৮ম বর্ষ ৩১ তম সংখ্যা । ২২ জুলাই ২০১৯

এই সংখ্যায় ২৬টি কবিতা । লেখকসূচি : হিমাদ্রিশেখর, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, তুলসীদাস ভট্টাচার্য, অনিমেষ সিংহ, বিদিশা সরকার, নীলাদ্রি দেব, শবরী শর্মা রায়, জয়দীপ চক্রবর্তী, সুমিত্রা পাল, মন্দিরা ঘোষ, শ্রীলেখা মুখার্জী, সুনীতি দেবনাথ, নাসির ওয়াদেন, আশিস ভৌমিক, মালবিকা হাজরা, কাকলি দাশ ব্যানার্জী, শুভাশিস দাশ, প্রীতি মিত্র, চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়, লক্ষী নন্দী, অপর্ণা বসু, সুতপা সরকার, সুধাংশু চক্রবর্তী, খাতুনে জান্নাত, ইন্দ্রাণী সরকার ও নাসরিন আলম ।

হিমাদ্রি শেখর

প্রতিবেদন

প্রতিদিনের জীবন থেকে
একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে কোরিওগ্রাফি
সন্ধ্যে নামলে ঘিরে ধরছে মৌনতা
দীর্ঘ দুপুরের দাগে শালিকের ডানা
ভাঙতে ভাঙতে জড়িয়ে যাচ্ছে ব্যস্ততা
এই যাপন কাল্পনিক নয়

এই যাপনে প্রেম নিবেদন আছে, অপেক্ষা আছে
ক্লান্ত দুপুরে হাতপাখার শব্দ আছে
শুধু চেনা গন্ধ আর চেনা নেই
তাই এ যাপন আমার হতে পারে না
যে ঘরে মাকড়সার জ্বাল নেই
সে ঘর আমার হতে পারে না


সমরেন্দ্র বিশ্বাস

যদি কিছু পার আমাকে শেখাও

চুপ করে রইলে কেন?
এই আমার তীর ধনুক,সাজ-সজ্জা,কবচকুন্ডল
তোমার পায়েই রাখলাম।

মেঘে মেঘে বৃষ্টি নেই,
রৌদ্র উত্তাপহীন,
সময়ের চিন্তাগুলো ঘসা ফিল্মের মতো ঝাপসা।

কে কার কাছে কি ভিক্ষা চাইবে?
এই শহরটাও জনহীন তৃণভূমি,
চোখে মরুমায়া।

যদি কিছু পার আমাকে শেখাও
প্রেমতত্ত্ব,বেঁচে থাকার কথা,
আগুন জ্বালার রহস্য।

চুপ করে রইলে কেন?
এই আমার তীর ধনুক,সাজ-সজ্জা,কবচকুন্ডল
তোমার পায়েই রাখলাম।


তুলসীদাস ভট্টাচার্য

কবিতাঘর

যা লিখি সবটাই কবিতা নয়
যা বলি পুরোটা সত্যি নয়

আপোষ করে কতদূর আর যাওয়া যায় ! 

স্বচ্ছ জলের ভেতর যেভাবে নুড়ি পাথর স্পষ্ট হয়ে ওঠে
সেভাবে যদি প্রতিটি অক্ষর অমোঘ শক্তি নিয়ে
জেগে থাকে জলের উপর 
সেটুকুই কবিতা বাকিটা ভেজাল।

টবে টবে বনসাইয়ে যে প্রকৃতি প্রেম 
প্রকৃতি ও প্রেমের  তা ভুয়ো ছাপ 

আতরমাখা মৃত জ্যোৎস্নায় সালোকসংশ্লেষে কার্যকরী নয় ।

কবিতার পথ ধরে যতটুকু হাঁটা যায়
ততটুকুই কবিতাঘর ।



অনিমেষ সিংহ

সাদা রঙের প্রলেপ

আমি কালো মানুষ ছিলাম। আমার পায়ের পাতাও ছিলো কালো।
ওরা আমার চামড়ায় ঢেলে দিলো দু'টাকার চাল,
এক কুঠুরির ঘর এবং
টিভি সিরিয়াল।

আজ আমিও সাদা চামড়ার মানুষ। অথচ, পায়ের পাতাগুলো ভীষণ রকম কালো হচ্ছে রোজ।
সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরছে।

আমার পাহাড় মারাংবুরু,
আমার নদীজল,
ভাঙছে তারা ভাঙছে

পৃথিবীর সব কালো মানুষের বুকে সফেদ ঘোড়ার দল।

ভাঙছে তারা ভাঙছে, বিন্ধ্য-হিমাচল।

পাহাড়ের বদলে তারা দিলো পতাকা দু'হাতে।
নদীর বদলে দিল মদ।
অরণ্যের বদলে দিল নিটোল শহরে, নাচ ও গানের অধিকার।

কয়েকদিন আমি সাদা থাকলাম।
সাদা থাকল কয়েকদিন,আমার চামড়া।

এখন সাদা চামড়ার স্মৃতি নিয়ে পড়ে আছি।
শহুরে জলসায় আমার সাদা চামড়া ভাসে।

আমিও ভেসে থাকি রোজ, মদের গেলাসে।

এইতো চেয়েছিল রাষ্ট্র

শুভ্র স্বপ্ন দিয়ে সব কালো মুছে দিতে।


বিদিশা সরকার

চালান

খোপ থেকে খোপের ভিতরে চালান হচ্ছে সমস্ত আংঠা,
সুদে আসলে উশুল করে নিয়ে ফিরে গেছে থিয়েটার কোম্পানি --
পায়রার ডানার আওয়াজ,না হাততালি হরবোলার পাল্লায় বাটখারা নেই
 নেই কোনও দোকানদারি বা ঝুঠো গয়নার বিষয়ে আগমার্কা ছাপ

ক্রমশ কুকড়ে যেতে যেতে অপারেশন থিয়েটারে সংজ্ঞা লোপ
যোনি ফুঁড়ে দৈব ওষুধনিরাময় সম্পর্কে বাকি কথা 
স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে
পারিবারিক রিক্রিয়েশন

সারিবাদি সালসা সম্পর্কে চীন থেকে বিশেষজ্ঞ সমিচীন
 টাট্টুঘোড়ার লপক ঝপক খামচে ধরছে অন্তরার মুখরা
 সম থেকে সমে ফিরে আসার সময়টুকুই যথেষ্ঠ
" লাগা চুনরি মে দাগ "--

নীলাদ্রি দেব

এলিজি 
প্রতিটি গাছের গায়ে সবুজ লতারা জড়িয়ে যাচ্ছে. আদিমতা সাবান জলে নিংড়ে নিচ্ছি. আবারও পরিপাটি মধ্যযুগ এঁকে নিতে হবে লোমের গোড়ায়. এরপর খিস্তি, খিল্লির সমান্তরালে হাঁটব. পকেটে লবণ শুধু জোঁকের জন্য নয়. প্রিয় বন্ধুর মুখ মনে পড়ে. এতসবের পর হোয়াটস্যাপ জুড়ে জল শুকিয়ে যাবার ছবি. অথচ ভুলে যাচ্ছি শোক ও জলতল এখনও সমানুপাতিক

হয়তো সমঝোতা ঠেলে নিজস্ব মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি নেবার ট্রেনিং দিচ্ছেন কেউ ।



জয়দীপ চক্রবর্তী

বৃষ্টির মাস
  
যে শব্দ লুকানো,তারই ডাকনাম আলোলাগা মন
সেদিনের ভার্চুয়াল চোরাটান,বন্ধুতার লাগাম
শব্দহীন তরঙ্গের নীরবতার শুশ্রুষা লেখা জখম
যেটুকু নিজের জানি ব্যথাতুর ফুলের বাগান।

তুমিও এসেছো?মনের জানালা মাপে ভার্চুয়াল জ্বর?
যে আলো হারাবার নয় ফিরে আসে উদাহরণ রোহিত
একাকী অন্ধকারে বিষন্ন পথিক,শূন্যতার সংস্রব
অন্তর্গত আষাঢ়ের টাপুরটুপুরে ধুইয়ে হারজিত

যে মনখারাপের গান নেই,সেইখানে বিনিদ্র শোক
যৌবনের দেনার যাত্রিক,লুকানো পথের সমাজ
সহজ জেনেছে আকাশের নিচে কুঁড়ে ঘরদোর
সমস্ত অবুঝের বিনিময়ে সেজে উঠো বৃষ্টির মাস...


শবরী শর্মা রায়

রঙ

পাগল রঘুকে দূর থেকে দেখি
দেখি মানুষ কতটা হয় মানুষ যেমন
মুখে কত রঙ পাল্টায়
এত রঙ সে কেমন করে সামলায়
দু'একজন পথচারী ভিক্ষার থালায়
টুংটাং রঙ ফেলে যায়

দূর থেকে এত রঙ আমি কুড়াতে পারি না...

সুমিত্রা পাল

যে জন আছে মাঝখানে

ফুলবাসর সাজানো ছিল
ছিল আমন্ত্রণ লিপি
বুকের মাঝে ছিল
গুড়গুড় মেঘের গর্জন
আর সাত পাকের সাত জন্ম।

সবই তো ছিল
ছিল দোয়েলের শিস
লাল চেলি রক্তকরবি
অগুনিত স্বপ্নের ওড়াওড়ি
সুশীতল ছায়া, প্রাণের শুশ্রূষা
এপার ওপারের মগ্ন মৃত্তিকা...

তবু মাঝখানটা জুড়ে
কেন যে এত অস্পষ্ট ছবি
সীমান্ত আর কাঁটাতারের বেড়া!



মন্দিরা ঘোষ

অবাধ্য কথার আঁকিবুঁকি 


দিন থেকে দিনের খেয়ালে
আলো আলো কথার সেলাই
বুকের নোটবুকে থৈ থৈ গোলাপ
ভেজানো  দরজায় সংকেত
ভয় হয় হঠাৎ যদি ফিরিয়ে নাও
তোমার তুমুল শব্দের চোখ


চোখের  আবদারে
ভাঙছি  তুমুল ঢেউ
হাত মাখছি হাতে
চোখের ভেতর চোখ
ঠিক তখনি অন্ধকারে 
জেগে উঠল  ঠান্ডা ঠান্ডা
কুল কুল আর
ট্রে ভর্তি পপকর্ন


একটা দুটো  তিনটে....
শব্দপালক
দোল খেতে খেতে ঘরময়
হুঁশ ফিরল যখন
তখন বিকেলের আলো
গুছিয়ে দিয়েছে  ঘর
মাঝবরাবর
মোবাইলের রিংটোন
মুখ্য সচেতক  কখন


মেঘ বৃষ্টি  আর তুমি মিলিয়ে
একটা ত্রিভুজ  আঁকলে
খুব ঝড় হয়
দুটি  মুখোমুখি  চায়ের কাপ
বাষ্প গুলি মিলে মিশে
একটি হাওয়া সেতু



গোলাপি ঠোঁট
চুমু এবং যা কিছু স্বপ্নময়
সেই সব বাস্তব
হেঁটে ফেরে উদাসীনতা এঁকে
তোমার চোখের ভেতর
অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি
তোমার ভ্রুক্ষেপহীন চোখ


ফিরে যাওয়ার পরও
ফেলে যাও ফেরার অভ্যেস
শূন্য  বারান্দায় ভাঙচুরের মেঘ
বিষন্ন রেলিংয়ে শেষ আবদারের
গুঁড়ো লিপস্টিক
কান্নার দোলনায় পিয়ানোকথার দুপুর
বৃষ্টি বিকেল একা একা
গতজন্মে ফিরে যায়



এই সব অবাধ্য আঁকিবুঁকি
অন্তঃসারশূন্য  খোলস
তবু চোখ বুজে আসে
এক কবিতার অন্ত্যমিল
যেখানে এসে মেশে পাখির গান
শীৎ এর  লুব্ধ প্রলাপ
আর ঝুরো ঝুরো বৃষ্টির আহ্লাদ