১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা ।। ২০ নভেম্বর ২০২০


 এই সংখ্যায় ২৮টি কবিতা । লিখেছেন জয়াশিস ঘোষ, অনুপম দাশশর্মা, সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়, তুলসী কর্মকার, সেঁজুতি রহমান, সুবীর সরকার, সুপর্ণা বোস, সুমিত্রা পাল, রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়, তপন মন্ডল, চৈতালী রায়, জয়ন্ত বাগচী, বিকাশ চন্দ, জ্যোতি পোদ্দার, চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়, আশিস ভৌমিক, খাতুনে জান্নাত, সুতপা সরকার, প্রীতি মিত্র, মালবিকা হাজরা, স্বপ্না কর, বচন নকরেক, অপর্ণা বসু ও সুজাতা দে ।

সম্পাদকীয়

শ্রদ্ধার্ঘ্য - সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
থেমে গেল এক কিংবদন্তির ৮৫ বছরের পথচলা । আদ্যপান্ত বাঙ্গালিয়ানার শেষ মহীরুহ, বাঙ্গালি মনন আর তার সাংস্কৃতিক অহংকারের শেষ ‘আইকন’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়  চলে গেলেন গতকাল ১৯শে নভেম্বর বেলা ১২-১৫তে । বাঙালি মননের কতখানি যায়গা জুড়ে ছিলেন তিনি তা আর নতুন করে বলার নয় ।তিনি শুধু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রাভিনেতাই ছিলেন না, ছিলেন অসামান্য নাট্যাভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, কবি এবং পত্রিকা সম্পাদক । ‘দেহপট সনে নট সকলি হারায়’ বহু ব্যবহৃত এই প্রবাদটি তাঁর ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে না ।যথার্থ শিল্পীর মৃত্যু হয় না । বাঙালি মননে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চির উজ্জ্বল, অম্লান থাকবেন, চির উজ্বল থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে । 

সদ্যপ্রয়াত শিল্পীর প্রতি অন্যনিষাদ পরিবার শোক-শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাচ্ছে তাঁরই লেখা একটি এবং অন্য দুটি কবিতা নিবেদন করে ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

 এ ভাবেই রয়েছে মানুষ


যেন বা শিকড় তার নেই

শিকড়ের স্থলাভিশিক্ত কোন অভিমান নেই

কূট কোন মায়া তাও নেই

কোনদিন ছিল কি হে ?

এ ভাবেই রয়েছে মানুষ এইখানে ।

যেহেতু মানুষ শিকড়েই টানে

জীবনের স্বাদ – মধু হোক তিক্ত কষায় হোক

ভালোবাসা ক্রোধ দুঃখ সমুজ্জ্বল শোক –

মানুষ টানে না ?

তাই শিকড়বিহীন

মানুষের অবয়বে খুঁত থেকে যায় । মানুষের ঋণ

শুধু স্বভূমির কাছে নয় শিকড়েরও নিকট

যেমন রয়েছে ঋণী নিজেদের কাছে ।

শিকড়ের অভিমান ছাড়া মানুষের কী বা থাকে

কী বা থাকে গাছে ?

কিছু কাঁটার আয়ূধ

অবীজ শাখায় কিছু ঘুমন্ত বারুদ

আর কিছু নয় –

এই নিয়ে মানুষ এখানে আছে

 

জয়াশিস ঘোষ

 ফুরিয়ে গেল শেষের গান

 

আলোর ঘরে পড়ল কাঁটা, ফুরিয়ে গেল শেষের গান

আলোর থেকে অনেক দূরে অপরাজিত কোথায় যান?

বসন্তে তাই বিলাপ শুধু হীরক রাজার সভায় শোক

রেলগাড়িতে চলল অপু, কাশবনে আজ বৃষ্টি হোক

খাতার পাতায় শূন্য লেখা টোল বসেনি পন্ডিতের

জমছে তারা আকাশ কোলে চাঁদেরই পাকদন্ডীতে

বেলাশেষের দু এক ফোঁটা। ফুরিয়ে যায় চোখের টান

এত তাড়া? যেতেই হবে? আকাশপ্রদীপ ঈষৎ ম্লান

কোনির কানে মন্ত্র বাজে, ফাইট! সে তো ক দিন আর!

অসুখ শুধু হারিয়ে দেয়। নিভিয়ে দেয় চারমিনার...

 

অনুপম দাশশর্মা

অম্লান নক্ষত্র


ভিজে গেছে মেঝে ভিজে গেছে পথ

দেহ থেকে সরে গেছে যাতনা দরদ

বহুচেনা কন্ঠের জাদুময়তা যখনই

ছড়িয়েছে মায়া, জেনেছি সবাই তিনি কী বৃহৎ।

ভিজে গেছে হেমন্ত দুপুর স্তব্ধ কারুবাক

তবু পুলুর দীর্ঘছায়া বাঙালির ছয় ঋতুতে

সজীব থাক।

 

 

 

সবর্ণা চট্টোপাধ্যায় / দুটি কবিতা

 এ কেমন নিস্তব্ধতা 


এ কেমন নিস্তব্ধতা? 

অবুঝ ঢেউ আছড়ে আসে তীরে

চোখ টেনে রাখে পূর্ণিমার চাঁদ।

তবু যে অপেক্ষা টিমটিম করে বাঁচিয়ে রাখি অন্তরালে

কখনো টের পাও, হাসির আড়লে কত জল ছাপ

শুকনো পাতার মতো মাড়িয়ে যাই রোজ?

তুমিও বোঝ না। বোঝ না কিভাবে বারবার 

ফিরে আসে মায়াবী জেলিফিশ… 

অজান্তে আঁকড়ে ধরে বালি!

 

কতবার ভিখারির মতো সর্বস্ব তুলে দিয়েছি সামনে

দুহাত পেতে বলেছি, শুধু একটু ভালোবাসা

চাইতে চাইতে কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে রোদ

ভোরের দরজায় টোকা দিয়েছে আর্তনাদ

নিজেকে দেখেছি, হাঁটু গেড়ে, মাথা নীচু, চোখে জল

 

অথচ যার থাকার কথা ছিল, 

স্তিমিত রাত্রির মতো সেও একযুগ একটি কথা বলেনি 

মন খুলে। নীরব নিঃশ্বাসটুকু 

ছুঁয়ে গেছে আমার কল্পনা শুধু

আর একের এক পর যন্ত্রণা লিখে রেখেছি কবিতা মনে করে। ভেবেছ, আমি কত দূরদর্শী… 

কত ভাবুক!

নিঃস্ব এক মানুষ কতটুকুই বা দিতে পারে শুধু ভালোবাসা ছাড়া?

 

 

একটা ম্যাপেল পাতা

 

আমার এক চেনা ছাদের বাড়ি 

সোনার খড় চাউনি

চড়ুই আর ঘুঘু পাখির ফুরুৎ ফুরুৎ।

আর একটা ছোট্ট পৃথিবী

তোমায় ঘেরা উঠোন।

হলুদ ম্যাপেল পাতা পায়ে পায়ে

তুমি খসে পড়ো ওমন শরীর থেকে প্রায়

ভরে যায় ঘর।

কত চিৎকার, আলো আঁধার ঘিরে ধরে।

শুধু চুপ করে থাকো। আমার ভেতর

যেন লুকিয়ে আছো শতজন্ম ধরে।

 

লিখতে লিখতে বেলা পড়ে যায়

ভিজে আসে চোখ

তোমাকে না লেখার যে তীব্র যন্ত্রণা আমায়

বারবার নগ্ন করে দেয় নিজের কাছে, 

তোমাকে বোঝাই।

বলো, বয়স পেরিয়েছে সেসব।

 

বয়স, সে তো শুধু অঙ্কের হিসেব

যাকে মেলাতে গেলে কত যোগ, কত বিয়োগ

গুণ ভাগ

বুঝিনা এতশত। 

শুধু জানি, ভোর থেকে রাত

যে বাতাস আমার শরীর বাঁচিয়ে রাখে রোজ,

তাকে আমি তুমি বলে মানি।

 

প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা ঝরে পড়া ম্যাপেলের পাতা

পায়ে পায়ে সারা উঠোন, তারপর ঘর, 

 

গোটা বিছানা বালিশ

 

তারপর

 

নিঃশব্দ মৃত্যুর সাথে জ্বলন্ত চিতায়

 

পেরিয়ে যাওয়া অনন্ত অন্ধকার!

 

তুলসী কর্মকার / দুটি কবিতা

 সাক্ষাৎকার 


বর্ণলেখা থমকে দাঁড়ায়। বার্ধক্য আসবে। জীবনকে টেনে নিয়ে যাবে। হিসেব দিতে হবে অনেক কিছুর। বোধ পিছু ছাড়েনি। যাপন বলতে জীবন্ত হয়ে থাকা সময়। 

 

কিছু বছর আগে........

বর্ণলেখা ঘন ঘন আয়নায় দেখে সুগোল মুখ ডাগর চোখ বাড়তে থাকা বুক। অনেক সময় বাথরুমে নিজের খেয়ালে নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে বারবার হারিয়ে যায়। হাত পা পেটতল তাকে স্বস্তি দেয়। লম্বালম্বা আঙুল ইউ কাট চুল ছিপছিপে চেহারা। বাদামী বলয়। কালচে চূড়। পায়রা দুটি নিটোল। বুক থেকে একটি রেখা নাভির মাঝ বরাবর নীচের দিকে নেমে গেছে অপরাজিতা পাপড়ির কাছে। এসবের হদিস বিশেষ কেউ পায়নি। কলেজ জীবনটা অনিকেত আগলে রেখেছিল। হঠাৎ চাকরি পেয়ে দূরে চলে যাওয়ার পর খামতি আসে। এখন নিজেকে দেখে কথাগুলো মিলিয়ে নেয়। পড়াশোনা শেষ করতেই বাবার চাপে স্কুলমাস্টার অম্লানের স্ত্রী হয়ে যায়। সম্মান বইতে বইতে বর্ণলেখা অতিষ্ঠ। দূর সম্পর্কের জনা পাঁচেক রঙিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু বর্ণলেখার নিস্ক্রিয়তায় ব্যর্থ হয়ে যায়।

 

একুশ বছর আগে..........

বর্ণলেখা পৃথিবীর আলো দেখে। চলতে বলতে বুঝতে কিছু সময় পেরিয়ে যায়। তারপর বেড়ে ওঠা। নমিতা মৃন্ময় সুচেতা রিক ছেলেবেলার সাথি। ওরা সবাই নঙ্কু নঙ্কু খেলত। কয়েকবার বর্ণলেখা যোগ দিয়েছে। সে আজব অনুভূতি আজও লেগে আছে। বাবার চাকরি স্থানান্তরিত হতে বর্ণলেখার স্কুল বদল বন্ধু বদল হয়। অনেক সচেতন শহর। অন্তরের কথা কেউ বলে না। মন্তু ক্লাস এইট এ একবার জড়িয়ে ধরেছিল বুকে হাত দিয়ে চুম খেয়েছিল। ইংরেজি স্যার দেখে মন্তুকে যা পিটিয়েছিল বর্ণলেখার মনে আছে। অবশ্য আরও জন পাঁচেক ক্লাসমেট ঘুরঘুর করত বর্ণলেখা পাত্তা দেয়নি।

 

আজ..........

বর্ণলেখার চোখে ঘুম কম শরীর সাথ দিচ্ছে না। স্বামী ওপারে চলে গেছেন। বর্ণলেখা সমীকরণ আঁকে। সময়ের সাথে সাথে মধুর খোঁজে কেউ না কেউ আসে। বর্ণলেখা অনুভব করেছে প্রকৃত সুখ রমণে আছে। শান্তি আছে ঘুমে। ক্ষতির জন্য দায়ী যাপন। লাভ একটি আপেক্ষিক বিষয়। জীবন ভাবতে থাকে বিশেষ কিছু না পাওয়া হলেও আখের লাভ ধর্ম্মের। 

 

কুড়ি বছর পর........

অজস্র বর্ণলেখা ধর্ম্ম মাথায় নিয়ে বৈতরণী পার হয়।

 

অপার্থিব

 

জনৈক কবচ বিক্রেতা হাঁক দিয়ে যায়

খোলা আকাশের নীচে ভগবান নীল হতে থাকে

আমোদ আঁকতে গিয়ে কথাদের মাতামাতি 

ব্যথারা আনন্দের গেট আগলে দাঁড়িয়ে 

সুখ আর সুখজ কলার ফুলঝুরি 

চলমান ক্যানভাস জুড়ে রঙ রাজত্বের ভেলকি

পছন্দের তালিকা প্রকাশিত 

লালা রসে হাজিরা দেয় উপযুক্ত এনজাইম 

অভাব লেগে থাকে স্বভাবে

লবণ লঙ্কা মাখানো শশাফালি টুকু পাতায় রাখা

ভাবনার ভাবে পেট ভরে 

ভক্তি বিশ্বাস কংক্রিট হলে স্বপ্ন সত্যি হতে জানে

 

 

 

সেঁজুতি রহমান

 পথিক আমি 

 

মানুষের মাঝে চলতে গিয়ে
দেখেছি তার হিংসা, লোভ,
স্বার্থপরতা, সত্য,মিথ্যা,
প্রেম অনেককিছু...
আমার মনের সবুজ অরন্যের
কত গাছ দুমড়ে মুচড়ে গেছে
তৈরি হয়েছে ছোট বড়
অনেক ফাটল।
আবার ভালোবাসার
নীলচে হ্রদে ফুটেছে লাল পদ্ম।
ঐ দূর পাহাড়ের চুড়ায়
কাঁচা সোনা রঙের রোদে
ভিজবো বলেই
হেঁটেই চলেছি
বুকে ভালোবাসা
আর রক্তাক্ত পা নিয়ে ।

1

 

 

সুবীর সরকার

 মৈষাল  


একটা দুরন্ত মহিষ।আর মহিষের পিঠে বসেই লিখে

                                ফেলি অসমাপ্ত চিঠি 

 দূরে গোল পাতার ঘর।

 ভাঙা আয়নার সামনে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন

                                           মৈষাল

 হেমন্তের বাথান।

 নদীতে মায়া ভাসে।

 দুরন্ত মহিষ নীরবেই শুনতে থাকে 

                                        মৈশাল বন্ধুর গান

 

সুপর্ণা বোস

 সুখ এক বিষধর সাপ


সাবধানে ভরতে হয় জীবনের থলে

এতটুকু অসাবধান হলে

নীলে নীলে নীলকমল...

ওহে আশীবিষ,

আমি তো সাপুড়ে নই তেমন

যেমনটি হলে ,জীবনের খালবিল ঘুরে

কেউটে খরিশ..

জড়োকরো তাগা ও তাবিজ

ক্লান্তিবোধ হয় ,. তারচেয়ে

চোখের কবচ ধুয়ে দুটিবিন্দু বারি

নিজেকে যতটা গোটাতে পারি

দুই ভ্রুর মাঝখানে আলো..

সেই ভালো , সেই ভালো l

 

সুমিত্রা পাল

 অর্থ


মাঝে মাঝে আক্ষরিক অর্থগুলি

সম্পূর্ণ বদলে যায়

সাংসারিক স্থিতিস্থাপকতায়

মান-অভিমান আর বিরহে।

 

এই যেমন আমি তোমায় ভালবাসি

এর অর্থ কখনো হয়ে উঠতে পারে-

 ডানা ভাঙ্গা পাখির কান্না!   

 

রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

 নির্মেদ কবিতা


আর কোনো কিছুতেই উৎফুল্ল বা বিচলিত হইনে
মহা কাঠিন্য ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছে গেছি
নিরুত্তাপ কোমল অলোকমালায়
অর্থাৎ
  শেকড় ছুঁয়েছে নক্ষত্র-উপমা
অদ্ভূতভাবে দাঁড়িয়ে গেছি এই অনুভবের চাঁদে
এখন একই ঔজ্জ্বল্যতায় ছুঁয়ে থাকি
সমস্ত জয়-পরাজয় .......

বরং ভালো আছি নির্মেদ কবিতা.....।

 

তপন মণ্ডল অলফণি

 লড়াই


আজ আর একবার লড়াইটা হয়ে গেল

ন্যায় অন্যায়ের লড়াই

ওরা সহস্র কুকুরের দল

আর আমি ন্যায়ের পক্ষে

একা ক্ষত বিক্ষত শরীর

লালামাখা মুখ

 

লড়াই যে আমাদের শেষ সম্বল

মৃত্যু যে আমাদের নৈমিত্তিক

বারংবার ওরা আঘাত করেছে

অর্থাবাণে মিথ্যা যশে

তবু শক্ত করে ধরে আছি

এই মধ্যবিত্ত গ্রাম্য লড়াইয়ের পতাকা

রক্তে ভিজে যাচ্ছে আমার কায়িক শ্রম

খুবলে খুবলে ধরছে নেকড়েগুলো

আমার হাত পা শরীর

 

এই নপুংসক সমাজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে

সেই আদিম দাস আর ষাঁড়ের লড়াই দেখছে

 

অবশেষে আমার শেষ ন্যায় রক্তের ফোঁটা ঝরে পড়ল

আমার চোখ বুজে আসছে

আবছা ভাবে দেখলাম

একটা ন্যায় পতাকা নিয়ে কেউ যেন

নেকড়েগুলোকে তাড়া করছে

জয়ন্ত বাগচী

 শুধু তোমাকে

 
যে পর্বে হাত রেখেছি
সেখানে দারুণ উত্তাপ
শুন্যতা থেকে পূর্ণতা
সব কিছুই অনুভব করি

রাত্রের গভীর শূন্যতা নয়
নয় যন্ত্রের হাজারো কারিকুরি
তোমার মুখোমুখি হতে চাই
যেখানে বাস্তবের সলজ্জ ছবি

জনতা তুমি ভালোবাসো
ভালোবাসো বন্ধুত্বের সমবেত কোলাহল
আমি যে জমে গেছি একটু একটু কোরে
তাই শুধু তোমাতেই সন্তুষ্ট থাকতে চাই ।

চৈতালী রায় / দুটি কবিতা

 ধারণ


লোকটা মাঝে মাঝেই উধাও হয়—
কোথায় যায়?
ও নাকি পাহাড় আনতে যায়
নদী, কচি ধানের মাঠ
আরও কত কী!

কেন?

তুমি আঘাত করলে পাথর হবে সে
কাঁদালে নদী
ভালোবাসলে সবুজ প্রান্তর
হাসালে ঝর্ণা
আরও সব আছে—

বয়ে আনে কী করে?
কেন!
বুকের ভেতর সব রাখা যায়
জানো না বুঝি?

 

যাজ্ঞসেনী


অগ্নি সম্ভূতা তুমি ,পাঞ্চালি দ্রুপদ-কন্যা ,
বহ্নি-শিখা তুমি ,হে নারী - রূপের বন্যা ।
যে লেলিহান মাঝে জন্ম নিয়েছিলে তুমি - (ভারতভূমি )
কোন পরিচয়ে তুমি চেয়েছো হতে পরিচিতা ?
তুমি কৃষ্ণসখী কৃষ্ণা ,দ্রুপদ কন্যা দ্রৌপদী ,
চাওনি কি তুমি পাণ্ডবের পরিচয়ে , হতে বন্দিতা ?
এ আদি বৈদিক প্রাচীন ভারতবর্ষ - আমার মাতৃভূমি
অপালা -গার্গী-মৈত্রেয়ী-ঘোষার জন্মভূমি
সীতা সাবিত্রীর পবিত্র পুণ্যস্থান।
বলো তুমি হে অগ্নিকন্যা ,বিধাতার আশীর্বাদ ধন্যা-
চিরকুমারীত্ব পেয়েছিলে জানি পঞ্চস্বামীর পরে !
পঞ্চসাগর সেঁচে দেবি ,পেয়েছিলে কি অমূল্য-রতন?
হওনি কি তুমি রাজনীতির ঘুঁটি ?
সত্যপ্রেম ছিল নাকি সে অনাথ-সাগর-হৃদয় প্রতি ?
অগ্নিতেজ ধায় যে চিরকাল অগ্নির বাণে ,
এ সত্য তো ইতিহাস জানে ।
আজও মনে হয় ,তোমার নারীত্বের পূর্ণ পরিচয় ,
অবগুন্ঠনে হলো যে দীর্ণ ! তবুও সে সাগরের শত তরঙ্গ
তোমার বহ্নি তেজে হয়েছে শীর্ণ।
ধর্ম মাঝে ,পত্নী মাঝে ,পরগোত্রে আর
করেছো ব্যক্তিত্ব চূর্ণ ,নারী তুমি কার ?
তুমি শক্তির ,তুমি সত্যের ,তুমি তেজের পরিচয়
তুমি মায়ার কায়া ,যাজ্ঞসেনী প্রলয় ।

 

 

 

বিকাশ চন্দ

 আগামী আগুন স্তবে


নিশিপদ্মের রঙ চেনে না অমাবস্যা কি পূর্ণিমা রাত

অবিকল শহুরে ম্যাজিক রাত নামে পদ্মদিঘির জলে,

সমস্ত অচেনা মুখ খুঁজে ফেরে তাদের দ্বিজাত স্বরূপ

কত না গাছের শরীর কুঁড়িময় মাতৃত্বের জঠরগত ভ্রূণ। 

 

ঘরে ফেরা সকল পাখিদের সুর শিস গান বাতাস চেনে

দেখেছে ঘিরে আছে রাজকীয় প্রাসাদের পদ্মমণি প্রাকার,

ঘুলিয়ে দিচ্ছে সব পা ডোবা ঘাসের মায়া কোমল আস্তরণ 

প্রাসাদ জানে গোপন ঘর আর আরও গোপন কৃষ্ণ অনুরাগ। 

 

খুব জানে মায়া তরু কোন বাতাসের ঘ্রাণ মাতোয়ারা মধুময় 

হাওয়া মোরোগের লেজ মাথা জানে কালো মেঘ নৈঋত প্রহর,

কতটা হৃদয় যন্ত্রণা ঘুরে দেখে ফেলে আসা হত্যার মাঠ খসড়া

সেখানে শব্দহীন রাতেরা নীরবে ফিরে যায় অদেখা আত্মার মতন। 

 

কতবার কতদিন প্রহর প্রহারে মিলেমিশে বিলীন আগুন রক্তবমি

তবুও বাহবা বিলাসে গলাউঁচু পারিষদ হাত তালি খোঁজে, 

ফোঁটা ফোঁটা শিশির তখন মুক্তা বিন্দু হেমন্ত ধানের শিসে

স্মৃতির ভেতরে প্রাণময় মুখেরা বাঁচে আগামী আগুন স্তবে। 

 

জ্যোতি পোদ্দার

 গ্যাস বার্ণার


গ্যাস বার্নারের নীল আলোর বিচ্ছুরণ দেখলেই আমার 

                                  কাকাতোয়ার কথা মনে পড়ে। 

সে ছিল আমার পোষ্য কাকাতোয়া।

 

শেকল বিহীন দাঁড়ে দাঁড় কামড়ে বসে 

নখে ছড়াতো মুসরি ডাল

আর জব

আর চালের খুদ

 

গ্যাসবার্নার গ্যাসবার্নারের মতো একবার নিভে গেলে

নি:শেষে বিভাজ্যের মতো

নিভে যায় নীল আলোর কম্পিত বিচ্ছুরণ।

 

কাকাতোয়া যেমন দাঁড় ভেঙে একদা উধাও।

 

চুলা নিভে গেলেও উত্তাপ থাকে

আঁচ থাকে

মুখ গহ্বর একটু ফুলিয়ে ফু দিলেই

                        ফুয়ের ভেতর থাকে দগদগে আগুন।

 

 

চিরন্তন বন্দ্যোপাধ্যায়

 প্রলাপ


চারিদিকে কিলবিলে মানুষের মত অন্ধকার;

আমার হাতে পায়ে পেটে নিশ্বাস ফেলে:

কাঁচের টুকরোর মত শব্দগুলো,

কেটে যায় চারপাশ, বোকা বোকা মন;

বাজারের আঁশকাটা বটি, মাছের লাশের খোঁজ করে।

 

মর্গের ঠান্ডা ঘরে শুয়ে দেখতে হবে, নিস্তব্ধ রাত কিছু বলে?

আজ অবধি শোনা হল কবে;

চারিদিকে ধংসের লীলা, আমার তো এখনো সবুজ ভালো লাগে।

 

চুপ কর, চুপ কর দেখি

আমায় এখন একটা কবিতা লিখতে হবে,

 বড় বড় আইনের বইগুলো পড়ে;

মাত্র তিনহাজার বাঘ বেঁচে আছে,

তুমি কেনো দামি বলতে পারো?

 

ভীড় বাসে ঘেঁষাঘেঁষি করে, বাড়ি ফেরা;

ধাক্কা লাগলে ভেংগে যেতে পারে

 

হাতে ধরা খুকুর ওষুধ, ছেলেটা আমার বড় ভোগে।

অচেনা হাত ছুয়ে দেয় হৃদয়ের ওপরের ত্বক,

সে ছোঁয়া আগুন জ্বালাতে কই পারে?

একদিন জ্বলে যদি যাই, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সব ছারখার করে দিয়ে যাবো -

 

হাতে বাঁশ তুলে নিয়ে যদি,

ষোলোটা মানুষের মাথা থেঁতলে মারি

তুমি কি আমায় একটা ঘুমের ওষুধ তুলে দেবে?

আশিস ভৌমিক

 অবসাদ


নদী চরে আটকে থাকা নৌকা অবসাদ 

একা মাঝি সাথী হারা নক্ষত্র আকাশ 

মাঝে মাঝে উঁকি দেয় মেঘে ঢাকা চাঁদ 

ভাটি জল নিঝুম রাত বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ।

 

চাঁদ কখন ভাসাবে সাগর জোয়ারের জল

পাটাতন গালুইয়ে আর কাটে না সময় 

মাঝি তাই জাগিছ প্রহর খুঁজে পেতে তল 

অপেক্ষায় অপেক্ষায় বুঝি রাত ভোর হয় ।

 

কত মাঝি চলে যায় স্রোত অনুকূলে

কর্ণের রথের চাকা মাটি গ্রাস করে

মাঝি মন সমুদ্র ঢেউ কেউ নেই কুলে

যে সময় চলে গেছে তা কি আর ফেরে ?

 

ধৈর্য্য তবু রাখে মাঝি আছে পিছুটান

সুখে দুঃখে পাশে থাকে নৌকা অন্ত প্রান ।