৮ম বর্ষ ১ম সংখ্যা - জন্মদিন বিশেষ সংখ্যা ২৫ অক্টোবর ২০১৮

এই সংখ্যায় ৫টি গদ্য : লিখেছেন- শ্রীশুভ্র, জয়া চৌধুরী, রত্নদীপা দে ঘোষ, নন্দিনী সেনগুপ্ত ও পৃথা রায়চৌধুরী, এবং ৩৫টি কবিতা লিখেছেন : বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, রত্নদীপা দে ঘোষ, বৈজয়ন্ত রাহা, তৈমুর খান, সৌমিত্র চক্রবর্তী, বিজয় ঘোষ, চয়ন ভৌমিক, তুষ্টি ভট্টাচার্য, অরুণিমা চৌধুরী, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, শৌনক দত্ত, তপন মন্ডল, শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপম দাশশর্মা, পিনাকী দত্তগুপ্ত, সুবীর সরকার, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, সতীশ বিশ্বাস, সুজন দেবনাথ, অমিতাভ দাশ (ব্যাঙ্গালোর), মিলি মুখার্জী,শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলী ভট্টাচার্য, মৌ দাশগুপ্ত আদক, পিনাকীপ্রসাদ চক্রবর্তী, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, অরিন্দম চন্দ্র, প্রীতি মিত্র, অরূপরতন হালদার, নাসির ওয়াদেন, বিদিশা সরকার, ব্রতীন বসু, কস্তুরী সেন, দ্বীপ সরকার ও ইন্দ্রাণী সরকার । 

সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

সম্পাদকীয়


    সাপ্তাহিক অন্যনিষাদও পাক্ষিক গল্পগুচ্ছসাত পেরিয়ে আটে পা দিল । অতয়েব ৮ম বর্ষের পথ চলার সূচনায় কিছু বলতেই হয় । কিন্তু বলার কথাগুলো প্রায় সবই বলে দিয়েছে এই সংখ্যার পাঁচ গদ্যকার শুভ্র, রত্নদীপা, জয়া, নন্দিনী, পৃথারা । এমনকি অন্যনিষাদের খামতিগুলোও, যেগুলি আমি বলবো বলে ভেবেছিলাম । আমার কিছু বলার সুযোগ তারা রাখেনি । তবু কিছু বলতে হয় তাই বলি ।

    প্রায় শূন্য প্রযুক্তি জ্ঞান নিয়ে, শূন্য থেকে শুরু করে দুটো ওয়েব পত্রিকা অন্যনিষাদগল্পগুচ্ছএই সাত বছরে প্রকাশ করেছে সাড়ে সাত হাজার কবিতা ও তেরো শো গল্প এবং গুগল পরিসংখ্যান অনুযায়ী অন্যনিষাদের পৃষ্ঠাদর্শন ছুঁতে চলেছে সাড়ে চার লক্ষ আর গল্পগুচ্ছর তিন লক্ষ । বিশ্বের যে প্রান্তেই বাঙালি সেখানেই অন্যনিষাদগল্পগুচ্ছএকটা আদরের যায়গা নিতে পেরেছে । নবীন কবি আর গল্পকাররা নিজস্ব ভুবন হিসাবেই দেখতে চাইছেন পত্রিকা দুটিকে,এটা কি কম পাওয়া ? কম তৃপ্তিকর ?

    অন্যনিষাদএ প্রকাশিত সব কবিতাই উত্তীর্ণ হতে পারছে এমন কথা কেউ বলবেন না,আমিও না । অনেক তরুণ লেখক যারা সবেমাত্র কবিতার জন্য কলম ধরেছেন,প্রতিষ্ঠিত কবিদের লেখার সঙ্গে তাদের তুলনামূলকভাবে অপটু লেখাও প্রকাশ করি । আমি তাদের উজ্বল মুখ দেখতে পাই । এটা আমাকে তৃপ্তি দেয়। আমাকে তৃপ্তি দেয় -অনেকে অন্যনিষাদে তার প্রথম লেখাটি প্রকাশ করে পরবর্তীতে কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন । কিন্তু প্রতিষ্ঠা সত্বেও অন্যনিষাদের থেকে সরে যাননি ।

    একটি সুসংবাদ জানাই । এই সংখ্যা থেকে অন্যনিষাদ প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন জনপ্রিয় প্রাবন্ধিক, কবি ও ব্লগার শ্রী শুভ্র । অন্যনিষাদের প্রচ্ছদভাবনাটিও তার । নতুন সাজে অন্যনিষাদকে কমন লাগছে পাঠকের জানাই ইচ্ছা আছে । এই সংখ্যাটি সম্পর্কে পাঠকের প্রতিক্রিয়া অষ্টম বর্ষের পথচলায় আমাদের উৎসাহিত করবে । পত্রিকার পৃষ্ঠায় আপনার মতামত বিভাগে কিংবা ফেসবুকে আপনার মতামত জানান, খুশি হবো ।

    এইটুকুই অন্যনিষাদের জন্মদিন সংখ্যার সম্পাদকীয় প্রতিবেদন । অন্যনিষাদগল্পগুচ্ছপত্রিকার সাত বছরের পরিক্রমা সম্ভব হয়েছে এর লেখক-লেখিকা, অগণিত পাঠক-পাঠিকার ভালোবাসায় । তাদের এবং পত্রিকাদুটির সমস্ত শুভানুধ্যায়ীকে জানাই কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা । সঙ্গে থাকুন, ভালো থাকুন ।



শ্রী শুভ্র


 কবিতায় মাংস নেই, রক্ত নেই, সানুনাসিক শব্দের কুণ্ডূয়ন, কখনো কখনো পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে-বলা কান্নার ভনিতা, যে কান্না এতই নিহিত প্রজ্ঞার ব্যাপার, এতই মাঞ্জা-দেওয়া যে কান্নার মশলাই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর……….

কথাগুলি বলেছিলেন সদ্যপ্রয়াত অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র তাঁর কবিতা থেকে মিছিলেপ্রবন্ধে। না হাতে পাওয়া চৌদ্দ আনা ইনটারনেটে সুনামির মতো আছড়ে পড়া কবিতা দেখে তাঁর এই মন্তব্য নয়। বিগত শতকের সাতের দশকেই ছাপা পত্রিকার সম্পাদকদের কাব্যবোধে ফিল্টার হওয়া আধুনিক বাংলা কবিতার স্বরূপ দেখেই পণ্ডিতপ্রবর মানুষটি বাংলা কবিতার অন্তঃসার শূন্যতার দিকটি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। যখন ফেসবুকে একাউন্ট খুললেই কবিতা লিখে লাইক কমেন্ট পাওয়ার কোন উপায় ছিল না। উপায় ছিল না জনপ্রতি ওয়েব ম্যাগাজিনের অরণ্যে নিয়মিত কবিতার জোগান দেওয়ার। আজকের পোল্ট্রি ফার্মের মুরগীর ডিমের মতো কবিতার ওভার প্রোডাকশানেরও উপায় ছিল না সেসময়। সম্পাদকের দপ্তরে কবিতা পাঠিয়ে বসে থাকতে হতো বছরে একটি দুটি কবিতা যদি ছাপার আলো দেখতে পায় সেই আশায়তখনই বাংলা কবিতার অবস্থায় আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন শ্রী মিত্র।

সেদিনও আর নাই। সেসময়ও আজ পাল্টিয়ে গিয়েছে। ইনটারনেটের রাজত্বে বাংলা কবিতা প্রায় সর্বত্রগামী হয়ে উঠেছে বলতে পারা যায়। নিজের ওয়ালে নিজেই এখন আমরা কবি হয়ে উঠেছি। কি লিখছি কেন লিখছি তার থেকে বড়ো হয়ে উঠেছে কত কত লাইক কমেন্ট পাচ্ছি সেই তথ্যই। সেই তথ্যেই আমাদের কবিত্ব শক্তি বিকশিত হয়ে উঠছে দিনে দিনে। প্রচারের সম্মোহিনী আলো এসে পড়ছে কবি নামের উপর। নিজের অর্থ সামর্থ্য থাকলে তো কথাই নাই, বছর বছর কাব্য সংকলনের প্রকাশে আমরা সবাই কবি আমাদের এই একুশ শতকে

সার্বিক এই ধোঁয়াশার মধ্যেই একটু অন্যরকম ভাবনার থেকে শুরু হয় সাহিত্যপত্র অন্যনিষাদের। পত্রিকার কর্ণধার শ্রী ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় আজ থেকে সাত বছর আগে প্রায় খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই একটি অভিনব লড়াই শুরু করেন। ইনটারনেট ফেসবুকে কবিতার সুনামির মধ্যে থেকেই প্রকৃত কবিতা খুঁজে বার করার লড়াইটা মোটেই সহজসাধ্য নয়। নিরন্তর অনলস পরিশ্রমে অকবিতার স্তূপের মধ্যে থেকে সামুদ্রিক ডুবুরির মুক্তো তুলে আনার মতো একটি একটি করে ভালো কবিতা উদ্ধার করার সাধনায় নিয়োজিত হয় অন্যনিষাদ। বিগত সাত বছর ব্যাপি সময় সীমায় অন্যনিষাদের এই সাধনার হাত ধরেই বেশ কজন ভালো কবির সন্ধান পেয়েছেন বাংলা কবিতার পাঠককুলযাঁরা সদ্য সদ্য কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করছেন, তাঁদের হাতের কাছে অন্যনিষাদ একটি দৃষ্টান্ত স্বরূপ। ভালো কবিতা প্রকৃত কবিতা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিনা পরিশ্রমে হাতের কাছে পাওয়াটাও নবীন প্রজন্মের পক্ষে আশীর্বাদ স্বরূপ। আর বিগত সাত বছর ব্যাপি নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ঠিক সেই কাজটিই করে চলেছে অন্যনিষাদ। প্রচারের ঢাক না বাজিয়েই নিজের অভিমুখের দিকে শক্ত হাতে হাল ধরে রেখে বিশুদ্ধ কাব্যচর্চার দিগন্তটুকু অমলিন রাখতে অক্লান্ত অন্যনিষাদ

অন্যনিষাদের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো, এখানে কেবলমাত্র আমন্ত্রিত লেখাই প্রকাশিত হয়। সম্পাদক তাঁর সাহিত্যিক প্রজ্ঞা ও প্রতীতিতে খুঁজে বার করে আনেন সেই সব লেখক কবিকেই যাঁরা ঠিক শৌখিন মজদুরি করেন না। বা কবি যশপ্রার্থী হয়ে ওয়ালে ওয়ালে লাইক কমেন্টের সাধনায় মগ্ন নন। সম্পদক জানেন কারা কারা এই সময়কে তাঁদের শব্দের দ্যোতনায় রূপ দিতে পারছেন বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য ও ঘরানায় থেকেও নতুন দিগন্তের অভিমুখে। সমাজ সংস্কৃতির নাড়ির স্পন্দনে মুখরিত হতে পারছে কাদের ভাষা ও ভাবনা। তাদেরকেই পরম যত্নে তুলে আনছেন অন্যনিষাদের সম্পাদক অনলস পরিশ্রমের একান্ত সাধনায়। এখানেই অন্যনিষাদের অনন্যতা।

বর্তমান দশকের ওয়েব ম্যাগাজিন সংস্কৃতিতে অন্যনিষাদ একটি মাইলস্টোন। বিশেষ করে একা একজন মানুষের সম্পূর্ণ একক অধ্যাবসায় ও সাধনায় এবং একারই পরিশ্রমে একটানা সাত বছর মানসম্মত একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করা কোনভাবেই সহজ কথা নয়। মনে রাখতে হবে অন্যনিষাদ কিন্তু একটানা সাত বছর প্রকাশিত হয়ে অষ্টম বর্ষে উপনীত হয়েছে। এই যে ধারাবাহিক সাধনা, এই সাধনারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত অন্যনিষাদ। আর সেই সাধনার নেপথ্যের যিনি সাধক, সেই ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, যিনি তাঁর বয়সকে অতিক্রম করেও এগিয়ে চলেছেন আলোর প্রদীপখানি হাতে তাঁকে সমগ্র বাংলা কাব্যচর্চার দিগন্তে আমাদের সংগ্রামী অভিনন্দন।

আমাদের আশা অন্যনিষাদ যে ঐতিহ্য ও ঘরানাকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে, তার সেই চলা দশকের পর দশক এমন ভাবেই জারি থাকবে। আমাদের আশা অন্যনিষাদের ভবিষ্যতের কাণ্ডারী যাঁরা হবেন, তাঁরাও সেই ঘরানাকে বজায় রেখেই নতুন দিনের ডঙ্কা বাজিয়ে আরও নতুন নতুন দিগন্তে উন্মোচিত করবেন বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎকে। উদ্বোধিত হবে আগমনী প্রজন্মের নতুন নতুন প্রতিভার আলো। বাংলা সাহিত্যচর্চায় অন্যনিষাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে, সেদিনই সার্থক হবে শ্রী ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের এই নিরলস সাধনা। সেই সাধনারই আর এক নাম অন্যনিষাদ।


জয়া চৌধুরী



নিষাদ বলতে আমি ব্যাধ বুঝি নি কখনও। বাল্মীকির রত্নাকর থেকে রূপান্তরে যার ভূমিকা ছিল বিশেষ। ঠিক যেমন কোনো না কোনো কারণনা থাকলে বড় কোন ঘটনা ঘটে না। যুদ্ধের কথা তো ইতিহাসে পাওয়াই যায়, “কারণআশ্রয় করে এমন সৃষ্টির কথা বাল্মীকিকেই দেখেছি। তার চেয়ে বরং নিষাদ নিয়ে আসে আমার কাছে সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা। সুর সপ্তকের চরম বিন্দু এই নিষাদ। তবে এটি কিন্তু খুব সহজ সুর নয়। একে আয়ত্ব করতে লাগে দীর্ঘ সাধনা।  শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন নি- তে বেশীক্ষণ থাকা যায় না।সত্যিই তাই । ওকে ধরিলে তো ধরা দেয় না সহজে। এবং সেই ধরার পরেও থেকে যাওয়া বিষয়টি ততোধিক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গীত যারা চর্চা করে তারা জানে কথাটির সত্যতা।

অন্য নিষাদ ব্লগ আট বছরে পা দিচ্ছে। আট বছর ব্লগ সাহিত্যে একটি দীর্ঘ সময়কাল। এমন নয় যে মুদ্রিত পত্রিকার মত তার বার্ষিক নয় ষাণ্মাসিক অথবা ত্রৈমাসিক নিদেনপক্ষে পাক্ষিক প্রকাশ। সাত বছর ধরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ এভাবে ব্লগজিন প্রকাশ করার অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা সম্বন্ধে কোন উপমা দেওয়াই নিষ্প্রয়োজন। বলতে গেলে বরং অন্য দিকগুলি দেখা যাক খতিয়ে। মূলতঃ কবিতা পত্রিকা এই অন্য নিষাদ। যদিও অন্য নিষাদ গল্পগুচ্ছের বয়সও ওই একই। অর্থাৎ সহোদর এই দুই পত্রিকার জননীহলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় শ্রী ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়। সম্পাদকের এই পরিশ্রম ও চিন্তার ভার তিনি স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছেন এই বৃদ্ধ বয়সে। 

একটি পত্রিকা জনপ্রিয় হবে ও তার গুণমান অক্ষুণ্ণ থাকবে এই দুটি দিক ভারসাম্য রাখা সত্যিই কঠিন। কারণ সাধারণ ও বিশেষ এই দুই ধারা একসাথে চলা অসম্ভব। কোনো একটির দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা খুবই। তবুও গুণমানের দিক থেকে বলতে গেলে যদি কবিতার গুণ বলি তাহলে মুদ্রিত পত্রিকাগুলিতে যারা সসম্মানে ইদানীং বিরাজ করছেন তাঁদের একটি বড় অংশই এই ব্লগেও লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। অর্থাৎ সিরিয়াস পাঠক পাচ্ছেন ভেবেই তাঁরা লেখা দিচ্ছেন। অন্যদিকে নবীন লেখকদের জন্যও ফাল্গুনিদা একই রকম সহাস্যে দরজা খুলেই রেখেছেন। তবুও দেখতে পাই নবীনদের মধ্যেও প্রায় আত্মসমীক্ষার পরে কবিতা পাঠানো দস্তুর। অর্থাৎ তাঁরাও লেখা পাঠানোর সময় আপ্রাণ চেষ্টা করেন সাধ্যমত ভাল কোনো লেখা দিতে। সম্পাদকের হাতযশ বা কৃতিত্ব এখানেই। কত ভীরু লেখকের অভিভাবক ফাল্গুনিদা, কত প্রতিষ্ঠিতের শ্রদ্ধেয়। কারণ সকলকে প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে সেরা লেখাটি বের করে আনার চেষ্টায় তিনি সতত যত্নশীল। 

তবুও বলব এর প্রচার মাত্রা বাড়ানোর জন্য যদি আরো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যেত। আমি ২// বছরের প্রাচীন ব্লগের কত সাধারণ লেখার কত অধিক পাঠক দেখি অন্য নিষাদ কি চেষ্টা করতে পারে না আরো বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছতে? আরো একটা কথা ভাবি কবিতার অলংকরণ। সেরকম কিছু নেই এখানে। এতে হয়ত মনোযোগী পাঠকই ব্লগটিতে আকর্ষণ বোধ করে। কিন্তু নবীন পাঠককে টানতে হলে দৃশ্য সুখের বিষয়টাকে বাদ দেওয়া যায় কি?

তবুও বলব পত্রিকাটি এভাবে নিয়ম করে প্রকাশ পাক, ঠিক যেমন রোজ সকালে সূর্য ওঠে আমাদের আলোও দেয়। বেঁচে থাকতে গেলে নিয়মানুবর্তিতা খুব জরুরী। সেখান থেকেই উঠে আসতে পারে উৎকর্ষ। সবশেষে আবার জানাই অন্য নিষাদের সমৃদ্ধি ও খ্যাতি, এবং সেই সঙ্গে শ্রী ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়ের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা।


রত্নদীপা দে ঘোষ



শুরু থেকে, খুবশুরু থেকেই রয়েছে পাশে। লেখালেখি যখন সবেমাত্র ভোর-ভোর, তা দিয়েছে আমাকে যে প্রথম, তার নাম অন্যনিষাদ। শ্রী ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত এই ওয়েব-পত্রিকাটি আমার অন্তরকোঠায় আসন পেতে আছে সেই কবে থেকে ... আজ তার আটে পা। ভাবা যায়?

কবিতাময় এই পত্রিকাটি যেন একটি সেতুমুখর নদী। হাজার রঙের জল, লাখো রঙের নৌকোভ্রমণের ছড়াছবি। একার হাতে গড়া সমগ্র কবিকুলের অবস্থান, গ্রহরত্ন এবং দিব্যদৃষ্টিতে সৃষ্টি করেই চলেছে সাহিত্যের অনুরণন। তার নক্ষত্রের কারিগরি, মহৎঋষির ছায়াপথটি ঋদ্ধ করে চলেছে বাংলাসাহিত্যের বায়োডাটা।

গভীর বার্তার আহিরবোল। মনোরম খড়খড়ি। জানালাটি খুলি যখন, দেখি সূর্যের ছাট। এগিয়ে দিয়েছে বরাভয়ের হাত। উঠোন ভরা কবিশিল্পের আকুতি। স্বাদগন্ধ আর ভ্রমণের স্মৃতি। বুঝতে পারি, অন্যনিষাদ আসলে এক অপার বসুন্ধরা। কিশোর পৃথিবীর ছন্দে মাতোয়ারা ফুলসৃজন আর মধুনিনাদ গঠনের আন্তরিক বারান্দা।

শারদীয় সকালে অন্যনিষাদ খুলে দেখেছি অজস্র কাশফুলের দরবারি কেশরনক্সা, স্নিগ্ধরাতে অন্যনিষাদ মেলে দেখেছি তুমুল বকুলঅলির একপশ্লা ষড়কোণ। শীতরোদে অন্যনিষাদ গায়ে গড়িয়েছে বারোদুয়ারের তেরো লণ্ঠন। ভিজেবর্ষায়, গোপন রোমন্থনের চাবি। ফুলেল যমুনা, কৃষ্ণবাঁশীর তানপুরা। গোকুল সমীপে আবার এই অন্যনিষাদই প্রেমজধূলার মনোরম রাজকুমারী।

বহু যত্নে জমানো বিভিন্ন লহমা।সম্পাদক এখানে মুহূর্ত দিয়েই গাঁথা করেন কল্লোলিত মন্দিরের সোপানতলা। আমরা যারা কবিতা লিখি, তাদের কাছে অন্যনিষাদ আসলে এক সিন্দুক বোঝাই আনন্দের আলমারি। প্রতিটি তাকে হীরে জহরত মাণিক্য মণিময় মন্ত্র-চামর। কবিতা তো মন্ত্রের মতোই সতত সুন্দর। স্কেচ-সোনালী, রুপোলী রঙবাহার, তাই অন্যনিষাদ আমাদের কাছে আশার কাঞ্জিভরম, স্বপ্নের বালুচরি।
ছন্দ-না-ছন্দের বেলোয়ারি উপাড়া-সিল্ক। যখনি লিখেছি কবিতা, অন্যনিষাদ বাড়িয়ে দিয়েছে কলমের শাখা-প্রশাখা। সব মনে পড়ছে  এই মুহূর্তে। প্রথম আলাপ, দ্যাখা প্রথম। অন্যনিষাদের পাতায় নিজের অক্ষর-মাধুরীর মৌচাক জড়ানো কাতর-পৃষ্ঠা, ঝিনুকইচ্ছের পাতালরেল। 

স্বপ্ন? স্বপ্নের চাইতেও সত্যি কিছু? ভ্রম? নাকি ভ্রমজাতক? অকালবোধনের বারিবর্ষণ? স্নেহপল অনুপল আকাশ হেমান্ত আর সকল শুভইচ্ছের আলাদিন... এতটুকু কালি নেই কোথাও, নেই অন্ধকারের মণিকর্ণিকা ...

অন্যনিষাদ কি কবিদের অবয়ব? কবিতার ক্লোরোফিল? কবিজীবনের রান্নাঘর? নাকি ফসফরাস জড়ানো ব্রহ্মাণ্ডের হাতেখড়ি?

কি বলে ডাকি তাকে? জন্মদিনে কি বা উপহার দিই? ড্রয়িং ভিজিয়ে দেওয়া চোখের প্যাস্টেল? নাকি প্রতিটি তুলি? লেখা-না-লেখার অজস্র রঙিন ভালবাসার বেদান্ত-উপাসক? অথবা শ্রাবণময় বরুখনের অরণ্য? সম্ভবত, প্রনম্য এক স্বর্ণচাঁপার নোলকদুলানো বনফুল ... আহ্লাদে ডগমগো অলকানন্দা...

যে পরিমান অন্তরঙ্গ হয়ে আছে প্রিয় অন্যনিষাদ, সাথে আছে অনন্ত পাখিবেলার শীষ, তাকে মাপা যায় না, তাকে যোগ / বিয়োগ করা যায় না। গুণভাগ তো অনেক দুরের কথা। মায়াবী পতঙ্গটি যেমন মায়ামগ্ন ধান্যআঙুরের কোয়াগুলি ছড়িয়ে রাখে কবিতার পৃথিবীতে, তার সব সবটুকুই যেন অমর-অমরাবতীর চক্ষুদান। শরতশশীর গেরুয়া-পূর্ণিমা। ঈশ্বরের পলিমাটি দিয়ে তৈরি। পালক উড়ে যায়, পালক উরে উড়ে আসে। আলো ফোটার আগে। আলোর উৎসব শুরুর পরে, অন্যনিষাদ আমাদের চোখে চোখ পেতে জাগে।

প্রিয় অন্যনিষাদ,
তোমার প্রতিটি লম্বাশ্বাস হোক ধরিত্রী সঞ্জাত মৃগশিরার শুভ জন্মদিন
তোমার প্রতিবার লেখাচিঠি ধ্রুবতারার সন্ধিক্ষণ, আমাদের ঘরোয়া মোমবাতি
তোমার মেঘবৃষ্টির আসবাব তোমার মায়াময় কুসুমকোমল পরমান্নের জ্যোতি
অগাধ চালচিত্রে কবিতা আঁকতে আঁকতে আমরা তোমার বড় হওয়াটি দেখি ...





নন্দিনী সেনগুপ্ত


অন্যনিষাদ। নিষাদশব্দটি দ্ব্যর্থক। একটি অর্থ ব্যাধ। অন্য অর্থটি স্বরমালিকার সপ্তম স্বর নি। আমার মতে দুটি অর্থই সুপ্রযুক্ত এই অন্যনিষাদওয়েবম্যাগের ক্ষেত্রে। ব্যাধ লক্ষ্যবস্তুর দিকে শরনিক্ষেপ করে শিকার সংগ্রহ করে; আমরা যারা কবিতা লিখি, আমাদের কাজটা অনেকখানি সেই ব্যাধের মত। আমরা শব্দ সাজিয়ে মালা গাঁথবার চেষ্টা করি। কবি নই, খুব বেশি হলে শব্দশ্রমিক বলতে পারি নিজেকে। লক্ষ্যবস্তুতে শরবিদ্ধ হলে সেই লেখা কবিতা হয়ে ওঠে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে তাকে কবিতাবলে অভিহিত করা যায়না। তবে আমার যে লেখা লক্ষ্যভ্রষ্ট, যা কবিতা হয়ে উঠতে পারেনি, তাকেও অন্যনিষাদ পরম মমতায় আঁচলে বেঁধে রাখে। আসলে যিনি লেখেন, তার কাছে লেখাগুলি সন্তানের মত। অন্যনিষাদ সব সন্তানদেরই জন্মমুহূর্তে জানায় শুভকামনা। কারণ, সে যে আর পাঁচটা জায়গার মত নয়। সে আলাদা। অন্যএবং অনন্য।    
অনেকেই হয়ত বলবেন যে শুধুমাত্র কবিতার ওয়েবম্যাগ যখন, তখন কি আরও একটু ঝাড়াই-বাছাই করে লেখা নেওয়া উচিত নয়? যে সব লেখা কবিতা হয়ে ওঠেনা, তাদের কেন স্থান দেওয়া? নিজের কথা এবং অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রথমবার অন্যনিষাদের পাতায় লেখা স্থান পাবার ফলে মনে যে উৎসাহ জেগেছিল, সেই উৎসাহটুকুই একজন শব্দশ্রমিককে ঠেলে দিতে পারে ভবিষ্যতের চর্চার দিকে।
স্বরমালিকার সপ্তম সুর নিষাদ যেভাবে আরোহণের চরমে উঠবার আগে টানটান স্বরে স্থির হয়, অন্যনিষাদও ঠিক সেভাবেই পৌঁছে যাক উত্তরণে। এই শব্দশ্রমিকের অফুরান শুভেচ্ছা রইল।

পৃথা রায় চৌধুরী




(‘আমি অনন্যাপত্রিকার লিটল ম্যাগ সংখ্যায় (এপ্রিল জুন ২০১৮) প্রকাশিত লেখার অংশ বিশেষ)

.অমানুষিক পরিশ্রম, সাহিত্যের প্রতি একনিষ্ঠ সেবা অনুরাগের ফসল এক একটি লিটল ম্যাগাজিন। এদের সঠিক মূল্যায়ন করার মতো ধৈর্য, সময় বা সাহিত্যানুরাগ হয়তো আমাদের মধ্যে নব্বই শতাংশ সাহিত্যপ্রেমী ভেকধারী মানুষেরই নেই। ছত্রাকের মতো গজিয়ে উঠছে এই লিটল ম্যাগাজিনেরা। বাজারে আজ কতশত ছোট পত্রিকা, কিন্তু আসল ঐতিহ্যকে ধরে রাখার মতো মনের জোর ঠিক কতো জনের রয়েছে? লেখা চাইলেই লেখা দিই, আনন্দেই দিই, ভালোবেসে দিই, এখন আমি পুরনো, হয়তোপোড় খাওয়াকলমচিদের দলে পড়ি, কিন্তু এককালে, সে বছর ছয়েক আগেও একেবারেই আনকোরা এক কলম ছিলাম, যাকে ছোট ছোট এই পত্রিকার দল আদর করে তাদের পৃষ্ঠা এগিয়ে না দিলে, আমার লেখা আসন পেতো কোথায়? মোদ্দা কথা, এখন বুঝি, যাদের লেখা পড়ে অভিভূত হতাম, অথচ সেই তাদেরই আমি চিনতে পারতাম না, তারা আমার অজ্ঞতার জন্য অচেনা ছিলো, তা নয়... তারা প্রত্যেকেই প্রায় আমার মতোই সদ্য লিখতে আসা কলমচি। বাজার চলতি বাণিজ্যিক যেসব সাহিত্যপত্রিকা আছে, যাদের লালায়িত হয়ে পড়ি আমরা, এবং যেগুলোর সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা, “অমুক পত্রিকায় লেখা ছাপা না হলে, সেই লেখক / লেখিকার কোনো মানই নেই”, তারা বুক ঠুকে বলতে পারবেন কি, নতুন অজস্র প্রতিভাকে তারা সাহিত্যের জগতে বিন্দুমাত্র স্থান করে দিতে পেরেছেন কিনা?

সারা বিশ্বব্যাপী যে ধ্বস নেমেছে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতির বাজার জুড়ে, তার বিরুদ্ধে লিটল ম্যাগেরাই আপ্রাণ রুখে দাঁড়িয়েছে চিরকাল। মানুষে মানুষে হানাহানি, ঘৃণা, এসব রুখে দিতে পারে এক অনন্য সাহিত্য-সংস্কৃতির ছাদ। এই ছাদের তলায় সম্মিলিত হতে পারে বিভিন্ন ভাষাভাষী, হরেক ধর্মাবলম্বী, রকমারি অর্থনৈতিক ভেদাভেদের মানুষজন।হতে পারে’... হতও। এখন মুষ্টিমেয় কিছু পত্রিকা এই আদর্শের পথে চলে অতি নিষ্ঠা সহকারে, বাকিরা উঠে পড়ে যেন লেগেছে, কিভাবেবড়োহওয়া যায়। ছোট পত্রিকার যে গরিমা, যে গরিমায় এইসব ফুলের কুঁড়ির মতো ছোট্ট সুন্দর পত্রিকাগুলোতেই আমরা পেয়ে যেতাম (এখনো পেয়ে যাই বৈকি) এমন সব তাজা কলমদের, যাদের অবদান সমৃদ্ধ করে তুলেছে এবং তুলছে সাহিত্য জগতকে, সেই গরিমা যেন আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন কলমদের সুযোগ দেওয়া হোক, আমি নিজেও একদিন নতুন ছিলাম, কিন্তু তা যেন কোনোগডফাদারবা পত্রিকার কর্ণধারদের দেয় উৎকোচের নিরিখে নয়। নতুন কলমদের লেখা অবশ্যই যাচাই করে সুযোগ দেওয়া উচিৎ, এতো বড়ো কথা বলার স্পর্ধা এই কারণে করছি আমি, কারণ ঝাড়খণ্ডের ধানবাদে বেড়ে ওঠা এক সাধারণ মেয়েকে কোনোগডফাদারঅথবা কোনো আর্থিক উৎকোচের বিনিময়ে কখনো লেখা প্রকাশ করতে হয়নি। এখানে বলে রাখা ভালো, আমার প্রথম লেখা বেরিয়েছিলো একটি ব্লগে, যাকে অনলাইন ছোট পত্রিকাই বলতে পারি। মাননীয় ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায় (কাকুমণি বলে ডাকি, ফেসবুকেই পরিচয় এই অসীম স্নেহশীল, পিতৃতুল্য মানুষটির সাথে) নিজে থেকে আমার কবিতা নিয়ে প্রকাশ করেছিলেনঅন্যনিষাদ’-এ। আজও সেই আনন্দ ভুলতে পারি না। দিন গেছে, বছর গেছে, প্রচুর ব্লগ এবং লিটল ম্যাগে আমার কবিতা, গদ্য, ইত্যাদি বেরিয়েছে, কিন্তু সেদিনের আনন্দ আজও অম্লান আমার কাছে।