৯ম বর্ষ ৯ম সংখ্যা ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০

এই সংখ্যায় ৪২টি কবিতায় ভাষাপ্রণাম । অলক বিশ্বাস, নন্দিনী সেনগুপ্ত, তৈমুর খান, রত্নদীপা দে ঘোষ, বিজয় ঘোষ, সৌমিত্র চক্রবর্তী, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমিত্রা পাল, ইন্দিরা দাশ, শর্মিষ্ঠা ঘোষ, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, সুবীর সরকার, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, উমা মাহাতো, চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, অনুপম দাশ শর্মা, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, কাজরী বসু, অরুণ সেনগুপ্ত, শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়, চিরশ্রী দেবনাথ, সবর্না চট্টোপাধ্যায়, সোনালি ভট্টাচার্য মুখার্জী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, খাতুনে জান্নাত, তপন মন্ডল, নাসির ওয়াদেন, প্রীতি মিত্র, কাজরী তিথি জামান, সৌগত রাণা, সিদ্ধার্থ শর্মা, আফরোজা অদিতি, মলয় সরকার, মনোজ জানা, রত্না মজিমদার, শাশ্বতী সরকার (টালিগঞ্জ) / দেবলীনা দে ও ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় (সম্পাদকীয় / 'একুশের প্রত্যয়')

সম্পাদকীয়


একুশের প্রত্যয় 

আজ বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার শপথ নেবার দিন । এবং সেইসঙ্গে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, সেইসব মৃত্যুঞ্জয়ী ভাষাশহিদদের শ্রদ্ধা-স্মরণের দিনও ।

   গত শতকের নব্বই দশকের শুরু থেকে উন্নত বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞানিরা ধারাবাহিক গবেষণা শুরু করেছিলেন বিশ্বায়ন বা পণ্যায়ন কি ভাবে অনুন্নত জনগোষ্ঠীর ভাষাগত ভারসাম্য এলোমেলো করে দিতে পারে, কি ভাবে ভাষাগত বহুত্ববাদ ধ্বংশ করতে চাইছে সেই বিষয়ে । সেইসব গবেষনায় এক ভয়াবহ ছবি উঠে এসেছিল যে এই শতাব্দীর মধ্যে এখন বিশ্বে প্রচলিত সাত হাজার ভাষার মধ্যে ছয় হাজার ভাষাই লুপ্ত হয়ে যাবে, যদি না ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতাকে ঠেকানো যায় । এই তাগিদ থেকেই বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস পালনের আহ্বান জানিয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ ।

   আমরা ভাবতে পারি, অনেকে ভাবেনও, তাতে আমার কি এলোগেলো ! আমার ভাষাটা তো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে না ! ঠিক, আমার মাতৃভাষা বাংলা এখনো বিপন্নতার সীমায় পৌছায়নি, অদূর ভবিষ্যতে তেমন সম্ভাবনা নেইও । এমন যারা ভাবি তাঁদের জানা দরকার যে জীব বৈচিত্র্যের বিলোপ যেমন মানব অস্তিত্বের পক্ষে বিপদজনক, ভাষা বৈচিত্র্যের হ্রাসও তেমন, হয়তো আরো বেশি বিপদজনক । একটি ভাষার বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানবগোষ্ঠীর স্মৃতিসম্পদেরও বিলুপ্তি ঘটে । একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতিসম্পদ তার লিখিত সাহিত্য সম্পদের চেয়েও মূল্যবান । একটা ভাষার বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে যায় তার স্মৃতিতে ধরে রাখা নীতি, মূল্যবোধ, কিংবদন্তি, প্রবাদ, স্বাস্থ্যবিধি, পুরাণকথা, ভেষজজ্ঞান ইত্যাদি ।

   উন্নত দেশগুলি সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও পণ্যায়নের লক্ষ্য অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ও উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের ভাষাগত ভারসাম্য এবং সেইসঙ্গে মাতৃভাষার আবেগ আমাদের যে সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বেঁধে রাখে সেটিকেও ধ্বংস করা ।  তারা চায় সারা বিশ্ব মাত্র পাঁচ/ছয়টি ভাষায় কথা বলবে । ভাষার নৃতাত্বিক উপযোগিতা তারা স্বীকার করে না । মনে করে ভাষার কাজ শুধুমাত্র সংযোগ সাধন করা । পণ্যায়ন ও ভোগবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আজকের তরুণ প্রজন্মও তাই মনে করে । মনে করে, নিজ মাতৃভাষা উচ্ছন্নে গেলে তার কি ? আর সেই কাজ সুসম্পন্ন করতে তাকে মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়ায় সুচতুরভাবে নিরন্তর কাজ করে চলেছে সবাদপত্র, টেলিভিষন আর বানিজ্যিক বিজ্ঞাপন । । সাম্প্রতিক সময়ের আর এক প্রবণতা – অন্তর্জালের বিভিন্ন সামাজিক পরিসর ও চলভাস বার্তায় রোমান অক্ষরে মাতৃভাষা লেখার ক্রবর্ধমান প্রবণতা । ফলে অনেক আঞ্চলিক ভাষার বর্ণমালা হারিয়ে যাচ্ছে ।
   একুশে আমাদের বড় আবেগের দিন । আবার প্রশ্ন করার দিনও । এই দিনেই প্রশ্ন করবো কেমন আছো তুমি, আমাদের মাতৃভাষা ? বাংলা ভাষার একহাজার বছরের পথচলায় আমাদের কোনদিন কি প্রশ্ন জেগেছে বাংলা ভাষা হে, ভালো আছো তো ?’ না, জাগেনি ।

   এ কথা ঠিকই যে ভাষাবিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলা ভাষা এখনো বিপন্ন ভাষা তালিকাভুক্ত হয়নি, হয়তো হবেও না আগামী একশো বছরে । কিন্তু তার পঙ্গুত্বের লক্ষণ  এখনই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে । ভাষা বিজ্ঞানীদের সূত্র অনুযায়ী কোন জনগোষ্ঠীর শিশুরা এবং নবীন প্রজন্ম তাদের দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার উচ্চারণ থেকে বিরত থাকেন এবং মাতৃভাষার উচ্চারণের দায় যদি প্রজন্মের পর প্রজন্মে হস্তান্তরিত না হয় তবে সেই ভাষার বিপন্নতা অনিবার্য । আমরা সেই দায় পালন করছি না, আমাদের সন্তানকে তার দৈনন্দি জীবনে মাতৃভাষার ব্যবহারে উৎসাহিত করছি না ।   আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার প্রয়োগ থেকে বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ তাই বেড়েই চলেছে । দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষায় কথা না বলার জন্য কত শব্দ যে লোপ পেয়ে যাচ্ছে তার হিসাব হয়তো এখন করছি না,  পঞ্চাশ বছর পরের প্রজন্ম দেখবে অনেক বাংলা শব্দই হারিয়ে গেছে, লুপ্ত হয়ে গেছে

   একুশ আমাদের বড় আবেগের দিন । একুশে বারবার । একুশে তাই আবেদন,আপনার দৈনন্দিন জীব্নে কথা-বার্তায়, আলাপনে, পত্র লেখায়, সাহিত্য রচনায়,কবিতায়,গান গাওয়ায়, হাসি-কান্নায়,কলহ-বিবাদে মাতৃভাষার ব্যবহার করুন, ভালোবাসুন নিজ মাতৃভাষাকে ।

অলক বিশ্বাস / দুটি কবিতা

আমার একুশ

একুশ আমার হৃদয় জুড়ে
একুশ ভালোবাসা
একুশ এলে স্বপ্ন দেখি
একুশ প্রাণের ভাষা।

একুশ আমার মাতৃভূমি
একুশ জননী
একুশ সে তো রক্তস্নাত
একুশ ভুলিনি।

একুশ আমার আকাশ ভরা
একুশ ঘরে ঘরে
একুশ ডাকে ফাগুনরঙে
একুশ রোদ্দুরে ।

একুশ আমার বাউল সুরে
একুশ ভাটিয়ালি
একুশ হাসে সরষেফুলে
একুশ বাঙালী।

একুশ এখন চোরাস্রোতে
একুশ আমার শ্বাস
একুশ তোলে নতুন দাবি
একুশ বারোমাস।

ধান ও বর্ণমালা

আমার যা কিছু সমর্পণ ফুলেদের কাছে
লিখে রাখা হৃদয়কথা বেজে ওঠে রোদ্দুরে
নদীর স্রোতে লিখতে প্রতিবাদ
যা মায়ের ভাষায় আছে।

তোমাকে আগলে বুকে
জ্বেলেছি প্রদীপ দ্বীপে
একদিন সকাল হবে
তারপর অধিবাস, সঙ্গীত দিকে দিকে।

কারা যেন চারপাশে নি:শ্বাসে ঢেলে যাচ্ছে বিষ
রাত গভীর হলে ডেকে যায় কুকুরের দল
এখানে আপোষ বৃথা
গাছে গাছে এখানে ফিরুক পাখিদের শিস

এই যে অন্ধকার,ভাষার দু:সময়
দুর্নীতি ছাড়া আর কোন বাধা নেই
প্রখর সূর্যতাপেও বেজে ওঠে অ আ ক...
আমার বর্ণমালায়!


নন্দিনী সেনগুপ্ত

ভাষাভূমি

ভাষা বেঁচে থাকে, ভাষার মৃত্যু নেই।
মিছে কেন তুমি ভাষা নিয়ে করো শোক?
ভাষা ঘুমোয় না, জেগে থাকে চিরকাল,
জাগে সহস্র ভাষার কল্পলোক।

ভাষা জেগে থাকে হাওয়ার উতল স্রোতে,
ঝিকিমিকি ঐ তুষারস্ফটিকে জ্বলে,
ভাষা জেগে থাকে ফসলপাকানো ওমে,
অকাল বাদলে বৃষ্টিভেজার ছলে।

পক্ষীযূথের ডানার পরিধি জুড়ে,
প্রতিটি পালকে ভাষা জাগে অবিরত।
কালো রাত্রির চালচিত্রের মাঝে,
জেগে তারা মোছে চাঁদের হাজার ক্ষত।

বৃথা কেন কাঁদো ভাষার দুঃখে তুমি?
সব সীমারেখা মুছে জাগে ভাষাভূমি।    



তৈমুর খান

ভাষার সাম্রাজ্যে ওড়ে দৃপ্ত পতাকারা 

আমার কান্নার শব্দ, আমার মর্মরিত প্রেম 
সমূহ শ্রদ্ধার গান, চেতনার নব উত্থান 
সব লিখে রাখি 

সব বেদনার পরাভব, অজর অক্ষর 
নীলাভ আকাশ আর নিরুচ্চার অভিমান 
বিশ্বাস আর বিস্ময়, কাঙ্ক্ষিত মুক্তির সোপান 

দূরদৃষ্টি জেগে ওঠা দূর্বার কাছে 
নিজেকে পাঠাই আমি নিরন্তর মুখর আলোকে 
এই নাও ফেব্রুয়ারি,সোনালি সকাল 
বিনম্র মহিমার 

একটি সুচারু ত্যাগ, উষ্ণ উল্লাস 
প্রাচুর্যের অন্তহীন ব্যাপ্ত ক্রিয়ায় 
মগ্ন যাপনের দিন ফিরুক আবার 

রক্তে পা ভিজে যায়, তবু দাঁড়ায় ভাষা 
ভাষার সাম্রাজ্যে ওড়ে দৃপ্ত পতাকারা 
স্নিগ্ধ তরবারি হাতে ভাষার যুবক যুবতীরা 
ঘোষণা করে জয় 


(১) রত্নদীপা দে ঘোষ / (২) বিজয় ঘোষ

এইটুক রেখে যাচ্ছি

এই সদাশস্যের ভাষা, লাবণি
পাবন-মুখর নিত্যপূর্ণ ইষ্টিকুটুমের
চিরওড়না
আমার কতোটুকুই বা ক্ষমতা
তবু রেখে যাই সমগ্র মা-ভাষা
মুখরিত বুলবুলি, অরুণ-পেন্সিলে লেখা
পৃথিবীর নাম-ধাম বয়েস পরিচিতি
স্তব্ধতায় দুলছে যে বর্ণমালার উপসাগর
তার ব্যাকরণ, চোখের অভিশ্রুতি
সকল অসফল আমার নাক্ষত্রিক প্রবন্ধ
বড় গল্পের হাতেখড়ি, গদ্যের চলন বলন
বানানের মাধুরী
এইটুকুই তো পারি
তোমারি জন্যে আমার অশ্রুরেচন
গুছিয়ে রাখছি দীর্ঘরঙিন টলোমলো
ঝকঝকে অনুস্বার বিসর্গের বিরতি
নতুন অক্ষর আর ছন্দের চাঁদোয়া
ক্রমাগত ছায়া দিতেছে আমাকে, দেবে তোমাকেও
সেইসব বিশ্বাসী
কান্নাবৃক্ষের মুখ, অভিমানী অবয়ব
সন্ধিস্বরে আঁকা পাখালি বাঁধা শব্দ এবং গুচ্ছ
বৃষ্টির কারক-বিভক্তি, তোমারি কারণে জেনো
এইসব আনন্দধারা আর ধারাআনন্দের মিছিল
শতাব্দীর সূর্য আর একুশে রক্তঝরা
সব তোমাদের জন্য হে অনাগত প্রজন্ম  



বিজয় ঘোষ

আমার মায়ের মুখের ভাষা

ক্রমশ ছায়াপথ বড় হতে থাকে,
রাক্ষুসে জিহ্বা চেটে খায় অক্ষরমালা,

আমাদের অমলযৌবন ছিল,
ভালোবাসার মতো শব্দ ছিল,

একদিন চর্যাপদের হরিণীর মতো
দ্রুত পায় হেঁটে যেতো আমার সোনার বাঙলা...

ধর্ম নয়-অর্থ নয়-মোক্ষ নয়
বেঁচে থাকুক হাজার বছর আমার মায়ের মুখের ভাষা...







সৌমিত্র চক্রবর্তী

আমাদের একুশ

শিকড়ে শিকড় লাগে
শিকড়েই টান
এই মাটি, ভালোবাসা
মা মুখের গান।

আমার স্তন্য দুধ
আমাদের ভাষা
এই শোক, এই সুখ
এই টুকু আশা।

আমাদের পিরীতি বা
মুগ্ধ মিলন
এই ভাব, এই ঘ্রাণ
বাংলার মন।

আমার আমিকে চিনি
বাংলার হেম এ
এ সবুজ, এই বাংলা
অফুরান প্রেমে। 


শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

গ্রহণ শেষে

এখন রাহুর ছায়া গায়ে নিয়ে সূর্য সাময়িক দিশাহারা
সহসা পড়েছে ঢুকে কক্ষপথে অযাচিত ক্ষণিক কৌতুক
দুরাচারী সময়ের নির্বোধ ও দৃষ্টিহীন প্রতিনিধি তারা
এখন আকাশজুড়ে আদিগন্ত নীলিমার দারুণ অসুখ।

পরিচিত কক্ষপথে ইদানীং চোখে পড়ে নানান ফাটল
তারাদের দেশে আজ নাগরিক হারিয়েছে পথের হদিশ
চাঁদের চোখের কোনে ব্যথাতুর অশ্রুবিন্দু করে টলমল
এখন বিভ্রান্ত দিনে বেঁচে থাকা কণ্ঠে নিয়ে সভ্যতার বিষ।

বাংলার মৃত্তিকা আজ নয় ঠিক ততখানি রঙ্গন আবীর
আলো ঢাকা দিনমানে চৌর্যবৃত্তি দৃশ্যতই খেলে লুকোচুরি
বাংলার আখরমালা পথভ্রান্ত পথিকের মতই অস্থির
ধর্ষকাম সভ্যতাই এ প্রজন্মে ভাষাশিল্পে করে বাহাদুরি।

কবির কলমে আঁকা বাঙলার মুখে আজ মেঘের চাদর
ভুলে গেছি ভাষা চেয়ে কারা যেন দিয়েছিল সবুজ জীবন
পশ্চিমী ঝঞ্ঝার তোড়ে উড়ে যায় আমাদের শান্ত কুঁড়েঘর
তবে কি ও সূর্য নয়, আধুনিক প্রসাধনে বাংলার গ্রহণ!

জানি না। মানি না আমি ভোলা যায় জন্মদায়ী মা'কে
এ কথা অবশ্য জানি ছায়া সরে গেলে হয় আলোর উদ্ভাস
হাতছানি দিয়ে আজও বাংলার রাঙাঋতু চুপিচুপি ডাকে
সঙ্গোপনে বলে যায় - এ বৈচিত্র‍্যে আমি তোর বাঁচার আশ্বাস।

কক্ষপথে গ্রহ উপগ্রহদের স্বেচ্ছাচারী খেলা শেষ হলে
পৃথিবী নির্মল হয়। নতুন আলোকরশ্মি সাজে অতঃপর
নতুন নতুন মাঠে নতুন নতুন ফুল হাসে দলে দলে
বাংলার মাটিতে আছে রক্ত দিয়ে বুনে যাওয়া বাংলার অক্ষর।

সুমিত্রা পাল

২১শে ফেব্রুয়ারি

একুশ মানে বুকের মাঝে
দলা পাকানো এক ব্যথা,
বাঙালির জাতিসত্বার আত্মকথা।  

একুশ মানে
ভাষাকে ভালোবাসার নীরব প্রতিশ্রুতি। 
দুর্বলতা নয়,
একুশ আজ আমাদের শক্তি।

একুশ মানে সরে গেছে সব কালো
দুই বাংলা জুড়ে শুধু
মাতৃভাষার আলো।

ইন্দিরা দাশ

আশা-ভরসা

মাতৃভাষার কথা লিখতে বসে
এঁকে ফেলি
জন্মের পর জগত দেখানো
দুটি চোখের তারায়
সস্নেহ আলো
মাতৃভাষার কথা লিখতে লিখতে
অাকুল জিহ্বাগ্রে শুধু 'মা' ডাক উঠে আসে
মাতৃভাষার কথা বলতে মনে পড়ে যায়
আমার যাবতীয় ভয়, অসহায়তা, ক্লান্তির একটিই আশ্রয়স্থলের কথা
মাতৃভাষা ছাড়া এখনও সন্তানকে অাদর করতে পারিনা
মাতৃভাষা অাজকাল আমার বৃদ্ধা মায়ের নীল শিরা-ওঠা হাত হয়ে
অামার কাছে কাঁপা-কাঁপা আশ্বাস চায়
'খুকু, ভুলে যাবি না তো'?

শর্মিষ্ঠা ঘোষ

তুমি যাকে যুদ্ধক্ষেত্র বল


তুমি যাকে যুদ্ধক্ষেত্র বল
নীলাচলে অহর্নিশ প্রেম
কিছু নেই শব্দ মায়া ছাড়া
অস্ত্র কোথা ? আমিই হত আজ
প্রিয় কিছু নিগড় ছিল খালি
মোহাবিষ্ট রম্য লেখনীতে
কিছু পরম হত্যা হেনে গেল
শব্দ ঘৃণা চরম হেমলকে


বিজ্ঞাপন ছাড়াই স্তন্য দেন মা
হীনমন্যতাহীন পুষ্ট হয় শিশু
এসব কোন সোচ্চার স্লোগানে লিখে ফেলে কাল
তার নাকি চক্র আছে আর গম্ভীর স্বর
আত্মঘোষণা ছাড়া যেন কেউ ফিরে তাকাত না
ধর্মরাজ্য শিষ্টের পালনে যুগে যুগে তিনি
আসছেন মঙ্গল শঙ্খ নাদে
নাভি কটি মূর্ধা বক্ষপিঞ্জরে বংশলতিকা
সবাই মা খুঁজে বেরাচ্ছে সংবিধান সম্মত




সুবীর সরকার

ভাষা

আমার কপালের ভাঁজে লাল প্রজাপতি লালায় জড়িয়ে নেয় ভাষা
ঘুমের কিনারে পাখিরা
ভাষার মিছিলে হেঁটে আসবার পর
আমি ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাই
                         জিরাফের গ্রামে।

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

আ মরি


বৃষ্টির শব্দ আর নীরবতার মাঝখানে পর্দা টাঙানো পৃথিবীটা
চেখে নিচ্ছে স্বাদ । নতুন রুটিন চলে এলেই নিয়মভাঙার ছক
ভাঙতেই থাকে তোমায় ।
বসন্তের অপেক্ষাভরা মানুষে বর্ষা লাগলে গান থামতে চায় না ।
নোঙর খুলে যায় ।
তরুণ অরণ্যের দিকে তবে যাত্রা হোক ।
হকারদের হাঁকহাঁকি শেষ হলে একটা
নতুন পোশাক এসে যায় । ডালিয়ার ডালে সূর্যমুখ ।
ভালোবাসাকে সুস্বাগতম্ ।
তম সরিয়ে বসে আছি তোমায় । ভাঙালে ভেদরেখাগুলো স্পষ্ট ।
তবে পট মানে শুধু যামিনী রায় নয় । কালিঘাট ছাড়িয়ে পিংলা
হয়তো আরো বাংলাভাষা পড়া .....

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

ফেব্রুয়ারি এলে

ফেব্রুয়ারি এলে একুশ সংখ্যার পাশে অনেকক্ষণ বসি।
 মায়ের কান্নার শব্দে ভারি হয়ে আছে এই নিথর সময়
আমাদের শেকড় থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে মাটি,খনিজ লবন
নিজেরাই ভুলে যাচ্ছি ভাষার ভূগোল।

বাতাসে রক্তের গন্ধ শুকিয়ে যায়নি তবু
ফাঁকা পড়ে আছে মাঠ

এখানে দাঁড়াও এসে খানিক সময়
কেউ কাঁদছে অশ্রুত কান্নার ধ্বনি অবিকল আমাদেরই বুকের মোচড় ।

উমা মাহাতো

আমার ভাষা

টিপটিপ,রিমঝিম,ঝমঝম উঠোন..ভোরের বৃষ্টি সহসাই  
বাবা ডাকটি মুষলধারা...কাদায় প্রথম হাঁটতে -পড়তে শেখা
যার কোলে এসেছি, তার ধুলো- বালি -মাটি..শব্দের প্রকাশ
জন্মান্ধের মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বুঝি, ব–শ্রুতিটিই বিশ্বাস,ভাষা অর্থে আত্মজনের ভরসা। 

আর ওই যে শরতে জন্ম,কোন এক আপাত -রুক্ষ কাশের ক্ষেতে.. 
এই যে শীতের প্রথম সুর, রোদ-আলো গায়ে মেখে কৈশোরস্নান
 সে আমি, সেই তো আমি..আমার  নদীর নামটি কাঁসাই,ওরফে কংসাবতী।
কী আশ্চর্য, কী আলাপ!রাগ -অনুরাগ... সহজ পাঠে বর্ণপরিচয় পৃথিবী ও প্রকৃতির!

তার পরের গল্প তো অনেকটাই  একজনের।

'এ মণিহার আমায় নাহি সাজে..এরে পরতে গেলে লাগে,এ রে ছিঁড়তে গেলে বাজে'.. 
শব্দকে এমন গভীর,এমন নিজের করে উচ্চারণ!
সে আমার যৌবন,আমার ঘোষিত দেবতার কাছে কেবলই আত্মসমর্পণ!!

ঝিলমিল রবির গান, অরণ্যের শীতার্ত পাতায়।
আমার ভাষা আমার মর্মর, দাবানল আন্দোলন জাগায়।

 ঘোর জ্বরের প্রলাপে মাঝে মাঝে শুদ্ধ ডাকি..কান পেতে থাকি...মা..মা..মা গো
এ জন্ম চেতনার কাছে ঋণী
বাংলা ভাষার কাছে ঋণী। 



চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষের কবিতা

কোনো এক বিস্মৃত ছড়া, কোনো এক ভোর শৈশবে
আমার কানের কাছে বলে, রূপকথা ভুলে গেলি কবে?
সারাদিন কাজ কাজ করে, পন্ড করিস সব কাজ
কখন যে জ্যামিতির রেখা, মুখে আঁকে ত্রিভুজের ভাঁজ।
কথা ছিল খুশি থাকবার, কথা ছিল মুক্ত স্বাধীন
তবু সেই কাঠ কুটো খড়, দিন আনি, রেঁধে খাই দিন।
কথা বলি ভীনদেশী সুরে, মন ঢাকি রোদচশমায়
চোখে চোখ কি যে বলেছিল, বেমালুম ভুল হয়ে যায়।
আমার শরীর জুড়ে শীত, আমার শহর জুড়ে রাতে
নিমন্ত্রিতরা ফিরে গেছে, উচ্ছিষ্টের ফাঁকা পাতে।
এখন একলা ঘরে একা, অক্ষর, চেনা তো সবই তা,
নিজের ভাষাকে ভালোবেসে, শেষ চিঠি হয়েছে কবিতা।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

বর্ণমালা –স্কুল বালকের


রাস্তা দিয়ে  কতকাল হেঁটে যাচ্ছে
মানুষের কথা , ক্লান্ত বর্ণমালা –
ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে
আমি এক স্কুল বালক
শব্দমালার সাথে হ্যান্ডশেক করবো ,
রাস্তায় সেই তো কবে থেকে দাঁড়িয়ে
পিঠে স্কুলের ভারী ব্যাগ ।
সময় বেশী নেই
অন্ধ স্কুলে বেজে চলেছে সতর্ক ঘন্টা !
 

ভাবনার মতো  থমথমে আকাশটা নীল ;
বর্ণমালাদের সারাদিন ঘোরাফেরা
আকাশের নীলে, ময়দানে, বাজারে, রেল স্টেশনে ।
পৃথিবী থেকে তুলে নেয়া কিছু গদ্যপদ্য
ভাষার সাথে মিশিয়ে
সকলের সাথে ভাগ করে নেবো ,
বর্ণমালাদের সাবেকি পোষাক ছিঁড়েখুঁড়ে
ভেবেছি আমাদের কাহিনী বানাবো ।


তীব্র সব বর্ণমালা ছুটেছে আকাশে
যেন কেশর ফোলানো সাদা সাদা ঘোড়া,
ওদের মিলেছে ডানা, অশ্বক্ষুরে অর্বুদ স্ফুলিঙ্গ !
এইসব উড়ন্ত আগুনকে সবার অজান্তে
স্কুল ব্যাগে ভরে রাখি আমি ।


একুশে ফেব্রুয়ারী ঘটে গেছে কবে ,
নীল আকাশের নীচে তবু তীব্র আগ্রাসন !
স্কুলে স্কুলে আমাদের প্রিয় ভাষা
নীল-ডাউন হয়ে আছে ।
ভাষা তুমি কি জানো না -
আমরা আজও ততো ভাল নেই ?


আমাদের বর্ণমালা হেঁটে যাক
তীব্রতর সুন্দরের দিকে ।
শব্দদের শ্লোগানে
রেখে যাবো আজানু কুর্নিশ ,
ভাষাদের মার্চপাস্টে ভালোবাসা ,
রেখে যাবো ক্লান্ত এক বালকের বিনম্র স্যালুট !

অনুপম দাশশর্মা

যে-ভাষার ওপর নামে আঘাত বারবার

দেখি, কীভাবে নীরব হয়ে আছে কান্নাভরা চোখে
এই আমাদের মাতৃভাষার পলান্নঘরখানি
এই আমাদের মাটির পিদিম জ্বলা
রক্তভেজা সে-সব দিনগুলি, আর-
প্রাণতুচ্ছ করা ইতিহাস খোদাই করা আন্দোলিত দিন
ঋণী রেখে গেছে প্রজন্ম থেকে ভদ্র-ইতরজনেরেও
এ কী নয় একুশের তিথি এলে নতচোখে
অশ্রু ঝরানোর প্রাচীন রীতি!

দেখি, রাজপ্রাসাদ থেকে ধেয়ে আসছে দানবেরা
তাদের কুড়াল হাতে ধরা আছে বাংলাভাষাকে
কোনঠাসা করবার ধূর্ত সনদ

এমন সময়ে তুলে নাও দৃঢ় অঙ্গীকার
বুক দিয়ে রুখে দাড়াবে বণিকের অসি
একুশের স্মৃতি হোক পরম পাথেয়
একজোট হও সমস্ত বাংলাভাষী।

ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়

একুশে

উত্তেজনার পারদ আকাশ ছুঁই ছুঁই
যে কোন সময় ফেটে পড়তে পারে
জনতার মাঝখানে
ফেটে পড়লে জন্ম নেবে গুটিকয়েক আখর
যা শব্দ গড়তে জানে
শব্দগুলি উড়বে হাওয়ায়
সঙ্গে অশ্রুবারি
কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে না আজ একুশে ফেব্রুয়ারি
সমস্বরে গাইবে সবাই--
‘আমি কি ভুলিতেপারি?
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি?’
রক্তে রাঙ্গা আখরগুলি উড়ছে হাওয়ায়
উড়ুক
আখরগুলি মায়ের ভাষা
বুকের মধ্যে থাকুক...!


কাজরী বসু

বর্ণমালার আলো 

সংক্ষেপিত অনুক্ত প্রেম। । বিস্তারিত খুশি। 
বুকের নদী মলিন জলের অথবা টলটলে 
রোজনামচার শিরীষ কাগজ ঘষতে ঘষতে ছেঁড়া,
বাদ প্রতিবাদ, জখমকালে বাংলা অকুস্থলে...

জেতার অনেক আগেই যেতাম হেরে
জয় পেয়েছি ছিনিয়ে নিতে পেরে..

সকাল কিংবা দুপুর বা রাত। বর্ণমালার আলো।
ভালোবাসাই যখন বাংলা নামের নামান্তর 
খণ্ড খণ্ড যুদ্ধকথায় রক্ত বিষাদ লেগে
একটু করে খুঁজতে থাকা ছিনিয়ে নেওয়া ঘর...

রক্ত মেখে লড়াই করা ছেলে
জন্ম জন্ম অনেক ভাগ্যে মেলে..

আকাশ খুঁজি আপনকথায়,স্বকীয় ক্যানভাস।
বাতাস পেলাম বাংলা নামের, নিজস্ব প্রশ্বাসে
আমার ঋতু ছয়ের ঘরের নামতা দিয়ে গাঁথা
বাউল গানের একতারা তাই ভাটিয়ালির পাশে..

বিস্তৃত এক আকাশ সেদিন জারি
রক্তে জেতা একুশ, ফেব্রুয়ারির


অরুণ সেনগুপ্ত

ভাষা 

মায়ের কোলে আদর রাখে ভ'রে
মাদুর পাতা উঠোন এককোণ
শীতলতালু কপাল ভরা জ্বরে
আকাশ জুড়ে মাটির রাঙা মন। 
     

শহর জুড়ে বুনট বাঁধা গ্রাম 
অদূরে যায় মিলিয়ে আলপথ
সহজতর কেনা-বেচার দাম
মেলার খুশি প্রসার উল্টোরথ। 


আমার ভাষা তোমার ভাষা প্রিয় 
নিকট থেকে ভাসল ভেলা দূর 
যে যার মা'র কোল আদরণীয়
স্বপ্নকথা ' মা ' ডাকে নাম সুর। 


সুরের স্বরে পাখির ডাকে ভোর 
বনের প্রাণী ঘরের প্রাণী সব 
আদর দিয়ে নরম থাবা কর 
যে মন যার মা ডাকাটাই সব। 


আমাদের এ বাংলাভাষা প্রিয় 
রক্ত দিয়ে আখর লিখে রাখা 
সব ভাষার পাওনা মান দিও 
' মা ' শব্দ আদর দিয়ে মাখা। 


চাঁদের আলো একলা ছাদ থাকে 
ভোরের আলো শিশিরমাখা ঘাস 
সবার কোল আদর দিয়ে রাখে 
এই বাতাসে জন্মাবধি শ্বাস।