৭ম বর্ষ ৪২তম সংখ্যা ২৯ অগস্ট ২০১৮

এই সংখ্যার লেখকসূচি - জয়ব্রত বিশ্বাস, প্রণব বসু রায়, তপন মন্ডল, সোমেন চক্রবর্তী, কামরুন নাহার কুহেলী, সৌমিত্র চক্রবর্তী, দেবাশিস মুখার্জী, কাজরী বসু, ফারহানা খানম, রুকসানা কাজল, সুবীর ঘোষ, বচন নকরেক, বিবেকানন্দ দাস, নীলরতন চক্রবর্তী, সুনীতি দেবনাথ, শুভাশিস দাশ, পদ্মাবতী রায়চৌধুরী, পায়েল খাড়া, সুতনু হালদার, মারুফ আহম্মেদ নয়ন, সৌরভ বর্ধন, অরূপকুমার পাল ও জয়া ঘটক ।

জয়ব্রত বিশ্বাস

ভাসান

ভাসতে ভাসতে যাওয়া মোহনার দিকে
ছাড়তে ছাড়তে পাওয়া হৃদয়ের মাঝে
এভাবেই নৌকাবিহার তোমার আমার

আনন্দে মাথা দোলায় নধর গাছেরা কোথাও
কোথাও ভাঙা পাড়ের উন্মুক্ত প্রান্তে
আদুল হ'য়ে যায় বে-আব্রু শিকড়ের দল

দাউ দাউ জ্বলতে জ্বলতে মিইয়ে যায় আগুন
চিতার কাঠ থেকে রাশি রাশি ধোঁয়া ওঠে
চোখ জ্ব'লে মরে বিপন্ন কাঁধবেশীরা
#
একলা কুকুর উবু হ'য়ে পাড়ে বসে /
ঘাড় তুলে ডাক ছাড়ে প্লুতস্বরে /
জলের দর্পণে হারানো সঙ্গীর সন্ধান

ভাসতে ভাসতে যাওয়া মোহনার দিকে
ছাড়তে ছাড়তে পাওয়া হৃদয়ের মাঝে
প্রবাহী তারে ছোটে ইলেকট্রনের স্রোত
পথের মোড়ে মোড়ে জ্বলে বিজলি বাতি ।

প্রণব বসুরায়

ঘটনাবলি

এইমাত্র দেখলাম চিতা থেকে ছিটকে উঠলো
আগুন- ফুলকি
ঠিক তখনই ঝপ ক'রে আলো নিভে গেলো...
কোথা থেকে আসা একটা সুগন্ধি, খুব চেনা লাগে,
দমকা হাওয়া এক টুকরো, নিয়ে এলো
নীল নদের ভিজে ঘ্রাণ
আকাশ ঝাঁকিয়ে দপ দপ করতে করতে একটা প্লেন
চলে যায় মেসোপটেমিয়ার দিকে
সে-ও কোন বিচ্ছেদ চায় নি।
বহুদূর থেকে এইসব দেখতে দেখতে
আমার মাথা টলমল করে
ও আমি পড়ে যাই।

কৃষ্ণবর্ণের একজন আমাকে তুলে
বসিয়ে দেয় এই হুইল চেয়ার...
বসে আছি সেই থেকে, কিছু না দেখেই

তপন মণ্ডল অলফণি

ছাতা বিহীন লোক

বৃষ্টিতে যে মানুষটি ভিজে গেল
তার পকেটে ছিল সারাদিনের রোজগার
তাকে কিনতে হবে পেটের জ্বালা নিবারণ
কিনতে হবে ছেলের ঔষুধ
সে দোকানে ঝোলানো ছাতার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে


এরপর কাল যদি নিম্নচাপ আরও ঘনীভূত হয়
রোজগারের পকেটের শূন্যতায়
বানে ভেসে যাবে নুনের বাটি
ভাতের হাঁড়ি আর
ছেলের বাবা ডাক


সোমেন চক্রবর্তী /দুটি কবিতা

অবৈধ

প্রথম যেবার বুঝলাম স্বপ্ন দেখছি
মনে হলো এক মৃত শরীরের ভিতর নিজেকে বেঁধে রেখেছিলাম এতদিন

তখন থেকেই প্রতি রাতে স্বাধীনতার চাষ করি এখানে,
পঞ্চায়েতের ভয় থেকে মুক্তি নিয়ে
অনুলোম বিলোম ডিঙিয়ে ঘুরে আসি নন্দনকানন
ছুঁয়ে দেখি রাজার মাথার কোহিনুর হীরা
মুক্তির আশায় কালো কাচের আড়ালে বসে থাকা গোলাপি পাখিটি

হয়ত ধরা পড়ে যাই দেবতার নজরে,
জানি না গরুড় পুরাণ
কী আছে বিধান বরাতে

এই নশ্বর শরীর অনুমতি দেয় না বলে
চিত্রগুপ্তের ঘড়ির কাঁটা দীর্ঘতর হয়...

নোঙরের ক্ষুধা
পুরাতন সময় ছুঁয়ে দেখি
যেন নীরব পাথর
প্রবাল ঠোঁটে সমুদ্র লুকিয়ে রেখেছে জলদেবতা

বেশি কিছু ছিলো না তো দাবি
পুনর্জন্মেও ডুবে যেতে চাই হিমশৈল জড়িয়ে

আমি আনাড়ি নাবিক, জানা ছিল না
ডুবতে গেলেও কম্পাস লাগে

মৃত্যুর মৃগয়াস্থল ভুলে
অজানা পথে নোঙর রাখে জাতিস্মরের জাহাজ
অসংখ্য বারমুডার পেটে হাঙরের ক্ষুধা
চিরায়ত মৃত্যুশৈলী

আমার চোখে শুধু মায়াবী হিমশৈলের খোঁজ




কামরুন নাহার কুহেলী

আঁধারের গল্প 

চোখে কাজল টেনে, ঠোঁট রাঙিয়ে 
আবদ্ধ আলোর ফাঁকে ফাঁকে ছোটে মেয়েটি-
শিকার হবার লোভে!
আর ঘুম জমায়।
ছোট ছোট দুঃখগুলো কুড়িয়ে 
নকশিকাঁথায় ফুল তোলে দিনমান; আর
ধুলোরঙা মেঘের দিকে তাকিয়ে ভাবে-
যেদিন পূর্ণ হবে জোড়াতালি দিয়ে নকশা আঁকা
সেদিন নকশিকাঁথা গায়ে জড়িয়ে খুব ঘুমাবো!
কেউ খুঁজে পাবেনা নিষিদ্ধ আঁধারের আমাকে !



সৌমিত্র চক্রবর্তী

ছড়ার খোঁজে

আভভি কুছ ছড়া লাও-
সম্পাদকের দাবী,
শুনেই আমি খুঁজতে নামি
ছড়ার ঘরের চাবি।

ছড়া কেমন প্রাণী বল
লম্বা কিম্বা বেঁটে?
জানো যদি দাও না বলে
মরছি শুধুই খেটে।

মাথায় কি তার লম্বা শিং
পায়ে বড় নখ?
হাসছ কেন, করছি নাকি
তোমার সাথে জোক!

টুকটুকে রঙ? কুচকুচে রঙ?
গায়ের কেমন জেল্লা,
এটা যদি জানতে পারি
ফতে হবেই কেল্লা।

পরে কি সে গঙ্গা শাড়ী?
মানায় নাকি কোটে?
চুপিচুপি বল তো শুনি
দাঁড়ায় নাকি ভোটে?

খুঁজছি সবই বাজার দোকান
বিগবাজার আর স্পেনসার
এর এনসার নাকি ক্যানসার
জিজ্ঞাসাতেই সেন্সর!

থাকে কোথায় ফ্ল্যাট বাড়ীতে
নাকি তালুক খাস?
খায় কি সে বিরিয়ানী
কিম্বা সবুজ ঘাস?

ওরে ছড়া কোথায় গেলি?
দে না রে ভাই দেখা,
আমায় গোলোকধাঁধায় ফেলে
পালাস না রে একা!

দেবাশিস মুখোপাধ্যায় / দুটি কবিতা

বিভাজিত

আঁশবঁটির কাছে যে রক্ত তার কাছে
সকাল । ধারালো সময় ফুলকে
খসিয়ে একটি চিত্র রাখলো ।
তার মাথা ও ধড়ের ভিতর
সামান্য অন্ধকার সম্পর্ক জিইয়ে রাখে

বিভাজন এমন একটি প্রক্রিয়া
অদৃশ্য দাগ চোখে না পড়লেও
আছে । ব্যবহারকারী জানে কৌশল
শব্দটি তার হাতে খুব খেলে ।
ঘাতক শুধু সুপারি খেয়েছে

খিদে একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা ।
চিন্তার মাঝখানে একটি স্মার্ট ফোন
ঢুকে গেলে অন্য খিদে চাগাড় দিয়ে
ওঠে । রাক্ষস হলে ভিতর ঐশ্বর্য হারিয়ে যায়
মা ,বোন,কন্যা খেয়াল থাকে না

যুদ্ধফল
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
ঢোলকলমীর বনে যুদ্ধ ভুঁড়াশিয়াল
আর ঢোঁড়াসাপের । রক্ষা পায় না
পুঁটি । টিঁকে থাকার লড়াই চলে ।
লে ভেলকি লাগ

গগন খুড়ার বউয়ের নাকে নোলক।
কয়েনের মতো কপালে টিপ । পদযুগল রুপার মলে ছম ছম ।
মস্তিতে মেতে উঠলে বনে বনে
চাঁদের রস

সরের মতো গড়িয়ে মাটির বিছানা
ভিজিয়ে ভাঙে বেড়া রা কাড়ে না
কেউ । উপর নীচের কাজ সারা হলে দুপুর বেলা ।
লাব ডুব লাব ডুব
বুক

কলম গাছটি টবে ফল দিলে
পাশের বাড়িতে বিষণ্ন লজ্জাবতী ঋতু
সরণীতে



কাজরী বসু

বেপর্দা

পর্দা খোলায় পর্দাফাঁসের আদল,খাতায় পেনের ঢাকনা খোলা নিব।
এখন তোমার ভয়ের কি বা আছে!পারবে হতে আদম সহ ইভ!
ইচ্ছে তোমার যতই করে করুক  বুকের ভিতর বৃষ্টি হয়ে ঝরুক
পড়শি আছে নিষ্ক্রিয়তার মোডে নাড়িয়ে দিলেই তেজস্ক্রিয় জিভ!

ইতস্তত বোতামঘরের ফাঁকে ইচ্ছেগুলোর নিছক ডুবসাঁতার।
মনের কোনায় ভাবনা ভেসে চলে,জলের উপর ভাসার প্রত্যাশার।
তোমার আমার সব স্পৃহাদের ছুট   ভালোবাসার লুকোনো চিরকুট।
সহস্র চোখ বন্ধ আপাতত খুললে যাপন কাঁপন ও ছারখার।

রইল যা থাক।বেপর্দা না-ই হই।পর্দানশীন,ব্যক্তিগত মোড।
বুকের মধ্যে বেপর্দা উল্লাস,আদ্যোপান্ত জীবন্ত আপলোড।
তোমার আমার আকাশ বন্ধ ঘর   সন্ধি অভিসন্ধি অতঃপর...
না ফুরোনো যে পথ অতিক্রমে আজকে গলি কালকেই মেনরোড।

হাতের উপর রাখতে পারো হাত।গভীরে চোখ আজকে রেখো প্রিয়।
পড়শিচোখের থেকেও তোমার চোখ বেপর্দা হোক,দুরন্ত,সক্রিয়..


ফারহানা খানম

ক্ষিদেও বিশ্রাম চায়

ক্ষিদেটা একেবারেই নেই
বিভ্রমের মত মাঝে মাঝে মোচড় দেয় তীব্রতাহীন
সত্যি একেবারে নেই
পা থেকে চুলের গোড়াঅব্দি ইতিহাস
তুলে দেখিয়েছি মনটাকে, দেখো কত মিটিয়েছো সমাহারে।
ভার নিয়েছো ভুলের তাও হজম হয়েছে সহজেই
তবে এখন তোমার কি হলো মরছো কেন অনাহারে?
ক্ষিদেও বিশ্রাম চায়
কথা বলে না ঘুমোতে চায়, ঘুমের ঘোরে
শুধু এক অনাকাঙ্খিত শ্বাপদভয় মেলে ধরে।

রুখসানা কাজল

রূপালি ফিতা

যতগুলো নদী পেরিয়ে এসেছি ,বলেছি ভাল থেকো জল,
দেখা হবে
দেখা হবে কোনো বিকেলে,
পাশাপাশি বসে আমরা দেখে নেবো সূর্যের গলিত নিভে যাওয়া ।

আমাদের সেই শহর, গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া মধুমতি মরে গেছে!
কত বার একটি ছবি চেয়েছি খাটরার অশত্থ গাছটির !
আমি একাই স্বপ্ন দেখি, ঘুরে ঘুরে নেমে আসছে হলুদ ঝরা পাতা ,
শ্যাওলার সর সরিয়ে জলপোকা ঠোঁটে নিচ্ছে চৈত্রের শালিক,
বাঁধাকপির ক্ষেতে মুখ উঁচিয়ে চেয়ে থাকা
সেই মোরগঝুঁটি ফুলগাছের কথা মনে আছে ?
মূলা কপির ঘরোয়া বাগান ?
তোমার সেই ছবি আঁকিয়ে বন্ধু
অনিন্দিত উল্লাসে যে চলে গেল মেঘের দেশে!
কেন যে গেল!

শহর উজিয়ে এক ভোরে ডেকে নিয়েছিলাম তোমাকে,
তারপর ঘাসে ঘাসে পা ফেলে হরিণী উচ্ছ্রাস,
লাল পলাশের মুকুট, ফসলের ক্ষেত মাড়িয়ে সাদা বাছুরের পেছনে
অর্বাচীন ছুটে যাওয়া !
কে জানত পরীক্ষা চলছে তোমার !
ছবি আঁকিয়ে চোখ পাকিয়েছিল বন্ধুর হয়ে।
দেখেও দেখিনি।
খই ফোটার মত ফুটেছিলাম নবান্নের সেই সকালে।

রূপালি ফিতা ছিঁড়ে ছুটছি এখন !
খয়েরি স্মৃতি ভেঙ্গে শুধু মনে পড়ে অবাক কিশোর চোখ !   

সুবীর ঘোষ

অন্ধকার

কবি কি জলের গানে নিজেকেই দেখে ?
জল কি জলের ঘোরে বুঝে নেয় অন্যের ইশারা ?
পৃথিবীতে কমে আসছে জল গান কবির বোধিও ;
ক্রমশ এক অন্ধকার উড়ে আসছে আকাশের গহ্বর থেকে

আমি খুব নিরাপদ নই, তোমাদের জন্যও
কোনো সুরক্ষার প্রস্তাব আনতে পারিনা