৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা ২১ অক্টোবর ২০১৯

এই সংখ্যায় ৩০টি কবিতা । লিখেছেন - চয়ন ভৌমিক, সুবীর সরকার, দীপায়ন পাঠক, জয়দীপ চক্রবর্তী, পাপড়ি গুহ নিয়োগী, মৃত্তিকা মুখোপাধ্যায়, শ্যামশ্রী রায় কর্মকার, উমা মাহাতো, বিদিশা সরকার, ফিরোজ আখতার, নাসির ওয়াদেন, রমা সিমলাই, সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য, গৌতম কুমার গুপ্ত, ওয়াহিদ জালাল, কোয়েলী ঘোষ, সেলিনা জাহান, মুজিব ইরম, নীলাদ্রি ভট্টাচার্য, সাইদুর রহমান মিলন, সতীনাথ মাইতি, খাতুনে জান্নাত, শুভাশিস দাশ, তন্ময় চট্টোপাধ্যায়, মলয় সরকার, ইন্দ্রাণী সরকার, সুমিতা মুখোপাধ্যায়, মৌসুমী চৌধুরী, দেবলীনা দে ও মহুয়া সমাদ্দার । এবং শুভেচ্ছা বার্তা শর্মিষ্ঠা ঘোষ । 
শুভেচ্ছা অন্যনিষাদ

শর্মিষ্ঠা ঘোষ

অন্যদিকে হাঁটে কেউকেউ । দলছুট কিন্তু ঋজু । চকচকে মোড়কহীন অথচ সলিড । চলছে কিন্তু দাগ রেখে যাচ্ছে । সাথে নিয়ে দৌঁড়চ্ছে । হাত ধরে টেনে আনছে আনকোরা । তুলে ধরছে জাগতিক বিস্ময়ে । তাদের শেকড়ে অনেক প্রশ্রয় । শাখা প্রশাখায় ভরসা । বাহুতে আশ্রয়। অন্যনিষাদ তেমনি কেউ । তেমন কিছু । নতুনের আড় ভাঙানো স্প্রিংবোর্ড । পুরনোর কাঁধে হাত রাখা বন্ধু । একটি মানুষ। একক নয় । সব্যসাচী । প্রাচীন প্রজ্ঞা । পরিমিতি । কাঠিন্য । স্নেহ রসে জারিত । মশাল হয়ে কাটছে অন্ধকার । শালপ্রাংশু মহাভূজ । গাঁইতি হয়ে ঘা মারছে অচলায়তনে । কুচো পানা টেনে নিচ্ছে স্রোতে । চিনিয়ে দিচ্ছে অনন্ত গতি । সূর্যোদয়ের দিকে । তীব্র লড়াই রক্তে । মতবাদে স্হির অবিচল পর্বত । সানুদেশে সবুজ বিচরণ ক্ষেত্র । লকলকিয়ে বাড়ছে সবুজ । ভরে যাচ্ছে ঊষর ধূসর । সজলা এ বরাভয়ে সুফলা হচ্ছে সৃষ্টি কৃষ্টি । সোনার ধানে ভরে যাচ্ছে কোঁচড় । টুংটাং সুরেলা বিষাদ । জলতরঙ্গের লহর বেয়ে মালিন্য পেরিয়ে দিন আনতে যাওয়া । স্বপ্নের । নরম । সম্পৃক্ত । ফলবতী । অন্যনিষাদ মানে অন্যরকম শুধু নয় জীবন জারিত বহমানতা । অতল থেকে মুক্তো কুড়োনো দুই বলিষ্ঠ হাত । পাশে থাকলে ছায়া হয় । ক্লান্তি জুড়োয় । তৃষ্ণা মেটে । শুভ জন্মদিন অন্যনিষাদ । শুভেচ্ছা আর অফুরন্ত ভালোবাসা ।

চয়ন ভৌমিক

স্বচ্ছতা অভিযান

এখন সব স্পষ্ট।

ঝাঁটা হাতে দাঁড়িয়ে আছো আলোয়,
চকচকে ছবিতে হাসি মুখ,
বিজ্ঞাপনে পরিচ্ছন্নতার
সুতীব্র উদ্যোগ।

এখন সব পরিস্কার -
আলোর পিছনে ঘন অন্ধকার
ঢেকে গেছে নিপাট ঔজ্জ্বল্যে।

ভ্রম হচ্ছে না আমাদের একদম,
বাহুল্যসূত্র মেনে আমরা বুঝে নিয়েছি
আসল ও নকলের আশ্চর্য ক্রীড়াকৌতুক।
আলনা / চয়ন ভৌমিক

ঋতু ভাঁজ করে রাখা আছে।

এ এক আশ্চর্য বর্ণালী,
পাশাপাশি গুছানো, যেন
সাজানো সংসার - মনপসন্দ
আলো-হাওয়া-জল।

চলো খুঁটে নিই জীবন চক্রাকারে,     
শুরু ও শেষ পর্যন্ত এভাবেই ছুঁয়ে থাকি
পরস্পরকে...

সুবীর সরকার

এন আর সি

হামিদুল রাষ্ট্রহীন হবে
তপন বর্মনের কোন দেশ থাকবে
                                           না
ডিটেনশন ক্যাম্পের ছবি দিয়ে সাজিয়ে
                               তোলা হবে কালিপুজোর
                                                  প্যান্ডেল
ফ্যাসিজম থেকে হল্লা ছুটে আসছে
পাখিরাও জেনে গেছে এন আর সি
ফড়িংয়েরা চিনে নিচ্ছে আদ্যপান্ত এই
                                            নরক



দীপায়ন পাঠক

অন্ত্যমিল  

জীবনটা একটা সরলরেখা 
মানুষ  টুকরো করে , তৈরি করে 
যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ 

জীবনের আবেগ নেই 
মানুষের থাকে, যেভাবে থাকে 
শিশ্ন, যোনী, কাম, বিকৃতি 

জীবন শেষ হয়না 
মানুষ হয় , উত্তর খোঁজে 
রোগে, ভোগে, যৌনতা, ধর্ষণে

আসল কথা , জীবন অন্ত্যমিল জানেনা 




জয়দীপ চক্রবর্তী

দিনলিপি

ফিরে আসবে যেভাবেই হোক,করে নাও মনস্থির
তোমারই নদী,খেতখামার,ইচ্ছে নদীর নীড়

প্রতিটা আরম্ভ লেখে সমাপ্তি,আমার,তোমারও
ফেরাতে লেখো দ্বিধাহীন প্রস্থান,নাহলে মনোমতো

এ জেনো এক ইচ্ছে ঘুড়ি,তোমার হাতেই লাটাই
একবার বলো অভিমান,অভ্যাসের রুট বদলাই

এবারের শরৎ ছলাত্ নির্জনতার,ব্যথাতুর মন
বৃষ্টি আসে,বৃষ্টি থামে,মেঘে করে আসা জীবন

এই সব নিচু হয়ে আসা দিন রাত্রি,পিছুটান
চেয়ে দেখো মন,তোমার হাতের লাগাম

শেষ বাসের চলে যাওয়া,একা করে সীমান্ত শহর
গভীর অন্ধকারেও আলো ফোটে,যদি চাও ঘরদোর

ফিরে আসবে যেভাবেই হোক,করে নাও মনস্থির
তোমারই নদী,খেতখামারে,ইচ্ছে নদীর নীড়

                  

পাপড়ি গুহ নিয়োগী

অসুখ

যতবার ডাক্তার-রোগীর  সম্পর্ক  আঁকতে চাও  
এঁকে ফেলো অভিযোগ

চিকিৎসা আঁকতে এত তাড়াহুড়ো করো
এঁকে ফেলো মৃত্যু  

 এসব ঈশ্বরকে জড়িবুটি টোটকা নিরাপত্তা দাও

 সমস্ত মৈথুন শেষে চিড় ধরেছে কি কোথাও
পারস্পরিক বিশ্বাসে


মৃত্তিকা মুখোপাধ্যায়

হারাই ক্ষণে ক্ষণ

আড়াল করেছো সব ভয়-
দগ্ধ দুপুর কিংবা নিঃসহায় রাতে
আমার দরজায় যখনই এসেছে চাঁদ অথবা সূর্য
কখনও রোদ, কখনও বা জ্যোৎস্নার ভিক্ষাপাত্র হাতে
চোখ বুজে আশরীর বাজিয়েছি তোমাকেই,
মুক্তিকামী কন্ঠির সহজ বয়ে যাবার মতো
পথ দেখিয়েছো বারবার.....
আমাতে তুমি তাই নিত্য‌ই নতুন

শ্যামশ্রী রায় কর্মকার

একুশতম নীরব সকালে 

কুয়াশার্দ্র হয়ে আছে আমাদের প্রেমের নরম
কাচের শার্সি জুড়ে কালকের আদরের দাগ
বিশদিন হয়ে গেলো, কথাও হয় না আমাদের
বাতাসে কদমগন্ধ, হাতের পাতায় লেগে রূপালী বিভ্রম 
চুলের প্রান্তে কিছু কুচো মেঘ, ভ্রুসংকেতে ঢেউ 
দক্ষিণের বারান্দায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠা তোমার গিটার 
আজ দ্যাখো,  শুয়ে আছে, নীলাভ-ধূসর পায়রাটি
বৃষ্টির ক্ষুরের শব্দে সোজা হয়ে বসেছে বিষাদ
ঘুমন্ত ঠোঁটের পারে খণ্ডকাব্য হয়ে আছে অশ্রচিহ্নগুলি 
আমার প্রেমিক, শোনো, 
ভেঙে দিচ্ছ,ঠেলে দিচ্ছ অপার সিন্ধুতে
এত যে জলের শব্দ,তুমি একা পারবে বাঁচাতে? 
ডুবের গভীরে শুধু অন্ধকার, পিপাসারা মুখ চেপে ধরে 
শীতলতা মধুরম্,  স্রোতস্পর্শ ওঁম মধুরম্
জল ছেঁচে কে জানে কে উঠিয়ে নিয়েছে সব শালুকের বীজ
এখন কোথাও কোন ফুল নেই,কুচো দাম নেই
দুঃখ তার শিখিপদ্মে রেখে গেছে দাক্ষিণ্যের হাত



উমা মাহাতো

এপিটাফ

সেই পথে,সেই প্রশ্বাসে
ঘাসের হৃদয়ে দ্রুত ছাপ রেখে ফিরে এসেছি
হরিণ-হরিণী।

নগরের প্রথম দূষণ-
থাবা এড়িয়ে ফেরার পথে দাঁড়িয়েছিল অচিন গাঁয়ের ঘাতক ;
জল থেকে উঠে এসেই অসুস্থ হয়েছি।

এই যে মৃত্যু-শীতল নদীটি 
সাঁতার জানিনা বলে আজীবন,দুই পাড়ে পড়ে আছি দুজন,
লিখে দেবে সমাধিফলক অযাচিত একখানি-

 'যেখানেই থেকো  ভালো থেকো,ফেলে দিয়ে সবুজ,
ভালো থাকার  পারাণি।


বিদিশা সরকার

নভেলেট 

ভালবাসা মিথ্যে হলে
কিছুটা দার্শনিকতা অতিমানিতার কাছে
জবাবদিহি।
এরমধ্যে গোটা একটা নভেলেট
জমা পড়লো অমুক পত্রিকায়।
কবির নিজস্ব পথে টর্চ নেই
চোখে বিচ্ছুরণ.....

সে তখন নদীর কাহন।
পারাপার
সেতু
ক্ষীণকটি,
এ নদীতে ভাসান হয়নি

আত্মগত কিছু কথা ভেসে যায় উজানের দিকে --

কোনো ঘরই মিথ্যে নয়
কোনো আপ্যায়ন
চারণের জন্য শুধু পথই ছিল
আলেখ নিরঞ্জন!
খুব রাতে শব্দ শুনি
পাড় ভাঙে শ্রমিক রফিক,
তেলরঙ নিয়ে বসি
হ্যারিকেন ছবিতে না,
মুখে।

ফিরোজ আখতার

প্রতারণা

ফিঙেরা আসে ও ফিরে যায়
আশ্বস্ত করতে পারে না

সেখানে বন্য পশুকে আগুনের উপরে বেঁধে
পোড়ানো হয়; ভক্ষণ করা হয়
ফিঙেদের ডাক লবনের কাজ করে...

সাদা তন্তু'র সাথে
পাখিদের নাব্যতা মিশে যায়
সুস্বাদু হয় ঝলসানো মাংস... আরও ৷


নাসির ওয়াদেন

পরনির্ভর পরবাসী
              

পুরোনো ছাতার মতো
  অহংকারগুলো
ঝুলে আছে ভোরের স্নিগ্ধ ছায়ায়
 
সংস্কারের অছিলায় নদীর পাড় ভাঙে
যৌবনের জলোচ্ছ্বাসে, কামনায়
 

তছনছ করে ঢেউ নিস্তব্ধ আলোছায়া
মেখে অলীক ফুলবনে ময়ূরীপুচ্ছ নাচে
ঘোমটা খুলে হাসে কালের ছায়া
                               রাত্রির  উষ্ণ আঁচে

শীতল ভালবাসা জমে জমে ক্ষীর
                     সৌহার্দ্যে সবুজে অবশেষে
জীবনের ভাঙা স্তম্ভ গুলি
                    এক এক করে
                       সরে যায় দিগন্তের দিকে
পরনির্ভর পরবাসী আকাঙ্ক্ষাকে
অন্ধকারে খুঁজে বেড়ায়
                                   হারানো স্বদেশে
                      



রমা সিমলাই

অলৌকিক

ভালবাসা
প্রেম
শ্রদ্ধা
বিশ্বাস
সহমর্মিতা
অভিমান

- আশ্চর্য বাতিস্তম্ভে সবটুকু জমা রাখলাম,
যাতে
সময়
শরীর ছাড়া
আমার আর কোনো কিছুই পোড়াতে না পারে !

অলৌকিক পাণ্ডুলিপি নিয়ে অহঙ্কারী হবো,
এমন একলব্য নই আমি

ভিতরের ঘর ঈর্ষায় পুড়ে ছাই হয়ে গেলে
নীলকণ্ঠ হয়ে, তোমাদের পুজো পাবো
এ আমার সৌখীন ভবিতব্য

এই সত্যি জেনে কাল উড়ে গেল নীলকণ্ঠ পাখি
তখন নরম চাঁদ
ভিজে যাওয়া একরাশ রূপালী রূপকথা নিয়ে
আমার ঠোঁটে চিবুকে
নাভিতে
চুমু
মৃগনাভি সোহাগ কি কবিতার দায় নিতে জানে!!!

তবে আমিও দেবযোনী

ঈশ্বরী,ঈশ্বরী,একরাত দুর্যোগ শরীরে সাজিয়ে
অপেক্ষায় থাকলাম

আমার অষ্টম গর্ভের অনন্তশয়ান
শুধু তোমার অপেক্ষায়

এসো কিন্তু  !!!


সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য

বোধ

ঐ পুষ্করিণী,রাণী কমলা ও জাদুকরী বিকেল
একটা চড়ুই দম্পতি,অনন্ত ঘূর্ণন আর মায়া সংসার চোখের জল ফেলার প্রক্রিয়া,সাধুবাদ
ইলিশ ভাপা বা বিচেকলার পাতুড়ির মত এখন 
এক একটা ইভেন্ট।

কতবার তো দেখা হল
কতবার তো শূণ্য দৃষ্টিতে প্রেমের ছোঁয়া আনার 
ব্যর্থ প্রচেষ্টাও  হল
লঙড্রাইভ,সূতাকলের মাঠ কিম্বা
কেষ্ট কিসসার উপমান উপমেয় যোগে
চায়ের আসরও।

বারবার নিজেকে ভাঙার চেষ্টা করেও
কেন বিফল হলে তুমি?আসলে
এত ন্যাশন্যাল,মাল্টিন্যাশন্যাল করতে করতে
ভেতরের সবুজটা ফিকে হয়ে গেছে বৃষ্টিহীনতায়
বুঝতেই পারনি

শ্রাবণ না আষাঢ় না আশ্বিন 
কাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে 
বোঝার চেষ্টার শুরুটাও করতে বড় দেরি করে ফেলেছো।

এখন ভাদ্রমাস।
কখনও ঝালর কখনও উড়নিতে মুখ ঢাকার প্রয়াসে বড় চাপানউতোর
সব কিছু বড় অশান্ত এখন
মুখ লুকোনোর আয়নার পরিসরও ছোট।

সুগন্ধি ধুয়ে গেছে 
যদিও রেশ আছে বাতাসে
রেশ আছে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া সুরেরও
আসলে কাঁদতে হবে
অবিরাম অবিশ্রান্ত টানা

এ কান্না একান্ত তোমার। 
ভালবাসায় ভরে আছো কানায় কানায়
ছাতিম না গোলাপ কাকে দেবে
বুঝতে পারছো না তুমি
এই বয়ে চলা শূন্যতায়।

এ শূন্যতা অপার
আগে পরিপূর্ণ হও নিজে

|ইতিকথা

ইগোটা ঝেড়ে ফেলুন
হাতটা উপুড় করুন
দেখুন চোখের পাতায় ঘুম নামবে
কালিদাসের শকুন্তলা 
আর আঙটি হারাবে না
দেখবেন কাচ আর হীরে 
চিনে নিতেও আর অসুবিধে হচ্ছে না
উত্তীয়র উষ্ণীষে রঙীন পালক 
সাজানো হবে পরপর
উত্তরীয়র বদলে উড়বে

একটা রুমাল শুধু, ডেসডিমোনা

|হে অঙ্গরাজ

এক শ্রাবণ মাসের ইতিহাস থেকে গড়িয়ে নামছে সন্ধ্যে।ছড়িয়ে ছিটিয়ে কুরুবংশর রাজপুত্রগণ।
এক বৃক্ষের তলে বসিয়াছিলেন পাংশুমুখে পাশুপত অস্ত্র অর্জনকারী পাণ্ডুতনয় অর্জুন।একটু দূরেই বনমধ্যে শায়িত ঘটোৎকচ পিতা ভীম।ব্যজন রতা হিড়িম্বা।তাঁর ভ্রাতা হিড়িম্ব পাহারায়।
তর তর করিয়া নামিয়া আসিলেন পর্বত শীর্ষ হইতে
দর্পণ হস্তে নকুল ও অকৃপণ সহদেব।
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির তখন আপন শয়নকক্ষে হস্তিনাপুরে দ্রৌপদীর জন্য অপেক্ষারত।
ঝুমঝুম কৃষ্ণা আসিলেন।পদপ্রান্তে বসিলেনও।তৎক্ষণাৎ ঝনঝনাৎ স্মৃতি উজিয়া আসিল।
           দ্রুপদ রাজ সভায় মৎস্য চক্ষু ছেদনকারী তৃতীয় পান্ডবকে অতিক্রম করিয়া যে চক্ষু তাঁকে তাড়াইয়া বেড়াইতেছে অবিরত সেই অঙ্গরাজের দৃষ্টি ও প্রতিটি অনুষঙ্গ।অনবরত রিমঝিম রিমঝিম ক্রমশ অবশ করিয়া দিতেছে তাঁকে।এ তৃষ্ণা নিবারণের নয় তাই ব্যাপ্তি গভীর হইতে গভীরতর হইতেছে ক্রমশঃ
হে রাজন,গোপনে গ্রহন কিম্বা বর্জন করুন ক্ষতি নাই কিন্তু সমভিব্যাহারে নারী বিবর্জিত আপনার কষ্টার্জিত আস্ফালন বড় বেমানান।
বিমুখতা পেরিয়ে বারংবার তাহা কষাঘাত করিতেছে কুরুকূলবধূর অন্তরে।
পাণ্ডু পুত্রগণ মাতা কুন্তীর তত্ত্বাবধায়ক।
আপনি কোথায়?মাতার অন্তরের সহিষ্ণুতা ও সকল সৌন্দর্য যে আপনাকে আরও উজ্জ্বল করিয়াছে। জ্যেষ্ঠ কুন্তীপুত্রের অভিমানে আচ্ছন্ন হইয়াছেন দ্রৌপদী।
আপনাকে যে অস্বীকার করিয়াছিলাম একদিন,তাহা ছিল কূটনীতির অন্তর্গত স্বরাষ্ট্র দফতরের এক রাজনৈতিক চালমাত্র।না হইলে হস্তিনাপুরের কুরু-পান্ডব আঁতাত বৈধতা পাইত না কোনওদিন।যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা আপনারই বিনাশের আয়োজন ছিল।
রাজা শান্তনুর পর থেকে আসলে ভারতবর্ষ শাসন করেছে  জারজ সন্তানেরাই।কূলশীলা বধূবরণ এক পরিহাসমাত্র।
হে সূর্যপুত্র,জন্মান্তর বিশ্বাস তীব্র হইতেছে। 
একটাই বিনীত প্রশ্ন করিতেছি আপনাকে অঙ্গরাজ,
তবে এজন্মে আপনিই কি চে'গুয়েভারা যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে কবিতা লিখিয়াছেন?
প্রথম কৌন্তেয় হিসেবে সমস্ত অবিচারের বিরুদ্ধে যাজ্ঞসেনীর রক্তিম অভিবাদন গ্রহণ করুন কমরেড।



গৌতম কুমার গুপ্ত

যতোবার লিখি 

যতোবার  লিখি  বিশ্বাস
একটা ফড়িং উড়ে এসে বসে
       শুঁড় নাড়ে
মিহি নিঃশ্বাসে জুড়ে থাকে পৃথিবীর আলো
অবিশ্বাস থেকে ছিটকে আসে নিভু জ্যোৎস্না
অন্ধকার কারাগৃহ কেঁপে ওঠে বুকে।

নিমিত্ত হয়ে খুঁজি সহিসের চাবুক
ঘোটক দুর্বিনীত হয়ে দ্রুত আশ্বাস রাখে 
অজন্তা ইলোরা যে ভাবে উন্মুখ থাকে দৃশ্যে
আমাদের সহজ বিশ্বাস রেখে আসি 
নগ্ন নীচু শরীরে।

যদি আসে সুখ সেই তো প্রত্যয়ের বপন
দুঃখ নিম্নবর্গীয় অবিশ্বাসের কীটপতঙ্গ
আড়াল করে রেখে চলি 
ব্যবহার জুড়ে থাকে প্রবল সত্যতা
মিথ্যা বেসাতি বোনে ভীরু সন্দিহানে।

অবিশ্বাস কাহিনী জুড়তে থাকে
অযাপিত যাপনে।



ওয়াহিদ জালাল

স্নেহের চেয়ে সন্ন্যাস বড় নয়

মানস বৃন্দাবনে ভৌগোলিক নীলাচল
চিৎকার করে বলছে
অন্ধকারের স্নেহের চেয়ে সন্ন্যাস বড় নয়।
যে বেদনায় আত্মহারা হয়ে
ভাষার বদল করে উল্লাসের সাথে
সে সত্যের সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের
অভাবে মোমের দর্শন অনায়াসে ভুলে যায়।

একটি হাত যখন বুকে এসে লাগে
অন্য হাতটির কত বেদনা অনুভব হয়
তাকে জিজ্ঞেস করে দেখো,
যে চিরকাল ফুল তুলে মালা গেঁথেছে
কখনো পরাতে পারেনি কারো গলায়,
তার অজ্ঞাতপূর্ব একটি তৃষ্ণা
মিলনের তীব্র কামনা হয়ে আজো
মনের মন্দিরে দ্বারোউন্মোচনের এক একা রহস্য।

আশা অবশ্য একদিন অনুস্মরনীয় প্রথায়
প্রচলিত হবে সেজন্য কোন সম্পর্ক তৈরী করে
তাকে মূর্তির সীমানায় অবন্ধ করে রাখতে নেই,
সম্পর্ক জীবনের শেষ নিশ্বাসটি ছুটে যাবার
মূহুর্তপর্যন্ত সাধনপথের তালুক খুঁজে বেড়ায়,
মানবহৃদয় বড়ই অবুঝ,
পাথরেও তাকে ভাঙা যায় না।

আজ আমি চিত্তের প্রবণতা অনুযায়ী
নিজের পিছু-পিছু ছুটছি,
আমার আত্মঘোষনার তীক্ষ মানসিকতা
আপন উচ্ছাসের প্রবল প্রবাহে
চিন্তা ও উদ্দেশ্যকে ভাসিয়ে নিতে নিতে বলছে,
এই পৃথিবীর সাথে বহুবার আবির্ভাবের কথা নিয়ে
তর্ক হয়েছে তোমার।

কোয়েলী ঘোষ

সিদ্ধান্ত

সবাই আমার আপনজন
এই ভেবে হাত বাড়িয়েছি যখন
বার বার ধারালো কাঁচি কিংবা ব্লেডের মত
তীক্ষ্ণ শব্দ দিয়েছ গেঁথে ।
সে জ্বালা আর ক্ষত বুকে
অন্ধকার তমসায় বিষাদে ডুবে ডুবে ,
জলে ভেসে ভেসে ভেবেছি ,তোমরা আপনজন ।
ছেঁড়া ঘুড়ির মত সম্পর্ক জুড়ে জুড়ে
উড়িয়ে দিয়েছি আকাশে , নিঃস্বার্থ ,
গেছে মুছে আমার অস্তিত্ব , হাসিমুখে
মিলিয়ে মিলিয়ে চলেছি পথ -
নীরব ,নিঃস্পন্দ সময় এখন ।
পর্বতপ্রমাণ অভিযোগ করেছ জমা
জীর্ণ শরীরে চলি এ ক্লান্ত দীর্ঘ পথ
যে যেখানে আছ ,থেকো নিজের মত
জুড়ব না আর কোনখানে , কোনখানে ।


সেলিনা জাহান

নির্জনতা ডেকে নাও

চারপাশের সব কোলাহল সরিয়ে
নির্জনতার কাছে গিয়ে দাঁড়াবো ভেবেছি,
কিন্তু নির্জনতার মুখোমুখি হতেও যে শক্তি লাগেে
সেই কথা ভাবিনি এতোকাল।
আমি তবে কি আঁকড়ে পড়েছিলাম এই বদ্ধভূমে?
কিছু অপ্রয়োজনীয় স্বপ্ন? যা তেমন কোন জরুরী ছিলো না
জীবনের জন্য? যে স্বপ্ন অস্থায়ী করে তোলে সুখ
আর কষ্টের স্থায়ীত্ব নিয়ে বসে যায় মনের চৌকাঠে
তাকে কি করে এতোটা পার্থিব করে তুলতে পারি?
দুঃখের প্রতি অবিরাম হেঁটে যাওয়া আমি
চির আনন্দের সুখ ভুলেছিলাম কি ভীষণভাবে!

যতোবার যোগবিয়োগ নিয়ে বসেছি,
ততবার ভুল করেছি, হিসাব করা আমার চিরকালের অপ্রিয়
কিন্ত হিসাবের বাইরে তো সে এক পাও হাঁটলো না,
একটি শব্দও লিখলো না, বেহিসাবি শব্দ গুনে গুনে,
ভুল ভাল তবু লিখে রাখি প্রতিদিনের ডায়েরিতে।
এক রুপকথা মিলেমিশে একাকার হলো চোখের জলে,
এক স্বপ্ন উড়ে যাবে বলে বাতি জ্বালালো
ফানুসের ভিতরে, আর উড়তে উড়তে
মেঘের কাছে গিয়ে নিভে গেলো চুপচাপ।

আমি আর কোন স্বপ্নকে জরুরী মনে করিনা জীবনের জন্য।
আমায় নির্জনতায় গিয়ে দাঁড়াবার সাহস দাও।