শৌনক দত্ত / গদ্য - নিজের ভাষা নিজের থাক

 নিজের ভাষা নিজের থাক


২০১৯ অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ দুর্গা পূজা শেষ করে কালি পূজার প্রস্তুতি চলছে পাড়ায় পাড়ায় একদিন সকালে বাগুইহাঁটি থেকে লেকটাউন যেতে যেতে হিন্দি উর্দুর আগ্রাসন থেকে বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে কলকাতায় অভিনব এক  প্রচারণায় চোখ আটকে গেলো কয়েক দিন ধরে অনেক জায়গায়ই লাগানো হয়েছে এমন সব ব্যানার-ফেস্টুন, যেখানে দেওয়া হয়েছে নানা হিন্দি-উর্দু শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ

কলকাতার অনেক বাঙালি এখন তাদের প্রতিদিনের কথায় এসব হিন্দি-উর্দু শব্দ ব্যবহার করে থাকে ব্যানার-ফেস্টুনের কোনোটিতে লেখাসওরভের থেকে সৌরভ ভালো’, কোনোটায় লেখাজলেবির থেকে জিলিপি ভালো’, কিংবাপরাঠার থেকে পরোটা ভালো অনেক বাংলাভাষী মানুষ নিয়মিত কথোপকথনের সময় যেসব হিন্দি বা উর্দু শব্দ মিশিয়ে বাংলা বলেসেগুলোই তুলে ধরে ব্যানার-ফেস্টুনগুলোতে লেখা হয়েছেনিজের ভাষা নিজের থাক

 

নিজের ভাষা নিজের থাক লাইনটা পড়ার পর থেকে একটা শৈশব কোচবিহার জেলার জেনকিন্স স্কুলের বাংলা ক্লাসে গিয়ে দাঁড়ায় দেবজ্যোতি বাবু পড়াচ্ছেন বাংলা ভাষার ইতিহাস গোটা ক্লাসরুমে টু শব্দটি নেই কেবল দেবজ্যোতি বাবুর ভরাট গলায় শোনা যাচ্ছে-

বাংলাভাষা মুলত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষামূল থেকে সৃষ্ট খ্রিস্টের জন্মের প্রায় হাজার দেড়েক বছর আগে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী আর্য জাতি ইরান ছেড়ে ভারতের পশ্চিম-পাঞ্জাবে আসে এবং তারপর পূর্ব-ভারতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এদের ভাষাকে আদি ভারতীয় আর্যভাষা বলা হয় বৈদিক সংস্কৃত ভাষাও এই ভাষা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে



খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ পর্যন্ত এই ভাষা বিকশিত হতে থাকে এরপরে প্রাকৃতজনের মুখের উচ্চারণে তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের পরিবর্তন হয় এই পর্বের নামপ্রাকৃত ভাষা খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় ৬০০ অব্দ পর্যন্ত এই প্রাকৃত ভাষার সময়কাল এই পর্যায়ের প্রথম ভাষার নাম পলিভাষা, দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রাকৃত পালিভাষা বুদ্ধদেবের সময়েই তৈরি হয় প্রাকৃত ভাষায় কিছু সাহিত্য রচিত হয়েছে অঞ্চলভেদে প্রাকৃতের চারটি রূপ: শৌরসেনী প্রাকৃত, মাহারাস্টী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত, অধমাগধী বা জৈন মাগধী প্রাকৃত মাগধী প্রাকৃত ভাষায় লিখিত নাটকে নিকৃষ্টজনের ভাষা হসিাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা পূর্বভারতের প্রতি বৈয়াকরণদের তাচ্ছিল্যের দৃষ্টান্ত আমাদের বাংলা ভাষা এই মাগধীরই উত্তরপুরুষ প্রাকৃত ভাষারও ব্যকরন ছিল ক্রমে ভাষা পরিবর্তিত হতে থাকে একে অপভ্রংশ বলা হয় মাগধী প্রাকৃত থেকে মাগধী অপভ্রংশের আবির্ভাব হয়েছে এই ভাষার অন্য অপভ্রংশগুলোর নাম মৈথিলী, মগহী, ভোজপুরিয়া, অসমীয়া ওড়িয়া মাগধী অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম হয় খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে এরপর থেকে বাংলা ভাষা আধুনিককাল পর্যন্ত অনৈক বিবর্তিত হয়েছে সময়ের সাথে সাথে



আদি যুগের বাংলা ভাষা বা প্রাচীন বাংলা ভাষার সীমা খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ে ওই সময়কার ভাষার পরিচয় পওয়া যায় এরপর মধ্যযুগের বাংলা ভাষা প্রচলিত ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতাব্দীর সময়কালের ভাষায় তেমন কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না চতুর্দশ পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলা কাব্যে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে তাকে মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার প্রথম পর্যায় হিসাবে অভিহিত করা হয় বড়ু চণ্ডিদাসেরশ্রীকৃষ্ণ কীর্তন এই সময়ে রচিত চর্যাপদের পর দুয়েক বছরের মধ্যে বাংলা ভাষায় আরও বিবর্তন হয়, অপভ্রংশ-প্রাকৃত শব্দের ব্যবহার কমে এসেছিল ব্যাকরণ ধ্বনীতত্ত্বের বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে কিছু তৎসম শব্দও ব্যবহৃত হতে শুরু করে খ্রিস্টীয় ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ অর্থাৎ ভারতচন্দ্রের মৃত্যু (১৭৬০) পর্যন্ত মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার অন্ত্য পর্যায় বিস্তৃত এসময় বৈষ্ণব সাহিত্য পৌরানিক অনুবাদ সাহিত্যের দ্বারা প্রচুর তৎসম শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করে এছাড়া প্রচুর আরবি শব্দও প্রবেশ করতে থাকে এরপর ইংরেজ আমলে ইংরেজি-ফরাসি-পর্তুগিজ শব্দ বাংলায় প্রবেশ করতে শুরু করে



ঊনবিংশ শতাব্দীতে নাগরিক জীবনে সাধু চলিত ভাষা সাহিত্যে প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে সাধু ভাষা মধ্যযুগের পয়ার-ত্রিপদীতে ব্যবহৃত হতো এরপরে অঞ্চলে মানুষের মুখের ভাষার ব্যবহৃত রূপ চলিত ভাষা হিসাবে লেখায় স্থান করে নিতে শুরু করে বর্তমানে সাধু ভাষার লিখিত রূপ প্রায় উঠে গেছে, সেখানে প্রমিত ভাষা নামে মুখের ভাষারই একটি রূপ ব্যবহৃত হচ্ছে


গাড়ির আওয়াজে ঘোর কাটে ভাষার আগ্রাসন নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনে হলো, বিভিন্নভাবে একেকটি ভাষা অন্য একটি ভাষার ভেতর প্রবেশ করে যায় আধিপত্য, বাণিজ্য, যাযাবরবৃত্তির কারণে একেকটি ভাষা অন্য একটি ভাষার শব্দে নিজের স্থান করে নেয় এতে গ্রাসকারী ভাষাটি সমৃদ্ধ হয় সন্দেহ নেই  মনে মনে বাংলা ভাষার ভেতর আরবি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি বহু ভাষার শব্দগুলো খুঁজতে লাগলাম এইসব ভাষার শব্দগুলো বেশিরভাগ দস্যু যাযাবর লুটেরা বাংলায় সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টাকালে তাদের ধর্ম ভাষাকেও আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার বানিয়েছিল

আমাদের বাংলা ভাষার ওপর সর্বশেষ যে দুটো আগ্রাসী ভাষা আগ্রাসন চালাচ্ছে তা হলো- ইংরেজি আর হিন্দি এদের আক্রমণের উপায় ভিন্ন এরা আমাদের কাছে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ডাকাতি করছে হিন্দি ভাষার আগ্রাসন নিয়ে লাগাতার সরব হতে হয়েছে দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলির সঙ্গে বাংলা, আসাম বা ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলিকেও এমনকিহিন্দী দিবসউপলক্ষে বর্তমান ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তো মন্তব্য করেই বসেছিলেন যে, ভারতের একটি জাতীয় ভাষা থাকা প্রয়োজন! কিন্তু সেই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে থিতিয়ে যাওয়ার পরেই সদ্য সামনে আসা কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শিক্ষানীতি সেই বিতর্কে ঘি ঢালল আবার এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার গৈরিকীকরণ করার অভিযোগ উঠেছে প্রবলভাবে দেশের সমস্ত রাজ্যগুলিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করতে বলা হয়েছে হিন্দিকে স্বাভাবিকভাবেই এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি সরব হয়েছে পশ্চিমবঙ্গও এই নতুন শিক্ষা তথা ভাষা নীতির পিছনে সরকারের মেরুকরণের রাজনীতি কাজ করছে বলে দাবি বিরোধীদের উল্টোদিকে সরকারি নীতির সমর্থকরা দাবি করেছেন সেই চিরাচরিত ভুল যুক্তিতে, যে রাষ্ট্রভাষা হিন্দি শিখতে আপত্তিটা কোথায়!স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ ভারত একদিন স্বাধীন হবে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা কী হবে? শান্তিনিকেতনে . মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অনেকের উপস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের প্রদেশগুলোতে প্রাদেশিক ভাষার প্রচলন যেমন আছে ঠিক তেমনি থাকবে তবে রাষ্ট্রভাষা হতে হবে ইংরেজিতিনি যে কত দূরদর্শী এবং অগ্রবর্তী চেতনাসমৃদ্ধ ছিলেন তার এই মন্তব্যটি বর্তমান বাস্তবতায় এক অনন্য নজির

অনেক বছর আগে এক আড্ডায় বলেছিলাম পুঁজিবাদ শুধু পণ্যনির্ভর নয়, ভাষানির্ভরও বন্ধুরা সব হেসেছিল,এত বছর পরে সেই কথা মনেও ছিল না দিন কতক আগে এক বন্ধু কথাটি মনে করিয়ে দিয়ে বললো তোর সেইদিনের কথাটা তখন না বুঝে হেসেছিলাম কিন্তু আজ বুঝি তুই কি বলেছিলি আজ এই বয়সে এসে বুঝতে পারছি,বড় পুঁজির যারা কারবার করে, তাদের ভাষাও যে আধিপত্য বিস্তার করবে এটা পুঁজিবাদের ধর্ম পণ্যায়ন মানুষকে নীতি, ভাষা সংস্কৃতিহীন করে তোলে ক্রমশ ভোক্তাকে সাংস্কৃতিক শেকড়হীন করে তোলার ভেতর বাণিজ্য বিস্তারের রাজনীতি আছেবিশ্বায়নএই ব্যবস্থার প্রকল্প অন্যান্য ব্যবসার মতোই তারা ভাষা শিক্ষা ব্যবসায় নিয়েছে লাভজনক পরিকল্পনা সারা পৃর্থিবীতে ইংরেজি এক ভয়াবহ দানবে পরিণত হয়েছে এই বিশ্বায়নের যুগে মূল আধিপত্যই ভাষাভিত্তিক

 

মনে পড়ে সাহিত্যে একটা সময় পাই লেখার সঙ্গে বা কথা বলার ফাঁকে একটু-আধটু ফরাসি বা হিস্পানি বলাটা আভিজাত্যের পর্যায়ে পড়ত রাশিয়ার সাহিত্যিক তলস্তয় বা দস্তইয়েভস্কি বা অন্যান্য লেখকের লেখাতেও প্রচুর ফরাসি উদ্ধৃতি চোখে পড়ে বিশ্বব্যাপী সেই জায়গাটা শুধু ইংরেজি দখলই করেনি, পুরোপুরি ইংরেজিতে লিখতে পড়তে চিন্তা জীবনযাপন করতে প্রলুব্ধ করেছে, বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন ভঙ্গিমায়



বন্ধুটির কথার পিঠে কথা জুড়ে দিয়ে বলেছিলাম এই বিশ্বায়নের আসল সিপাহসালার ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডব্লিউটিও) জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড ইন সার্ভিসেস (গ্যাটস) ডব্লিউটিও অসাবধানী অনিচ্ছুক রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে তাদের নীতিগুলো চাপিয়ে দিচ্ছে এই আক্রমণের ফলে ডব্লিউটিও আবিষ্কার করেছে, চিন্তা উৎপাদনের সম্ভাব্যতা এই উৎপাদিত চিন্তার ক্রেতা, ভোক্তা বিক্রেতাদের মনস্তত্ত্ব বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের স্কুল ভাউচার প্রোগ্রাম, গণশিক্ষার ক্ষেত্রে করপোরেট অনুদানসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রকল্প চালু করে শিক্ষার জগতে নিজেদের ব্যবসার অনধিকার প্রবেশের সুযোগ করে নিয়েছে শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা জড়িত ফলে শিক্ষাকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখার বিষয়টা এতদিন অনৈতিক ছিল



কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শিক্ষাকেও বাজারব্যবস্থার আওতায় আনার ফলে শিক্ষা এখন শিক্ষক-ছাত্রের ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যান্য পণ্য উৎপাদনকারী করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাইভেট স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় বিনিয়োগের মাত্রা বাড়িয়েছে বিশ্ব শিক্ষাব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক করপোরেট বাণিজ্যের অন্যতম লাভজনক ব্যবসা



যুক্তরাষ্ট্র কেবলমাত্র ১৯৯৬ সালেই . বিলিয়ন ডলার মূল্যের শিক্ষা রপ্তানি করেছে আর এতে তাদের লাভের পরিমাণ বিলিয়ন ডলার আর গ্যাটসের কাজ হলো- শিক্ষাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ করা মোস্ট ফেভারিট নেশন ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট গ্যাটসের প্রধান দুই নীতি প্রথমটির বক্তব্য বাস্তবায়নের বিষয় হলো সমস্ত জাতি বা দেশকে অভিন্ন হিসাবে গণ্য করে আমদানি-রপ্তানির গতি ত্বরান্বিত করা দ্বিতীয়টির লক্ষ্য সমস্ত জাতি রাষ্ট্রগুলো বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও তাদের দেশীয় কোম্পানির মতোই সুযোগ সুবিধা দেবে ভাবনার যথাযথ বাস্তবায়ন করা এই দুটি নিয়মের পিছনেই রয়েছে বিশ্ব মুক্তবাজার ব্যবস্থা তৈরির নীলনকশা শিক্ষার ক্ষেত্রে গ্যাটসের এই নীতি বিশ্ব শিক্ষাব্যবস্থাকে একই ছাতার তলায় হাজির করেছে



আর বলাই বাহুল্য এই শিক্ষা ব্যবসার প্রধান বাহন হচ্ছে ইংরেজি অন্য একটি ভাষায় দক্ষতা থাকা মোটেই অযোগ্যতা নয় অন্য ভাষা না জানলে আমরা অনেক মৌলিক সাহিত্য পেতাম না কিন্তু আপত্তিটা সেখানেই- বিনোদন, বাণিজ্যিক প্রয়োজন, শিক্ষার ছদ্মবেশে যেখানে ভাষাটা রাক্ষসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়!



ভাষার আধিপত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহায়ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে কেনিয়ার লেখক নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো তারডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ডবইয়ে চমৎকার কিছু তথ্য জ্ঞাপন করেন, ‘ইংরেজিকে রক্ষার স্বার্থে সবকিছুকে, সবাইকে মাথা নত করতে হবে মাতৃভাষায় কথা বলা অবস্থায় ধরা পড়লে কঠিন শারীরিক শাস্তি ভোগ করতে হতো; লেখা থাকত আমি আহাম্মক কিংবা আমি গাঁধা মাঝে মাঝে অপরাধীকে জরিমানা গুনতে হতো জরিমানার টাকা বেশিরভাগ অপরাধীর পক্ষে জোগাড় করা কঠিন ছিল শিক্ষকগণ অপরাধীদের ধরতেন কীভাবে? একজন ছাত্রের হাতে দিয়ে দেয়া হতো একটি বোতাম মাতৃভাষায় কথা বলার অপরাধে যে ধরা পড়ত, তার হাতে আগের ছাত্রটি দিয়ে দিত সেই বোতাম দিনের শেষে যার হাতে পাওয়া যেত সেই বোতাম তাকে ধরলেই বের হয়ে পড়ত সারা দিনে কে কে মাতৃভাষায় কথা বলার অপরাধ করেছে এভাবেই শিশুদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হতো নিকটজনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে কতখানি মজা পাওয়া যায়



এভাবে তৃতীয় বিশ্বের মননের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে ভাষা তথা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ অর্থনীতিতে দুর্বল আর অসাবধানী দেশের ভাষাকে ক্রমে গ্রাস করছে ইংরেজি নামের সাদা তিমিটি



ডেভিট ক্রিস্টাল তারভাষার মরণগ্রন্থে একটা চমৎকার তথ্য সন্নিবেশিত করেছেন তিনি এতে বলেছেন, ‘এই পৃথিবীর ছয় হাজার ভাষা ইংরেজির প্রভাবে এই শতাব্দীতেই ধ্বংস হয়ে যাবে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে ইউনাইটেড আরব আমিরাতের দুবাই শহরটির আরবি ভাষা নষ্ট হয়ে গিয়ে ইংরেজি ভাষাভিত্তিক এক নতুন শহরে পরিণত হবে এসব কথা বলছি, তার মূল কারণ হলো- শিক্ষার মাধ্যম হলো ভাষা যদি বিশ্বজুড়ে একটি ভাষার আধিপত্য বিস্তার করা যায়, তাহলে শিক্ষার যে ট্রিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, তা গগণচুম্বী হতে পারে



ইউনেস্কো স্ট্যাটেসটিক্যাল ইয়ারবুক ১৯৯৬ সালে একটা চিত্র দেখায় এই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাত্র ১১টি ভাষা এখন তাবৎ জাহানের মাতৃভাষা এর মধ্যে শীর্ষে আছে মান্দারিন চায়নিজ



আজ ইংরেজি নিয়েছে সাদা তিমির ভূমিকা ইউনেস্কোর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইংরেজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সব ভাষাই মোটামুটি তাদের অবস্থান পাল্টিয়ে নিতে সচেষ্ট



লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কেবল বাংলা ভাষা তার নিজস্ব স্থানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে, হিন্দি আর ইংরেজি সবার বেডরুমে ঢুকে গেছে অথচ ভারতীয় উপমহাদেশে এই ভাষা আলাদা সমীহ পেত একসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ভাষাই দক্ষিণ এশিয়ার মুখ উজ্জ্বল করেছিল আরবাঙলাশব্দটাই মূলত একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা একান্তই ভাষাগত



বাংলাদেশের সাহিত্যেও ইংরেজিকেন্দ্রিক এক ধরনের হীনম্মন্যতা লক্ষ্য করা যায় এখানে ইংরেজিতে বই পড়তে না পারলে যেন জাতে ওঠা যায় না এটা একটা হীনম্মন্য ধারণা মাত্র বিশেষ কোনো ভাষায় আছে জ্ঞান অর্জনের নির্দিষ্ট পথ- ধরনের বক্তব্য রাজনীতি হীনম্মন্যতা প্রসূত যেকোনো ভাষাতেই জ্ঞান অর্জন সম্ভব ইংরেজি না জানা সত্ত্বেও এক ধরনের সাহিত্য চর্চাকারীকে দেখা যায় ইংরেজি বই হাতে নিয়ে ঘুরতে কথায় কথায় তারা বলে এদেশের সাহিত্যে কিচ্ছু নাই কিছু হচ্ছে না ধরনের বিদঘুটে ধারণা অন্তদারিদ্র্যের পরিচয় বহন করে তারা নিজেদের অজান্তেই প্রায় সংক্রমিত



বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রাইভেট রেডিওতেও অদ্ভুত ধরনের একটা বাংলা-ইংরেজি মিশেল ভাষা বলার চেষ্টা হচ্ছে এর পেছনে কারা আছে খুঁজে বের করা জরুরি কেন তারা ধরনের আজগুবি ভাষা প্রচারে মেতে উঠেছে তা ভেবে দেখা দরকার এখন কথা হচ্ছে ইংরেজির এই দানবীয় আচরণে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার প্রয়োজন আছে কিনা নাকি ইংরেজি টাইফুনে ঘুমের মধ্যে ভেসে যাওয়াই বাংলা ভাষার নিয়তি



ফরাসি লেখাপত্র অনুবাদ করার জন্য ইংল্যান্ডে আলাদা ডিপার্টমেন্ট আছে বিভিন্ন ভাষা থেকে সাহিত্য অনুবাদ করার জন্য সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য একাদেমিতে মূল ফেঞ্চ, হিস্পানি, রুশ থেকে অহরহ বই বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে অথচ বাংলা পুরো বাংলাদেশের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আক্রান্ত ঢাকার বাংলা একাডেমি সরকারি আমলা, রাজনীতিবিদ আর বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের হাবিজাবি ছাপাতে ব্যস্ত বাংলা ভাষাকেও বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে হয়তো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে, অন্যান্য বড় দুর্ধর্ষ ভাষার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সমস্ত ক্ষমতা অর্জন করতে হবে নয়তো নীরবে বিলীন হয়ে যেতে হবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় দ্রুতই চলে যাচ্ছে যে বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে কিনা সেই প্রস্তুতি বাংলার আছে কিনা!



সম্ভবত প্রতিটি ভাষারই আগ্রাসি একটা রূপ আছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও সেটা সত্য বিশ্বায়নের বিরূপ প্রভাবে ভাষা সংস্কৃতির স্বকীয়তা-বৈচিত্র এখন হুমকির কবলে এর থেকে রক্ষা পেতে প্রত্যেক জাতিকে তার ভাষা-সংস্কৃতির রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে ভাষা বৈচিত্র্যের পৃথিবীতে বৈচিত্র থাকাটা আবশ্যক এবং জরুরিও সব জাতিসত্তার ভাষা-সংস্কৃতি টিকে না থাকলে পৃথিবী বৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়বে যেটা মোটেই কাঙ্খিত হতে পারে না

 

 

 

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন