৮ম বর্ষ সংখ্যা ১৩, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯

এই সংখ্যার লেখকসূচি : অরুণিমা চৌধুরী, রমা সিমলাই, তপন মন্ডল, নাসির ওয়াদেন, সেলিনা জাহান, সুমিত্রা পাল, বিদিশা সরকার, রূপক সান্যাল, রুখসানা কাজল, ফিরোজ আখতার, রঘুনাথ মাজি, কাজরী তিথি জামান, পারমিতা চক্রবর্তী, ওয়াহিদ জালাল, প্রীতি মিত্র, নীলাদ্রি ভট্টাচার্য, মালবিকা হাজরা, আশিস ভৌমিক, ঈশিকা ভট্টাচার্য, রিয়া ভট্টাচার্য, দেবাশিস কোনার, পায়েল খাঁড়া ও স্বপ্ননীল রুদ্র ।

                সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

অরুণিমা চৌধুরী

সম্পর্কের নাম সেতু হতে পারতো

ভীষণ জবাবদিহির সকালে  যখন
 আগুনের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম 
 অন্ধ নাবিক নিজস্ব   জল ছাড়া ছুঁয়ে দেখেনি কিছুই 

আমি পুড়ে গেছি পুড়ে গেছে আমার স্পর্শকাতর ত্বক

সম্পর্কের নাম সেতু হতে পারত
 অথচ তার অনেক মুখ 
সহস্র রোঁয়াদার সন্ধ্যে
 আমাকে অসুস্থ করে, গা গুলিয়ে ওঠে  

  সমস্ত স্নায়ুমুখে কাপড় গুঁজেছি যেন  শব্দ না ওঠে, যেন এই বদ্ধ অপ্রতিভ পুকুরে
 কোনো ছায়াপাত  না হয়

দুধারে খিলান যাবতীয় কারুকাজ নিয়ে
 দাঁড়িয়ে থাকুক  নির্বিকার 
এইই নিয়তি তার.. 







রমা সিমলাই

ভুল চাঁদের আলোয়

ভুল চাঁদের আলোয় হেঁটে যাচ্ছে দুটো মানুষ !
ঘাস লতা জড়িয়ে ধরছে দু'জনের পা,
শরীর ছুঁয়ে বাতাবি ফুলের আধো উপস্থিতি,
ওদের ছেড়ে যাওয়া পায়ের দাগ মাটিতে
একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে স্বাভাবিক আয়োজনে।

পিছন থেকে ডাকছে, বারবার ডাকছে গোছা গোছা চাবি,
রান্নাঘর, খাট আলমারি আর ডাইনিং স্পেসের সদ্য কেনা ছবিটা !
মাথার উপর চক্কর খেতে খেতে রাত জাগা পাখিটা বলে গেল,
"ফিরে যা, ফিরে যা উজানের  ভরাট সংসারে.......!"

ভুল ঠিক না বুঝেই বেশ কয়েকটা কাঁকড়া গণ্যমান্য ভঙ্গিতে
হেঁটে বেড়াচ্ছে বালির সমুদ্রে,
ধুসর চাঁদ পিছলে যাচ্ছে খসখসে পিঠময় বালিতে !

মোহনায় পৌঁছে, দু'জনে  হাত ধরাধরি ক'রে একবার চাঁদ আর
ফেলে আসা পায়ের দাগগুলোকে দেখলো।  শেষবার একসাথে
চোখ বন্ধ ক'রে ঈশ্বরের কাছ থেকে চেয়ে নিল
অনন্ত পরমায়ু আর সুখ-স্বাচ্ছ্যন্দের আশীর্বাদ,
একমাত্র সন্তানের জন্য !

শেষবারের মতো মিলে গেল দু'টো ঠোঁট নিবিড় উত্তাপে
আর ভালোবাসায়,

    তারপর

দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে নেমে গেল
একটু একটু ক'রে
অন্তহীন জলের গভীরে !

এক জায়গায় পাওয়া যায় নি বলে,
কাল সকালে ভিন্ন ভিন্ন দুই বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার
 কথা ছিল ওদের । ছেলে অবশ্য কথা দিয়েছিল,
খুব শিগগিরই একজায়গায় থাকার যা' হোক একটা ব্যবস্থা করে দেবে.......

বয়স বাড়লে মা বাবারা এত অবিবেচক হয়ে যান !

      সব খুন খুন নয়
একটু আধটু রক্তপাত না হলে  মোমবাতিই বা   
         জ্বলবে কেন !

আর যাই  হোক, এটা নিছক কোনো আত্মহত্যার   
        প্রতিবেদন নয় !!!

তপন মণ্ডল অলফণি

তবু

তবু আমি সেদিন ভ্রাম্যমান পথের পথিক
মৃত্যুর পদশব্দ শুনি মিছিলের পতাকায়
মনের ভিতর মিথগুলো জমাট বাঁধছে
টুকরো টুকরো করে কেটে নিচ্ছে স্বত্ব
আর স্লোগানে গলা মেলানো মনটা
তখন ময়দানের ঠোঙা


আমরা সব জেনেও হুড খোলা গাড়িতে উঠি
শুধু মন খুলে হাসি না

নাসির ওয়াদেন

পূর্ণিমা রাতে 
             

নদী পুড়ে যাওয়া ছাই মাখছে জলস্রোত
 
জোছনা লেগে আছে রাতের পাতায়
 
একটা নৌকা জীবনের খেয়াঘাটে
 
ফেরি করে বেড়াচ্ছে জীবনপণ্য

আর কতদিন পুড়ে যাবে অমাবস্যা ?
নিষ্ঠুরতা জীবনের কাছে মুখ ঢাকা
 
রাত্রি অনেক হলো, এবার বিশ্রাম
 
কত যে রাত পরীদের ডানা কাটে
 

বিষন্নতার ছায়া ঢাকতে সেই নিষিদ্ধ বাজনা
 
আলখাল্লা আর নাচে না নূপুরের গায়ে
 
অনাস্বাদিত চাঁদ উঁকি দিচ্ছে শৈশবের আলোয়
 

অনেক রাত হলো পূর্ণিমা ঘুমোতে যাও


সেলিনা জাহান

প্রশ্নোত্তর

(উৎসর্গ: শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা রুমীকে

ছায়া, তুমি কার?
মৌন আমি, আমার নির্লিপ্ততা আধিক তীব্র করে
পৌরুষদীপ্ত রুমীর ভরাট কণ্ঠস্বর।

ছা....য়া.... তুমি কার?
বিস্ময়ে কুঁচকানো ভুরুতে তাকাই
হঠাৎ রুমীর চোখে।
তারপর কিছুটা কাব্যিকতায়...
পৃথিবীর বয়েস অবধি
কিংবা, তারও অধিককাল ধরে যে আমার,
আমি তার।

ওহো! হলো না
তোমার কাব্যরঙ হালকা করো ছায়া,
সহজ কথায় গাঢ় করো প্রশ্নোত্তর
যাতে শিশু থেকে বৃদ্ধ, মূক থেকে সবাক
প্রতিটি মানুষ একবাক্যে বুঝে নেয় তোমার ভাষ্য।

ধরো, বাংলাদেশের আকাশসীমার
সর্ব্বোচ্চ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তুমি,
সাড়ে সাত কোটি জোড়া চোখ
নিরাক দৃষ্টি শূন্যে তুলে
তোমার প্রশ্নোত্তরের গভীর প্রতীক্ষায়......
ছায়া, তুমি কার?
আমি... তোমার ছায়া,
আমি রুমীর ছায়া
না!...হলো না ছায়া...হলো না
সঠিক করে মনের কথাটি
মনের মতো গুছিয়ে বলো।
ছায়া, তুমি কার!

দুকূল ছাপানো রুমীর চোখে মেঘনা নদীর ঢেউ
তার সবটুকু জল তুলে নিয়ে হাতের মুঠোয়
দৃঢ় প্রত্যয়ে,
আকাশ বাতাস আর সাড়ে সাত কোটি হৃদয় কাঁপিয়ে বলি
রুমী.......
আমি তোমার বাংলাদেশের ছায়া!

অতঃপর নিবিড় প্রশান্তিতে শান্ত হয় সে,
আর আমার বুকের স্পন্দন শুষে নিয়ে বুকের সূর্যতাপে
আরো একবার জেনে নেয় রুমী
আমি তার নিখাদ সবুজ বাংলাদেশের ছায়া।

সুমিত্রা পাল

আশ্বাস

 ইমনের রোমান্টিকতাকে ছুঁতে চেয়েছি
কিন্তু শিবরঞ্জনী'র দীর্ঘ আলাপের মত
বুকের পাঁজরে গেঁথে বসে প্রতিটি না-পাওয়া।   
বিন্দু বিন্দু স্বেদ জমে সারা মুখমণ্ডলে
চোখের কোণায় চিক্ চিক্ অশ্রুকণা,
জীবনের অলিখিত চুক্তিগুলি এসে জমে সন্ধিপ্রকাশে।

অপ্রাপ্তি আছে বলেই
চাওয়ার আকাশে শ্রাবণী পূর্ণিমার চাঁদ
কদম্বকাননে রাসলীলা।

দূর থেকে ভেসে আসা অশ্বক্ষুরের ধ্বনি
এখনও বদলে দিতে পারে
আমার গোটা জীবনটা।