৯ম বর্ষ ১০ম সংখ্যা ৯ই মার্চ ২০২০


এই সংখ্যায় ২৫টি কবিতা । লিখেছেন : রত্নদীপা দে ঘোষ, ব্রতী মুখোপাধ্যায়, সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য, দময়ন্তী দাশগুপ্ত, বৈশাখী চক্রবর্তী, মানসী কবিরাজ, উজ্বল চৌধুরী, শাশ্বতী ভট্টাচার্য, জয়িতা ভট্টাচার্য, শুভ্রপ্রকাশ ভট্টাচার্য, জয়াশিস ঘোষ, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, পিনাকীপ্রসাদ চক্রবর্তী, সুবীর সরকার, শেখর কর, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, সুনীতি দেবনাথ, মলয় সরকার অপর্ণা বোস ও মহমুদ নজির ।

সম্পাদকীয়


২১ শে ফেব্রুয়ারির ভাষাদিবস বিশেষ সংখ্যার পর বেশ কিছুদিনের ব্যবধানে অন্যনিষাদ বেরলো । শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তো আছেই তারওপর গত ১৫দিন আমি নিজের আস্তানায় নেই । যেখানে আছি সেখানে গত প্রায় একমাস বিএসএনএলের ব্রডব্যান্ড পরিষেবা মৃত অবস্থায় ছিল অনেক তদ্বিরেও কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে সে নট নড়নচড়ন ছিলমাত্র গতকাল সে প্রাণ ফিরে পেয়েছে ।এদিকে আমার নিজস্ব কম্পিউটার সঙ্গে না থাকায় নতুন করে লেখা সংগ্রহ করে পত্রিকা প্রকাশ করতে হল । ফলে কিছু লেখা এই সংখ্যায় দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া গেল না, রেখে দিতে হল আগামী সংখ্যার জন্য ।

একটা তথ্য জানাই । গুগল জানাচ্ছে এ পর্যন্ত অন্যনিষাদের পৃষ্ঠাদর্শন পাঁচ লক্ষ অতিক্রম করেছে । অন্যনিষাদের সকল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই । ভালো থাকবেন ।

রত্নদীপা দে ঘোষ

একদিন চাঁদ পতাকার লাল

একদিন সূর্য উদ্ধত আকাশের কার্তুজ
একরাতে মেঘ বেপরোয়া বৃষ্টির কামান
এক সন্ধ্যায় প্রদীপ নাদিয়া তুলসী জামান
একদিন রোদ্দুরে ডানা মেলবো
হাজার বুলেট লক্ষ হাসিতে ওড়াবো
আমরা মহিনের কালো ঘোড়া
বেয়নেটে সাদা সরোদ বাজাবো
একদিন আমরা ইনকিলাব, স্লোগানের শিখা
আমদের বুক তপ্ত বারুদ রক্তগাছের প্রশাখা
একদিন ঘুরবেই পৃথিবীর ডায়নামো
একদিন মানুষের নাম হবে স্বাধীনতা



ব্রতী মুখোপাধ্যায় / দুটি কবিতা

আপনি কিছুই দেখতে পাননি

অপরাধ যা, কপিল শর্মা সবার সামনে করেছে,
লুকিয়ে করেনি,
সবাই দেখেছে
নির্মেদ অপরাধকাজ

আজ সবাই দেখছে
সবাই যা দেখেছে
সমস্তই
কেমন করে যেন
হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট দেখতে পাচ্ছে না

সবাই ভাবছে
হাই আর সুপ্রিমের চোখের অসুখ নিরাময়বশ নয় হয়ত

অথবা সেই ফিল্মের সংলাপ বিলবোর্ড হয়ে,
ওই তো ওই সংলাপ,
সবাই জানে আর প্রায় সবাই মান্যও করে,
ওই তো
আপনি কিছু দেখতে পাননি, মাস্টামশায়...


একদিন সবাই বলবে

একদিন সবাই বলবে
উত্তর প্রদেশের পুলিশ
দিল্লির পুলিশ
আর যাই হোক মানুষ ছিল না

একদিন সবাই বলবে
এইসব পুলিশদের ঘরবাড়ি ছিল না
মা ছিল না বাবা ছিল না
ভাই বোন  বউ বাচ্চা কিচ্ছু ছিল না

একদিন সবাই বলবে
এইসব পুলিশ মানুষখেগোদের জন্যে
জ্যান্ত জ্যান্ত ছেলে বুড়ো মা মেয়ে সাপ্লাই দিত

একদিন সবাই বলবে
উত্তর প্রদেশের পুলিশ
দিল্লির পুলিশ
আর যাই হোক...

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য

আজ নারীদিনে

নারী দিন আজ শপিংমলের
অফারে অফারে বন্দী
চেতনা আরও পণ্য আধারে
শোনো ক্লারা জেটকিন
নারী দিবসের পতাকায় বাঁধা
গুঁড়ো গুঁড়ো শ্রম গুলো
প্রেমে জরো জরো
ফ্রেমে থরো থরো
হোর্ডিং এ লেবেলে সাঁটা
বোতলটি শুধু হয়েছে বটল
নতুন হয়েছে নয়া
পানীয় আরও রঙীন মোহিনী
বিজ্ঞাপনের দয়ায়
আইনে বাঁধানো অহমে শানানো
নারী মুক্তির পথ
দাবিসনদের খেরোর খাতায়
বন্ধ প্রতিকী শপথ

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

অনুগত হও

অনুগত হও।
কেন বার বার প্রশ্ন কর?
বলেছি না, অনুগত হও।
অনুগত হও। নাহলে
উদ্ধত মাথা কী করে নত করতে হয়
সে মন্ত্র আমার জানা আছে।
অনুগত হও। নাহলে
তুমি এবং তোমার প্রিয়জনদের
বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই।
অনুগত হও, পা চাটো।
তোমাকেও মুষ্টিভিক্ষা দিতে পারি
মানুষের রক্তে-ঘামে ভেজা লুটের ভাগের।
অনুগত হও, পা চাটো।
তোমাকেও দিয়ে যেতে পারি
ক্ষমতা অথবা ধর্মের উত্তরাধিকার।


বৈশাখী চক্রবর্তী / দুটি কবিতা

যারা জন্মাতে চলেছে

যারা জন্মাতে চলেছে
তাদের নরম শরীরের ওপর নেমে আসুক
সহজ নদী।
আমরা, যারা বেঁচে আছি
বাইশদফা দাবী আর জাতীয়তাবাদী লাঠির
মাঝের একচিলতে ক্লেদাক্ত জমিতে,
হেঁটে যাবো নিরঙ্কুশ শূন্যতার দিকে
অমেয় ক্ষয়িষ্ণু ফুসফুস বুকে নিয়ে।
কে যেন ডেকে যায়?
বৃষ্টিবেলার লাল ফড়িঙ
হেমন্তের শালিখ
ভোরের বাতাপি ফুলের পাপড়ির মত নরম চর্যাপদ।
ডাক দিয়ে যায় রাতভর নির্জন আকাশের যত
চলমান নক্ষত্র পরাগ
আর পৃথিবীর অপাপবিদ্ধ মাটি বুবুক্ষুর মত তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে
ডানা খুলে সব অলীক ভালবাসা নেমে আসবে এই প্রতীক্ষায়,
শরীরের খোঁজে নেমে আসে নীলাভ জন্মান্তর
আমাদের পিপাসার্ত শরশয্যায়
ভেসে আসে বিষন্ন ঈশ্বর।
যারা জন্মাতে চলেছে তাদের খোলা শরীরে ওপর নেমে আসুক সেই ঈশ্বরের অমল আলো।

শব্দের তমসা

বাহারী পোশাক খুলে গেলে দেখি মুমুর্ষুর স্বগতোক্তির মত
শরীরে লেগে আছে বিক্ষত অক্ষর
শব্দের তমসা।
আমি উৎসর্গ লিখি,লিখি ছায়ানমিত বিকেল,
নির্জনে লিখি আস্পৃহ আকুতি
ইমন ছুঁয়ে থাকা হলুদ পলাশ
ঝরা পাতার অস্ফুট চর্যাপদ
ধীর পদক্ষেপে তারা চলে যায় হরিতকী বনে।
ঠিক তখন‌ই তুমি হেসে ওঠো
রক্তাল্পতায় ভুগতে ভুগতে মৃদু হেসে ওঠে তোমার
অক্ষচ্যুত বিবর্ণ মোহ।
বসন্তের আবরণ খুলে পথে নেমে আসে যে অস্থিসার কদর্য শরীর,
খুবলানো ঠোঁট,তাকে দেখে
নদীর কষ্টের মত আমার শরীরে
নিভে যায় জলজ উদ্ভিদ
জলে ভেসে যাওয়া সহজ বাউলের কম্পমান ছায়া
শুধু অবতল দর্পণে লেগে থাকে অপরিচিত শহর আর এক
কবন্ধ সভ্যতা।
এ বসন্ত আমার নয়



মানসী কবিরাজ / দুটি কবিতা

একটি দাঙ্গা এবং অন্তিম সংস্কার.....

এখন আর উত্তাপ নেই কোনো
এখন শুধুই টলটলে শান্তির জল
অজস্র নাভিকুন্ড পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে

রফু চক্কর ঘোরে
বিজোড়ে মাটির চাদর
জোড় হলে অগ্নিপ্রবেশ....
বাতিঘরের অসুখ দীর্ঘস্থায়ী হলে
নাভিকুন্ডরা
ক্রমশ সংখ্যা হয়ে যায়...

আসুন উল্লাস বলি

আসুন উল্লাস বলি
প্লেটের উপর সাজানো আছে
অলিভ অয়েলে মাখা ধর্মীয় স্যালাড
টুথপিকে গেঁথে নিন
সোনালি হলুদ কিম্বা বেগুনি
মকটেলে কী নেবেন
দু চামচ রক্তের সঙ্গে
তিন চামচ ঘৃণা !
গার্নিশড?
অসহিষ্ণুতা কুচি কুচি কেটে
বিদ্বেষের সোয়া সস...
উইড মাখনের ছুরি

আগুনের খবরে আদার ব্যাপারির কী কাজ!
আপনি বরং রেওয়াজ করুন
জী হুজুর বুলি কিংবা
জাতীয় সংগীত




উজ্জ্বল চৌধুরী

ইউটিউব

নেমে যাচ্ছে কঙ্কাল ছায়া

ঘুমন্ত মরা মানুষের পচা গন্ধ

রোজ আত্মহত্যার ভিতর গাছজন্ম


উৎপত্তি জুড়ে সাপ, ব্যাঙের অকাল মৃত্যু

পায়ের নিচে পার্থক্য কেটে দেয়



যে বালিকার যোনি চেটে দেয় সাইকো পোষ্য

তার বৃক্ষে পিরিওডের রক্ত



সমতুল্য কেউ নেই

নপুংসকের লালায় জীবাশ্মের উচ্ছিষ্ট



কতদূর !

স্তনের ওপর যতিচিহ্ন নেই





শাশ্বতী ভট্টাচার্য

এটাই কবিতা


যে মেয়েটি ভোর হলে মাটি হয়, গাছ হয়,
অথবা উঠোন,
সকালে উনোন হয়, গনগনে আঁচ হয়
হাঁড়ির বহরে।
বেলা হলে পথ হয়, ভিড় হয়, রোদ হয়
অফিসে কেরানী
বিকেলে বাদুড় হয়, জোড়াতালি ঘর হয়
সন্ধেবেলা পোড়ে।
তারপর ভাত হয়ে নিজেকেই বেড়ে দেয়
রাতের থালায়,
হাপুস হুপুস চাঁদ, বাসনে ব্যথার এঁটো
বিছানায় চিতা
সে মেয়ে শরীর হয়, অবশ আগুন মাখে
দায়বদ্ধতায়
বাদামী ঘুমের আগে সে মেয়ে শ্মশান হয়
এটাই কবিতা।


জয়িতা ভট্টাচার্য

গাণিতিক 

এক প্ল্যাটফর্ম থেকে আরেকটি 
যেতে  কতটা সময়,
শূন্য থেকে শূন্যতায়
যাওয়া জটিল 
গাণিতিক 

ঝি থেকে অপভ্রংশে রমণী।
চন্দ্রযান বেপথু আকাশে

তোমার প্রতিটি শব্দে, 
যোজন দূরত্বে তুমি এখন মা

এইসব চুপচাপ বাসা ভাঙা
ভালো নয়
ভালো নয় ইস্তাহারে মেটে লাল।

এক প্ল্যাটফর্ম থেকে আর এক

ক্রমশ আরো 
 আরো অচেনা
এখন  প্রাচীন 
 আমার  মা।

শূন্য ভেঙে অন্য আরো শূন্য পথ
রিক্ত করে


শুভ্র প্রকাশ ভট্টাচার্য

দাম্পত্য 

আজ বুকের কোলাজ খুলে দিলো ডাকনাম
বোতাম খোলা জামায়, 
ফেলে আসা হলুদ খামের হাতছানি,
একটা হারানো রাস্তা মিশে যায় তিস্তায়,
সবকিছু মিলেমিশে,
তোমার শহরে আমার শহরের ছবি আঁকা হয়।

চুপি চুপি রাত ছোট্ট চাঁদের গল্প বলে
আকাশে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে যাওয়া যায় তাকে
কানে কানে গান শোনায় ফেরিওলা
শিরায় শিরায় টান পড়ে রাতের শরীরে,
তবুও চোখে ঘুম আসেনা, 
কে জানে কার অপেক্ষায়.....

সেখানে বৃষ্টি খুলে দিলো গোপনতা
আর দুই হাত আঁকড়ে রাখতে চায়,
পাশ ফিরে শুয়ে থাকা যত রাগের আস্ফালন
ধুয়েমুছে যায় হাজারো চুম্বনে,
সুখী গৃহকোন খুঁজে নেয় ভালো বাসা।
তোমায় ছুঁয়ে থাকা যতসব ভালোবাসা।



জয়াশিস ঘোষ

কত রোদ আছে পৃথিবীতে
আজ বড় গাছ কেটে ফেলা হবে।
জঙ্গলের সবার মন খারাপ
একে একে এসে বসে আছে গাছের তলায়
কেউ কুড়িয়ে নিচ্ছে বুনো ফল
কেউ ফুল, কেউ বা ডালপালা, শুকনো পাতা
শেষ ছায়াটুকু দিয়ে বিনুনী বানিয়ে
চোখ মুছছে রোদ।
যতই ঝগড়া হোক, মনখারাপ তারও
একটা একটা করে হাত পা কেটে
সাজিয়ে রাখছে কাঠুরের দল
শুধু চারাগাছ ভাবছে, জানতাম না তো!
কত রোদ আছে পৃথিবীতে
কতদূর দেখা যাবে আরো!


পিনাকীপ্রসাদ চক্রবর্তী

জন গণ মন

জন গণ মন
একটা লাঠির আঘাত
জন গণ মন
আর একটা লাঠির আঘাত
মন অধি নায়ক
আরো আরো
এরপর আর শব্দ ওঠেনি
আঁধার ভালবেসে, গুহার ভেতরেই
অসংখ্য মানুষ দেওয়ালে নখ দিয়ে ছবি আঁকে
জন গণ মন
অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে
আঁধার বড় আঁধার হলে যেমন---


সুবীর সরকার

সাদা কালো ছবি

সাদা কালো ছবিগুলি ফিরে আসছে
হলুদ রঙের বাড়ি।
সিঁড়িতে জোড়া খড়মের 
                                   নষ্টালজিয়া
অপমান মনে রাখতে নেই।
তুমি হারিয়ে যাবার পর সতেরো মাস কেটে
                                                      গেল
নৌকোর মাঝিকে এখন তোমার গল্প শোনাই
তোমার বাদামী চুলে ছায়া 
                                  খুঁজেছিলাম 
তোমার আঙুলের উপর পেতে রেখেছিলাম
                                                   রেললাইন
                 
গাছের কোটরে পাখি।
এ জীবন সাজঘর।আর পুতুলের ঠোঁটে
                                                           শিস।
স্মৃতি

আমি মৃত্যুর আগে একটু জোনাকী দেখতে 
                                             চেয়েছিলাম
জলের সামনে দাঁড়িয়ে
জলস্রোত লিখতে চেয়েছিলাম
আস্তিন গুটিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসছে
                                            মৃত্যু
কাদার উপর দিয়ে হাঁটছি
ছুঁড়ে দিচ্ছি পুতুলের বাক্স
আমার কোনো বান্ধবী নেই
বান্ধবীদের হাতব্যাগ থেকে কোনোদিন চকলেট
                                        পাইনি আমি
আমি কিন্তু মেয়েদের শোনাতে চেয়েছিলাম
                                          রক্তপাতের কথা
যুদ্ধ  বল্লমের কথা
কামানের পাশে হেঁটে যাওয়া নির্জনতার
                                                কথা
তোমার নাম লিখে আকাশে উড়িয়ে দেব
                                           বেলুন
চড়কের মেলা থেকে নিয়ে আসবো ভাঙা 
                                           আয়না
আত্মহত্যার আগে তোমার সাথে আর দেখা
                                         হবে না
আত্মহত্যার পরেও দেখা হবে না আমাদের
শহরে গান বাজবে
উড়ে যাবে বসন্ত কোকিল
খরা  বন্যার স্মৃতিতে খুব দুলে উঠবে
                                        তুমি