘরের পেছনে তুমি সেদিন "কী একটা" দেখে, এক'ছিটকে এসে আমার হাত ধরে হাঁপাতে-হাঁপাতে আমাকে বললে -- এই জানিস? জুলেখা'বুড়ির বেড়ালটা বোধহয় আর নেই- মরে গেছে! দেখলাম তোমার দু'চোখ ভর্তি টলটলে জল! "আমি চুপিচুপি গিয়ে দেখতে পেলাম - জুলেখা'বুড়ি ঘুমপাড়ানি গানের সুরে কাঁদছে - আর তার কান্নার অনুষঙ্গ গুলো একটা-একটা করে তার "প্রত্নবাক্সে" যত্ন করে তুলে রাখছে --- তার অন্নপ্রাশন্নের দিন থেকে শুরু করে তার তখনকার মেঘস্পর্সী স-ব অশ্রু চক্রহীন এক নালার পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে! "আমি সেদিন তোমার চোখে স্নেহগ্রস্ত এক মিনার গড়তে দেখেছিলাম- আর দেখেছিলাম পার্থিব বিচ্ছেদ ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে অপার ক্রোধ আর আজন্ম ঘৃণার অস্ত্রাগার। অতনু- "তুমি আবার তোমার হাতের টান বাড়িয়ে দিলে আমার আজন্ম লক্ষ্য করে।