১০ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা ।। ২৫ নভেম্বর ২০২০

 


এই সংখ্যার লেখকসূচি : রত্নদীপা দে ঘোষ, অরুণিমা চৌধুরী, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, প্রণব বসু রায়, এলিজা খাতুন, জয়িতা ভট্টাচার্য, মতিন বৈরাগী, বৈশাখী চক্রবর্তী, সৌগত রাণা, তুলসীদাস ভট্টাচার্য, নিলয় গোস্বামী, সুবীর ঘোষ, ওয়াহিদ জালাল, অদিতি শিমুল, সেলিনা জাহান, সঞ্জয় সোম, মিজান ভূইয়া, জারা সোমা, কুমকুম বৈদ্য, শৈবাল বিশ্বাস, নাহার আলম, শমীক বসু ও দেবলীনা দে ।

                                     সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন

রত্নদীপা দে ঘোষ

 পাশের ঘর


সম্ভবত ঘরটির রঙ বাবার পছন্দের গাঢ়নীল, আকাশটা আরও অনেকখানি বুকভরা প্রশস্ত।

সূর্যের শিরদাঁড়াটি বিস্তৃত চাঁদের জোয়ার অবধি। পূর্ণিমার জ্যোৎস্না? সেও হয়তো লক্ষহাসিতে কুসুমিত।

হয়তো বৃষ্টিরাও স্বাস্থ্যবান খুব, গাছেরা আরও দীর্ঘদেহী।হয়তো সেইঘরের পাখিরা শুক্লপক্ষের অরণ্য। আরও গভীর উদার মেঘশাবকের বারো দুয়ার। হরিণপন্থী সবুজে মেদুর সেই ঘরের আকার এবং দেওয়াল।

হয়তো সেই ঘরে বাবার জন্যেই রাখা আছে একটা রূপোর মাঠ, খেলার ধূলিবলটি সোনার।

তাইতো ফুলপাতায় মণিহারেরর জনীগন্ধায় দুলতেদুলতে বাবা চলে গেলেন পাশের বাতাসে!

 

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

 মাটি


তোমার পায়ের চাপে গুঁড়িয়ে যাওয়া মাটি

যাকে তুমি বিতৃষ্ণার চোখে ভাবতে

অনাথ

এবং অনাত্মীয়,

সেই মাটি আজ ফিসফিসিয়ে উঠলো।

মাটি তার প্রত্যেকটা রোমে

ফোটালো ঘামের স্বচ্ছ্ব ফোঁটা,

আর সেই স্ফটিকে আয়না মেললো

হাজারো মানুষের মুখ!

 

তাই নতজানু হতে হ’লো

তোমাকেই, এই মাটির কাছে।

ঠিক তক্ষুনি

অনুভবের আকাশ ছোঁয়া জলবায়ু

ঢেকে দিল তোমার স্বত্বার আত্মম্ভরিতা –

চলচিত্রের সেলুলয়েডে

আবর্তিত হ’লো মাটি মাটি আর মাটি,

যে মাটিতে পা ডুবিয়ে

সূর্যের দিকে হাত বাড়িয়েছে

আলোক প্রত্যাশী মানুষ।

ধানক্ষেতের জ্যোৎস্না পেরিয়ে

চেরনোবিলের অন্ধকার পেরিয়ে

মাটি

মাটি

উঠে এলো অন্তর্গতে।

 

অন্তর্গতে মাটি মাটি আর মাটি, তাতে

জীবনকে প্রাকৃতিক পুঁতে রাখাটাই

তোমার আজীবনের অন্যতম শিল্প।

তা ছাড়া তুমি তো জেনে গেছ

তোমার শরীর গুল্ম এ পথের শেষে

চন্ডাল আগুন ছাড়া আরো যাকে সঙ্গে নেবে

সেও এই মাটি!

 

অরুণিমা চৌধুরী

 দীপাবলী


কবরে শায়িত শব ঘুম থেকে অভ্যেসে উঠে বসে 

চারিদিকে মৃতের চিহ্ন স্বরূপ

অনেক প্রদীপ নিভুনিভু

পুড়ে গেছে সলতের বুক

ঠোঁট তবু কথা বলে চলে কান্নার অভ্যেসে 

 

পোড়া স্মৃতি, সাপের খোলস...

অবশেষ এইটুকু

কার কাছে যাবে! যে দিয়েছে হেমলক

 যে দিয়েছে চিবুকের সামান্য আদর! 

এখনো কি ভাবো নিয়তি পালটে যাবে!

 পাল্টাবে পুরনো অসুখ

 মলমপট্টি নিয়ে প্রেমিক ফিরবে এঘরে ! 

 

শোনো!  ঘুমের ভেতরে

 ঢুকে গেছে সব সম্ভাবনা

 শরীর জ্বলেনা 

শুধু আত্মা নিভে যায় 

 

তারও পরে কেউ কেউ নষ্ট কথায় কবরের  ঘুম থেকে জেগে ওঠে তোমার মতোই

 এর মাঝে এক একটা দিন মুছে যায়, কিছু স্মৃতি জেগে থাকে

 এর বেশি কিছু নয়!  

 

 

প্রণব বসুরায়

 না


আমার স্বপ্নের ভেতর ঘুম আছে, কিন্তু

ঘুমের কোন পূর্ব পরিচয় নেই

ঘুমের মধ্যে আছে রেলগাড়ি, কিন্তু

সেই ট্রেন কোথাও যায় না

সোনালী ধানের উৎসবে প্রতিবেশি আসে

স্বজন আসে না

আগুন-পরবের রাশি কাঠ জমানো হয়েছে

...... অগ্নিশলাকা নিয়ে কেউ তো আসেনি!

তুলো ধোনার টঙ্কার শুনেছি, গিয়ে দেখি

আমার পূর্বপুরুষ কিছুই জানে না

#

তোমার হাতের বাতি জ্বালাতে পারি না

কেন তুমি মোম জ্বেলে আসোনি, বলতো!

 

 

 

জয়িতা ভট্টাচার্য

 পরিশোধ 


ছেলেটা জোনাকির ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে,

দু একটা বন্ধ্যা ডাল ওকে নিষেধ করছে,

যেও না ওদিকে, তিথি ভালো নয়,

মাত্র উনিশ এখন

রক্তে আর ধমনীতে তেজ

ভাঙা মন, ভেঙে পড়া দেউল,

ভাঙা বিগ্রহ, চামচিকে ওড়ে

পাথরের চোখ, স্কন্ধকাটা অন্ধ দেব

 

ট্রেন যায়,একে একে,

এগিয়ে দেয় যতটা পারে

রুগ্ন চাঁদ , শেষবার 

শেষ হয়ে যায় সব আশা।

প্রণয় ঘাতক হলো হৃদয়ে সমীপে....

 

অপেক্ষায়, আনিদ্রায় 

তবু তো মা !ভাবে,

ওই বুঝি ছায়া পড়ে

ওই বুঝি আসে খোকা

অভাগিনী মা সদর খুলে দেখে চুপি চুপি, ছেলে ওই, রোজ আসে

কেউ না জানতে পারে সেই কথা

কেউ না জানতে পারে ...

 

এলিজা খাতুন

 মরিচাবেলা


তরুণ বয়সে দু'চোখের কোণে বিস্তর মাটি ছিল

সপ্রাণ উদ্দামতায় ভেঙেছি কত ঢেলা-ভুঁই !

বীজের গূঢ় হৃদয় পাঠ ছাড়া

অন্য কোনো জরুরী কাজ ছিলোনা কখনও

 

অথচ সভ্যতার মরিচা পড়তে পড়তে

আমার বিধ্বস্ত চোখ দেখতে পায়

লাঙল-বীজ-মাটির নিখাদ নিবিড়তাকে খামচে তুলে

পকেট ভরে নিচ্ছে কতিপয় হাইব্রিড উন্নয়ন-কর্তা

 

এবং নির্বাসিত অন্তর টের পেয়ে যায়

যাদুঘরের ধুসর দেয়ালে ঐতিহ্যর প্রহসনে

আমাকে টাঙানো হয়েছে 'লাঙল' নামে

 

আর বিস্মিত হই !

পৃথিবীর নতুন চোখগুলো অর্থাৎ

যারা গবেষণায় নিয়োজিত হয়েছে ;

শুরু থেকেই তাদের দৃষ্টিগুলো মরিচাবৃত

মতিন বৈরাগী

 তুমি শুরু করো শেষ করবে আগামী


অকারণ হাত তালি দিওনা পোষা কুকুরের মতো : নাড়িওনা লেজ

কলুসিত করোনা আপন আত্মা

লাফিয়ে লাফিয়ে কয়েদায়িত করো না বিশ্বাসের ফুসফুস

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মতক আত্মবিক্রয়ের স্লোগান ধরো না কণ্ঠে

বিভক্ত হয়ো না হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টান বলে

সবাই প্রথমে মানুষ

ভাগ করো না নিজের কব্জি

চিরকালের দালাল হয়ো না চামচা কিংবা বিশ্বাসঘাতক; চাটার সুবিধায়

নিজেকে দেখো বিম্বিত আয়নায় নিজের অস্তিসন্ধির বিস্ময়

অনুসন্ধান করো দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ

কোথায় কে কাকে ভাঙে-

 

অনুভব করো ধুমায়িতহৃদপিণ্ড শিরার উষ্ণ রক্তদ্রোহধারা

তুমি স্বাধীন জন্মসূত্রের; উমেদার নও কখনও নও কৃতদাস

কোনো প্রভুর দাস নও তুমি

তুমি তুখোড় যোদ্ধা, বীর বিপ্লবী কীর্তি ও কৃতির মহানায়ক সহিষ্ণুমৃত্তিকার

নও কারো পায়ের তলার ধুলো লেগে থাকবে জুতার শুকতলায়

পিষ্ট হবে কারও উল্লাসে

হয়ে ও না সর্বনাশ জনগণের বুকের পাঁজর ফোঁড়া অভিশপ্ত পেরেক

তোমার জন্য অপেক্ষায় আছে জগতের অপার আলোক

তুমি তৈরি করবে এক ঝলমলে নক্ষত্র

ভ্রমণ করবে মহাকাশের মহাধ্বনির রূপমগ্নতা

আর যখন খোলা প্রান্তর থেকে উঠে আসবে হাওয়া আর যখন

গর্জন করবে আগামীর জাগরণ ঢেউকলরোল

তুমি প্রস্তুত হও, গুছিয়ে রাখো তোমার মনোবল

সার্থবাহী ক্ষুদ্র লাভ থেকে

গুছিয়ে রাখো সকল চিন্তার দোটানা দোমনা

লেগে থাকো নাবিকের মতো

শিখে নাও যা মানুষ চাইছে এবং পেতে চায় সত্যের পরিভ্রমণ

নিশিথের ধ্রবতারা

শিখে নাও প্রকৃতির পাঠ কী করে হাল ধরতে হবে নিজের মধ্যের

এবং জমে যাওয়া শেওলাকে

কোন ক্রিয়ায় গড়িয়ে দিলে মুক্ত হবে অন্তরনুড়িশিলা

চেতনায় ফেরো সে তোমার মধ্যের তোমারই গোপনলিপি

আকাশপাখায় ঝকমকি তারাফুল

আপন সত্তাকে অস্তিত্বমান করো কারণ তোমারই নবায়িত হবার

শক্তি আছে

ক্ষুদ্র থেকে জ্বলে উঠবার ইতিহাস আছে

বিজয়ের কাছে পৌছানোর আছে নির্ভুল সামাজিক বিজ্ঞান

নবায়িত হও প্রতিদিন-

 

তুমি শুরু করো

আগামী শুরু করবে তোমার কোন এক শেষ বিন্দু থেকে -

 

 

 

বৈশাখী চক্রবর্তী

 অপূর্ণ প্রচ্ছদ


এখনো ঠিক হয়নি

আমার প্রচ্ছদে কার মুখ আঁকা হবে,

নীরবতার ভাঙা মেঘ

ভাঁজ খুলে মেপে নেওয়া নিখুঁত জলরাশি

শূন্যতার ভিতর স্খলনের তীব্র প্রবণতাও পারেনি নিশিতে পাওয়া এ ক্ষয় আঁকতে।

দেরি হওয়া বোধহয় স্বাভাবিক,

এটা বৈশিষ্ট্যও হতে পারে,

একদিকে খুঁড়ে ফেলা অজ্ঞাতবাস

পাঁজরের ফাঁকে কিছু অন্ধ করতালি

বারবার ছিঁড়ে ফেলা সদানন্দ আলো

ধাতব স্বপ্ন কিছু রক্তমাংসের পৃষ্ঠা

আর কিছু ব‍্যর্থ উড়ান

অন্যদিকে এক তাৎপর্যপূর্ণ নিরেট শূন্যতা,

একই আয়নায় ফিরে আসে বারবার

বায়বীয় বুদ্বুদে, অন্তর্লীন তমসায়

বেজে ওঠে অন্তিম দেহভৃৎ নিভৃত একতারা

তবু অসম্পূর্ণ রয়ে যায় যে প্রচ্ছদ থেকে যাবে শেষমেশ।

 

সৌগত রাণা কবিয়াল

  পথ আর তার ময়ূরপঙ্খী নদী.....

 

নিঝুম কুয়াশার আলোয় নববধূবেশে রূপবতী প্রান্তর...

সেই গোধূলি আবীরে ঘাস ফড়িংয়ের আয়না-পাখায় নকশীকাঁথার রংধনু...

এরপর, 

হঠাৎ হঠাৎ দুরন্ত গাংচিলের শৈলরাজ ঠোঁটে

হাঁটু নদীর শান্ত জলের ক্যানভাসে

হলুদ-কালো সাপের শৈল্পিক শিকার......!

 

ছুটছে দিন, ছুটছে রাত,

ছেলেটার চোখ তখন,

দুধ-বালক সময়টা পেড়িয়ে

খেয়ালি এক কৈশোরের মাকড়সা অভিমান....!

 

সামনের মেঘ সামিয়ানার ছোট্ট নদীটির উজান-ঘাস ছোঁয়া যাওয়া-আসার লাল মাটির এক পথ,

সোজা গিয়ে জমেছে শহরের কংক্রিট তল্লাটে.....!

 

 উঠোনের পরন্ত রোদে ভেজা ধানের শীতল পাটিতে

দুটো গেরুয়া-চড়ুই, আপোষে বেঁধেছে সংসারের সুখ-দুঃখের খেলাঘর....!

 

প্রকৃতির সেই সুখ-ছবির বায়োস্কোপ নেশা ছাড়িয়ে অনেকটা দূর নীলকন্ঠ-সাদা তুলো ভেজা এক আকাশ.....

যেখানে দুটো সাদা পাহাড় ব্যাস্ত তাদের গম্ভীর মুখোমুখি কথোপকথনে...!

 

রূপের যখন বয়স বাড়ে বুকে তখন আঁধারের খিদে জাগে...!

 

ছেলেটির নব্য-পৌরুষের শরীর-বাঁকে বইবে বলে,

উর্বশী ঢেউ নিয়ে কত নদী

পায়ে সোনার নূপুর পড়ে ঝর্নার মতো নাচতে ডাকে...

ছেলেটা কেমন যেন অদ্ভুতুড়ে বোবা এক...!

 

'বোকা ছেলে, এ বয়সে কি কেউ চুপ করে হাঁটুর উপর মুখ গুঁজে

ময়ুরপঙখী শাড়ির শান্ত নদীটির আঁচলা-জলে মন রাখে....??

 

লাল ইচ্ছের চোখ পেতে একদিন কলতলাতে শরীর ছুঁড়ে দিয়ে

 নীলিমা বৌদি মুচকি মুচকি হেসে বলেছিল,

" এই ছেলে, একবার দেখ তাকিয়ে..

তোর ওই নদীর চাইতে এই নদীতে অনেক রঙ্গিন বাঁক...

ওর থেকে ঢেরবেশি নাইতে পারবি এতে....;;

মাটির ছাঁচে তুলির আঁচড়ে নকল শরীরের আঁকাবাঁকা কথায়, ছেলেটার ভয় হয় কেমন....!!

 

ছেলেবেলার উঠোনে মাটির উনুনে খেলাপাতি সংসারের আকাশ চোখের শ্যামলা রঙের একহারা মেয়ে রানু,

 যেদিন একলা দুপুরে তার বদলে যাওয়া বুকের উপর ছেলেটির হাত চেপে ধরে বলেছিলো,

" হ্যাঁ রে, একটিবার ছুঁয়ে দেখ এখানে,

এখন থেকে আর মিছেমিছি সংসার খেলবো না আমরা..

খেলবো সত্যি-সত্যি ফুলসজ্জা ".....!

 

সেদিনের সেই বিকেলে বোকা ছেলেটি,

তার ময়ুরপঙখী নদীটির সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলো... কেও বোঝেনি, সেই কান্নায় ছেলেটির মলাট বন্দী অনুভূতিতে কি লেখা ছিলো সেদিন..

 পাপ না পরিতাপ....??

 

আজকাল ছেলেটির খুব 'পথ' হতে ইচ্ছে হয়,

' ময়ুরপঙখী নদীর উজানি সেই পথ...

যে পথ ঘেঁষে কত মানুষ জীবনের সুর তুলে হেঁটে যায়...

কত গল্প, কত কথা, কত সুখ, কত কান্না....!

 

মাথার উপর রাত-ভোর সময় চলে যায় অনেকদূর...!

 

ছেলেটি আজকাল সত্যি সত্যি পথ হতে শিখে গেছে..

তুলতুল সুখের নরম মাটির পথ.... এই পথে দুরন্ত মানুষও ছোটে, আবার এই পথেই জন্ম নেয় নতুন সবুজের মাতৃ-জঠর....!

 

 

এখন, আঁকা-বাঁকা এক দূর শহরের কাঁচা মাটির পথ হয়ে,

ছেলেটি ইচ্ছে করেই ঘিরে থাকে তার ময়ুরপঙখী নদীটিকে...!

 

 সারাদিন ছেলেটি অপলক দৃষ্টিতে, সরাসরি চোখ রেখে তার প্রিয়তমা নদীর বুকের ঢেউ দেখে সাহস করে...

বাতাস জোছনার রাতে যখন পাগলের মত অকারণ চন্দ্রিমা দুঃখ ছোটে ছেলেটির চোখে,

ময়ুরপঙখী শাড়ী পড়ে মায়াবতী নদীটি তখন

স্থির হয়ে সামনে এসে মাটিতে হাঁটু ছুঁইয়ে শান্ত হয়ে বসে,

আদর করে ধুয়ে দেয় কাঁচা মাটির  পথ-ছেলেটির পা....

নিজের আঁচলের গন্ধে ছেলেটির বুকের কাছে মাথা রেখে চুপ করে শোনে বুকের ধুপ-ধুপ শব্দ........!

 

ছেলেটি, ছেলেটি তখন অদ্ভুত এক প্রেমিক পুরুষ হয়ে উঠে....

হয়ে উঠে সৃষ্টির প্রাচীণতম পিতা.....!

 

অসম্ভব সুন্দর এই জোছনা রাতে সৃষ্টি-শক্তির মিলন দেখে

মেঘ সোহাগি চাঁদের গা ছুঁয়ে উড়ে যায় মুক্ত ডাহুকের দল....

হলুদ প্রজাপতির দল নিঃশব্দে ভালোবেসে সৃষ্টি করে সময়ের বৈকুণ্ঠধাম.... !

 

এভাবে, দিন-দিন, প্রতিদিন..

প্রেম বাড়ে, স্বপ্ন বাড়ে, সুখ বাড়ে, দুঃখ বাড়ে....!

 

হঠাৎ,  হঠাৎ একদিন..

দূরের গায়ে জোর হৈচৈ....

প্রেমহীন ওপারে আজকাল আর তেমন বৃষ্টির জল জমে না..

তাই সময়ের পঞ্জিকার শাসন মেনে হেমন্ত আসে না ঠিকঠাক...

তাই, তাই ওরা নাকি, ওরা নাকি... শরীর কাটবে ময়ুরপঙখীর....

নতুন বাঁকে পরিচয়  বদলে দেবে শান্ত নদীটির....

নতুন কোন উজানী পথের সাথে প্রিয়তমা ময়ুরপঙখী নদীর জীবন জুড়িয়ে দেবে....

সেই জলে ভরিয়ে দেবে বন্ধ্যা ধানের শীষের মাতৃ চিবুক.....!

 

 

ছেলেটি, ছেলেটি চিৎকার করে ওঠে...

বিভীষিকাময় সেই নিশব্দ চিৎকারে,

শাপলা-শালুকের গায়ে ঘর বাঁধা ঘাসফড়িং-এরা পালিয়ে যায়.... পরের দিন,

ছেলেটি আরও জোরে চিৎকার করে ওঠে..

সেই চিৎকারে চড়ুই-শালিকের দল, ময়ুরপঙখী নদীটির নতুন পরিচয়ের জলে ভাসা

ছাউনি নৌকোর ছেঁড়া পালে বাঁচিয়ে পালিয়ে বাঁচে....!

 

 দিন যায়, মাস যায়,

ছেলেটি, ছেলেটি ক্রমশ

পাথর এক পথ হয়ে ওঠে.... সেখানে...

সেই পথে আজকাল আর একসময় প্রাণখোলা বেঁচে থাকা মানুষেরা

তাদের নরম পায়ে আরাম করে হাঁটতে পারে না সুখ-দুঃখের কথা বলতে বলতে....

সেই পথে এখন,

খুব সাবধানে দামী হাওয়াই চটি পড়ে হাঁটতে হয়,

নইলে তাদের পায়ে

উন্মাদ পথের সূর্য-অভিমান তাপে দগদগে পোড়া ঘায়ের জন্ম হয়.....!

এখন,  এখন..

দামি দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি দুরন্ত ছোটে সেই পথের মন-বুক চিরে...

 একসময়ের নরম মেঠো পথের শরীরে

এখন পাথর কালো আস্তরণ...

মৃত ফসিল এই আস্তরণের বুক চিড়ে....

আজকাল আর নতুন সবুজ মায়েরা প্রার্থনার দৃষ্টিতে মাথা তুলে সূর্যের দিকে তাকায় না......!

 

আর আমাদের গল্পের ছেলেটি...

সে এখন,

এক দৃষ্টিতে চোখের সামনে মরে যাওয়া তার ময়ুরপঙখী নদীটির

 শুকিয়ে যাওয়া বুকের পাঁজরে মমতার আদরের শব্দ বোলায়....!

 

নিখোঁজ নদীটির শান্ত জলাধারে, আর আগের মত গাঙচিলের গন্ধ নেই...

ময়ূরপঙ্খী ফুলের রেণু ছুটে বেড়ায় না বসন্তের নদী ভেজা বাতাসে...

 গা এলিয়ে জলের থৈথৈ নূপুরের শব্দে হাঁস-পাকালের মায়ার খেলা নেই এখন আর আগের মতন ...!!

 

অনেক দিন পর, অনেক বছর পর..

পথ হয়ে ওঠে ইটকাঠ শহরের ব্যস্ততম এক হাইওয়ে.....!!

 

শুনেছি,

ময়ুরপঙখী নদীটি নাকি ,

ওই পাড়ে স্বর্ণ যৌবনা সুখী এক নববধূ বেশ....!!

 

এপারে আর সেই প্রথম যৌবনের বর্ষা ক্লান্তি নেই....

এপারের ফড়িংয়ের গায়ে এখন অনেক রোগ...

লোকে বলে কতো কি সব নাকি মরন রোগ...!!

 

ছিমছাম সেজে বেঁচে থাকা ছেলেটি এখন

তুলসীদাস ভট্টাচার্য

 শোক


শোকের একটা বহিঃপ্রকাশ

থাকতেও পারে আবার নাও পারে

 

ঝিনুকের মত যন্ত্রণার দহন 

যে সইতে পারে 

সেই এনে দিতে পারে বসরাই মুক্তো 

 

তুমি যেটা প্রকাশ করছো 

তা শোক নয়, শোকের প্রলেপ

 

এ দিয়ে আঁকা যায় না 

শোকের কোরিওগ্রাফি ।

 

লক্ষ্মীর পাঁজ এঁকো শোকের আলপনায় 

বেহালার ছড়ে যে ঝড় ওঠে 

সে তো আমারই নিজস্ব প্রতিলিপি ।

 

হাহাকারের ভেতর যে সংবাদ পরিবেশন

তা কিন্তু সার্বজনীন নয় ।

 

নিলয় গোস্বামী

 শহর


এক সাথে হাঁটি এক পথ ধরে খেজুর পাতার ছায়ায়

শপথ করেছি আজীবন শুধু ভালোবেসে যাব মায়ায়।

সন্ধ্যা রাতের তারার মহল রঙিন করেছে

প্রহর

জোছনা এলো যে ঝাড়বাতি নিয়ে রুপোলী হয়েছে শহর।

 

মেঘের পরতে জমিয়ে রেখেছি মনখারাপের

আবেশ

রঙধনু থেকে কুড়িয়ে এনেছি খুনসুটি আর  নিবেশ।

ধ্রুপদী সুখের বনিবনা থেকে গড়ে যাই প্রীতি সাগর

হৃদয় হয়েছে লুটেরা ডাকাত কোষাগার হল নাগর।

 

সাঁতার আড়ালে ভেসে আছি তবু অনুরাগ কত গভীর

মৃত্যু এসেছে পোড়া বাড়ি নিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে শরীর

ইতিহাস লিখে পুরনো প্রবাদে নাকছাবি আর চাদর

শরীর ছেয়েছে শুঁয়োপোকাদের শিরশিরানির আসর।

 

 

সুবীর ঘোষ

 মলয়সম্ভবা বাণী


 মনে করাও,

কিছু কী ফেলে যাচ্ছি !

কিছু কী ভুলে যাচ্ছি

বেড়াতে বেরিয়ে পাখিটার ফেলে যাওয়া পালকের মোহে ?

ভিতরে অদৃশ্য তাড়া –

অতিথিরা বসে আছে সন্ধ্যাকে কর্ষণে মুড়ে দেবে বলে ।

এমন অদৃশ্য হাতে আমার থাক্ না কিছু সান্দ্র উপহার ।

তেঁতুলপাতারা দোলে যূথবদ্ধ ফলের সোহাগে ।

তার থেকে আরো কিছু বেশি  আশা থাকে

মলয়সম্ভবা বাণী দক্ষিণের কাছে ।

অল্প এসো  গল্পে কৌতুকে

এবং অবশ্য নিও সুরভরা সুরার সোরাহি ।

অশ্ব যায় অপরাহ্ণে অপহৃত প্রান্তরের খোঁজে ।

অস্ফুট বুটজুতোর শব্দে বর্ষা দূরে যায় ।

আত্মপ্ররোচনাকে আমি বশ্যতার ধারা  বলে ভাবি ।

নদীতীরে ফেলে আসা ঘাসের চুপড়ি খুঁজে দেখ দেখি

শৈশবের ফড়িং লুকিয়ে আছে কী না !

 

ওয়াহিদ জালাল

 পঞ্চায়েতী পুকুর


কোন মানুষকে নিঃস্ব করে,তার থেকে

কেউ কিছুই পৃথিবীতে ধরে রাখতে পারে না,

সে সাথে করে নিয়ে যায় আমাদের না জানা

অনেক বিরল সংগ্রহ যা কখনো জানা হয়নি।

আমরা শুধুমাত্র তার স্মৃতিকে ছিঁড়ে ফেড়ে

বারংবার আয়নার উপর টাঙিয়ে রাখি।

 

হিজরত শেষে ঘরে ফেরা পুঁটলি ভেজা থাকে,

কিছু পুরানো গন্ধ সুখ দুঃখের সাথী হয়ে

মনের দরজা খুলে উদাস বসে,

যেখানে কেউ থাকেনা,কখনো কারও বসবাস

ছিলো না,সেই শূন্যতার নাম হয়ে যায় পঞ্চায়েতী

পুকুর,তার জলে লিকর কাটে বিশ্বাসের পাথর।

 

যার মুখ দেখা যায় না,কোথাও আর দেখি না,

তাকে ভুলে যাবার নাম স্বভাব,

পাষান ঢেউ জীবনকে চরে ফিরিয়ে দিলেও

তার টানে অহংকারের জোর বড় বেশি

তাইতো দিনের আলামত নষ্ট করে সূর্যের ভাবুক

স্বীকারোক্তি,আলিঙ্গনের চেয়েও নরম হয়

অন্ধকারে সুখের চাঁদ কষ্টের বুকে।

অদিতি শিমুল

 ট্রাজেডি



[কিছু অপূর্ব অন্ধকার পুড়ে -পুড়ে ব্রহ্মাণ্ডের প্রত্যেকটি ভোরে যে জ্বলন্ত গোলক পৃথিবীতে আলো ছড়ায়-সে আলোয় আমিও নিজের হাত দেখি,পা দেখি,দেখি ছড়িয়ে -ছিটিয়ে থাকা অবয়বগত "একজীবনের সমস্ত পালক; তাল-তাল স্তুপাকৃতি আমার জীর্ন "নকশা"...!]

দেখি,ডানহাতের কব্জি থেকে হাতটা আলাদা হয়ে যাবার পরেও হাত এবং কব্জির সংযোগের খানিক
ব্যবধানে লালচুড়িতে কেটে যাবার বেওয়ারিশ দাগটা এখনও স্থুল আপদের মতো তাকিয়ে আছে !
ফেলে দেয়া কিংবা হাতে নেয়া - পরিপূর্ণ হতে- হতে একদিন মানুষ ক্ষয়ে যায় আর এটাই জীবনের "সিম্পল ট্র‍্যাজেডি "...!

" আলোর দিকে উছলে যাওয়া অসংখ্য হাত, পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জমিয়ে-জমিয়ে আমিও চেয়েছি আরও সম্পূর্ণ করতে আমার আত্মাকে -জমিয়ে রাখতে চেয়েছি নিজের মালিকানাধীন যাবতীয় চেতনা এবং বিস্ময়সমগ্র !
পার্থিব জলছাপ থেকে এখনও একটা আকৃতি নিয়ে আশা করে থাকি -আমাকে নিয়ে গান গাওয়া হবে, কবিতা লিখবে কেউকেউ;
আরেকটা কিংবা অসংখ্য " আমাকে রেখে যাবার একরোখা বাসনায় মগজের নিউরোন থেকে একাধিক সন্তান খুলে আনি আমিও - খুলে আনি অজস্র কবিতার অক্ষর, বাড়িভর্তি সাজানো আয়না; খিদে -তেষ্টার টানে এখনও আগুন হাওয়ায় চুড়ান্ত প্রেমের কঙ্কাল পোড়ে ! ছাইয়ের ভেতরে গুড়ো - গুড়ো জীবন ওড়ে!
অপরাহ্ণের হাত ধরে রক্ত পার হয়ে পোড়োবাড়িতে ঢুকতে গিয়ে দেখি - জন্মাবধি মানুষের নিজের বলতে

কোনও পা -ই ছিল না!

সেলিনা জাহান

 শিউলির হাসি


এখনো শিউলির দেখা পাইনি,

অথচ আশ্বিনের ভরা যৌবন বেয়ে পড়ছে

চারপাশের আকাশ, মাটি, জলে।

দুটো শিউলীর গাছ ছিলো বাড়ির দক্ষিনের উঠোনে

যেই না ঐ উঠোন থেকে আমার পায়ের দাগ

মিশে যেতে লাগলো, আর অমনিি

এক এক করে সরে যেতে লাগলো আমার প্রিয় পাদপেরা।

এখন এমন কেউ নেই, যে আমাকে

খুব ভোরের গা বেয়ে উঠে কিছু শিউলি এনে দেবে

অথবা, কেউ শুধু আমারই জন্য পাতা কুড়ানির মতো

শিউলি কুড়ানি হবে!

নাগরিক জীবন তো বেছে নিয়েছি স্বভাব দোষে

কিন্তু শিউলির জন্য মন কেন কাঁদে!

কেন আমার স্বভাবে এখনো শাপলা, শিউলি আর শালুকের

হাসি লেগে থাকে!