৭ম বর্ষ ৩৮তম সংখ্যা ১ অগস্ট ২০১৮

এই সংখ্যায় ২৮টি কবিতার লেখকসূচি - তুষ্টি ভট্টাচার্য, তৈমুর খান, জয়াশিস ঘোষ, অরুণিমা চৌধুরী, ভগীরথ মাইতি, পিনাকী দত্তগুপ্ত, জয়া চৌধুরী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, বিজয় ঘোষ, গোলাম কিবরিয়া পিনু, সুতপা সরকার, রেজা রহমান, সবিতা দত্ত, উদয়শঙ্কর দুর্জয়, প্রীতি মিত্র, পায়েল খাড়া, সুধাংশু চক্রবর্তী, পুষ্পিতা ঘোষ, শ্রীময়ী গুহ, বচন নকরেক, মনোজ জানা, মমতা দাস, নীলাদ্রি ভট্টাচার্য, স্বপ্ননীল রুদ্র, শুক্লা মালাকার, সৌরভ বর্ধন ও পিনাকীশঙ্কর চৌধুরী ।

তুষ্টি ভট্টাচার্য

বেঁচে থাকার মানে

চারপাশে যাদের মেরে ফেলা হচ্ছে 
তাদের মরে যাওয়ার শব্দ শোনা ছাড়া
আর কিছু করার নেই।
শোনা আর অপেক্ষায় থাকা,
কখন আমাদের পালা আসবে

প্রিয়জনকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে ওরা
গুলির শব্দ শুনব আর ভাবব
কখন আরও একটা বুলেট ফুঁড়ে দিয়ে যাবে
মা হারানো এক শিশুর কান্না শুনতে শুনতে
মৃত্যুকেই কামনা করব

প্রতি রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে আশা করব
আর যেন ঘুম না ভাঙে-
বাবার পকেট ঘড়িটা টিকটিক করছে হাতের মুঠোয়        
গত রাতেই ঘড়ির মালিককে গ্যাস চেম্বারে যেতে হয়েছিল 
কাঁদতে কাঁদতে ভাবব, কেন এখনো মরে যাইনি

বেঁচে থাকার মানে বুঝতে গেলে 
এই পৃথিবীতে এখনো যারা বেঁচে আছে
তাদের বেঁচে থাকার অর্থ জানাতে হবে 



তৈমুর খান / দুটি কবিতা

নিজেকে লুকিয়ে রাখি
  
কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না
ভালোবাসা হারিয়ে গেল   
একটি হলুদ রঙের পোশাক ফেলে চলে গেল   

স্মৃতির উঠোন খাঁখাঁ করে
পারস্পরিক শূন্যতায়
কিছু জ্বরের উষ্ণতা
ঘুরেফিরে খেলাধূলা করে   
দিনশেষের ক্লান্তি উড়ে আসে
সেও অদৃশ্য কোনও পাখি
আমার কাছেই বৈধতা চায়   
দু'একটি রাস্তা খুঁজে খুঁজে
নিরর্থ কল্লোলে আমি কান পেতে থাকি   
কে নৌকার দাঁড় টানে  ?
ছোপ ছোপ শব্দ হয়
শব্দের বিস্তারে রাত্রি নামে   
আমি স্তব্ধতার কাছে আমার ব্যাকুলতা রাখি
নিজেকে নিজের ভেতরে লুকাই   ....

বৈশাখ এল

আজ নতুন বৈশাখ এসেছে
সূর্যটা দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির কানাচে
তোমার জন্য নতুন শাড়িও এনেছে

সুসংবাদ পাওনি এখনও  ?
সমস্ত সংবাদই আজ সুসংবাদ হবে
ওই দ্যাখো কল্পনার পাখায় পাখায় গান
বেদবতী সরস্বতী স্নান করে স্বপ্নের জলে  
মানসসরসী জুড়ে ঢেউ
হাওয়ায় তার সাদা শাড়ি পত্ পত্ ওড়ে   

ভীরু হয়ে তাকিয়ে আছি
নষ্ট কার্নিশে কাক ডাকে   
তোমাকে স্পর্শের ডাকে
হাত এগিয়ে যায়   
কবে যে হেসেছ তুমি
এখনও হাসির ঝিলিক পড়ে আছে   !
মরা দূর্বাঘাসে বিরহ চিহ্ন আঁকা
নিরীহ চোখে তবু আলো জ্বলে
আলোয় আলোয় বৈশাখ নাচে  
বাড়ির কানাচে ঘুমভাঙা দিন
জেগে উঠল, জেগে উঠল
                                 তার বন্দনায়....


জয়াশিস ঘোষ

মায়াচরের রূপকথারা

পাখিটি ভুলে গেছে ঘরে ফেরা, ডাকবাক্স, ছুট
এমন রাতের দেশ সেজেছে নিঁখুত
পরিপাটি তার জখম, নিভে যাওয়া আলো
কে যেন ভুল করে বেসেছিল ভালো
তার কথাগুলো এখানে বেজে যায়। প্রতিধ্বনি
পাখিটি ভুলে গেছে অভ্যাস, ফেরার সরণি....

এখানে কেউ কারো নয়, তবু মায়াজন্মের ছলে
পাশাপাশি বসে আছে আকাশের তলে
ফেনাদুধ গড়িয়েছে জ্যোস্না আঁতুর
রাতের বুক থেকে, ফোঁটা ফোঁটা সানাইয়ের সুর
নদীর গভীরে চলে গেছে
কে জানে, গতজন্মে কে কাকে কবুল বলেছে!

এখানে সমস্ত প্রতিশ্রুতি গুঁড়ো গুঁড়ো মিশে গেছে অন্ধকারে
যেন কেউ নৌকা রেখে পারে
চলে গেছে। তার কথা ফিসফিস বলছে নালিঘাস
অনেক অনেক দিন ধরে জমানো নিশ্বাস
ঝড় হয়ে উঠেছে। কি হবে উপায়?
সে যদি না ফেরে কোনোদিন? যদি ভুলে যায়
তাকে? জেনে রেখো
অন্ধকারের একটা নিজস্ব আলো থাকে!

যদি আর কিছু কথা থাকে, বলে দাও
এরপর এই মায়াচরে মিশে যাবো আমি
যদি বেঁধে নেবে মনে করো, হাতকড়া দাও
না হলে ভুলে যাবো আসলে
কে ছিল আসামী!

অরুণিমা চৌধুরী

জীবন ব্যক্তিগত

সাধনার কথা নিভৃতে বলা ভালো
অথচ অদ্ভুত  চোখ বাতাসে ভাসে..
ঈর্ষাকাতর সে,  তেরোহাত লম্বা  জিভ
বাতাস কাটে, এগিয়ে আসে পিঠ লক্ষ্য করে..  

আমাদের শাকভাত জল মাটি রোদ
--
এইতো আহার্য! তবুও
মেধার কথা ওঠে ঋণের কথা... সে যখন বলে, বলতেই থাকে অনর্গল.. পুরনো গলিঘুঁজি রুটিরুজি তারও একদিন ছিল  অসুখে দিন

ব্যক্তিগত জীবনের কথা  যখনই বলতে গিয়েছ
ছড়িয়ে গিয়েছে শব্দ আর
ঢাক বেজে উঠেছে অসংখ্য ..আসলে ধর্ম হল ধারক
আর সে  বহন করে রাজার চাতুর্য, ছল


আমাদের ধুলোমুঠি,   মাটির পাত্রে বিষ
দিনান্তে নেয়ে এসে নিজের হাতের  উপরে হাত রাখি  মাটির প্রতি নত হই, তিলতিল করে জমানো আয়ু
ক্ষয়ে আসে, অথচ সে হাওয়ায় হাওয়ায়
উড়ো কথা পাঁচকান করে.. যেমন তার
লাগানিভাঙ্গানি স্বভাব
ছেয়ে ফেলে দেউলের পাঁচিল..
সন্ধ্যে জুড়ে ঘন  শ্যাওলার রস  নামে

আমি খই উড়িয়ে দিই খই ছড়িয়ে দিই
মাটি ভরে ওঠে নুনে

এইতো দেখাচ্ছি ঝাঁপি খুলে
জীবন ব্যক্তিগত

মাটি ছাড়া  এপর্যন্ত কারো কাছে  ঋণ নেই