৮ম বর্ষ সংখ্যা ২০ ২৮ মার্চ ২০১৯

এই সংখ্যায় ২৫টি কবিতা, লিখেছেন - রত্নদীপা দে ঘোষ, জয়াশিস ঘোষ, রমা সিমলাই, চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমেন গুহ রায়, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, বিদিশা সরকার, শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজরী বসু, সেলিনা জাহান, অমিতাভ দাশ, অজন্তা রায় আচার্য, জপমালা ঘোষ রায়, ওয়াহিদ জালাল, নাসির ওয়াদেন, দেবাশিস কোনার, নীলাদ্রি ভট্টাচার্য, ব্রতীন বসু, সুদীপ ঘোষাল, মনোজিৎ দাশ, শ্রী সেনগুপ্ত, উত্তম বিশ্বাস, বিনতা রায় চৌধুরী ও চিরদীপ সরকার । 

             সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

রত্নদীপা দে ঘোষ


ডাকনাম

শুনলাম আপনার মেয়েটি নাকি সেই অনশনদলের মধ্যমণি...
সেই মেয়েটি যাকে আপনি লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছেন এতকাল

আজ দীর্ঘ চব্বিশ দিন মেয়েটি মুখে তোলেনি কিছু।
শুনলাম, গর্ভপাত ঘটেছে তার ... রক্ত...স্রাব ...
থই থই রুধির পলাশ

যদিও এখন চারদিক ঘোর আনন্দঋতু। সর্বত্র তুরীয় বসন্ত।
ফিটফাট পোশাক।টগবগে ঘোরাফেরা। উৎসব অগণিত।

এদিকে মেয়ের রক্ত বেসামাল
গর্ভ-আবীরে ভারি হোয়ে আছে বাতাস

শহুরে কলকাতা, নামজাদা কলকাতা
বাদশাবেগমের চৌখস কলকাতা এখন
রাজসূয় যজ্ঞ, নির্মেঘ আকাশ

মহাকবি কৃষ্ণচূড়ার কলমভরা সোনালী
পুষ্ট হচ্ছে দুরন্ত কবিতার শ্রেষ্ঠ হলোগ্রাম

কী যেন ছিল আপনার মেয়ের ডাকনাম !

জয়াশিস ঘোষ


প্রত্যয় অমোঘ

পরপর কটা ছেলেমেয়ে। সামনে শাসকের বুট
গিলে নেওয়া খিদে, সন্তান। বাকীটা ভীষণ অস্ফূট

পাশাপাশি শুয়ে আছে তারা। কেউ ঊনিশ কেউ বিশ
প্রেসক্লাব ভোটের বাজারে কুড়িয়েছে ঘুঁটে ছাব্বিশ

কথাও দেয়নি কেউ এসে, কেউ বলেনি কবে শেষ
একঝাঁক তাজা ছেলেমেয়ে বাজি রেখেছে পোড়া দেশ

তবু ডিজে বাজে পার্টিতে। তবু ওড়ে হোলির বিষাদ
খোলা নর্দমা, জমাজল। ফেটে যায় ত্রিপলের ছাদ

হাতে হাত ধরে আছে ওরা। জং ধরা শাসকের বুট
ক্ষীণ নাড়ি, সোজা শিরদাঁড়া। প্রত্যয় অমোঘ, অটুট..

রমা সিমলাই


ফিরে যাও বসন্ত

অনেক হয়েছে রঙের খেলা!
ফিরে যাও বসন্ত।
তুমি তো রাজনীতি র মতো মূর্খ নও।

এখানে মুখোমুখি অন্ধকারে,
যে সব দুর্দান্ত ইউক্যালিপটাস
মাথা ঝুঁকিয়ে, সুযোগ্য বাতাসের অপেক্ষায়
ধরে রাখছে  নিজস্ব পরমায়ু, রঙচটা প্রতিটি
দেওয়াল,ঝু্লকালি,যতগুলো অবিনাশী অক্ষর
বুকের প্রকোষ্ঠ আর শিরা উপশিরায় জমা করলে,
সাদামাটা একটা চাকরী জোটে দোপাটির সংসারে
                            তাকে তুমি অসম্মান কোরো না
অশোকে কিংশুকে,কিংবদন্তি কোকিলার মৃদুহাসি কোণঠাসা যাপনে...........
                                     ঈশ্বরী নেমে এসে অনশনে
বসে ঘৃতাহুতি দেবেন  রঙচটা লিপস্টিক ঠোঁটে  তার ব্যাথাময় দারুণ ঘোষণা !

তারপর,
মরচে পড়া সময়ের
                       একা একা ছায়া মেখে গতসুখ
রাসলীলা আখ্যানে স্থাপন করে অঙ্গীকার এর জলঘট 
বুঝে নেবে,অন্ধকারে ঘরে স্যাতসেতে
ছারপোকা খাট আর ইটের বালিশে মাথা রেখে শুতে যাওয়ার অজুহাত
                                     ইশারায় ধর্মযুদ্ধ চায় !

বাল্মীকি পুনর্বার রত্নাকর হলে
                                           রাজকীয় উল্লাসে
বরণের মুদ্রা এঁকে তাকে দেবো শিরোপাখানি
                         শ্রেষ্ঠ কবিতার !

বেঁচে থাকার দাবী নিয়ে ওই যারা রাজপথে
সুর্য মাখে, প্রখর আগুনে, দহন জেনেছে যারা
নিভৃত শিকড়ে,

একমুঠো প্রলয়ের সাঙ্কেতিক রোজনামচায়
                    তাদের সহায় হও
ফিরে এসো,মাটিকথা,শিকড়ের মুখোমুখি
                           প্রবল অসুখ


চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়


অরাজনৈতিক

মাস্টারমশায়, আপনি কিন্তু কিচ্ছু দেখেননি।
তবু, অ্যাসিডের চুমু লাগা অন্ধ দুটি চোখ,
কখন কি দেখে ফেলে যেতে আসতে পথে
ভয়ে ভয়ে পর্দা টেনে রাখি, অর্থমূল্যে কেনা।

না দেখাই ভালো ছিল, হঠাৎ যা দেখি অন্ধকারে
জল দিয়ে গিলে ফেলি, বাঙালীর ঢেকুর সম্বল -
তারপর ঘরে বসে পান্তাভাত, তেঁতুলের টক
একথায় ওকথায় দিনরাত চর্বিতচর্বন।

বদলের কথা ছিল কোন এক বসন্তকালে
হাবিজাবি কত কি যে ভাবি বসে বসে, মাথামুন্ডু নেই -
জামাকাপড়ের ভাঁজে আমার সে একই মন রাখা
ঘামের দাগের গন্ধ ছবি আঁকে কয়েকশো কোটি।

আমার তো কথা ছিল অন্ধের লাঠি নিয়ে যাবো,
সেইখানে, যেইখানে সমুদ্রের শেষে, দারুচিনি দ্বীপ-
সারামনে, পৃথিবীতে ভরে দেব এলাচ বাতাস
ওইখানে দৃষ্টিহীন নয়নের অস্ত্রোপচার, পদ্মলোচন।

যেতে যেতে পায়ে লাগে, আলতা না রক্তের দাগ?
জেগে উঠে দেখি রাতে স্বপ্নের মোমবাতি শেষ,
পড়ে আছে কালিমাখা আধখাওয়া আমার শহর
তার মাঝে মেয়ো রোডে একরাশ ভুখা কৃষ্ণচূড়া।

সৌমেন গুহ রায়


অরুণ বরুণ কিরণমালা

অবিমিশ্র ঘৃণা নিয়ে বুকের ভিতর
আমি চাঁদ ভাঙা দেখি
প্রথাসিদ্ধ ঘটে ছুঁড়ে দি
আনন্দ বিষাদ
তা দি অব‍্যক্ত আলাপে

সাম্প্রতিক সমাচারে কাঁপন ধরায়
জানুতে ও জঙ্ঘায়
মগজ খেয়েছে কীটে সে কবেই
‌‌
উরুভঙ্গ হয়ে পড়ে থাকি অনিত‍্য এ যাত্রায়
ব্যাথার প্রলেপ নয়
সঙ্কেত শূন্য আজ আবিল অবজ্ঞায়

কি স্পর্ধায়
গর্ভপাতের পরেও ও'রা রাজপথে নিশান ওড়ায়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়


হারানো যাত্রীর খোঁজে

আবার পরের ট্রেন
পথের বিরুদ্ধে হাওয়া  মুছে দিচ্ছে কাঙ্খিত ঠিকানা 

প্রতিদিন ঘরবাড়ি  থেকে দূরে  নিয়ে যাচ্ছে হারানোর নেশা

তোমার দেখার বাঁকে
যে যে দৃশ্য পড়ে আছে এলোমেলো
বিন্যাসবিহীন
ভুলেও তাদের গায়ে পোশাক দিও না


 সময়ের অল্প আগে যে ছিল নিকটে
তার হাত ছুঁয়ে আছে দগ্ধতর ঘা
অথচ  মায়াবী পকেটে  তার ট্রেনের টিকিট
সরে যাচ্ছে গাছপালা  একা একা মাঠ

বিদিশা সরকার


জীববৃত্তি

একটা বাজেয়াপ্ত মস্তিষ্ককে চূর্ণবিচূর্ণ করতে
কয়েকজন সান্রাসকে ভাড়া করা হয়েছে--
অ্যালজাইমার কারণে অকৃতকার্য একটা মেধা
কোনো সংখ্যাই মনে করতে পারছে না। শুধু
ফল ফুল নাম দেশ পদবীর সেই ছোটবেলা
জানলার বাইরে দু'মুঠো সম্প্রদান বিশাল আকাশকে!
মাঝখানের নানা পর্যায় আর ট্রেসিং পেপার
ওয়ার্ক এডুকেশনের ক্লাস - কল্পনা দি'র গৃহবিজ্ঞান !

শেষ সময়ে সবাই কী বলে" বেঁচে থাকাটাই বিড়ম্বনার"?
-- বাবা বলেছিলেন। মৃত্যুর সঙ্গে করমর্দন করে কী
অবলীলায় চলে যাওয়া!

যখন কলম স্থিত হয় না, বক্তব্য আর বয়ান
থেকে চুন সুরকি খসে পড়ে,হাড়িকাঠ সম্পর্কে
অনভিজ্ঞ একটা মিশমিশে কালো ছাগল
নির্বিকারে কাঁঠাল পাতা চিবোয় --তখন আমি
তার থেকে মৃত্যু শিখি, নির্বিকার কাঁঠাল পাতার জীববৃত্তি।

যখন অক্ষরগুলো কাঁপা কাঁপা অথবা ভাবনাগুলো ছত্রধর মাহাতো- আমি জল জঙ্গলেও নিরাপদ অন্ধকারে
সমস্ত সাক্ষাৎকার বাতিল করে দিই।
যাতায়াতের পথে সেই বাজ পড়া গাছটায়
একটা পাখিও বসেনা দেখেছি। ঠিক সেরকম নির্বিকার হতে পারিনি বলেই রঙের কারিগরকে
ভেবেছি, রঙিন পোশাক
বিজ্ঞাপনের সুলভ আরোগ্য


শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়


একটি বেয়াড়া ইচ্ছে

 রাজধানীর এগারো তলায় সরকারি ফ্ল্যাটের শোবার ঘরে
ভোরবেলা ঘুমচোখে মাঝে মাঝেই দেখতে পেতুম
মশারির চালে পায়রাদের নির্বিচার হাঁটাহাঁটি।
যেন ট্র্যাপিজের খেলা দেখাতে দেখাতে
হঠাৎ পড়ে যাওয়া কুশীলব ওরা !
আর আমি অপার প্রশ্রয়ে দেখছি
তাদের সেই অনন্য পদচারণা
দম চেপে; পাছে উড়ে যায় 

এখন থাকি বাংলার রাজধানীতে।
এটাও হাইরাইজ। এখানেও চারিদিকে
ওদের বকবকম, ভোর হয়, মশারি আছে,
গ্রিল ছাড়া জানালা। আর আছে অশেষ অপেক্ষা।
কতরকম কসরৎই না দেখাচ্ছে ছাদে কার্নিসে বারান্দায়!
তবু ওরা ট্রাপিজের খেলা দেখাতে আর কিছুতেই আসেনা!
ওরা কি বদলে গেল! নাকি আমাদের বদলটা ওরা টের পেল?

অথচ ওই খেলাটাই দেখার বেয়াড়া ইচ্ছে আমার আজও গেলনা।             


শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়


 রাজার পাট

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে সামাল সামাল সামাল রব
মন্ত্রী, সান্ত্রী, আমলা সবাই ত্রস্ত ভারি, ব্যস্ত সব
এই বুঝি কার ভুল হয়ে যায়, হলেই যাবে মুণ্ডু কাট
তোরা যারা দুধ দুয়েছিস, সামলে থাকিস মারবে চাঁট
বাগাড়ম্বর চলছে জবর, এখন আবার বৈদ্যুতিন
যুদ্ধ-যুদ্ধ চলছে খেলা, ভূতের নেত্য তা-ধিন-ধিন
নিজের ঢাকে পড়ছে কাঠি মোসাহেবরা উদ্বাহু
দিগবিদিকে উঠছে ধুয়ো হুক্কা হুয়া হুক্কা হু
শব্দ ব্রহ্ম, শব্দ জব্দ, শব্দে চলছে বলাৎকার
যুদ্ধবাজের প্রস্তুতি সব, তোয়াক্কা নেই তোর আমার
শুষছে মানুষ, ধুঁকছে মানুষ, মারছে মানুষ মানুষকেই
বিপক্ষরা রটায় অমন সে সব কথা শুনতে নেই
সামন্তরা জোর যুযুধান আস্ফালনে পাকশাটে
উড়ছে নিশান, ঝুলছে ছবি, রাজপথে ও মাঠ ঘাটে
ধরতে হবেই মুরুব্বি এক, যেমন খুশি ইচ্ছে তোর
সব রাজাকেই সমান দেখি, কেউ বেশী কেউ অল্প চোর
ফারাক তেমন বিস্তর নয়, ফারাক শুধু উনিশ-বিশ
গণ্ডা কড়ায় হিসেব কষে, তবেই বাপু পক্ষ নিস
ঠগ বাছতে উজাড় গাঁয়ে পরব মেলা জমজমাট
ঢের হয়েছে ছিঁচকে চুরি, এবার লক্ষ্য রাজার পাট